রবিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৩

ক্রোধ বিনাশক ব্যবস্থা

 

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৪)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ক্রোধ বিনাশক ব্যবস্থা

ক্রোধ দমনের জন্য ব্যবস্থা অবলম্বন ও সাধনা অবশ্য কর্তব্য। কারণ, ক্রোধেই অধিকাংশ মানুষকে দোযখে লইয়া যায় এবং ইহা হইতেই জগতে অশান্তি, কলহ-বিবাদ ও যুদ্ধ বিগ্রহের সৃষ্টি হয়। ক্রোধ দমনের দুইটি উপায় আছে। 

প্রথম- ক্রোধ বহিষ্কারক উপায়। ইহা জোলাপের মত ক্রোধরূপ ব্যাধির জড় ও মূল অন্তর হইতে বাহির করিয়া দেয়। 

দ্বিতীয়- ক্রোধ উপশমমূলক উপায়। ইহা ‘শিকাবীন' নামক অম্লরস ও মধু বা চিনি মিশ্রিত পানীয় সদৃশ। ইহা ব্যাধির তীব্র দোষসমূহ উপশম করে ও উগ্র স্বভাবকে সাম্যভাবাপন্ন করিয়া তোলে।


ক্রোধ বহিষ্কারক উপায়--

সর্বাগ্রে ক্রোধ সঞ্চারের কারণ নির্ণয় করিবে এবং তৎপর ইহার মূলোচ্ছেদ করিবে। ইহাই ক্রোধ বহিষ্কারক উপায়। পাঁচটি কারণে ক্রোধের সঞ্চার হয়;  যথা : (১) অহঙ্কার, (২) ওজ্ব অর্থাৎ নিজে নিজকে উত্তম ও গুণবান বলিয়া মনে করা, (৩) কৌতুক, (৪) তিরস্কার এবং (৫) ধনলিপ্সা ও প্রভুত্বপ্রিয়তা।


ক্রোধ-বহিষ্কারক উপায়ের প্রথম ধাপ-

অহঙ্কার ক্রোধ সঞ্চারের অন্যতম প্রধান কারণ। অহঙ্কারী ব্যক্তি কথাবার্তা ও কাজকর্মের অপরের নিকট হইতে প্রত্যাশিত সম্মান না পাইলেই ক্রোধে উত্তেজিত হইয়া উঠে। অতএব বিনয়ী ব্যবহারে অহঙ্কার চূর্ণ করিতে হইবে। তোমার হৃদয়ে অহঙ্কার দেখা দিলে চিন্তা করিবে, তুমি আল্লাহর একটি নগণ্য দাসমাত্র; দাসের পক্ষে অহঙ্কার শোভা পায় না। আরও বুঝিবে যে, সৎস্বভাবেই দাসত্ব হইয়া থাকে; অহঙ্কার অসৎস্বভাবের অন্তর্গত। সুতরাং অহঙ্কার দাসত্বের দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটায়। বিনয় ব্যতীত অন্য কিছুতেই অহঙ্কার বিনাশ করা যায় না।


ক্রোধ-বহিষ্কারক উপায়ের দ্বিতীয় ধাপ--

ক্রোধ সঞ্চারের দ্বিতীয় কারণ খোদপছন্দী বা নিজে নিজকে উত্তম ও গুণবান বলিয়া মনে করা। ইহা বিদূরিত করিতে হইলে স্বীয় পরিচয় লাভ করিবে। অহঙ্কার ও খোদপছন্দী দূর করিবার উপায় যথাস্থানে বণিত হইবে।


ক্রোধ-বহিষ্কারক উপায়ের তৃতীয় ধাপ – 

ক্রোধ সঞ্চারের তৃতীয় কারণ কৌতুক। কাহাকেও কৌতুক করিলে অধিকাংশ সময় সেই ব্যক্তি উত্তেজিত হইয়া উঠে। সুতরাং এইরূপ অপকর্মে সময়ের অপচয় না করিয়া বরং আখিরাতের সম্বল সংগ্রহ কার্যে ও সৎস্বভাব অর্জনে নিজকে ব্যাপৃত রাখিবে এবং কৌতুক হইতে বিরত থাকিবে। কৌতুকের ন্যায় উপহাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপেও ক্রোধ জন্মে। তুমি কাহাকেও উপহাস ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করিলে সে-ও তোমাকে তদ্রূপ করিবে। এইরূপে তোমার নিজের সম্মান নিজেই নষ্ট করিবে। অতএব এইরূপ কৌতুক, উপহাস ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ হইতে নিরস্ত থাকা নিতান্ত আবশ্যক।


ক্রোধ-বহিষ্কারক উপায়ের চতুর্থ ধাপ – 

কাহাকেও তিরস্কার করিলে তিরস্কারকারী ও তিরস্কৃত ব্যক্তি এই উভয়ের হৃদয়েই ক্রোধের উদ্রেক হয়। ইহা হইতে অব্যাহতি লাভের উপায় এই মনে করিবে, নিজে দোষমুক্ত না হইয়া অপরের দোষ ধরিয়া তিরস্কার করা শোভা পায় না। অপরপক্ষে, দোষমুক্ত ব্যক্তিই বা অপরকে তিরস্কার করিয়া নিজেকে কলঙ্কিত করিবে কেন? অতএব তিরস্কার করা কাহারও পক্ষে সঙ্গত নহে।


ক্রোধ বহিষ্কারক উপায়ের পঞ্চম ধাপ — 

যদিও সংসারযাত্রা নির্বাহ করিতে অধিকাংশ স্থলেই মানবের ধন, প্রভুত্ব ও মান-সম্ভ্রমের দরকার হইয়া পড়ে, তথাপি ধন-লিপ্সা ও প্রভুত্বপ্রিয়তাই ক্রোধ উৎপত্তির অন্যতম কারণ। কৃপণের নিকট হইতে এক কপর্দক গ্রহণ করিলেও সে ক্রুদ্ধ হয়, আর অতি লোভীর নিকট হইতে এক গ্রাস অন্ন লইলেও সে ক্রোধে উত্তেজিত হইয়া উঠে। ধনাসক্তি ও প্রভুত্ব কামনা মন্দ স্বভাবের অন্তর্গত এবং ক্রোধের মূল কারণ। ধনাসক্তি ও প্রভুত্ব কামনা দমনের জ্ঞানমূলক ও অনুষ্ঠানমূলক উপায় রহিয়াছে।


জ্ঞানমূলক উপায়— 

ধনাসক্তি ও প্রভুত্ব কামনার আপদ, কদর্যতা এবং ইহ-পরকালে ইহাদের অনিষ্ট সাধন সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি করত ইহাদের প্রতি আন্তরিক ঘৃণার উদ্রেক করিবে।


অনুষ্ঠানমূলক উপায়— 

উক্ত প্রবৃত্তিদ্বয়ের বিরুদ্ধাচরণে প্রবৃত্ত হইবে; ইহারা যে বিষয়ে তোমাকে উত্তেজিত করিতে চেষ্টা করে, ইহা হইতে তুমি বিরত থাকিবে। প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণে যে শুধু ধনাসক্তি ও প্রভুত্বপ্রিয়তা নিবৃত্ত হয় তাহাই নহে, বরং ইহা সকল প্রকার কুস্বভাব নিবারণের উপায়। ‘রিয়াযত’ বিষয় বর্ণনাকালে প্রথম অধ্যায়ে ইহার বিস্তৃত আলোচনা হইয়াছে।


ক্রোধান্ধ ব্যক্তির সংসর্গে ক্রোধ সঞ্চার—

মানব অন্তরে ক্রোধ বদ্ধমূল হওয়ার অপর একটি প্রধান কারণ রহিয়াছে। যাহারা ক্রোধকে মহিমা ও বীরত্বের কারণ বলিয়া মনে করে এবং ইহাতে গর্ব অনুভব করে, এইরূপ ক্রোধান্ধ লোকের সংসর্গে যাহারা প্রতিপালিত হয় তাহাদের অন্তরে ক্রোধরূপ ব্যাধি সংক্রামিত হয় এবং পরিশেষে ইহা তাহাদিগকে চির রুগ্ন করিয়া ফেলে। ক্রোধান্ধ ব্যক্তিগণ ক্রোধের মাহাত্ম্য বর্ণনা করিতে যাইয়া বলে- “অমুক সাধু পুরুষ এক কথায় এক ব্যক্তিকে মারিয়া ফেলিয়াছেন, অমুকের জানমাল ধ্বংস করিয়াছেন, কাহার সাধ্য যে, তাঁহার কথার প্রতিবাদ করে। সিংহপুরুষ বটে, যে কেহ তাঁহার রোষে পতিত হইয়াছে সেই ধ্বংস হইয়াছে। সিংহপুরুষ এইরূপই হইয়া থাকেন; কাহাকেও ক্ষমা করিয়া ছাড়িয়া দেওয়াকে তাঁহারা অপমান, অক্ষমতা ও অনুপযুক্ততার কারণ বলিয়া মনে করেন।” ক্রোধান্ধ ব্যক্তিগণের মুখে ক্রোধের এইরূপ প্রশংসাবাদ শ্রবণ করিয়া তাহাদের নব সঙ্গিগণের অন্তরেও পরিশেষে ক্রোধ বদ্ধমূল হইয়া পড়ে।


ক্রোধ কুকুরের স্বভাব। কিন্তু ক্রোধান্ধগণ ইহাকে বীরত্ব ও বাহাদুরির কারণ বলিয়া মনে করে। মানবের প্রশংসনীয় গুণাবলী, যাহা পয়গম্বরগণের স্বভাব, যেমন সহিষ্ণুতা, ধৈর্য, ক্ষমা প্রভৃতিকে তাহার অনুপযুক্ততা ও কাপুরুষতার লক্ষণ বলিয়া থাকে। ইহাই শয়তানের কাজ। সে প্রতারণা দ্বারা প্রশংসনীয় গুণের কুৎস রটনা করত মানুষকে সৎস্বভাব অর্জনে বিরত রাখে এবং জঘণ্য দোষের গুণকীর্তন করত অসৎস্বভাবের দিকে তাহাকে আহ্বান করে। জ্ঞানীগণ জানেন, ক্রোধের সহিত বীরত্বের কোন সম্বন্ধ নাই। তাহা হইলে অবলা নারী, অসহায় শিশু, দুর্বল বৃদ্ধ এবং রুগ্ন ব্যক্তির কখনও ক্রোধের সঞ্চার হইত না। কিন্তু ইহা অবিদিত নহে যে, তাহারা তাড়াতাড়ি উত্তেজিত হইয়া থাকে। ক্রোধ বিজয়ীগণের ন্যায় বীরপুরুষ আর নাই। নবী ও কামিল দরবেশগণই সেই বীরত্বের অধিকারী। পাহলোয়ান, তুর্কী সিপাহীগণ সিংহ-ব্যাঘ্রাদি প্রাণীর হিংস্র বলে বলীয়ান হইলেও ক্রোধ দমন ক্ষেত্রে তাহাদের কোনই বীরত্ব নাই।

প্রিয় পাঠক, এখন ভাবিয়া দেখ, নবী ও দরবেশগণের গুণে ভূষিত হওয়া তোমার পক্ষে গৌরবের বিষয়, না নির্বোধ অজ্ঞদের ন্যায় হওয়া সঙ্গত।



পরবর্তী পর্ব

ক্রোধ-উপশমমূলক উপায়

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...