অপরের সুখ-সম্পদ দর্শনে অসন্তুষ্ট হইয়া মনে কষ্ট অনুভব করা এবং তাহার সেই সুখ-সম্পদ দূর হওয়ার কামনাকে ঈর্ষা বলে। ঈর্ষা হারাম। হাদীসের বিভিন্ন উক্তি, আল্লাহর কার্য ও বিধানের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির অসন্তোষ প্রকাশ এবং অপরের সুখ-সম্পদে তাহার ঈর্ষা উদ্রেকের জঘন্য ও ক্ষতিকর মনোভাব ঈর্ষা হারাম হওয়ার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। যে সম্পদ তুমি লাভ করিতে পার নাই, অপরের ভাগ্যে ঘটিয়াছে দেখিয়া তাহা লোপ হউক, তোমার এই মনোভাবকে জঘন্য ও কদর্য ব্যতীত আর কী বলা যাইতে পারে?
পারলৌকিক কার্যে প্রতিযোগিতা মঙ্গলজনক
অপরের সম্পদ লাভে যদি তুমি অসন্তুষ্ট না হও এবং ইহা নষ্ট হওয়ার কামনাও না কর, অথচ তুমি সেইরূপ সম্পদ পাইতে চাও, তবে তোমার এই প্রকার মনোভাবকে গিত্তা (প্রতিদ্বন্দ্বিতা) এবং মুনাফাসা (প্রতিযোগিতা) বলে। পারলৌকিক কার্যে উহা উত্তম, বরং অবশ্য কর্তব্য। আল্লাহ্ বলেন :
>“আর লালসাকারিগণের পক্ষে এইরূপ জিনিসের প্রতি লালসা করা উচিত।”
আল্লাহ্ অন্যত্র বলেন :
>“তোমরা আপন প্রভুর ক্ষমার দিকে ধাবিত হও।”
অর্থাৎ “দৌড়িয়া চল, একজন অপরজন অপেক্ষা অগ্রসর হইতে চেষ্টা কর।”
রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন-
>“দুইটি স্থলে ঈর্ষা হইয়া থাকে। প্রথম- আল্লাহ্ কোন ব্যক্তিকে ধন ও জ্ঞান উভয়ই দান করিয়াছেন, সে স্বীয় ধন জ্ঞান অনুসারে সদ্ব্যবহার করে; অপর ব্যক্তিকে তিনি ধন ব্যতীত শুধু জ্ঞান দান করিয়াছেন, তেমন ব্যক্তি যদি সেই ব্যক্তিকে দেখিয়া বলে- “আল্লাহ্ আমাকেও ধন দান করিলে আমিও তাহার ন্যায় (সৎকার্যে) ব্যয় করিতাম” তাহা হইলে এই দুই ব্যক্তিই সমান সওয়াব পাইবে। আর কেহ যদি পাপকার্যে ধন অপচয় করে এবং অপর ব্যক্তি (ইহা দেখিয়া) বলে- 'আমার ধন থাকিলে আমিও তদ্রূপ (পাপ কার্যে) অপচয় করিতাম', তাহা হইলে এই দুই ব্যক্তিই সমান পাপী হইবে।”
এই হাদীসে প্রথমোক্ত স্থলে প্রথম ব্যক্তির ধন-দৌলতের সমান দ্বিতীয় ব্যক্তির ধন লাভের ইচ্ছাকে ‘মুনাফাসাত' না বলিয়া ‘হাসাদই' বলা হইয়াছে। কিন্তু ইহাতে প্রথম ব্যক্তির ধন-দৌলত লাভে দ্বিতীয় ব্যক্তির মনে বিরক্তি, অসন্তোষ ও সেই ধন বিলুপ্তির কামনা নাই।বিরক্তি কোন স্থলেই জায়েয নহে।
কুকর্ম সহায়ক সম্পদের বিনাশ-কামনা সঙ্গত
কাহারও সম্পদ বিলোপের কামনা সঙ্গত নহে; কিন্তু যে সম্পদ দুরাচার ও অত্যাচারীর হস্তগত হইলে তাহাদের অপকর্ম ও অত্যাচারের কারণ হয়, উহার বিলোপ কামনা জায়েয। বাস্তবপক্ষে, ইহা সম্পদ বিলোপের কামনা নহে, বরং অপকর্ম ও অত্যাচারের প্রতিরোধ কামনামাত্র। কিন্তু দুরাচার ও অত্যাচারীর সম্পদ বিনাশের কামনা বাস্তবপক্ষে তাহাদের অপকর্ম ও অত্যাচার প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে হইল কিনা ইহা বুঝিবার উপায় এই— তাহারা তওবা করিয়া অপকর্ম ও অত্যাচার হইতে নিরস্ত হইলে তাহাদের সম্পদ বিলোপের কামনা তোমাদের অন্তরে যদি না থাকে, তবে মনে করিবে, ইহা পাপকর্ম প্রতিরোধের জন্যই ছিল। কিন্তু তখনও তোমাদের অন্তরে তাহাদের সম্পদ বিলোপের কামনা থাকিলে বুঝিবে, ইহা ঈর্ষা ব্যতীত আর কিছুই নহে।
সম্পদের অসমতায় ঈর্ষার উৎপত্তি
এ স্থলে একটি সুক্ষ্ম বিষয় বর্ণনা করা হইতেছে। মনে কর, আল্লাহ্ কাহাকেও কোন বিশেষ সম্পদ দান করিলেন। অপর ব্যক্তিও এইরূপ সম্পদের জন্য লালায়িত হইল, কিন্তু কিছুতেই সে ইহা লাভ করিতে পারিল না। এমতাবস্থায়, সম্পদের অসমতা দেখিয়াই তাহার মন বিরক্ত হইয়া উঠিল। তখন সম্পদশালীর সম্পদ বিনাশ হইয়া অসমতা বিদূরীত হইলে তাহার মনঃকষ্ট দূর হইতে পারে। অপরের সম্পদ দেখিলেই মানব মনে ইহার অভিলাষ হয়। কিন্তু ইহা অর্জনে অসমর্থ হইয়া অপরের সম্পদ বিনাশের কামনা করাই ক্ষতিকর বলা চলে না। কিন্তু এইরূপ সম্পদ প্রত্যাশী ব্যক্তি সম্পদশালীর বিষয়ে অবাধ ক্ষমতা পাইলেও সে ইহা বিনাশ না করিলে বা ছিনাইয়া না লইলে মনে করিবে, তাহার হৃদয়ে ঈর্ষা নাই। এমতাবস্থায়, অপরের সমান সম্পদ লাভের কামনা অন্তরে থাকিলেই সে আল্লাহর বিচারে দায়ী হইবে না।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন