জানা উচিত যে, প্রত্যেক রোগের প্রতিকার হবে তার কারণের বিপরীত কারণকে সম্মুখে আনা। আত্মপ্রসাদের কারণ যেহেতু অজ্ঞতা, তাই তার প্রতিকার হবে সেই জ্ঞান, যা অজ্ঞতার বিপরীত। অজ্ঞতাবশত যে সকল বিষয় নিয়ে মানুষ আত্মপ্রসাদে লিপ্ত হয়, সেগুলো মোটামুটি আট প্রকার।
(১) রূপ, সৌন্দর্য, স্বাস্থ্য, অঙ্গসৌষ্ঠব ইত্যাদি নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। এর চিকিৎসা তাই, যা আমরা রূপলাবণ্য নিয়ে অহংকার করার বেলায় উল্লেখ করেছি। অর্থাৎ, নিজের আদি-অন্ত অপবিত্রতার কথা চিন্তা করবে এবং অনুধাবন করবে যে, এর আগে কত অপরূপ সৌন্দর্যশালীরা মাটিতে মিশে গেছে এবং কবরে তাদের দেহ কেমন দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে গেছে।
(২) শক্তিসামর্থ্য নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা; যেমন কোরআনে উল্লিখিত আদ সম্প্রদায়ের লোকেরা বলেছিল,
>আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিধর আর কে?’ এর চিকিৎসা এ কথা হৃদয়ঙ্গম করা যে, একদিনের জ্বরে শক্তিশালী মানুষ নিঃশক্তি হয়ে যায়।
(৩) আপন বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতা নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। এর ফলে মানুষ নিজের মতামতকে বহাল রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে এবং যে তার বিরুদ্ধে বলে, তাকে মূর্খ জ্ঞান করে। এর চিকিৎসা হল, স্রষ্টার পক্ষ থেকে যে বুদ্ধিমত্তা দান করা হয়েছে, তজ্জন্যে তাঁর শোকর করবে এবং চিন্তা করবে যে, তার মস্তিষ্কে সামান্য রোগ দেখা দিলে এমন পাগল হয়ে যেতে পারে, যার পেছনে বালকেরা হাসি-তামাশা করবে। এছাড়া নিজের বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান-গরিমাকে কম মনে করবে। মনে রাখবে, যার বুদ্ধিমত্তায় ত্রুটি থাকে, সে নিজে কখনও সেই ত্রুটি জানতে পারে না।
(৪) বংশমর্যাদা নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। যেমন কতক সৈয়দ বংশীয় ব্যক্তি আত্মপ্রসাদবশত মনে করে, বংশ-গরিমা এবং পূর্বপুরুষদের দৌলতে তাদের মাগফেরাত হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ মনে করে, সকল মানুষ তাদের বাঁদী-গোলাম। এর চিকিৎসা একথা চিন্তা করা যে, আমি কর্ম ও চরিত্রে বংশের কৃতী পুরুষদের বিরুদ্ধাচরণ করেছি। এ সত্ত্বেও ধারণা করি যে, তাদের স্তরে পৌঁছে গেছি। এটা নিছক মূৰ্খতা। আমার গুরুজনদের মধ্যে তো আত্মপ্রসাদ ছিল না; বরং তারা নিজেদেরকে তুচ্ছ এবং সকল মানুষকে বড় মনে করতেন।
আল্লাহর আনুগত্য ও উত্তম অভ্যাস দ্বারাই তো তারা গৌরব অর্জন করেছিলেন- বংশমর্যাদা দ্বারা নয়। অতএব, আমাকেও সেই গৌরব অর্জন করতে হবে। গৌরব খোদাভীতি দ্বারা অর্জিত হয়। বংশমর্যাদা দ্বারা নয়। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
>”তোমাদের মধ্যে সেই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানী, যে অধিক খোদাভীরু।”
এ আয়াতের শানে নুযূল এই যে, মক্কা বিজয়ের দিন হযরত বেলাল (রাঃ) আযান দিলে হারেছ ইবনে হেশাম, সোহায়ল ইবনে উমর ও খালেদ ইবনে উসায়দ সবিস্ময়ে বলল : এই কাফ্রী ক্রীতদাস আযান দেয় ! কোরআন পাকে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি নিকট-আত্মীয়দেরকে সতর্ক করার আদেশ অবতীর্ণ হলে তিনি একজন একজন করে সকলকে নাম ধরে ডাকলেন। এমনকি বললেন : হে মোহাম্মদ তনয়া ফাতেমা এবং সফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব, তোমরা নিজের জন্যে নিজেই আমল কর। এটা মনে করো না যে, আমি তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারব। যে ব্যক্তি এসব বিষয় অনুধাবন করবে, সে কখনও বংশমর্যাদার অহমিকায় লিপ্ত হবে না।
(৫) যালেম রাজা-বাদশাহের বংশধর প্রকাশ করে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। এটাও চরম মূর্খতা এবং এর চিকিৎসা এই যে, সেই রাজা-বাদশাহদের যুলুম ও অত্যাচারের কথা চিন্তা করবে এবং এর কারণে তারা যে আল্লাহর গযবে পতিত হয়ে দোযখের ইন্ধন হয়ে গেছে একথাও চিন্তা করবে। কিয়ামতে তাদের দুরবস্থার একটি চিত্রও কল্পনা করবে যে, তারা যে সব লোকের উপর যুলুম করেছিল, তারা তাদেরকে জড়িয়ে ধরবে এবং মাথার চুল ধরে উপুড় করে টেনে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। এটা কল্পনা করলে নিজেই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে এবং বলবে- শূকর ও কুকুরের সাথে আত্মীয়তা ভাল- এদের সাথে নয়।
মোটকথা, যালেম রাজা-বাদশাহদের বংশধরকে যদি আল্লাহ যুলুম থেকে বাঁচিয়ে রাখেন, তবে তারা তজ্জন্যে শোকর করবে। তাদের পিতৃপুরুষ মুসলমান হলে তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।
(৬) অধিক সন্তান-সন্ততি, চাকর-নওকর ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা; যেমন হুনায়ন যুদ্ধে মুসলমানরা নিজেদের সংখ্যাধিক্যের কারণে বলেছিল, আজ আমরা পরাজিত হব না। এর প্রতিকার এটা ধ্যান করা যে, সকলেই আল্লাহর অক্ষম বান্দা। কেউ নিজের লাভ-লোকসানের মালিক নয়। আল্লাহ বলেন : “অনেক ক্ষুদ্র দল আল্লাহর আদেশে বৃহৎ দলের উপর বিজয়ী হয়েছে।”
(৭) ধন-সম্পদ নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। যেমন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) একবার দেখলেন, জনৈক ধনী ব্যক্তির কাছে এক ফকীর এসে বসতেই সে তার কাপড় টেনে সংকুচিত হয়ে বসল। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ধনী ব্যক্তিকে বললেন : তুমি কি আশংকা কর যে, তার দরিদ্রতা তোমার মধ্যে সংক্রমিত হয়ে যাবে? বলা বাহুল্য, এটা ছিল ধনের আত্মপ্রসাদ। এর চিকিৎসা এই যে, ধন-সম্পদের বিপদাপদ, এতে অপরের হকের আধিক্য, ফকীরদের ফযীলত এবং জান্নাতে তাদের অগ্রগামিতার কথা চিন্তা করবে। আরও চিন্তা করবে যে, ধন-দৌলত সকালে আসে, বিকালে চলে যায়। এর কোন মৌলিকতা নেই। অনেক কাফেরও অগাধ ধন-সম্পদের মালিক।
(৮) আপন ভ্রান্ত মত নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। এরূপ ব্যক্তি সম্পর্কেই আল্লাহ তা'আলা বলেন :
>”যার জন্যে তার কুকর্মকে সুসজ্জিত করা হয়। অতঃপর সে তাকে সৎকর্ম দেখে।”
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে :
>”তারা ধারণা করে যে, তারা খুব সৎকর্ম করছে।”
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন-
>”ভ্রান্ত মত নিয়ে আত্মপ্রসাদ এ উম্মতের শেষ যুগে হবে।”
এ সর্বনাশা বদ অভ্যাসের কারণে পূর্ববর্তী উম্মতরা ধ্বংস হয়ে গেছে। কারণ, এর কারণেই ভিন্ন ভিন্ন মত ও পথের সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যেকেরই বিশ্বাস যে, সেই খুব জ্ঞানী। অতঃপর সে তার মত ও পথ নিয়েই খুশী থাকে। দুনিয়াতে অনেক বেদআতী ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তি আপন আপন বেদআত ও পথভ্রষ্টতাকে শক্তভাবে আঁকড়ে থাকে। এর কারণ এটাই যে, তারা আপন ভ্রান্ত মত নিয়ে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত।
বেদআত নিয়ে আত্মপ্রসাদ অর্থ এই, যে বিষয়ের প্রতি খাহেশ ও মন ধাবিত হয়, তাকে ভাল ও সত্য বলে ধারণা করা। এ প্রকার আত্মপ্রসাদের চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে কঠিন। কেননা, যার মতামত ভ্রান্ত, সে তার ভ্রান্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকে। সুতরাং যাকে রোগই মনে করে না, তার চিকিৎসা কিরূপে করবে? কিন্তু যারা সাধক ও বিভুজ্ঞানী তারা মূর্খতা সম্পর্কে অবগত করতে পারে এবং তা দূর করতে পারে। যদি সে মূর্খতা নিয়েও আত্মপ্রসাদে মগ্ন থাকে, তবে সাধকের কথায়ও কর্ণপাত করবে না; বরং সাধককেও দোষী মনে করবে। এমতাবস্থায় তার চিকিৎসা কিরূপে হবে? তবে একটি মোটামুটি চিকিৎসা আছে। তা এই যে, প্রত্যেকেই আপন মতকে অভ্রান্ত মনে করবে না; বরং বিশ্বাস করবে যে, তার মতও ভ্রান্ত হতে পারে। এ ছাড়া বিরোধপূর্ণ মাযহাবসমূহ নিয়ে মাথা ঘামাবে না; বরং বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ এক। তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি দেখেন ও শুনেন। তাঁর রসূল সত্য। যা কিছু তিনি নিয়ে এসেছেন, তা সত্য ৷ আল্লাহ আমাদের সকলকে যাবতীয় পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করুন।
(সমাপ্ত)
[আমিন ! ইয়া রব্বে মোস্তফা সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম]
প্রথম পর্ব
অহংকার ও আত্মপ্রীতি মারাত্মক ব্যাধি

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন