📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
প্রথম অবস্থায় মুরীদের বিবাহের ঝামেলায় পড়া উচিত নয়। কারণ, এটা আখেরাতের পথে বাধা সৃষ্টি করবে। মুরীদ স্ত্রীর মহব্বতে আটকা পড়ে যাবে। এ বিষয় থেকে ধোকা খাওয়া উচিত নয় যে, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) অনেক বিবাহ করেছিলেন। কেননা, স্ত্রীর মহব্বত দূরের কথা, দুনিয়ার সকল বস্তু মিলেও তাঁর অন্তরকে আল্লাহ তাআলার দিক থেকে ফেরাতে পারত না। আল্লাহর মহব্বতে তাঁর মগ্নতা এতদূর ছিল যে, মাঝে মাঝে যখন মহব্বতের উত্তাপ অন্তরে উথলে উঠত, তখন অন্তর বিস্ফারিত হওয়ার আশংকা দেখা দিত। তিনি তখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঊরুতে করাঘাত করে বলতেন, কিছু কথাবার্তা বল। তাঁর কথাবার্তার ফলে উত্তাপ কিছুটা প্রশমিত হত। সুতরাং অন্য কোন ব্যক্তি নিজেকে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে তুলনা করতে পারে না। করলে সে ধোকা খাবে।
মোট কথা, প্রাথমিক পর্যায়ে অবিবাহিত থাকাই মুরীদের জন্যে উপযুক্ত।
আবু সোলায়মান বলেন : যে বিবাহ করে, সে দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। আমি এমন কোন মুরীদ দেখিনি যে বিবাহ করে পূর্বাবস্থায় বহাল রয়েছে। যে কোন বস্তু আল্লাহ্ থেকে বিরত রাখে- স্ত্রী হোক, অর্থ হোক অথবা সন্তান-সন্ততি হোক, তাকেই অলক্ষুণে মনে করা উচিত। তবে মুরীদের অবিবাহিত থাকা তখন পর্যন্তই শোভনীয়, যে পর্যন্ত খাহেশ জোরালো না হয়। খাহেশ প্রবল হতে দেখলে প্রথমে ক্ষুধা ও সার্বক্ষণিক রোযা দ্বারা তা দমন করবে। এতেও দমিত না হলে খাহেশকে শান্ত করার জন্যে বিবাহ করবে। নতুবা দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখা সম্ভব হবে না এবং উদ্দেশ্য বিঘ্নিত হবে। দৃষ্টির গোনাহ সগীরা গোনাহসমূহের মধ্যে অনেক বড়। এ থেকে কবীরা গোনাহ্ও হয়ে থাকে। যে তার দৃষ্টি আয়ত্তে রাখতে পারে না, সে তার দ্বীনদারীরও হেফাযত করতে পারে না।
হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : তাকানো থেকে বেঁচে থাক। এর কারণে অন্তরে খাহেশের বীজ পড়ে এবং এতটুকু অনর্থই যথেষ্ট। হযরত সায়ীদ ইবনে জোবায়র বলেন : কেবল দৃষ্টির কারণে হযরত দাউদ (আঃ) অনর্থে লিপ্ত হন। এ কারণেই হযরত সোলায়মান (আঃ) এরশাদ করেন : সিংহ ও সর্পের পেছনে যেয়ো; কিন্তু নারীর পেছনে যেয়ো না।
হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল : যিনার সূচনা কিভাবে হয়? তিনি বললেন : দেখা ও বাসনা করার মাধ্যমে।
হযরত ফোযায়ল এরশাদ করেন, ইবলীস বলে : দৃষ্টি আমার প্রাচীন তীর ধনুক, যা কখনও ভুল করে না। দৃষ্টি সম্পর্কে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর উক্তিসমূহ নিম্নরূপ-
>“দৃষ্টি ইবলীসের তীরসমূহের মধ্যে একটি বিষাক্ত তীর। যে আল্লাহ তা'আলার ভয়ে এটি পরিত্যাগ করে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে এমন ঈমান দেবেন, যার মিষ্টতা সে অন্তরে অনুভব করবে”।
>“আমি আমার পরে পুরুষদের জন্যে নারীদের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কোন ফেতনা ছেড়ে যাইনি”।
>”তোমরা দুনিয়ার ফেতনা ও নারীদের ফেতনা থেকে বেঁচে থাক। বনী ইসরাঈলের প্রথম ফেতনা নারীদের পক্ষ থেকেই ছিল”।
>”প্রত্যেক মানুষের জন্যে যিনার কিছু অংশ আছে। কেননা, চক্ষুদ্বয় যিনা করে। তাদের যিনা হচ্ছে দৃষ্টিপাত করা। হস্তদ্বয় যিনা করে। তাদের যিনা হচ্ছে স্পর্শ করা। পদদ্বয় যিনা করে, তাদের যিনা হচ্ছে হাঁটা। মুখ যিনা করে, তার যিনা হচ্ছে বলা। অন্তর ইচ্ছা ও বাসনা করে। লজ্জাস্থান তাকে সত্যে পরিণত অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।”
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
“মুমিনদেরকে বলে দিন, তারা যেন দৃষ্টি নত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাযত করে”।
হযরত উম্মে সালামা (রাঃ) বলেন : একবার অন্ধ ইবনে মকতুম (রঃ) রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আসতে চাইলেন। তখন আমি ও মায়মুনা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে বসা ছিলাম। তিনি আমাদেরকে পর্দা করতে বললেন। আমরা বললাম, সে তো অন্ধ। পর্দা করার প্রয়োজন কি? তিনি বললেন : তোমরা তো তাকে দেখ।
এ থেকে জানা গেল, নারীদের অন্ধের কাছে বসা এবং বিনা প্রয়োজনে তার সাথে কথা বলা জায়েয নয়। আজকাল এটা প্রচলিত আছে। হাঁ, প্রয়োজনের সময় নারী পুরুষের সাথে কথা বলতে অথবা দেখতে পারে।
যদি মুরীদের অবস্থা এমন হয় যে, সে নারীদের থেকে তো দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখতে পারে; কিন্তু বালকদের থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারে না; তবুও বিবাহ করা উত্তম। কেননা, বালকদের সৌন্দর্যপ্রীতির মধ্যে অনিষ্ট বেশী। কোন নারীর প্রতি মন আকৃষ্ট হয়ে গেলে তাকে বিবাহ করে মনের আশা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু বালকদের দ্বারা এটা সম্ভবপর নয়। এ কারণেই বালককে কুদৃষ্টিতে দেখা হারাম। এক্ষেত্রে মানুষ খুব শৈথিল্য প্রদর্শন করে এবং পরিণামে ধ্বংসের মুখে পড়ে। জনৈক তাবেয়ী বলেন : যুবক সাধকের সাথে শ্মশ্রুবিহীন বালকের উঠাবসা আমি হিংস্র জন্তুর চেয়েও অধিক ভয় করি। হযরত সুফিয়ান সওরী বলেন : যদি কোন ব্যক্তি খাহেশবশতঃ কোন বালকের পায়ের অঙ্গুলিতেও সুড়সুড়ি দেয়, তবুও সে সমকামী হবে।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : এই উম্মতে তিন প্রকার সমকামী হবে। কেউ তো কেবল দেখবে, কেউ করমর্দন করবে এবং কেউ কুকর্মই করবে। এ থেকে বুঝা গেল, দৃষ্টির কারণে বড় বড় বিপদের উদ্ভব ঘটে। সুতরাং যখন আপন দৃষ্টি ফেরাতে এবং চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে না, তখন বিবাহ করাই তার জন্যে শ্রেয়ঃ। অধিকাংশ মানুষের যৌন উত্তেজনা ক্ষুধার কারণে হ্রাস পায় না। সেমতে জনৈক বুযুর্গ বর্ণনা করেন, সাধনার প্রথম পর্যায়ে একবার আমার উপর খাহেশ প্রবল হয়ে গেলে আমি আল্লাহর দরবারে খুব কান্নাকাটি করলাম। স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে দেখলাম, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন, তোমার কি অবস্থা? আমি ঘটনা বর্ণনা করলে তিনি বললেন : এগিয়ে এস। আমি এগিয়ে গেলাম । তিনি আপন হাত আমার বুকের উপর রাখলেন। আমি এর শীতলতা অন্তরে ও দেহে অনুভব করলাম। সকালে ঘুম থেকে জেগে নিজের মধ্যে সেই যৌন উত্তেজনা পেলাম না। এক বছর কাল এ অবস্থা বহাল রইল। এরপর আবার প্রাবল্য দেখা দিল । আমি আবার হাহুতাশ করলে স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে দেখলাম। সে বলল : যদি তুমি তোমার ঘাড় কাটাতে সম্মত হও, তবে আমি তোমার চিকিৎসা করি। আমি বললাম : উত্তম। সে বলল : ঘাড় নত কর। আমি ঘাড় নত করলে সে একটি নূরের তরবারি দিয়ে আমার ঘাড়ে আঘাত করল। আমার নিদ্রা ভঙ্গ হল। এক বছর কাল আবার সুস্থ থাকার পর পুনরায় সেই রোগ দ্বিগুণ বেগে দেখা দিল। এ অবস্থায় এক ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখলাম, সে আমার বক্ষ ও পাঁজরের মাঝখানে বসে আমাকে বলছে : যে বিষয়টি দূর করা আল্লাহর অভিপ্রেত নয়, তা দূর করার জন্য আর কতদিন কাকুতি মিনতি করবে? এরপর আমি জাগ্রত হয়ে বিবাহ করলাম এবং সন্তানাদি হল। এখন সেই খাহেশের জোর আর নেই।
সুতরাং মুরীদের বিবাহ করার প্রয়োজন দেখা দিলে বিবাহের শুরুতে নিয়ত ভাল রাখবে এবং পরিণামে জরুরী হক আদায় করবে। নিয়ত ভাল রাখার আলামত হচ্ছে, কোন সম্বলহীন ধর্মপরায়ণা মহিলাকে বিবাহ করবে, বিত্তশালিনী তালাশ করবে না। জনৈক বুযুর্গ বলেন : বিত্তশালিনী মহিলাকে বিবাহ করার অনিষ্ট পাঁচটি, (১) মোহরানা বেশী হওয়া, (২) স্বামী গৃহে গমনে ইতস্ততঃ করা, (৩) সেবা না করা, (৪) অধিক ব্যয়ভার বহন করা এবং (৫) ত্যাগ করতে মনে চাইলে বিত্তের লোভে তা না পারা। পক্ষান্তরে সম্বলহীনাকে বিবাহ করার মধ্যে এরূপ কোন অনিষ্ট নেই।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : চারটি বিষয়ে নারীর পুরুষের চেয়ে কম হওয়া চাই। নতুবা সে পুরুষকে হেয় মনে করবে। চারটি বিষয় এই : বয়সে, দৈহিক গড়নে, অর্থকড়িতে এবং বংশ মর্যাদায়। পক্ষান্তরে চারটি বিষয়ে নারীর পুরুষের চেয়ে বেশী হওয়া দরকার- সৌন্দর্যে, শিষ্টাচারে সংযমে এবং চরিত্রে।
পরিণামে জরুরী হক আদায়ের আলামত হচ্ছে সদা সদাচার প্রদর্শন করা।
জনৈক মুরীদ বিবাহ করে সদা সর্বদা স্ত্রীর সেবাযত্ন করতে থাকে। অবশেষে স্ত্রী লজ্জিত হয়ে তার পিতা-মাতাকে বলল : আমি আমার স্বামীর সদাচারে বিস্মিত হয়েছি। এত বছর ধরে তার গৃহে যখনই পায়খানা করতে যাই তখনই সে বদনা আমার পূর্বে সেখানে রেখে দেয়। অন্য একজন বুযুর্গ জনৈকা রূপসী মহিলাকে বিবাহ করেন। স্বামী গৃহে যাওয়ার সময় নিকটবর্তী হলে স্ত্রী বসন্ত রোগে আক্রান্ত হল। তার পরিবারের লোকজন মহাচিন্তায় পড়ল, এখন স্বামী তাকে পছন্দ করবে না। বুযুর্গ ব্যক্তি সংবাদ পেয়ে প্রথমে চক্ষু রোগের বাহানা করলেন, এরপর অন্ধ সেজে গেলেন। স্ত্রী স্বামী গৃহে এসে বিশ বছর সদ্ভাবে সংসার করার পর মারা গেল। এরপর বুযুর্গ ব্যক্তি চক্ষু খুললেন। লোকেরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আমি ইচ্ছা করেই অন্ধ সেজেছিলাম যাতে শ্বশুরালয়ের লোকেরা দুঃখ না করেন। এতে সকলেই পরম বিস্ময় প্রকাশ করে বলল : এমন সদাচারী লোক দুনিয়াতে দ্বিতীয়জন আর নেই।
জনৈক সুফী এক বদমেযাজ মহিলাকে বিবাহ করে সর্বদাই তার কটূক্তি সহ্য করতে থাকেন। লোকেরা বলল : আপনি এই মহিলাকে তালাক দেন না কেন? তিনি বললেন : আশংকা হয়, অন্য কোন ব্যক্তি তার হাতে নিপীড়িত হবে। অতএব মুরীদ বিবাহ করলে এরূপই হওয়া উচিত। আর যদি বিবাহ ছাড়া থাকতে পারে এবং বিবাহের কারণে আখেরাতের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে মনে করে, তবে বিবাহ না করাই উত্তম।
বর্ণিত আছে, মুহাম্মদ ইবনে সোলায়মান হাশেমীর দৈনিক আমদানী ছিল আশি হাজার দেরহাম। তিনি বসরার আলেমগণের কাছে এ মর্মে পত্র লেখলেন : আমি কোন মহিলাকে বিবাহ করতে চাই । আপনারা পছন্দ করে দিন। সকলেই একমত হয়ে তাঁকে জওয়াব দিলেন, রাবেয়া বসরীয়াকে বিবাহ করাই আপনার জন্যে উপযুক্ত। সেমতে তিনি রাবেয়া বসরীয়াকে এভাবে পত্র লেখলেন :
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। হামদ ও সালাতের পর আবেদন হল, আল্লাহ তাআলা আমাকে আজ দৈনিক আশি হাজার দেরহাম আমদানী দিয়েছেন। আশা করা যায়, কিছু দিন পরেই আমদানী বৃদ্ধি পেয়ে দৈনিক এক লাখ দেরহাম হয়ে যাবে। যদি তুমি আমাকে মঞ্জুর কর, তবে এই ধন-সম্পদ সমস্তই তোমার হবে। —ইতি
হযরত রাবেয়া বসরীয়া এই পত্রের জওয়াবে লেখলেন : বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, হামদ ও না'তের পর জানাচ্ছি, সংসার নির্লিপ্ততার মধ্যেই অন্তরের শান্তি ও দেহের সুখ নিহিত এবং দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ দুঃখ ও অশান্তির কারণ। পত্র পাওয়ার সাথে সাথে আপনার উচিত পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করা এবং পরকালের চিন্তায় মগ্ন হওয়া। আপনি নিজেই নিজের ওছি হয়ে যান, যাতে ত্যাজ্য সম্পত্তি বণ্টনের জন্যে অন্যকে ওছি নিযুক্ত করার প্রয়োজন না থাকে। সারা জীবন রোযা রাখুন এবং মৃত্যুর সময় ইফতার করুন। আমার অবস্থা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা যদি আমাকে আপনার সমপরিমাণ অথবা আরও কয়েকগুণ বেশী ধন-সম্পদ দিয়ে দেন, তবুও এক মুহূর্ত আল্লাহকে স্মরণ না করে থাকতে পারব না। - ইতি
এ থেকে জানা যায়, যে বিষয় আল্লাহর স্মরণে অন্তরায় হয়, তা ত্রুটিযুক্ত। সুতরাং মুরীদ তার অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে গভীর চিন্তা করবে। অবিবাহিত থাকা সম্ভব না হলে বিবাহ করা উত্তম। এ রোগের তিনটি প্রতিকার রয়েছে— প্রথম অনাহারে থাকা দ্বিতীয়, দৃষ্টি সংযত রাখা এবং তৃতীয়, অন্তরকে এমন কাজে ব্যস্ত রাখা, যাতে আচ্ছন্ন রাখে। এ তিনটি তদবীরে কোন উপকার না হলে সর্বশেষে বিবাহ করতে হবে। এতে এ রোগের মূল উৎপাটিত হয়ে যায়। এ কারণেই পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ তাড়াহুড়া করে কন্যাদের বিবাহ দিতেন। সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব বলেন :
“শয়তান কারও তরফ থেকে নিরাশ হয় না। সে নারীদের দ্বারা অবশ্যই ফাঁদ পাতে”।
হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িবের বয়স যখন চৌরাশি বছরে পৌঁছে, তখন তাঁর একটি চক্ষু নষ্ট হয়ে যায় এবং অপর চক্ষু থেকেও পানি ঝরতে থাকে । তখনও তিনি বলতেন : আমি নারীদের চেয়ে অধিক অন্য কিছুকে ভয় করি না।
আবদুল্লাহ ইবনে আবী ওদায়া বলেন : আমি তাঁর কাছে গিয়ে বসতাম। কয়েক দিন যাইনি। এরপর একদিন গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ কয়দিন কোথায় ছিলে? আমি বললাম : আমার স্ত্রী মারা গিয়েছিল। তাই হাযির হতে পারিনি। তিনি বললেন : তুমি আমাকে খবর দিলে না কেন? এরপর আমি প্রস্থানোদ্যত হলে তিনি বললেন : খুব তো চলে যাচ্ছ; কিন্তু জিজ্ঞেস করি, পরে বিয়ে শাদী করলে কি না? আমি আরজ করলাম : হুযুর, আমি গরীব মানুষ। আমাকে কে কন্যা দান করবে। তিনি বললেন : আমি দিচ্ছি। আমি সবিস্ময়ে বললাম : আপনি ! তিনি বললেন : হাঁ। অতঃপর খোতবা পাঠ করে সামান্য মোহরানার বিনিময়ে আপন কন্যার বিবাহ আমার সাথে সম্পন্ন করে দিলেন। আমি আহ্লাদে আটখানা হয়ে সেখান থেকে চলে এলাম এবং কারও কাছ থেকে কিছু কর্জ নেয়ার কথা ভাবছিলাম। ইতিমধ্যে মাগরিবের সময় হয়ে গেল। আমি নামায পড়ে গৃহে ফিরে এলাম। বাতি জ্বালিয়ে রুটি ও তেল নিয়ে ইফতার করতে বসলাম। এমন সময় দরজা থেকে করাঘাতের শব্দ কানে ভেসে এল। আমি জিজ্ঞেস করলাম : কে? জওয়াব এল : সায়ীদ। আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম, কোন্ সায়ীদ হতে পারে! সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব হবেন, তা কল্পনায়ও ছিল না। কারণ, তিনি চল্লিশ বছর ধরে মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়া সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু দরজা খুলেই দেখি, সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব দণ্ডায়মান। আমি ধারণা করলাম, বোধ হয় কোন সাংঘাতিক প্রয়োজনে আমার কাছে এসেছেন । আমি আরজ করলাম : আমাকে ডেকে নিলেন না কেন? তিনি বললেন : তোমার কাছে আসাই সমীচীন মনে হল। আমি বললাম : আদেশ করুন। তিনি বললেন : তুমি বিবাহ করেছ। এখন একাকী শয়ন করবে- এটা আমার কাছে ভাল মনে হয়নি। তাই তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছে পৌঁছে দিতে এসেছি। আমি ভাল করে দেখতেই দেখি, বাস্তবে সেই ভাগ্যবতী কন্যা সলজ্জ ভঙ্গিতে তাঁর পেছনেই দণ্ডায়মান রয়েছে। তিনি তার হাত ধরে ভিতরে ঠেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে গেলেন । এদিকে কন্যাটি লজ্জা শরমের আতিশয্যে মাটিতে পড়ে গেল। আমি দরজা খুব ভাল করে বন্ধ করে দিলাম। অতঃপর যে পেয়ালায় রুটি ও তেল রাখা ছিল, তা বাতির কাছ থেকে সরিয়ে দিলাম, যাতে স্ত্রীর দৃষ্টিগোচর না হয়। এরপর গৃহের ছাদে উঠে প্রতিবেশীদেরকে ডাক দিলাম। সকলেই একত্রিত হয়ে জিজ্ঞেস করল : ব্যাপার কি? আমি বললাম : সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব আজ দিনের বেলায় তাঁর কন্যার বিবাহ আমার সাথে সম্পন্ন করেছেন। এখন রাতের বেলায় অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি তাঁর কন্যাকে এখানে রেখে গেছেন। লোকেরা সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল : সায়ীদ তোমাকে বিবাহ করিয়েছেন? আমি বললাম : হাঁ। তারা বলল : তাঁর কন্যা এখন তোমার গৃহে? আমি বললাম : হাঁ। অতঃপর তারা সকলেই তার কাছে গেল। আমার মা সংবাদ পেয়ে এলেন এবং বললেন : তিন দিন পর্যন্ত তুই বউ মাকে স্পর্শ করতে পারবি না। যদি করিস কখনও তোর মুখ দেখব না। এই তিন দিনে আমরা তাকে ঠিক করে নেব। মায়ের আদেশমত আমি তিন দিন আলাদা রইলাম। এরপর যখন তাকে দেখলাম, তখন পরমাসুন্দরী, কালামুল্লাহর হাফেয, সুন্নতের আলেম এবং স্বামীর হক সম্পর্কে বেশ ওয়াকিফহাল পেলাম। একমাস পর্যন্ত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব আমার গৃহে এলেন না এবং আমিও তাঁর কাছে গেলাম না। একমাস পর যখন গেলাম, তখন তিনি ভক্তদের বৃত্তের মধ্যে উপবিষ্ট ছিলেন। আমি সালাম করলে তিনি শুধু জওয়াব দিলেন এবং কিছু বললেন না। ভক্তদের প্রস্থানের পর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন : তোমার স্ত্রীর অবস্থা কি? আমি বললাম : খুব ভাল। তিনি বললেন : মর্জির খেলাফ কোন কিছু পেলে লাঠি দিয়ে খবর নেবে। আমি গৃহে চলে এলাম। এরপর তিনি বিশ হাজার দেরহাম আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এ ছিল সেই কন্যা, যাকে খলীফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান তার খেলাফত কালে আপন পুত্রবধূরূপে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব অস্বীকৃত হন। এরপর খলীফা মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে একশ' বেত্রদণ্ডে দণ্ডিত করেন এবং কনকনে শীতের মধ্যে এক কলসী ঠাণ্ডা পানি তাঁর গায়ে ঢেলে দেন। এছাড়া কম্বলের কোর্তাও পরিধান করান। এসব কারণে কন্যাকে রাতেই স্বামী গৃহে বিদায় দেয়া পূর্ণ ধার্মিকতা ও সাবধানতার পরিচায়ক ছিল। (আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দিন।)
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন