শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০২৩

রিয়ার বিপদাপদ


 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব - ৬)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রিয়ার বিপদাপদ

জানা উচিত, খাহেশ বর্জনকারী ব্যক্তি এমন দু'টি বিপদের সম্মুখীন হয়, যা সাধের বস্তু খাওয়ার চেয়েও অধিক ক্ষতিকর। প্রথম হচ্ছে, নফস কোন কোন খাহেশ ত্যাগ করতে পারে না। কিন্তু কেউ জানুক, এটাও চায় না। তাই নির্জনে সে বস্তুটি খেয়ে নেয়- জনসমাবেশে খায় না। একে বলা হয় “শেরকে খফী” তথা গোপন শেরক। জনৈক আলেমকে কোন দরবেশের হাল জিজ্ঞেস করা হলে তিনি চুপ করে রইলেন। লোকেরা বলল : তার কোন দোষ আপনি জানেন? তিনি বললেন : সে একান্তে এমন বস্তু খায়, যা প্রকাশ্যে খায় না। মোট কথা, এটা খুব বড় বিপদ । কেউ খাহেশের মহব্বতে লিপ্ত হয়ে গেলে তার উচিত তা প্রকাশ করে দেয়া। 'সাচ্চা হাল' একেই বলা হয়। এতে শুধু এটাই জানা যাবে যে, আমলের দোষে সাধনা ভণ্ডুল হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে কোন দোষ গোপন করে তার বিপরীতে জনসমক্ষে পূর্ণতা প্রকাশ করলে দু'টি ক্ষতি হবে; যেমন মিথ্যা বলে তা গোপন করলে দু'টি মিথ্যা হয়ে যায়। দু'টি সত্যিকার তওবা না করা পর্যন্ত কেউ এরূপ ব্যক্তির প্রতি সন্তুষ্ট হয় না । এ কারণেই আল্লাহ পাক মোনাফেকদের আযাব বেশী বলে এরশাদ করেছেন। কেননা, কাফের প্রকাশ্যে কুফর করে; কিন্তু মোনাফেক কুফর করে তা গোপন করে। অতএব গোপন করা দ্বিতীয় কুফর হল। সে মানুষের দৃষ্টিকে আল্লাহর দৃষ্টির চেয়ে অধিক প্রখর বলে বিশ্বাস করে আপন কুফর গোপন করে। তাই সে দ্বিগুণ আযাবের যোগ্য হয়। বিভুজ্ঞানীগণ খাহেশ এমনকি, গোনাহে লিপ্ত হয়ে যান; কিন্তু রিয়ায় গ্রেফতার হন না। তাঁরা আপন দোষত্রুটি গোপন করেন না; বরং পূর্ণ বিভুজ্ঞান হচ্ছে, খাহেশকে আপন নফস থেকে আল্লাহর ওয়াস্তে দূর করবে এবং বাহ্যতঃ মানুষের বিশ্বাস হ্রাস করার জন্যে খাহেশ প্রকাশ করবে। জনৈক বুযুর্গ সাধের মামুলী বস্তু এনে গৃহে লটকিয়ে রাখতেন; অথচ খেতেন না, যাতে গাফেল লোক তাঁর কাছে এসে ভিড় না জমায় এবং তাঁকেও খাহেশ পূজারী মনে করে। দরবেশের বড় কৃতিত্ব হচ্ছে দরবেশীতে দরবেশী করা; অর্থাৎ দরবেশীর বিপরীত প্রকাশ করা। এটা সিদ্দীকগণের কাজ। এরূপ ব্যক্তি সেই ব্যক্তির মত, যাকে কেউ কিছু দিলে প্রকাশ্যে তা গ্রহণ করে; কিন্তু পরে গোপনে মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়। বলাবাহুল্য, তার অন্তর দু'বার বিনয়ী হয়। এক, বাহ্যতঃ গ্রহণ করার লাঞ্ছনা মেনে নেয়ার সময় এবং দুই, গোপনে ফেরত দেয়ার কালে আপন অভাব অব্যাহত রাখার সময়। এই স্তর অর্জিত হওয়া পর্যন্ত নিজেকে অপূর্ণ জ্ঞান করা এবং খাহেশ প্রকাশ করা উচিত। শয়তান তাকে এই বলে ধোকা দিতে চাইবে যে, এ খাহেশ প্রকাশ করলে অন্যেরাও তোমার অনুসরণ করবে। সুতরাং গোপন করার মধ্যেই অপরের সংশোধন

নিহিত। অথচ বাস্তবে অপরের সংশোধন লক্ষ্য হলে আপন নফসের সংশোধন অগ্রে এবং অধিক গুরুত্বপূর্ণ হত। এতে বুঝা গেল, উদ্দেশ্য রিয়া ছাড়া কিছুই নয়।


দ্বিতীয় রিপদ হচ্ছে, খাহেশ বর্জনে সক্ষম; কিন্তু সাধু বলে পরিচিতি হওয়ার আকাঙ্ক্ষী। এমতাবস্থায় খাদ্যের খাহেশ, যা আসলে দুর্বল, তা তো বর্জন করা হল; কিন্তু সুখ্যাতির খাহেশ, যা অধিক অনিষ্টকর- তার খপ্পরে পড়া হল। একে বলা হয় গোপন খাহেশ। এটা খাদ্যের খাহেশ অপেক্ষা অধিক জোরালো। কেউ নিজের মধ্যে এ ধারার খাহেশ অনুভব করার পর যদি একে অধিক জোরালো মনে করে খাদ্যের খাহেশ মিটিয়ে নেয় এবং খেয়ে ফেলে, তবে এটা তার জন্যে উত্তম। হযরত আবু সোলায়মান বলেন : তোমার সামনে যখন বর্জন করা সাধের খাদ্য আসে, তখন তা থেকে সামান্য খেয়ে নাও, নফসের চাহিদা মোতাবেক খেয়ো না। এতে দু'টি উপকারিতা আছে। এক, খাহেশ থাকবে না এবং দুই, নফস আকাঙ্ক্ষার মধ্যে থেকে যাবে। হযরত ইমাম জাফর (রহঃ) বলতেন : আমার সামনে কোন খাহেশের বস্তু এলে আমি আপন নফসকে দেখি। যদি প্রকাশ্যে আকাঙ্ক্ষা করতে দেখি, তবে খাইয়ে দেই। বাধা দেয়ার চেয়ে এটা ভাল । আর যদি দেখি, গোপনে আকাঙ্ক্ষা করে এবং প্রকাশ্যে বর্জনকারী হতে চায়, তবে খাওয়া বর্জন করি- কখনও খাই না । এ থেকে গোপন খাহেশের জন্যে নফসকে সাজা দেয়ার পদ্ধতি জানা গেল । মোট কথা, খাদ্যের খাহেশ ত্যাগ করে গোপন খাহেশে লিপ্ত হওয়া এমন, যেমন কেউ বিচ্ছুকে ভয় করতঃ সাপের কাছে চলে যায়। কেননা, রিয়ার ক্ষতি খাদ্যের খাহেশের ক্ষতির তুলনায় অনেক বেশী।


(৭) লজ্জাস্থানের খাহেশ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...