শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০২৩

উদরের খাহেশ চূর্ণকারী সাধনা


 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব– ৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

উদরের খাহেশ চূর্ণকারী সাধনা 

উদর ও খাদ্যের ব্যাপারে মুরীদের উচিত চারটি বিষয় নির্দিষ্ট করে নেয়া  (১) খাদ্যের পরিমাণ, (২) খাদ্যের সময়, (৩) খাদ্যের শ্রেণী এবং (৪) পরহেযের স্তর। শেষোক্ত বিষয়টি আমরা হালাল ও হারাম অধ্যায়ে বর্ণনা করেছি। এখানে প্রথমোক্ত তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হচ্ছে। প্রথম কথা, খাদ্যের পরিমাণ হ্রাস করতে হবে এবং এতে ধাপে ধাপে সাধনা করতে হবে, যাতে একটি অনুমানে পৌঁছা যায়। কারণ, অতিভোজনে অভ্যস্ত কোন ব্যক্তি যদি হঠাৎ খাদ্য হ্রাস করে দেয়, তবে কষ্টও বেশী হবে এবং দুর্বলতা হেতু সাধনা সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। সুতরাং অল্প অল্প করে খাদ্য হ্রাস করতে হবে। উদাহরণতঃ যদি কেউ দু'রুটি খায় এবং তা হ্রাস করে এক রুটিতে আনতে চায়, তবে পূর্ণ এক মাস সময়ের মধ্যে তা হ্রাস করা যায়। প্রথমে দু'রুটির পরিমাণ ওযন করবে। এর পর প্রত্যহ এক রুটির ওযনের ত্রিশ ভাগের এক ভাগ হ্রাস করবে। অথবা লোকমার গণনার মাধ্যমেও এটা করা যায়। এভাবে কোন ক্ষতি অথবা বিরূপ প্রভাবের আশংকা নেই। খাদ্যের পরিমাণের চারটি স্তর আছে। 


প্রথম স্থর, এতটুকু কম, যাতে জীবনটা কোন রকমে বেঁচে যায়। এটা সিদ্দীকগণের স্তর। সহল তস্তরী (রহঃ)ও একেই পছন্দ করেন । তিনি বলেন : আল্লাহ্ তাআলা জীবন, বুদ্ধি-বিবেচনা ও শক্তি- এই তিনটি বিষয় দ্বারা এবাদত করান। যদি বান্দা জীবন ও বুদ্ধি-বিবেচনা বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা করে, তবে আহার করবে- রোযা রাখবে, মাঝে মাঝে রোযা ছাড়াও থাকবে। খাদ্য নিজের কাছে না থাকলে তালাশ করবে। আর যদি এ দু'টি বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা না হয়- কেবল শক্তি বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা হয়, তবে খাদ্যের কোন পরওয়া করবে না, যদিও দুর্বলতার কারণে বসে বসে নামায পড়তে হয়। এক্ষেত্রে বিশ্বাস করতে হবে যে, উপবাসের দুর্বলতার কারণে বসে নামায পড়া খাদ্যের শক্তি দ্বারা দাঁড়িয়ে নামায পড়ার তুলনায় উত্তম। কেউ তার খাদ্যের অবস্থা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আমি সারা বছরে তিন দেরহামের খাদ্য খাই। এক দেরহামের বিনিময়ে আঙ্গুরের ঘন রস ক্রয় করি, এক দেরহাম দিয়ে চাউলের আটা এবং এক দেরহাম দিয়ে ঘি কিনে নেই। এর পর সবগুলো মিলিয়ে তিনশ' ষাটটি বড়ি তৈরি করে নেই। প্রতি রাতে এক বড়ি দিয়ে ইফতার করি। তবে আজকাল সময়ের কোন পরিমাণ নির্দিষ্ট নেই। জনৈক সংসারত্যাগী সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি আপন খাদ্য সাড়ে তিন মাশা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে ছিলেন।


দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে, দিনে-রাতে পাঁচ ছটাক পরিমাণে খাদ্য খাবে । সম্ভবত এটা অধিকাংশ লোকের এক-তৃতীয়াংশ পেটের সমান হবে, যা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। হযরত ওমর (রাঃ)-এর অভ্যাস তাই ছিল। তিনি সাত লোকমা অথবা নয় লোকমা খেতেন।


তৃতীয় স্তর হচ্ছে, সারা দিনে আড়াই পোয়া পরিমাণে আহার করবে। এটা পেটের এক-তৃতীয়াংশের বেশী এবং খুব সম্ভব দু-তৃতীয়াংশের সমান । এমতাবস্থায় এক-তৃতীয়াংশ পেট পানীয়ের জন্য থেকে যাবে।


চতুর্থ স্তর হচ্ছে, আরও বাড়িয়ে এক সের পর্যন্ত আহার করবে। এর বেশী খাওয়া অপব্যয়ের মধ্যে দাখিল এবং খোদায়ী আদেশের বিপরীত। এখানে বুঝা দরকার, অধিকাংশের দিকে লক্ষ্য করে উপরোক্ত স্তরসমূহ বর্ণিত হয়েছে। নতুবা খাদ্যের পরিমাণ ব্যক্তি, বয়স ও সংশ্লিষ্ট কাজকর্মের দিকে লক্ষ্য করে প্রত্যেকের জন্যে আলাদা ।


পঞ্চম স্তর হচ্ছে, সত্যিকার খাহেশ হলে আহার করবে এবং সত্যিকার খাহেশ বাকী থাকা অবস্থায় হাত গুটিয়ে নেবে; কিন্তু এক রুটি অথবা দু’রুটির পরিমাণ নির্দিষ্ট না করলে সত্যিকার খাহেশের শেষ সীমা প্রকাশ পাবে না। তবে সত্যিকার খাহেশের আলামত এই লিখিত আছে যে, যে কোন রুটি পেলে তা খেয়ে নেয়া। যদি নির্দিষ্ট রুটি মনে চায় কিংবা তরকারিও কামনা করে, তবে খাহেশ সত্যিকার হবে না ।

আরেকটি আলামত হচ্ছে, থুথু ফেললে তাতে মাছি বসবে না। অর্থাৎ থুথুর মধ্যে তৈলাক্ততা না থাকায় বুঝা যায়, পাকস্থলী শূন্য। সুতরাং সত্যিকার খাহেশের পরিচয় কঠিন। সুতরাং মুরীদের জন্যে এটাই উত্তম যে, খাদ্যের একটি পরিমাণ নির্দিষ্ট করে নেবে, যাতে যে এবাদত সে করে, তা সুন্দররূপে আনজাম দিতে পারে- তাতে দুর্বল না হয়ে পড়ে। এ সীমায় পৌঁছে যাওয়ার পর খাহেশ বাকী থাকলেও থেমে যাবে এবং পরিমাণ বাড়াবে না।


সারকথা, খাদ্যের বিশেষ পরিমাণ নির্ধারণ সম্ভবপর নয়। কেননা, অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে প্রত্যেকের জন্যে আলাদা আলাদা সীমা রয়েছে। তবে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে এক দলের অভ্যাস ছিল, তাঁরা সপ্তাহে এক ছা' গম আহার করতেন এবং খেজুর খেলে সপ্তাহে দেড় ছা' খেতেন। চার মুদে এক ছা' হয়। প্রতি মুদ আড়াই পোয়ার সমান। এভাবে এক দিনের খাদ্য হয় গম আধা মুদের কিছু বেশী। খেজুর বেশী হওয়ার কারণ এ থেকে বীচি বের হয়ে যায়। এ পরিমাণটি পেটের এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি। হযরত আবু যর গেফারী (রাঃ) রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর প্রকাশ্য-জীবদ্দশায় প্রতি সপ্তাহে তিন সের যব খেতেন । রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর ওফাতের পরও তাই আহার করতেন। তিনি বলতেন : আল্লাহর কসম, আমি সারা জীবন এই পরিমাণ বৃদ্ধি করব না । আমি প্রিয় হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি  : “কেয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি আমার অধিক নিকটে থাকবে, যে আমৃত্যু বর্তমান অবস্থার উপর কায়েম থাকবে”। তিনি কতক সাহাবীর উদ্দেশ্যে বলতেন : তোমরা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর রীতিনীতি বদলে ফেলেছ। এখন যব শোধন করে খাও, চাপাতি রুটি তৈরী কর এবং দুধ, তরকারি ও নানা রকম খাদ্য খাও। পোশাক সকালে এক প্রকার ও বিকালে এক প্রকার পরিধান কর। এগুলো রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর আমলে কোথায় ছিল? সুফফাবাসীদের খাদ্য ছিল প্রত্যহ দু'জনের জন্যে তিন পোয়া খোরমা। এতে বীচিও রয়েছে, যা বাদ দেয়ার পর পরিমাণ খুব কম থেকে যেত।


দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, খাদ্যের সময় নির্দিষ্ট করা; অর্থাৎ একবার খাওয়ার পর কতক্ষণ পর পুনরায় খাবে। এতে তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর, তিন দিন অথবা আরও বেশী সময় খাবে না। কোন কোন সাধক এ ক্ষেত্রে এত সাধনা করেছেন যে, এই মেয়াদ ত্রিশ দিন, চল্লিশ দিন পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আলেমগণের মধ্যে অনেকের অবস্থা এরূপ। উদাহরণতঃ মুহাম্মদ ইবনে ওমর ওরফী, আবদুর রহমান ইবনে ইবরাহীম তায়মী, সোলায়মান খাওয়াস, সহল তস্তরী, ইবরাহীম ইবনে আহমদ খাওয়াস প্রমুখ। হযরত আবু বকর (রাঃ) ছয় দিন নির্দিষ্ট করতেন। সুফিয়ান সওরী ও ইবরাহীম ইবনে আদহাম তিন দিন নির্দিষ্ট করতেন । তাঁরা সকলেই উপদেশ দ্বারা আখেরাতে সাহায্য চাইতেন। জনৈক আলেম বলেন : যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে চল্লিশ দিন কিছু না খায়, তার কাছে কতক খোদায়ী রহস্য উন্মোচিত হয়ে যায়। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে, দু' থেকে তিন দিন পর্যন্ত নির্দিষ্ট করা। এটা অভ্যাস বহির্ভূত নয়; বরং সম্ভবপর । সামান্য চেষ্টা সাধনা করলেই এই স্তর অর্জন করা যায় । তৃতীয় স্তর হচ্ছে, দিন ও রাতের মধ্যে একবার খাবে। এর বেশী হলে তা অপব্যয় হবে। সর্বদা তৃপ্ত অবস্থায় থাকা এবং ক্ষুধা অনুভব না করা বিলাসীদের কাজ, সুন্নত বিরোধী। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন : “রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) সকালে খেলে সন্ধ্যায় খেতেন না এবং সন্ধ্যায় খেলে সকালে খেতেন না”। বড় বড় বুযুর্গগণও এ নিয়ম পালন করতেন। তারা দিনে একবার খাদ্য গ্রহণ করতেন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বলেন : “তুমি অপব্যয় থেকে বেঁচে থাক। প্রত্যহ দু'বার খাওয়া অপব্যয়ের মধ্যে দাখিল। প্রত্যেক দু'দিনে একবার খাওয়া মারাত্মক; কিন্তু প্রত্যহ একবার খাওয়া উভয়ের ঠিক মধ্যবর্তী স্তর। আল্লাহর কিতাবে এটা প্রশংসিত।”


অতএব, যে ব্যক্তি দিবারাত্রির মধ্যে একবার খেতে চায়, তার জন্যে তাহাজ্জুদের পর সোবহে সাদেকের পূর্বে অর্থাৎ সেহরীর সময়ে খাওয়া মোস্তাহাব। এতে দিনের বেলায় উপবাস করার কারণে রোযা হয়ে যাবে। এছাড়া রাতেও তাহাজ্জুদের জন্যে উঠা সহজ হবে।


তৃতীয় যে বিষয়টি নির্দিষ্ট করা দরকার, তা হচ্ছে খাদ্যের প্রসার। জানা দরকার, সর্বোত্তম খাদ্য হচ্ছে গমের আটা। এটা শোধিত অবস্থায় পাওয়া গেলে তা স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে দাখিল হয়ে যায়। মধ্যম খাদ্য হচ্ছে যবের শোধিত আটা এবং নিম্নস্তরের খাদ্য যবের অশোধিত আটা। উৎকৃষ্ট ব্যঞ্জন হচ্ছে গোশ্ত ও মিষ্টি, মধ্যম গোশতবিহীন শুরবা এবং নিম্নস্তরের হচ্ছে লবণ ও সিরকা। অধ্যাত্ম পথের পথিকদের অভ্যাস, তারা কখনও ব্যঞ্জন খান না; মনোলোভা সুস্বাদু খাদ্য থেকেও তারা বিরত থাকেন । কেননা, এতে নফসের আস্ফালন ও কঠোরতা বাড়ে এবং মনে দুনিয়ার আনন্দ ও বিলাস আসন পেতে নেয়। ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ায বলেন : হে সাধকবৃন্দ! যদি জান্নাতের ওলীমা খেতে চাও, তবে দুনিয়াতে নফসকে যত বেশী সম্ভব অনাহারে রাখ। এখানে ক্ষুধা যত বেশী হবে, ততই সেখানকার খাদ্য খাওয়ার খাহেশ বৃদ্ধি পাবে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : “আমার উম্মতের মধ্যে অসৎ তারা, যারা ধনৈশ্বর্যের মধ্যে লালিত-পালিত এবং এর উপরই বড় হয়। তাদের সাহসিকতা কেবল নানা রকম খাদ্য এবং বিভিন্ন পোশাক-পরিচ্ছদ। তারা গলা ফাটিয়ে কথাবার্তা বলে”।


আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে এরশাদ করেন : স্মরণ রাখ, তোমাকে কবরে থাকতে হবে। সেখানে অনেক খাহেশ থেকে বঞ্চিত থাকবে। পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ সুস্বাদু খাদ্যকে খুব ভয় করতেন এবং একে দুর্ভাগ্যের আলামত মনে করতেন। তাই হযরত ওমর (রাঃ) ঠাণ্ডা পানির শরবত পান করেননি এবং বলতেন : আমাকে এর হিসাবের সাথে জড়িত করো না। 

হযরত নাফে' (রঃ) বর্ণনা করেন, ইবনে ওমর (রাঃ) একবার অসুস্থ হয়ে টাটকা মাছ খাওয়ার বাসনা প্রকাশ করেন। মদীনায় অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তা পাওয়া গেল না । কয়েকদিন পর যখন পাওয়া গেল, তখন দেড় দেরহাম দিয়ে কিনে এনে রান্না করা হয়। অতঃপর একটি রুটির উপর মাছটি রেখে হযরত ইবনে ওমরের সামনে পেশ করা হয়। ইতিমধ্যে জনৈক ভিক্ষুক দরজায় এসে হাঁক দিল। হযরত ইবনে ওমর খাদেমকে বললেন : মাছটি রুটিতে জড়িয়ে ভিক্ষুককে দিয়ে দাও। খাদেম আরজ করল : জনাব, অনেক দিন থেকে যখন মাছ খেতে আপনার মন চাইছিল, তখন পাওয়া যায়নি। এখন পাওয়ার পর দেড় দেরহাম দিয়ে কিনে আপনার জন্যে রান্না করেছি। আপনি বললে ভিক্ষুককে এর মূল্য দিয়ে দেই। তিনি বললেন : না, এ মাছটি রুটিতে জড়িয়ে তাকে দিয়ে দাও। অতঃপর খাদেম গিয়ে ভিক্ষুককে বলল : তুমি এটি এক দেরহামের বিনিময়ে বিক্রয় করবে? ভিক্ষুক সম্মতি দিলে খাদেম এক দেরহাম তাকে দিয়ে মাছটি আবার তাঁর সামনে হাযির করল এবং বলল : এ মাছটি এক দেরহাম দিয়ে কিনে এনেছি। তিনি বললেন : ভিক্ষুকের কাছ থেকে দেরহাম ফেরত না নিয়ে মাছটি রুটিসহ তাকে দিয়ে এস। আমি রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি : যে ব্যক্তির কোন খাহেশ হয়, অতঃপর তাকে বাধা দেয় এবং ত্যাগ স্বীকার করে অন্যকে সমর্পণ করে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন।


হযরত ওমর (রাঃ) একবার সংবাদ পান যে, ইয়াযীদ ইবনে আবু সুফিয়ান নানা রকম খাদ্য আহার করেন। সেমতে তিনি ইয়াযীদের খাদেমকে বললেন : তার রাতের খাদ্য প্রস্তুত হয়ে গেলে আমাকে সংবাদ দিও। খাদেম তাই করল। হযরত ওমর (রাঃ) ইয়াযীদের গৃহে চলে গেলেন। যখন খাদ্য এল, তখন প্রথমে “ছরীদ” (গোশতের শুরুয়া) আনা হল। হযতর ওমরও তার সাথে আহার করলেন। এরপর ভাজা করা গোশত আনা হলে ইয়াযীদ হাত বাড়ালেন; কিন্তু হযরত ওমর (রাঃ) হাত গুটিয়ে নিলেন এবং বললেন : হে ইয়াযীদ ইবনে আবু সুফিয়ান! তোমার এখানে এক খাদ্যের পর আরেক খাদ্য হয় নাকি? আল্লাহর কসম, যদি তুমি পূর্ববর্তীদের সুন্নত ছেড়ে দাও, তবে তাদের গোটা তরীকা থেকে তুমি আলাদা হয়ে যাবে। ইয়াসার ইবনে ওমায়র (রঃ) বলেন : আমি কোন দিন হযরত ওমরের জন্যে আটা শোধন করিনি। কখনও করে থাকলে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে করেছি। ওতবা (রাঃ) আটাগুলো রৌদ্রে রেখে দিতেন। শুকিয়ে গেলে খেয়ে নিতেন এবং বলতেন : একখন্ড রুটি ও নিমক খেয়ে থাকা উচিত, যাতে আখেরাতে ভাজা করা গোশত ও উৎকৃষ্ট খাদ্য পাওয়া যায়। তিনি একটি মাটির কলসী থেকে পানি পান করতেন, যা সারাদিন রৌদ্রে পড়ে থাকত। তাঁর বাঁদী বলত : আটা দিয়ে দিলে আমি রুটি তৈরী করে এবং পানি ঠাণ্ডা করে দেব। ওতবা জওয়াবে বলতেন : ক্ষুধার কুকুরকে দমন করা উদ্দেশ্য। সে এভাবেও দমিত হয়ে যায়।


শাকীক ইবনে ইবরাহীম বলেন : একদিন আমি যখন মক্কায় রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর জন্মস্থানের নিকটে অবস্থিত আলইয়াল বাজার দিয়ে গমন করছিলাম, তখন ইবরাহীম ইবনে আদহামকে রাস্তার ধারে বসে ক্রন্দন করতে দেখলাম। আমিও পথ ছেড়ে তাঁর কাছে গিয়ে বসলাম, এবং ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন : ভাল আছি, যাও। অবশেষে আমি দ্বিতীয় ও তৃতীয় বার জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : কারও কাছে না বললে বলতে পারি। আমি বললাম : ঠিক আছে, বলব না, আপনি বলুন। তিনি বললেন : তিরিশ বছর ধরে আমার মনে “হারীরা” খাওয়ার সাধ ছিল। কিন্তু আমি সর্বপ্রযত্নে মনকে তা থেকে বিরত রেখেছি। গতকাল রাতে যখন আমি বসে বসে ঝিমুচ্ছিলাম, তখন সবুজ পেয়ালা হাতে এক ব্যক্তি আগমন করল। পেয়ালা থেকে হারীরার সুগন্ধি বের হয়ে এল। আমি সাহস করে নফসকে বাধা দিলাম। লোকটি পেয়ালা আমার নিকটে রেখে বলল : ইবরাহীম, খাও। আমি বললাম : আমি আল্লাহর ওয়াস্তে এটা ছেড়ে দিয়েছি। খাব না। সে বলল : যদি আল্লাহ তাআলাই খাওয়ান, তবে খাওয়া উচিত। আমি এর কোন জওয়াব দিতে পারলাম না এবং কাঁদতে লাগলাম। লোকটি আবার বলল : নাও, খাও। আমি বললাম : খানা কোত্থেকে এল, এ কথা না জানা পর্যন্ত খেতে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। সে বলল : খাও, এটা তোমার জন্যে প্রদত্ত হয়েছে। আমাকে আদেশ করা হয়েছে, হে ইসফের, এ পেয়ালাটি নিয়ে যাও এবং ইবরাহীমের নফসকে খাইয়ে দাও। সে অনেক দিন ধরে নফসকে বাধা দিয়ে যাচ্ছে। এখন আল্লাহ্ তার প্রতি রহম করেছেন। হে ইবরাহীম, স্মরণ রাখ, আমি ফেরেশতাদের মুখে শুনেছি, যে ব্যক্তি দান গ্রহণ করে না, সে পরে তা তালাশ করেও পায় না। আমি বললাম : যদি তাই হয়, তবে আমি তোমার সম্মুখে আছি। এর সমাধান আল্লাহ তাআলাই দেবেন। এরপর আর এক ব্যক্তি দৃষ্টিগোচর হল । সে প্রথম ব্যক্তিকে কিছু দিয়ে বলল : তুমিই আপন হাতে খাইয়ে দাও। সেমতে সে আমার মুখে লোকমা দিতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত আমি ঘুমিয়ে পড়লাম । জাগ্রত হয়ে আমি মুখে হারীরার স্বাদ অনুভব করলাম।


শাকীক বলেন : ইবরাহীম এ কথা শেষ করতেই আমি বললাম : আপনার হাতটি দেখান তো। আমি তাঁর হাত ধরে চুম্বন করলাম এবং বললাম : হে আল্লাহ্! যাঁরা আপন খাহেশকে পূর্ণরূপে দাবিয়ে রাখে, তুমি তাদের সাধ পূর্ণ করে দাও। তুমিই অন্তরে বিশ্বাস দান কর এবং অন্তরকে প্রশান্ত রাখ । অধম বান্দা শাকীকের প্রতিও কৃপাদৃষ্টি দাও। এরপর শাকীক হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহামের হাত আকাশের দিকে উত্তোলন করে বললেন : ইলাহী, এই হাত ও এই হাতের মালিকের বরকতে এবং ইবরাহীমকে প্রদত্ত অনুগ্রহের বরকতে এই মিসকীন বান্দার প্রতি অনুগ্রহ কর। সে তোমারই কৃপা, অনুগ্রহ ও রহমতের মুখাপেক্ষী, যদিও এর যোগ্য নয়। এরপর তিনি সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে হরম শরীফে প্রবেশ করলেন।


কথিত আছে, মালেক ইবনে দীনার (রঃ) চল্লিশ বছর পর্যন্ত অন্তরে দুধের স্পৃহা নিয়েও দুধ পান করেননি। একদিন তাঁর কাছে খোরমা হাদিয়াস্বরূপ এলে লোকেরা তা খাওয়ার জন্যে তাঁকে পীড়াপীড়ি করল । তিনি বললেন : তোমরাই খেয়ে নাও। আমি চল্লিশ বছর এর স্বাদ গ্রহণ করিনি। তিনি বলেন : আমি পঞ্চাশ বছর ধরে দুনিয়া ত্যাগ করেছি। আমার অন্তর চল্লিশ বছর ধরে দুধ পান করার সাধ পোষণ করে আসছে। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি সারা জীবন তা পান করব না। ক্রীতদাস ওতবা বলেন : সাত বছর পর্যন্ত আমার মন গোশত খাওয়ার খাহেশ করতে থাকে। অবশেষে আমি এই ভেবে লজ্জাবোধ করলাম যে, মনের খাহেশ আর কত মুলতবী রাখব। সাত বছর তো হয়ে গেছে। অতঃপর একদিন একখন্ড গোত নিয়ে ভাজা করলাম এবং তা রুটিতে জড়িয়ে নিলাম। মুখে দেয়ার আগে একটি বালককে দেখে জিজ্ঞেস করলাম : তুমি কি অমুকের পুত্র নও, যে মারা গেছে? সে বলল : হাঁ। অতঃপর আমি গোশ্ত জড়ানো রুটিটি তাকে দিয়ে দিলাম । বর্ণিত আছে, বালকের হাতে রুটি সঁপে দিয়ে তিনি কেঁদে কেঁদে এই আয়াত পাঠ করতে থাকেন- “তারা খাদ্যের মহব্বত সত্ত্বেও মিসকীন, পিতৃহীন এতীম ও বন্দীকে খাদ্য খাওয়ায়”। এরপর তিনি কখনও গোশ্ত খাননি ।

জাফর ইবনে নসর বলেন : হযরত জুনায়েদ আমাকে কিছু আঞ্জীর ফল কিনে আনতে বললেন। আমি কিনে আনলে তিনি ইফতারের সময় তা মুখে দিলেন এবং সাথে সাথে ফেলে দিলেন। আমি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : অন্তরের কানে গায়েব থেকে আওয়াজ এসেছে, তুমি আমার খাতিরে এটি ছেড়ে দিয়েছিলে । আবার খাবে?


সালেহ্ বলেন : আমি আতা সলমীর খেদমতে আরজ করলাম : আমি আপনার জন্যে একটি বস্তু প্রেরণ করতে চাই। কিন্তু শর্ত হচ্ছে, আপনি ফেরত দিতে পারবেন না। তিনি বললেন : ভাল কথা। আমি আমার পুত্রের হাতে ঘি ও মধুর সাথে ছাতু মিশ্রিত করে পাঠিয়ে দিলাম এবং বলে দিলাম. যতক্ষণ তিনি না খান, সেখানেই থাকবে। তিনি খেলেন। এর পরের দিন আমি আবার প্রেরণ করলাম। কিন্তু তিনি না খেয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। সেমতে আমি রাগতস্বরে তাঁকে বললাম : সোবহানাল্লাহ! আপনি আমার হাদিয়া ফেরত দিয়েছেন। তিনি আমাকে রাগ করতে দেখে বললেন : রাগের কোন কথা নেই। একবার তো আমি তোমার আবদার রেখেছি। দ্বিতীয় বার যখন তুমি প্রেরণ করলে তখন আমি অনেক খেতে চেয়েছি, কিন্তু সম্ভব হয়নি। যখনই আমি খাওয়ার ইচ্ছা করতাম তখনই এ আয়াত মনে পড়ে যেত-“চুমুক দেয় এবং গলাধঃকরণ করতে পারে না। সালেহ্ বলেন : আমি কেঁদে কেঁদে বললাম : হায়! আমি এক জায়গায় এবং আপনি অন্য জায়গায় আছেন । .


জনৈক আবেদ তাঁর এক আপনজনকে দাওয়াত করে এনে কয়েকটি রুটি সামনে রেখে দিলেন। লোকটি রুটিগুলো ওলট-পালট করে খাওয়ার জন্যে ভাল রুটি বেছে নিতে লাগল। আবেদ বললেন : এ কি করছ? তুমি জান না, যে রুটিটি তুমি বাদ দিয়েছ, সেটি কতজন কারিগরের হাত হয়ে তোমার কাছে এসেছে। প্রথমে মেঘমালা থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। বৃষ্টি দ্বারা মৃত্তিকা ও চতুষ্পদ জন্তু সতেজ হয়েছে। অনেক মানুষে কাজ করেছে। এরপর এ রুটি তোমার কাছে এসেছে। এখন তুমি ওলট-পালট করছ এবং খাওয়ায় আগ্রহ দেখাচ্ছ না। হাদীসে বলা হয়েছে :

“রুটি গোলাকার হয়ে তোমার সামনে আসে না যে পর্যন্ত তাতে তিন'শ ষাট জন কারিগর কাজ না করে। প্রথম কারিগর হচ্ছে মীকাঈল (আঃ), যে পানিকে রহমতের ভাণ্ডার থেকে মেপে দেয়। এরপর সেই সকল ফেরেশতা, যারা মেঘমালা হাঁকিয়ে নিয়ে যায়। এরপর রয়েছে সূর্য, চন্দ্র এবং আকাশের ফেরেশতাকুল। সর্বশেষ কারিগর হচ্ছে রুটি প্রস্তুতকারী। যদি তুমি আল্লাহ্’র নেয়ামতসমূহ গণনা কর, তবে শেষ করতে পারবে না।


জনৈক বুযুর্গ বলেন : আমি কাসেম জাওরীর কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বৈরাগ্য কি? তিনি বললেন : তুমি এ সম্পর্কে কি শুনেছ? আমি কয়েকটি উক্তি উদ্ধৃত করলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। আমি বললাম : এ সম্পর্কে আপনার উক্তি কি? তিনি বললেন : উদর হচ্ছে মানুষের দুনিয়া। একে যতটুকু নিয়ন্ত্রণ করবে ততটুকু বৈরাগ্য অর্জিত হবে এবং যে পরিমাণ একে বাধা না দেবে, সেই পরিমাণ তুমি দুনিয়ার করায়ত্ত হয়ে যাবে।


এসব গল্প থেকে জানা গেল, আমাদের বর্ণিত উপকারিতাসমূহ অর্জনের উদ্দেশেই বুযুর্গগণ খাহেশ থেকে বিরত রয়েছেন এবং উদরপূর্তি করে আহার বর্জন করেছেন। মাঝে মাঝে এর কারণ এটাও ছিল যে, তাঁরা খাদ্যদাতার রুযী হালাল ও স্বচ্ছ মনে করতেন না। জানা উচিত, মন যা চায় তাই প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত নয়। আবু সোলায়মান দারানী বলেন : লবণও খাহেশ বা কামনার বস্তু। কারণ, এটা রুটির অতিরিক্ত। রুটির অতিরিক্ত সবকিছুই বাড়তি এবং খাহেশের মধ্যে দাখিল। এটা চূড়ান্ত নীতি। কেউ এতে সক্ষম না হলে তার উচিত কমপক্ষে আপন নফস সম্পর্কে গাফেল এবং খাহেশের মধ্যে নিমজ্জিত না হওয়া। যা মনে চায়, তাই খাওয়া এবং যা খুশী তাই করা অপব্যয়ের জন্যে যথেষ্ট। তাই বিরতিহীনভাবে গোশত ভক্ষণ ত্যাগ করা উচিত। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন পর্যন্ত গোশত বর্জন করে, সে বদস্বভাব হয় এবং যে চল্লিশ দিন অবিরত গোশত খায়, সে কঠোর প্রাণ হয়ে যায়। সার কথা, নফসকে বৈধ খাদ্যসামগ্রীর খাহেশের মধ্যেও ফেলা উচিত নয়। যদি কেউ দুনিয়াতে সকল খাহেশ পূর্ণ করে নেয়, তবে কেয়ামতে তাকে বলা হবে,  এজীবনেই তোমরা তোমাদের মজা নিঃশেষ করে দিয়েছে এবং ভোগ করে নিয়েছ। (এখন কি চাও? ) পার্থিব দুনিয়াতে নফসের বিরুদ্ধে জেহাদ করে যে পরিমাণ খাহেশ বর্জন করা হবে, আখেরাতে সেই পরিমাণ লোভনীয় সামগ্রী পাওয়া যাবে। বসরার জনৈক বুযুর্গ বিশ বছর পর্যন্ত চাউলের রুটি ও মাছ খাওয়ার সাধ পোষণ করতে থাকেন; কিন্তু নফসের উপর মোজাহাদা করে নিজেকে তা থেকে বিরত রাখেন । ওফাতের পর কেউ তাঁকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করল : আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন? তিনি বললেন : যেসকল নেয়ামত প্রাপ্ত হয়েছি, সেগুলো বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। সর্বপ্রথম আমাকে যা দেয়া হয়েছে, তা ছিল চাউলের রুটি ও মাছ। আমাকে বলা হয়েছে- আজ যে পরিমাণ ইচ্ছা বেহিসাব খেয়ে নাও। আল্লাহ স্বয়ং বলেন : “স্বচ্ছন্দে খাও ও পান কর, বিগত দিনে যা পাঠিয়েছিলে তার কারণে”।


এ কারণেই আবু সালমান (রহঃ) বলেন : একটি খাহেশ ত্যাগ করা এক বছর রোযা রাখা ও রাত্রি জাগরণ অপেক্ষা অধিক উপকারী। আল্লাহ আমাদেরকেও মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর ওসিলায় স্বীয় সন্তুষ্টির তওফীক দান করুন।


পরবর্চী পর্ব

(৫) ক্ষুধা ও তার ফযীলতে মিতাচার-

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...