📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
অন্তরে কতক জ্ঞান না আসার কারণ-
প্রথম কারণ, স্বয়ং অন্তর ত্রুটিপূর্ণ হওয়া; যেমন শিশুদের অন্তর। এতে ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতার কারণে জ্ঞাতব্য বিষয়সমূহ উদ্ভাসিত হয় না।
দ্বিতীয় কারণ, গোনাহ ও নাফরমানীর ময়লা, যা অধিক কামলিপ্সার কারণে অন্তরের উপর এসে জমা হয় এবং তার ঔজ্জ্বল্য ও স্বচ্ছতা বিনষ্ট করে দেয়। এই কালিমার কারণে অন্তরে সত্য বিষয়টি ফুটে উঠতে পারে না। এদিকে ইঙ্গিত করেই হাদীসে বলা হয়েছে, যেব্যক্তি কোন গোনাহ্ করে, বিবেক-বুদ্ধি তার কাছ থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং কখনও তার কাছে ফিরে আসে না। অর্থাৎ, তার অন্তরে এমন কালিমা পড়ে যায়, যার প্রভাব কখনও দূরীভূত হয় না। কেননা, গোনাহের পরে পুণ্য কাজ করলেও তার কারণে সেই প্রভাব দূর হবে না, কিন্তু সে যদি গোনাহ্ না করত এবং পুণ্য কাজই করত, তবে নিঃসন্দেহে অন্তরে নূর বৃদ্ধি পেত। প্রথমে গোনাহ করার কারণে পুণ্য কাজের তেমন উপকার হয়নি। বরং গোনাহের পূর্বে অন্তর যেমন ছিল, তেমনি রয়ে গেল- নূর বৃদ্ধি পেল না। বাস্তবে এটা এমন ভয়ংকর ক্ষতি, যার কোন প্রতিকার নেই। দেখ, যে আয়নায় একবার মরিচা পড়ে যায়, এর পর তা ঘষে-মেজে পরিষ্কার করা হয়, তা সেই আয়নার সমান হয় না, যা মরিচা ছাড়াই পরিষ্কার রাখা হয়। মোট কথা, আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের দিকে ধাবিত হওয়া এবং কামলিপ্সা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া আন্তরিক স্বচ্ছতার কারণ হয়ে থাকে।
এ জন্যেই আল্লাহ্ তাআলা এরশাদ করেন :
“যারা আমাকে পাওয়ার জন্যে অধ্যবসায় করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথ প্রদর্শন করব।”
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : “যে ব্যক্তি তার জানা বিষয়ে আমল করে, আল্লাহ তাকে অজানা বিষয়ের এলেম দান করেন।”
তৃতীয় কারণ, প্রার্থিত স্বরূপের প্রতি বিমুখ হওয়া। উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি আনুগত্যশীল ও সৎকর্মপরায়ণ, কিন্তু তার অন্তর সত্যান্বেষী নয়। বরং অধিকাংশ শারীরিক এবাদত কিংবা জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রে আপন প্রচেষ্টা ব্যাপৃত রাখে। এরূপ ব্যক্তির অন্তর যদিও স্বচ্ছ হয়ে থাকে, কিন্তু তাতে সত্যের দ্যুতি বিদ্যমান থাকে না। এতে সেই বিষয়ই উদঘাটিত হয়, যার কল্পনায় সে মগ্ন থাকে। অতএব যেব্যক্তি আপন প্রচেষ্টাকে জাগতিক কামলিপ্সা ও তার আনন্দে ব্যাপৃত রাখে, তার সামনে সত্য বিষয় কিরূপে উদঘাটিত হতে পারে?
চতুর্থ কারণ “হিজাব” তথা আড়াল থাকা। উদাহরণতঃ কোন আনুগত্যশীল ব্যক্তি তার কামলিপ্সা দাবিয়ে রেখেছে। সে কোন সত্য উদ্ঘাটনের জন্য চিন্তা-ভাবনা করলে মাঝে মাঝে তার সামনে সত্য উদ্ঘাটিত হয় না। কেননা, সে পৈতৃক অনুকরণ কিংবা সুধারণার কারণে কোন একটি বিশ্বাস মনে পোষণ করে নেয়। এ বিশ্বাসটিই সত্য বিষয়ের মধ্যে ও তার অন্তরের মধ্যে আড়াল হয়ে যায়। সে শৈশবকাল থেকে যে বিশ্বাস নিয়ে বড় হয়, সেই বিশ্বাস অন্তরে কোন বিপরীত বিশ্বাস উদঘাটিত হওয়ার পথে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় অন্তরায়, যার কারণে অধিকাংশ মুসলিম দার্শনিক ও বিভিন্ন মতের বিদ্বেষপরায়ণ ব্যক্তিবর্গ সত্যের আড়ালে রয়ে গেছেন। বরং অধিকাংশ সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি, যাদের চিন্তা-ভাবনা যমীন ও আকাশের রাজ্যে বিচরণ করে, তারাও এই বালায় গ্রেফতার আছেন।
পঞ্চম কারণ, প্রার্থিত সত্যের দিক সম্পর্কে অজ্ঞতা। উদাহরণতঃ কোন বিদ্যার্থী যদি কোন অজানাকে জানতে চায়, তবে যে পর্যন্ত জানা তথ্যসমূহকে জ্ঞানীদের কাছে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে বিন্যস্ত না করবে, সেই পর্যন্ত প্রার্থিত ফল অর্জিত হবে না। কেননা, যেসকল জ্ঞান মজ্জাগত নয়, সেগুলো অন্যান্য জানা তথ্যসমূহের সাহায্য ব্যতিরেকে অর্জিত হতে পারে না। যেমন- নর ও মাদী ব্যতীত বাচ্চা আসতে পারে না। কেউ যদি ঘোটক শাবক লাভ করতে চায়, তবে তা উট ও গাধা থেকে অর্জিত হবে না; বরং এর জন্যে ঘোটক-ঘোটকী দরকার। অনুরূপভাবে প্রত্যেক জ্ঞানের জন্যে দু'টি বিশেষ মূল ও একটি বিন্যাস পদ্ধতি প্রয়োজন। এতে প্রার্থিত জ্ঞান অর্জিত হবে। সুতরাং এসব মূল বিষয় ও বিন্যাস পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতা সত্যোপলব্ধির ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে থাকে; যেমন আয়নায় সঠিক দিক না জানার কারণে চিত্র প্রতিফলিত হয় না। এ বিষয়ের একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত হল, কোন ব্যক্তি যদি আয়নায় তার পৃষ্ঠদেশ দেখতে চায়, তবে আয়না মুখের সামনে রাখলে পৃষ্ঠদেশ দেখা যাবে না। কেননা, আয়না পিঠের বিপরীতে নয়। আয়না পিঠের বিপরীতে রাখলেও পিঠ দৃষ্টিগোচর হবে না; বরং স্বয়ং আয়নাও দেখা যাবে না। কেননা, আয়না তার দৃষ্টি থেকে উধাও হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় পিঠ দেখতে হলে আরও একটি আয়নার প্রয়োজন হবে। একটি পিঠের বিপরীতে রাখবে এবং অপরটি চোখের সামনে এমনভাবে রাখবে যে, উভয় আয়না একটি অপরটির বিপরীতে থাকে। এমতাবস্থায় এই ব্যক্তি নিজের পৃষ্ঠদেশ দেখতে পারে। কেননা, তার পিঠের প্রতিচ্ছবি পেছনের আয়নায় পড়বে এবং তার প্রতিচ্ছবি সামনে রক্ষিত অপর আয়নায় পড়বে। এমনিভাবে জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টান্তের চেয়েও অধিক বিচিত্র ধরনের কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নিতে হয়। ভূপৃষ্ঠে এমন কেউ নেই, যার এসব কর্মকাণ্ড আপনা আপনি জানা হয়ে যায়। এটাই অন্তরের জন্যে সত্যোপলব্ধিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্যেক অন্তরেরই মজ্জাগতভাবে সত্য অনুধাবনের যোগ্যতা নেই। কেননা, এ যোগ্যতা একটি খোদায়ী বৈশিষ্ট্য এবং এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই অন্তরাত্মা সকল সৃষ্টি থেকে ভিন্ন ও সেরা। আল্লাহ্ তাআলা কোরআন পাকে এ বিষয়টিই এরশাদ করেছেন
“আমি আমানতটি পেশ করেছি আকাশমণ্ডলীর সামনে, পৃথিবীর সামনে এবং পর্বতমালার সামনে। অতঃপর কেউ তা বহন করতে স্বীকৃত হল না। তারা ভীত হয়ে গেল, কিন্তু মানুষ তা বহন করেছে।”
অর্থাৎ, মানুষ একটি বৈশিষ্ট্যের কারণে আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও পর্বতমালা থেকে স্বাতন্ত্র্য লাভ করছে এবং খোদায়ী আমানত বহন করার যোগ্য সাব্যস্ত হয়েছে।
এই আমানত হচ্ছে অধ্যাত্ম জ্ঞান তথা মারেফত ও তাওহীদ। প্রত্যেক মানুষের অন্তর এই আমানত বহন করার যোগ্য, কিন্তু আমরা যেসকল কারণ বর্ণনা করেছি সেগুলোর ফলস্বরূপ অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না । এ জন্যেই নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন
-প্রত্যেক নবজাত শিশু ‘ফিতরত” তথা মূল ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে। এর পর তার পিতামাতা তাকে ইহুদী এবং খৃস্টান বানিয়ে দেয়।
অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে : -যদি আদম সন্তানের অন্তরের চারপাশে শয়তানরা ঘুরাফেরা না করত, তবে সে আকাশের ফেরেশতা ও রহস্যাবলী অবলোকন করত।' এতে কতক কারণ বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো অন্তর ও ঊর্ধ্ব জগতের মধ্যে আড়াল হয়ে থাকে। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর এই উক্তির মধ্যেও এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
একবার লোকেরা জিজ্ঞেস করল : ইয়া রসূলাল্লাহ্! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ্ তা'আলা কোথায় আছেন- পৃথিবীতে, না আকাশে?
তিনি বললেন : আল্লাহ্ ঈমানদার বান্দাদের অন্তরে আছেন।
এক হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে- পৃথিবীতে আমার সংকুলান হয় না আকাশেও না। আমার সংকুলান আমার মুমিন বান্দার অন্তরে হয়, যে অন্তর নরম ও স্থির। এ কারণেই হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : আমার অন্তর আল্লাহকে যখন দেখেছে, তখনই তাকওয়ার কারণে নূর আড়াল হয়ে গেছে। যার সামনে থেকে আড়াল দূর হয়ে যায়, তার অন্তরে ঊর্ধ্ব জগতের চিত্র ফুটে উঠে। সকল এবাদত ও দৈহিক ক্রিয়াকর্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্তর পরিষ্কার ও স্বচ্ছ হওয়া। আর স্বচ্ছতার লক্ষ্য হচ্ছে অন্তরে খোদায়ী মারেফতের দ্যুতি এসে যাওয়া। মারেফতের এই দ্যুতিই নিম্নোক্ত আয়াতে বুঝানো হয়েছে : “আল্লাহ্ তা'আলা ইসলামের জন্যে যার বক্ষ উন্মুক্ত করে দেন, সে তার পরওয়ারদেগারের পক্ষ হতে একটি নূরের উপর থাকে।
পরের পর্ব -

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন