শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০২৩

যিনা ও কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করা

 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব - ৯)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যিনা ও কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করা 
জানা উচিত, লজ্জাস্থানের খাহেশ সর্বাধিক প্রবল এবং উত্তেজনার মুহূর্তে জ্ঞান-বুদ্ধির সর্বাধিক অবাধ্য। এর ফলাফল খুবই লজ্জাজনক। মানুষ যে এ খাহেশ থেকে বেঁচে থাকে, তার কারণ হয় অক্ষমতা, না হয় লোকনিন্দার ভয়, না হয় লজ্জা শরম, না হয় মান-ইযযত রক্ষা করা। এগুলোর মধ্যে কোনটিতেই সওয়াব নেই। কারণ, এতে মনের এক আনন্দকে অন্য আনন্দের উপর অগ্রাধিকার দেয়া হয় মাত্র। হাঁ, এসব বাধার মধ্যেও একটি ফায়দা আছে। তা হচ্ছে, মানুষ গোনাহ্ থেকে বেঁচে থাকে, তা যে কোন কারণেই বেঁচে থাকুক। কিন্তু উচ্চ মর্তব্য ও সওয়াব তখন অর্জিত হবে, যখন সকল প্রকার সামর্থ্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেউ শুধু আল্লাহর ভয়ে যিনা থেকে বিরত থাকে, বিশেষতঃ যখন সত্যিকার খাহেশ বিদ্যমান। এটা সিদ্দীকগণের স্তর। তাই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : যে আশেক হয়ে সাধু থাকে এবং এশক গোপন রাখে, অতঃপর মারা যায়, সে শহীদ। তিনি আরও বলেন : সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা কেয়ামতের দিন আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন। সেদিন অন্য কোন ছায়া থাকবে না। তাদের মধ্যে একজন সে ব্যক্তি, যাকে কোন সম্ভ্রান্ত রূপবতী নারী নিজের দিকে আহ্বান করে, সে জওয়াবে বলে : আমি বিশ্বপালক আল্লাহকে ভয় করি। সামর্থ্য এবং আগ্রহ সত্ত্বেও যুলায়খার সাথে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর কিস্সা প্রসিদ্ধ ও সুবিদিত। আল্লাহ তা'আলা পাক কালামে এ জন্যে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এ ব্যাপারে হযরত ইউসুফ (আঃ) সকল সৎ ও সাধু পুরুষের ইমাম। 

সাহাবী হযরত সোলায়মান ইবনে ইয়াসার (রাঃ) অসাধারণ সুশ্রী যুবক ছিলেন। তাঁর গৃহে জনৈকা মহিলা আগমন করে তাঁর সাথে কুকর্ম করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি অস্বীকার করেন এবং গৃহ থেকে পালিয়ে যান। তিনি রাত্রে স্বপ্নে হযরত ইউসুফ (আঃ)-কে দেখে আরজ করলেন : আপনি ইউসুফ? উত্তর হল : হাঁ, আমি সেই ইউসুফ, যে ইচ্ছা করেছিল, আর তুমি সেই সোলায়মান, যে ইচ্ছাও করেনি। এই সাহাবীরই আর একটি আশ্চর্যজনক কাহিনী বর্ণিত আছে। তা হচ্ছে, একবার একজন সঙ্গীসহ তিনি মদীনা থেকে হজ্জের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। আবওয়া নামক স্থানে পৌঁছার পর তাঁর সঙ্গী কিছু কেনাকাটা করার জন্যে বাজারে চলে গেল। তিনি তাঁবুতে একাকী বসে রইলেন। জনৈকা বেদুঈন মহিলার দৃষ্টি তাঁর অনন্য রূপ সৌন্দর্যের উপর পতিত হতেই সে মনে প্রাণে তাঁর প্রতি আসক্ত হয়ে গেল এবং পাহাড় থেকে নেমে একেবারে তাঁর সামনে এসে দণ্ডায়মান হল। মহিলা নিজেও রূপ-সৌন্দর্যে ছিল চন্দ্র-সূর্যবৎ অপরূপা। সে বোরকা উত্তোলন করে চন্দ্র-সূর্যের সংযোগ ঘটাতে বিলম্ব করল না। অতঃপর সে বলল : আমাকে কিছু দিন। সোলায়মান মনে করলেন, খাবার চাইছে, তাই রুটি দেয়ার জন্য হাত বাড়ালেন। সে বলল : আমি এটা চাই না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যা হয়, আমি তাই কামনা করি। তিনি বললেন : তোমাকে শয়তান আমার কাছে পাঠিয়েছে। অতঃপর তিনি আপন মস্তক দুই হাঁটুর মাঝখানে রেখে সজোরে ক্রন্দন শুরু করে দিলেন। মহিলা তাঁর এই করুণ অবস্থা দেখে ব্যর্থতার গ্লানি বহন করে আপন গৃহে চলে গেল। সঙ্গী বাজার থেকে ফিরে এসে দেখল, কাঁদতে কাঁদতে সোলায়মানের চক্ষুদ্বয় ফুলে গেছে এবং কণ্ঠস্বর ভেঙ্গে গেছে। সে জিজ্ঞেস করল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি ব্যাপারটি এড়িয়ে যেতে চাইলেন। বললেন : কিছুই নয়। আমার কন্যার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। সঙ্গী বলল : না, ব্যাপার অন্যকিছু। তিন মনযিল পথ অতিক্রম করার সময় তো আপনার কন্যার কথা একবারও মনে পড়ল না। আজ হঠাৎ মনে পড়বে কেন? মোট কথা, অনেক পীড়াপীড়ি করে জিজ্ঞেস করার পর সোলায়মান বেদুঈন মহিলার ঘটনা বলে দিলেন। সঙ্গী বাজার সওদার থলে রেখে অঝোরে কান্না শুরু করে দিল । তিনি কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল : আমার কান্নার কারণ হচ্ছে, যদি আপনার স্থলে আমি থাকতাম তবে সবর করতে পারতাম না, গোনাহে লিপ্ত হয়ে যেতাম। কিছুক্ষণ পর্যন্ত উভয়েই কাঁদলেন । অতঃপর তাঁরা মক্কায় পৌঁছলেন। তওয়াফ ও সায়ীর পর যখন তাঁরা হাজারে আসওয়াদের কাছে এলেন, তখন সোলায়মান ইবনে ইয়াসার উপবিষ্ট অবস্থায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তিনি স্বপ্নে জনৈক দীর্ঘদেহী, সুশ্রী, জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিহিত, আতরমাখা ব্যক্তিকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন : আপনি কে? তিনি বললেন : আমি ইউসুফ। সোলায়মান আরজ করলেন : যুলায়খার সাথে আপনার আচরণ খুবই বিস্ময়কর। ইউসুফ (আঃ) বললেন : আবওয়ার মহিলার সাথে তোমার আচরণ আরও বেশী আশ্চর্যজনক।


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর পবিত্র মুখ থেকে শুনেছি, প্রাচীনকালে তিন ব্যক্তি সফরে বের হয়েছিল। তারা রাতের বেলায় একটি গুহায় অবস্থান গ্রহণ করে।ঘটনাক্রমে একটি বিরাট প্রস্তরখণ্ড পাহাড়ের উপর থেকে পড়ে গুহার মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিল। তারা একে অপরকে বলল : আপন আপন সৎকর্ম স্মরণ করে আল্লাহ্ তা'আলার কাছে দোয়া কর। সৎকর্মের বরকতে এই পাথর সরে যেতে পারে। সেমতে তাদের একজন হাত তুলে বলল : ইলাহী, তুমি জান, আমার পিতামাতা বৃদ্ধ ছিলেন। আমি সন্ধ্যায় প্রথমে তাদেরকে আহার করিয়ে দিতাম, এরপর সন্তান-সন্ততি ও গৃহপালিত গবাদিপশুকে আহার দিতাম। একদিন গবাদিপশুর খাদ্য যোগাড় করতে বিলম্ব হওয়ায় আমি দেরীতে বাড়ী পৌঁছলাম। অতঃপর গাভীর দুধ দোহন করে তা পিতামাতার কাছে নিয়ে দেখি, তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েছেন। ডেকে জাগানো আমি ভাল মনে করলাম না। তাই দুধের পেয়ালা হাতে নিয়ে আমি পর্যন্ত তাঁদের শিয়রে দাঁড়িয়ে রইলাম। সন্তানরা আমার পায়ে লুটিয়ে পড়েছে; কিন্তু আমি পিতামাতার পূর্বে তাদেরকে খাবার দেয়া ভাল মনে করিনি। সকালে যখন তারা পান করলেন, তখন অন্যদেরকে দিলাম। ইলাহী, যদি তুমি জান, এ কাজ আমি কেবল তোমার সন্তুষ্টির জন্যে করেছি, তবে এ বিপদ থেকে মুক্তি দাও। এ দোয়ার বরকতে পাথরটি এই পরিমাণ সরে গেল যে, আকাশ দৃষ্টিগোচর হল। 


দ্বিতীয় জন দোয়ায় বলল : ইলাহী, তুমি জান, আমি আমার পিতৃব্য-কন্যার প্রতি আশেক ছিলাম। আমি তার কাছে মিলনের বাসনা প্রকাশ করলে সে অস্বীকৃতি জানাল। এরপর দুর্ভিক্ষের সময় নিদারুণ কষ্টে পড়ে সে আমার কাছে আগমন করল। সে অস্বীকার করবে না। আমি তাকে এই শর্তে একশ' বিশটি স্বর্ণমুদ্রা দিলাম। সে আমার কথা মেনে নিল; কিন্তু আমি যখন তার সাথে অপকর্মে লিপ্ত হতে চাইলাম, তখন বলল : আল্লাহকে ভয় কর। আমার বেইজ্জতী করো না। এতে আমি ভীত হয়ে পড়লাম এবং তাকে ছেড়ে দিলাম। তাকে যা দিয়েছিলাম, তাও ফেরত নিলাম না । ভালবাসাও যথারীতি কায়েম রাখলাম। ইলাহী, যদি আমি কেবল তোমার ভয়ে এ কাজ করে থাকি, তবে এর বরকতে এ বিপদ দূর করে দাও। এরপর পাথরটি আরও সামান্য সরে গেল। কিন্তু বের হওয়ার পথ হল না।

তৃতীয় জন বলল : ইলাহী, আমি একবার কয়েকজন মজুরকে কাজে নিয়োগ করেছিলাম এবং সকলের মজুরিই শোধ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু জনৈক মজুর তার মজুরি রেখেই চলে গেল। তার অনুপস্থিতিতে আমি তার অর্থ কারবারে নিয়োগ করায় তা বেড়ে অনেক হয়ে গেল। অনেক দিন পর যখন সে মজুরি চাইতে এল, তখন আমি অনেকগুলো উট, গরু ও ছাগল দেখিয়ে বললাম : এগুলো সব তোমার। সে বলল : আপনি আমার সাথে ঠাট্টা মস্করা করছেন? আমি বললাম : ঠাট্টা নয়। এগুলো তোমার মজুরির অর্থ দিয়ে ব্যবসা করে অর্জিত হয়েছে। এগুলো নিয়ে যাও। সে জন্তুগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে গেল এবং কিছুই রেখে গেল না। ইলাহী, যদি আমি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টির জন্যে করে থাকি, তবে আমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার কর। তার এই দোয়ার পর পাথরটি সম্পূর্ণ সরে গেল এবং তারাও গন্তব্য পথে রওয়ানা হয়ে গেল। যে নিজেকে যিনা থেকে বাঁচিয়ে রাখে তার হচ্ছে এই ফযীলত। তারই নিকটবর্তী সে ব্যক্তি, যে চোখের যিনা থেকে নিরাপদ থাকে। কেননা, যিনার সূচনা চোখ দ্বারাই হয়। তাই চোখ সংযত রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দুরূহ কাজ। কিন্তু একে হালকা মনে করা হয়, তেমন ভয় করা হয় না। অথচ সব বিপদের উৎসমূল হচ্ছে চোখ। যদি ইচ্ছা ব্যতিরেকে একবার দেখা হয়, তবে তার জন্যে শাস্তি নেই; কিন্তু পুনর্বার দেখার মধ্যে শাস্তি আছে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন :-“প্রথম বার দেখা তোমার জন্যে জায়েয এবং দ্বিতীয় বার দেখা বিপদ”! এখানে চোখের দেখাই উদ্দেশ্য। 

আলা ইবনে যিয়াদ বলেন : নারীর চাদরের উপরও দৃষ্টি নিক্ষেপ করো না। কেননা, দৃষ্টি অন্তরে খাহেশের বীজ বপন করে। মানুষ যখন কোন নারীর উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, তখন দ্বিতীয় বার না তাকানোটা খুবই বিরল। রূপের ধারণা দৃষ্টিতে থাকলে দ্বিতীয় বার দেখতে মন চাইবে। তখন নিজের মনে সাব্যস্ত করে নেবে যে, পুনর্বার দেখা নিছক বোকামি। কেননা, দ্বিতীয় বার দেখলে যদি মুখমণ্ডল ভাল মনে হয়, তবে নফসে খাহেশ হবে, অথচ সে পাওয়ার নয়। অতএব পরিতাপ ছাড়া আর কি হাতে আসবে। আর যদি মুখমন্ডল বিশ্রী মনে হয় তবে যে উদ্দেশে দেখা; অর্থাৎ আনন্দ লাভ, তা অর্জিত হবে না। কেবল মজাবিহীন গোনাহে লিপ্ত হবে। পক্ষান্তরে যদি না তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়া হয় তবে মনের উপর থেকে অনেক বিপদ টলে যায়। চোখের ত্রুটির পর যদি কেউ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নিজেকে যিনা থেকে বাঁচিয়ে নেয়, তবে এটা বড় শক্তিমত্তা ও অসাধারণ তওফীকের কাজ হবে। আবু বকর ইবনে আবদুল্লাহ মুযানী রেওয়ায়াত করেন, জনৈক কসাই তার প্রতিবেশীর বাঁদীর প্রতি আশেক হয়ে যায়। বাঁদীর মালিক তাকে কার্যোপলক্ষে অন্য গ্রামে প্রেরণ করলে কসাই তার পিছু নেয় এবং আপন কুমতলব প্রকাশ করে। বাঁদী বলল : যতটুকু তুমি আমাকে চাও আমি তার চেয়ে বেশী তোমাকে চাই। কিন্তু অপকর্ম থেকে আমাকে মাফ কর। কারণ, আমি আল্লাহকে ভয় করি। কসাই বলল : তুমি আল্লাহকে ভয় করলে আমি করব না কেন? অতঃপর সে তওবাকারী হয়ে বাড়ীর পথে রওয়ানা হল। পথিমধ্যে সে দারুণ পিপাসায় মরণোন্মুখ হয়ে পড়ল। এমন সময় বনী ইসরাঈলের একজন পয়গম্বরের দূতের সাথে তার সাক্ষাৎ হল। দূত অবস্থা জিজ্ঞেস করলে সে পিপাসার কথা জানাল। দূত বলল : আমি তুমি মিলে দোয়া করি, যাতে গ্রামে পৌঁছা পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা মেঘমালা দ্বারা আমাদেরকে ছায়া দান করেন। কসাই বলল : দোয়া করার মত কোন নেক কাজ আমি করিনি। তুমিই দোয়া কর। দূত বলল : আচ্ছা, আমিই দোয়া করি। তুমি কেবল 'আমীন' বলবে। অতঃপর দূত দোয়া আরম্ভ করল এবং কসাই আমীন বলে গেল। অবশেষে এক খণ্ড মেঘ তাদের মাথার উপর চলতে লাগল এবং তার গ্রামে পৌঁছে গেল। কসাই যখন আলাদা হয়ে তার গৃহের দিকে চলতে লাগল, তখন মেঘখণ্ডটিও তার সাথে যেতে লাগল। দূত বলল : তুমি তো বলছিলে, তোমার কোন নেক আমল নেই। তাই আমি দোয়া করেছিলাম। এখন মেঘখণ্ড তোমার সাথে চলল কিরূপে? তোমার অবস্থা আমাকে খুলে বল। কসাই তওবার ঘটনা বর্ণনা করলে দূত বলল : আল্লাহর কাছে তওবাকারীর এমন মর্তবা, যা অন্য কারও নেই ।


আহমদ ইবনে সায়ীদ তাঁর পিতার বাচনিক বর্ণনা করেন- কুফায় আমাদের কাছে একজন সুগঠন, সুশ্রী ও সৎস্বভাবের আবেদ বসবাস করত। তিনি বেশীর ভাগ সময় মসজিদেই অতিবাহিত করতেন। জনৈকা রূপসী বুদ্ধিমতী মহিলা তাঁকে দেখে প্রেমাসক্ত হয়ে পড়ল এবং দীর্ঘ দিন পর্যন্ত প্রেম অন্তরে গোপন রাখল। একদিন আবেদ যখন মসজিদে গমন করছিলেন, তখন মহিলা তাঁর পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল : আপনাকে আমি কিছু বলতে চাই, প্রথমে তা শুনে নিন, এরপর মনে যা চায় করুন। কিন্তু আবেদ কিছুই না বলে সোজা চলে গেলেন। ঘরে ফেরার পথে মহিলা আবার তাঁর পথ আগলে দাঁড়াল এবং বলল : আমার কথা শুনে যান। আবেদ মথা নত করল এবং অনেকক্ষণ পর বলল : এটা অপবাদের জায়গা। কেউ আমাকে অপবাদ দিক, আমি তা ভাল মনে করি না। মহিলা বলল : আমি আপনার অবস্থা না জেনে এখানে দাঁড়াইনি । খোদা না করুন, কেউ আমার পক্ষ থেকে খারাপ কিছু জানুক। কিন্তু এহেন কাজে আমার নিজেরই আসতে হল। আমি জানি, মানুষ তিলকে তাল বানায়। আপনারা আবেদ সম্প্রদায় আয়নার মত। সামান্য বিষয়েই আপনাদের গায়ে দোষ লেগে যায়। আমার একশ' কথার এক কথা হল, আমি আপনার প্রতি প্রেমাসক্ত। এখন আমার আপনার ব্যাপারটি আল্লাহ তা'আলাই নিষ্পত্তি করুন। যুবক আবেদ এ কথা শুনে গৃহে চলে গেলে। তিনি দিশেহারা অবস্থায় নামায পড়তে চাইলেন; কিন্তু পারলেন না। অবশেষে এক চিরকুট লেখে গৃহ থেকে বের হয়ে পড়লেন। দেখলেন, মহিলা পথিমধ্যে পূর্বের জায়গায়ই দণ্ডায়মান আছেন। তিনি চিরকুটটি মহিলার দিকে নিক্ষেপ করে আপন গৃহে ফিরে এলেন- চিরকুটের বিষয়বস্তু ছিল এই :


“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

হে নারী! জেনে রাখ, যখন বান্দা আল্লাহর নাফরমানী করে, তখন আল্লাহ সহ্য করেন। যখন পুনর্বার করে তখনও দোষ গোপন রাখেন। কিন্তু যখন গোনাহে গা ভাসিয়ে দেয় তখন এমন গযব নাযিল করেন, যা পৃথিবী, আকাশ, পাহাড় ও বৃক্ষলতা কোন কিছুই সহ্য করতে পারে না। সুতরাং এমন গযব সহ্য করার ক্ষমতা কার? তুমি যে কথা বলেছিলে, তা যদি মিথ্যা হয়, তবে সেদিনকে স্মরণ কর যখন আকাশমণ্ডলী গলিত তামার আকার ধারণ করবে, পাহাড়-পর্বত ধুনা তুলার মত হবে এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ক্রোধ ও প্রতাপ এমন প্রচণ্ড হবে যে, সকল মানুষ হাঁটু গেড়ে পড়ে থাকবে। আমার অবস্থা হচ্ছে, আমি নিজেকে সংশোধন করতে অক্ষম। পক্ষান্তরে যদি আমার উক্তি সত্য হয়, তবে এমন চিকিৎসকের সন্ধান দিচ্ছি, যিনি সকল ব্যথা নিরাময় এবং মারাত্মক ব্যাধির চিকিৎসা করবেন। তিনি হচ্ছেন আল্লাহ জাল্লা শানুহু । খাঁটি মনে তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করা উচিত। তোমার পক্ষ থেকে আমার জন্যে এ আয়াতটিই যথেষ্ট :

“তাদেরকে সতর্ক করে দিন আসন্ন দিন সম্পর্কে, যখন কষ্টের কারণে তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে। জালেমদের জন্যে কোন অন্তরঙ্গ বন্ধু নেই এবং সুপারিশ গ্রাহ্য হয় এমন কোন সুপারিশকারীও নেই। চোখের অপব্যবহার এবং অন্তরের গোপন বিষয় আল্লাহ জানেন”।

এ আয়াত থেকে পলায়নের উপায় নেই। ইতি -


কয়েকদিন পরে এই মহিলা আবার এসে পথিমধ্যে দণ্ডায়মান হল। আবেদ তাকে দূর থেকে দেখেই গৃহপানে ফিরে যাবার ইচ্ছা করলেন। 

মহিলা বলল : চলে যান কেন? আজই শেষ সাক্ষাৎ। এরপর আল্লাহ তা'আলার কাছেই দেখা হবে। এরপর সে খুব কান্নাকাটি করল এবং বলল : যে আল্লাহর হাতে আপনার প্রাণ, আমি তাঁর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আপনার সমস্যাটি আমার জন্যে সহজ করে দেন। কিন্তু আমাকে কোন উপদেশ দিন। আবেদ বললেন : নিজেকে নফসের কবল থেকে বাঁচিয়ে রাখ এবং এ আয়াতটি মনে রেখ :

“তিনিই তোমাদেরকে রাতের বেলায় ওফাত দেন এবং দিনে যা কর, তা জানেন”।


মহিলা আঁচলে মুখ লুকিয়ে প্রথম বারের চেয়েও অধিক কান্না শুরু করল। এরপর আপন গৃহে চলে গেল। কয়েকদিন আল্লাহর এবাদতে মশগুল থাকার পর সে দুঃখেই ইন্তেকাল করল। আবেদ তাকে স্মরণ করে কাঁদত। লোকেরা জিজ্ঞেস করত : আপনিই তো তাকে নিরাশ করেছেন। এখন কাঁদেন কেন? আবেদ বলতেন, সূচনাতেই তাকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর কাছে নিজের জন্যে ভাণ্ডার করেছি। এখন তা বিনষ্ট হয় কি না, তাই ভেবে কাঁদি।


প্রথম পর্ব

 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...