বুধবার, ৫ জুলাই, ২০২৩

অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৯) ইমানের স্থর সমুহ



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৯) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ইমানের স্থর সমুহ —
ঈমানের তিনটি স্তর–  বলাবাহুল্য, এই দ্যুতি ও ঈমানের তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর সর্বসাধারণের ঈমান। নিছক অনুকরণের উপর এর ভিত্তি। দ্বিতীয় স্তর দার্শনিকদের ঈমান। এতে কিছু যুক্তি প্রমাণও থাকে, কিন্তু এটাও সর্বসাধারণের ঈমানের কাছাকাছি। তৃতীয় স্তর আরেফ তথা বিভুজ্ঞানীদের ঈমান, যা একীনের নূর থেকে অর্জিত হয়।
 
আমরা এ তিনটি স্তরকে একটি উদাহরণ দ্বারা বর্ণনা করছি। উদাহরণতঃ যায়েদ গৃহে আছে- এ কথা তিনভাবে জানা যায়। প্রথমতঃ কোন সত্যবাদী ব্যক্তির বর্ণনা, যার সত্যবাদিতা বার বার পরীক্ষিত হয়েছে এবং যার কথায় মিথ্যার অবকাশ নেই। এরূপ ব্যক্তির কথায় বিশ্বাস করা যাবে যে, যায়েদ নিঃসন্দেহে গৃহে আছে। এটা নিছক অনুকরণমূলক ঈমানের দৃষ্টান্ত। সাধারণ মানুষের অবস্থা তাই। তারা জ্ঞানবুদ্ধি বয়সে পৌঁছে পিতামাতার কাছে আল্লাহ্ তা'আলার অস্তিত্ব, জ্ঞান, কুদরত, ইচ্ছা ইত্যাদি সকল সেফাত, পয়গম্বরগণের আগমন এবং তাঁদের আনীত বিধি-বিধান সত্য হওয়ার কথা শুনে এবং তৎক্ষণাৎ বিশ্বাস স্থাপন করে। অতঃপর আজীবন এর উপরই কায়েম থাকে। এর বিরুদ্ধে অন্তরে কোন কল্পনা আসে না। কেননা, পিতামাতা ও গুরুজনদের প্রতি তারা সুধারণা পোষণ করে। এ ধরনের ঈমান পারলৌকিক মুক্তির কারণ হয়ে থাকে। এরূপ মুমিন ব্যক্তি কোরআনে বর্ণিত “আসহাবে ইয়ামীনের” সর্বনিম্ন স্তর। সে “মোকাররাব” তথা নৈকট্যপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা, নৈকট্যশীল হওয়ার জন্যে কাশফ এবং বক্ষ একীনের আলোকে আলোকিত হওয়া জরুরী, যা এ ধরনের ঈমানে অনুপস্থিত। এছাড়া এ'তেকাদ তথা  বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কতক লোক কিংবা অনেক লোকের বর্ণিত খবরে ভ্রান্তিরও সম্ভাবনা থাকে। ইহুদী ও খৃস্টান (বা অন্যেন্য ধর্মাবলম্বি) দের অন্তরও তাদের পিতামাতার কথায় প্রশান্ত হয়, কিন্তু তারা যেসব আকীদা পোষণ করে, সেগুলো ভ্রান্ত । কেননা, তাদের অন্তরে ভ্রান্তিই নিক্ষিপ্ত হয়েছে। পক্ষান্তরে মুসলমানদের আকীদা সত্য।


দ্বিতীয়, প্রাচীরের আড়ালে দাঁড়িয়ে গৃহের ভিতর থেকে যায়েদের শব্দ শ্রবণ করা। এর মাধ্যমেও জানা যায় যে, যায়েদ গৃহে আছে। অপরের কাছে শুনে যে পরিমাণ বিশ্বাস হয়, নিজ কানে শব্দ শুনে তার চেয়ে বেশী বিশ্বাস হবে। কেননা, আওয়াজ শুনলে যার আওয়াজ, তার সমস্ত আকার-আকৃতি চিন্তায় উপস্থিত হয়ে যায় এবং অন্তরে বদ্ধমূল হয়, এই আওয়াজ অমুকের। এটা দ্বিতীয় প্রকার ঈমানের দৃষ্টান্ত, যার মধ্যে কিছু প্রমাণেরও মিশ্রণ আছে, কিন্তু ভ্রান্তির সম্ভাবনা এর মধ্যেও রয়েছে। কেননা, একজনের কণ্ঠস্বর অন্যজনের সাথে মিলেও যেতে পারে। কেউ কেউ আবার অন্যের কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করতে পারে।


তৃতীয়, তুমি নিজে গৃহের ভিতরে গিয়ে যায়েদকে দেখে নেবে যে, সে গৃহে উপস্থিত আছে। এটা বিভুজ্ঞানী নৈকট্যশীল ও সিদ্দীকগণের ঈমান। একেই মারেফত ও মুশাহাদা বলা হয়। কারণ, তাদের ঈমান মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষকরণের পরে হয়ে থাকে। তবে এর মধ্যে সর্বসাধারণ ও দার্শনিকের ঈমানও শামিল এবং তাতে কেবল প্রত্যক্ষকরণের স্তরটি অতিরিক্ত, সে কারণে ভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকে না। হাঁ, এর মধ্যে কাশফ ও জ্ঞানের পরিমাণে তফাৎ হয়। জ্ঞানের পরিমাণে তফাৎ এমন, যেন কোন ব্যক্তি গৃহের আঙ্গিনায় গিয়ে যায়েদকে খুব আলোর মধ্যে দেখে এবং অন্য ব্যক্তি কোন কক্ষে অথবা রাতের বেলায় দেখে। এখানে প্রথম ব্যক্তির দেখা অধিক কামেল হবে। এমনিভাবে প্রত্যক্ষকরণের ক্ষেত্রে কেউ সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়গুলোও দেখে জেনে নেয় এবং কেউ এ থেকে বঞ্চিত থাকে। জ্ঞানার্জনের দিক দিয়ে এ হচ্ছে অন্তরের অবস্থা।



পরবর্তী পর্ব 

বিভিধ জ্ঞানে অন্তরের অবস্থা 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...