রবিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৩

ঈর্ষা ও ইহার আপদ

    

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১১)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ঈর্ষা ও ইহার আপদ 
ক্রোধ হইতে বিদ্বেষ এবং বিদ্বেষ হইতে ঈর্ষা জন্মে। ঈর্ষা নিতান্ত অনিষ্টকর দোষসমূহের অন্যতম।

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- 

>“আগুন যেমন শুষ্ক কাষ্ঠ জ্বালাইয়া দেয়, ঈর্ষাও তদ্রূপ নেকীসমূহ ধ্বংস করিয়া ফেলে।” 

তিনি আরও বলেন “কেহই তিনটি বিষয় হইতে মুক্ত হইতে পারে না; (উহা এই) (১) বদগুমান (কুধারণা), (২) ঈর্ষা ও (৩) মন্দ ফাল (অর্থাৎ শুভাশুভ লক্ষণ-বিচার, যেমন শূণ্য কলসী, শিয়াল-কুকুরের ডাক, হাঁচি, টিকটিকি প্রভৃতিকে কুলক্ষণ বলিয়া গণ্য করা)। আমি তোমাদিগকে উহার প্রতিষেধক জানাইয়া দিতেছি; (তোমাদের মনে কাহারও সম্বন্ধে) বদগুমান হইলে মনে মনে ইহার সত্যতা অনুসন্ধানে লিপ্ত হইও না এবং অন্তরে ইহা পুষিয়া রাখিও না। মন্দ ফাল দেখিলে বিশ্বাস করিও না। ঈর্ষার উদ্রেক হইলে ইহার বশীভূত হইয়া হস্ত ও রসনা সঞ্চালন করিও না।” 

তিনি আরও বলেন 

>“হে মুসলমানগণ, যে বস্তু তোমাদের অগ্রগামী বহু জাতিকে ধ্বংস করিয়াছে, তাহা তোমাদের মধ্যে উৎপত্তি হইতে আরম্ভ করিয়াছে। উহা ঈর্ষা ও শত্রুতা। যে আল্লাহর হাতে মুহাম্মদের (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)  প্রাণ, তাঁহার শপথ, ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত তোমরা বেহেশতে যাইতে পারিবে না; আর তোমরা যে পর্যন্ত পরস্পরকে ভালবাসিবে না সেই পর্যন্ত তোমরা ঈমানদার হইতে পারিবে না। আর ভালবাসা কি উপায়ে লাভ করা যায়, তোমাদিগকে জানাইয়া দিতেছি- তোমরা পরস্পরকে প্রকাশ্যে সালাম দিতে থাক।”


হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম এক ব্যক্তিকে আরশের ছায়াতলে দেখিয়া মনে করিলেন যে, তিনি আল্লাহর নিকট উচ্চ মরতবার অধিকারী। তাঁহার সেই মরতবা লাভের ইচ্ছা হইলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন- “হে খোদা, এই ব্যক্তি কে এবং তাঁহার নাম কি?” আল্লাহ্ তাঁহার নাম ব্যক্ত না করিয়া তাঁহার কার্যকলাপের সংবাদ দিয়া বলিলেন- 

>“এই ব্যক্তি কখনও ঈর্ষা করে নাই, মাতাপিতার নাফরমানি করে নাই এবং একের কথা অপরের কানে লাগায় নাই।” 


হযরত যাকারিয়্যা আলায়হিস্ সালাম বলেন যে, আল্লাহ্ বলেন- 

>“ঈর্ষী ব্যক্তি আমার নিআমতের শত্রু এবং আমার বিধানের উপর বিরক্ত ও আমার বান্দাগণের মধ্যে আমি যেভাবে (আমার নিআমত) বন্টন করিয়া দিয়াছি, সে উহা পছন্দ করে না।”


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- 

>“ছয় প্রকার পাপের ফলে ছয় শ্রেণীর লোক বিনা বিচারে দোযখে যাইবে; (তাহা এই) 

(১) শাসনকর্তা অত্যাচারের জন্য; 

(২) আরববাসী- অন্যায় পক্ষপাতিত্বের জন্য; 

(৩) ধনবান ব্যক্তি অহঙ্কারের জন্য; 

(৪) বণিক- খিয়ানত অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাতের জন্য; 

(৫) গ্রাম্য গঁওয়ার লোক- অজ্ঞানতা ও মূর্খতার জন্য এবং 

(৬) আলিম ব্যক্তি ঈর্ষার জন্য।” 


হযরত আনাস রদিয়াল্লাহু আন্হু বলেন- “একদা আমরা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি বলিলেন 

>"বেহেশতী লোকদের অন্তর্ভুক্ত একজন এখন আসিতেছে।" আসার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এক ব্যক্তি তখন আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহার বাম হস্তে পাদুকা ঝুলিতেছিল এবং তাঁহার দাঁড়ি হইতে ফোঁটা-ফোঁটা ওযুর পানি পড়িতেছিল। দ্বিতীয় দিনও হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এই কথাই বলিলেন, আর ঐ ব্যক্তিই আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ক্রমাগত তিন দিবস এরূপ ঘটনাই ঘটিল। হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর ইবন আস সেই আনসারীর কার্য-কলাপ কিরূপ, জানিবার জন্য কৌতূহলী হইলেন। তিনি তাঁহার গৃহে যাইয়া বলিলেন— ‘আমি আমার পিতার সহিত ঝগড়া করিয়াছি। আপনার গৃহে তিন রাত্রি থাকিতে ইচ্ছা করি।' তিনি বলিলেন- 'আচ্ছা বেশ, তিনি (হযরত আবদুল্লাহ) ক্রমাগত তিন রজনী তাঁহার সংসর্গে অবস্থান করত তাঁহার ক্রিয়া-কলাপ লক্ষ্য করিলেন। যখনই তাঁহার নিদ্রা ভঙ্গ হইত তখনই তিনি আল্লাহর যিকির করিতেন; এতদভিন্ন তাঁহার অন্য কোন বিশেষ আমল (কাজ) তিনি দেখিতে পাইলেন না। তখন তিনি (হযরত আবদুল্লাহ্) বলিলেন- 'আমি স্বীয় পিতার সহিত ঝগড়া করি নাই; কিন্তু রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আপনার সম্বন্ধে এইরূপ বলিলেন (সুসংবাদ দিলেন), এইজন্য আপনার ক্রিয়া-কলাপ জানিতে আসিয়াছিলাম।' তিনি (আনসারী) বলিলেন- 'আপনি যাহা দেখিলেন তদ্ব্যাতীত আমার আর কোন কার্য-কলাপ নাই।' হযরত আবদুল্লাহ (রঃ) চলিয়া যাইতে লাগিলে তাঁহাকে ডাকিয়া তিনি (আনসারী) বলিলেন- 'আরও একটি কথা আছে, আমি কাহারও সৌভাগ্যে ঈর্ষা করি নাই।' তিনি (হযরত আবদুল্লাহ) বলিলেন- 'তজ্জন্যই আপনার এই মরতবা।”


হযরত আওন ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রঃ) এক বাদশাহকে উপদেশ প্রদান করিয়া বলিলেন— 

>“কখনও অহঙ্কার করিও না, কারণ অহঙ্কারেই সর্বপ্রথম পাপ হইয়াছিল; অহঙ্কারের জন্যই শয়তান হযরত আদম আলায়হিস সালামকে সিজদা করে নাই। লোভ হইতে দূরে থাক; কেননা, লোভই হযরত আদম আলায়হিস সালামকে বেহেশত হইতে বাহির করিয়াছিল। কখনও ঈর্ষা করিও না; কারণ ঈর্ষার জন্যই সর্বপ্রথম খুন হইয়াছিল; ইহারই প্রভাবে হযরত আদম আলায়হিস সালামের পুত্র স্বীয় ভ্রাতাকে বধ করিয়াছিল। আর হযরত সাহাবা রদিয়াল্লাহু আনহুমের জীবন-চরিত্র আলোচনা, আল্লাহ্ প্রশংসাবলী বর্ণনা বা নক্ষত্ররাজির প্রসঙ্গ হইলে নীরবে শ্রবণ কর, কথা বলিও না।”

হযরত বকর ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন- “এক ব্যক্তি প্রত্যেকদিন এক বাদশার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া বলিত- ‘সাধু ব্যক্তির সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর, দুর্বৃত্তকে তাহার কার্যফলের উপর ছাড়িয়া দাও। কারণ, তাহার কু-কর্মই তাহাকে যথাযোগ্য শাস্তি প্রদান করিবে।' এই নীতিবাক্যের জন্য বাদশাহ তাহাকে ভালবাসিতেন। এক ব্যক্তি তৎপ্রতি ঈর্ষান্বিত হইয়া বাদশাহকে জানাইল- 'ইহার প্রমাণ কি?' সে বলিল ‘আপনি তাহাকে নিকটে আহবান করিয়া দেখুন, দুর্গন্ধ যাহাতে নাসিকায় প্রবেশ না করে তজ্জন্য সে হাত দ্বারা নাসিকা ঢাকিয়া রাখিবে।' অপরদিকে এই ঈর্ষান্বিত ব্যক্তি ঐ লোকটিকে স্বীয় গৃহে লইয়া যাইয়া কাঁচা রসুন মিশ্রিত খাদ্য অধিক পরিমাণে ভোজন করাইল। তৎপরই বাদশাহ তাহাকে নিকটে আহবান করিলেন। বাদশার নাসিকায় যাহাতে রসুনের দুর্গন্ধ প্রবেশ না করে তজ্জন্য সে হাত দ্বারা স্বীয় মুখ ঢাকিয়া রাখিল। বাদশাহ বুঝিলেন, ঐ ব্যক্তি সত্যই বলিয়াছে। বাদশাহর অভ্যাস ছিল যে, মহাপুরস্কার প্রদানের আদেশ ব্যতীত অন্য কিছুই স্বহস্তে লিখিতেন না। ঐ ব্যক্তির প্রতি বাদশাহ ক্রুদ্ধ হইয়া স্বহস্তে আদেশপত্র লিখিলেন— ‘পত্রবাহকের শিরচ্ছেদ করিয়া তাহার চর্মে ভূষি ভর্তি করত আমার নিকট প্রেরণ কর।' আদেশপত্রটি বাদশাহ নিজ হস্তে খামে পুরিয়া মোহর আঁটিয়া সেই ব্যক্তি মারফত তাঁহার এক কর্মচারীর নিকট প্রেরণ করিলেন। সেই ব্যক্তি আদেশপত্র হস্তে দরবার হইতে বহির্গত হইলে ঐ ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি দেখিতে পাইয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল- 'ইহা কি?' সে বলিল ‘মহাপুরস্কারের আদেশপত্র।' ঐ ঈর্ষী ব্যক্তি তাহার নিকট হইতে তৎপর আদেশপত্রটি লইয়া গেল। সে ইহা ঐ কর্মচারীর হস্তে দিবামাত্র তিনি তাহাকে বলিলেন- 'ইহাতে তোমাকে হত্যা করিয়া তোমার চর্মে ভূষি ভর্তিপূর্বক বাদশাহর নিকট প্রেরণের আদেশ রহিয়াছে।' সে বলিল- 'সুবহানাল্লাহ্, এই আদেশ ত অপর এক ব্যক্তির উপর প্রদত্ত হইয়াছে। বিশ্বাস না হয় বাদশাহর নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া দেখুন।' কর্মচারী বলিলেন ‘ইহাই বাদশাহর আদেশ, পুনরায় তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিব কেন?' অনন্তর কর্মচারী সেই ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তিকে হত্যা করিয়া ফেলিলেন। সেই ব্যক্তি পূর্ববৎ বাদশাহর সম্মুখে দন্ডায়মান হইয়া পরদিন সেই নীতিবাক্য উচ্চারণ করিল। বাদশাহ বিস্ময়ে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন- 'ঐ পত্র কি করিলে?' সে বলিল- 'অমুক ব্যক্তি আমার নিকট হইতে চাহিয়া লইয়া গেল।' বাদশাহ বলিলেন- 'ঐ ব্যক্তি ত আমার নিকট বলিয়াছিল তুমি এইরূপ কথা বলিয়াছ।' সে উত্তর দিল- ‘আমি কখনও সেইরূপ কথা বলি নাই।' বাদশাহ আবার জিজ্ঞাসা করিলেন- 'আচ্ছা, তাহা হইলে সেই দিন তুমি মুখ ও নাসিকা হস্ত দ্বারা ঢাকিয়া রাখিয়াছিলে কেন?' সে বলিল- 'সেই ব্যক্তি আমাকে কাঁচা রসুন খাওয়াইয়া ছিল।’ বাদশাহ বলিলেন- 'তুমি যে প্রত্যহ বল- ‘দুর্বৃত্তের কর্মই তাহার শাস্তিদাতা' ইহা সত্যে পরিণত হইল।”


হযরত ইব্‌ন সীরান (রঃ) বলেন- “পার্থিব উন্নতিতে আমি কাহাকেও ঈর্ষা করি নাই। কারণ, সেই ব্যক্তি বেহেশতী হইয়া থাকিলে বেহেশতের নিআমতের তুলনায় দুনিয়া নিতান্ত তুচ্ছ। আর সেই ব্যক্তি দোযখী হইয়া থাকিলে তথায় আগুনে জ্বলিবে; দুনিয়ার সুখ-সম্পদে তাহার কি লাভ?” 

হযরত হাসান বসরী (রহঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল— “মুসলমান কি ঈর্ষা করে?” তিনি বলিলেন- “হযরত ইয়াকুব আলায়হিস সালামের পুত্রগণের উপাখ্যান কি তুমি ভুলিয়া গিয়াছ? তবে যাহা আচরণে  প্রকাশ পায় না তেমন ঈর্ষা কোন ক্ষতি করে না।” 

হযরত আবূ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “যে ব্যক্তি অধিক মৃত্যু চিন্তা করে সে না আনন্দিত হয়, না ঈর্ষা করে।”



পরবর্তী পর্ব

ঈর্ষার পরিচয়

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...