বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ৬) তওবা সর্বদা ও সর্বাবস্থায় ওয়াজিব



তওবা - (পর্ব - ৬) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তওবা সর্বদা ও সর্বাবস্থায় ওয়াজিব—
তওবা সর্বদা ও সর্বাবস্থায় ওয়াজিব। কেননা, কোন ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গোনাহ থেকে মুক্ত নয়। পয়গম্বরগণও এ থেকে বাঁচতে পারেননি। কোৱআন ও হাদীসে পয়গম্বরগণের ত্রুটি, তাঁদের তওবা ও কান্নাকাটি উল্লেখ রয়েছে। কদাচিৎ মানুষ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গোনাহ থেকে বেঁচে থাকলেও মনে মনে গোনাহের কল্পনা থেকে বাঁচতে পারে না। যদি অন্তরেও গোনাহের কল্পনা না থাকে, তবে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয় না। সে অন্তরে বিক্ষিপ্ত কল্পনা নিক্ষেপ করতে থাকে। ফলে আল্লাহর এবাদতে গাফলতি দেখা দেয়। যদি কেউ কুমন্ত্রণা থেকেও মুক্ত থাকে, তবে আল্লাহ তা'আলা তাঁর গুণাবলী ও ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কে যথার্থ ওয়াকিফহাল হওয়ার ব্যাপারে ত্রুটি থেকেই যায়। মোটকথা, ত্রুটিমুক্ততা মানুষের জন্যে কল্পনা করা যায় না। তবে ত্রুটির পরিমাণে মানুষের অবস্থা বিভিন্নরূপ হতে পারে। মূল ত্রুটি প্রত্যেকের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে। 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : “আমার অন্তরে মরিচা ধরে যায়। এমনকি, আমি দিবা-রাত্রিতে সত্তর বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি”। বলা বাহুল্য, এই ক্ষমা প্রার্থনার কারণেই আল্লাহ তাঁকে মাহাত্ম্য দান করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন : “যাতে আল্লাহ আপনার আগের ও পেছনের সমস্ত ত্রুটি মিটিয়ে দেন”। [এখানে উল্লেখযোগ্য যে ত্রুটি থাক বা না থাক সেটা কোন ধারনার বিষয় নয়]

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)- উনার যখন এই অবস্থা, তখন অন্যদের কি দশা হবে। এই ত্রুটির কারণ পরিত্যাগ করা এবং তার বিপরীত কারণ অবলম্বন করাই তওবার সারকথা। 

এখানে প্রশ্ন হয় যে, অন্তরে নানাবিধ জল্পনা-কল্পনা আসা নিঃসন্দেহে ত্রুটি এবং অন্তর এগুলো থেকে মুক্ত হওয়া পূর্ণতা। বলা বাহুল্, প্রত্যেক ত্রুটির কারণ থেকে পূর্ণতার দিকে উন্নতি করাকে তওবা বলা হবে। 


পূর্বের বর্ণনা অনুযায়ী তওবা ওয়াজিব। অথচ ত্রুটি থেকে পূর্ণতার উন্নতি করা ফযীলত তথা বাড়তি গুণের কাজ, ওয়াজিব নয়। কারণ, পূর্ণতা অর্জন করা ওয়াজিব নয়। এমতাবস্থায় সর্বাবস্থায় তওবা ওয়াজিব হওয়ার মানে কি? 

এর জওয়াব এই যে, পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে, মানুষ জন্মলগ্ন থেকে কখনও কামনার অনুসরণ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে না এবং কামনা থেকে তওবা করার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, কামনার অনুসরণ কেবল ভবিষ্যতে পরিত্যাগ করবে; বরং পূর্ণ তওবা হচ্ছে অতীতকালের ক্ষতিও পূরণ করা। মানুষ যখনই কামনার অনুসরণ করে, তখনই তার অন্তরে এক প্রকার অন্ধকার ছায়াপাত করে; যেমন আয়নায় মুখের বাষ্প লাগলে আয়না মলিন হয়ে যায়। যদি এই কামনার অনুসরণ একের পর এক অব্যাহত থাকে, তবে অন্তরের অন্ধকার মরিচায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। যেমন, মুখের বাষ্প অব্যাহতভাবে আয়নায় পড়তে থাকলে কালক্রমে আয়নায় মরিচা ধরে যায়। কামনার কারণে অন্তরে মরিচা ধরার কথা কোরআনে উল্লিখিত হয়েছে। বলা হয়েছে- 

>“বরং তাদের কৃতকর্ম তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে”।

মরিচা যদি অনেক বেশী হয়, তবে অন্তরে মোহর লেগে যায়। যেমন আয়নার মরিচা অনেকদিন পরিষ্কার না করলে তা আর পরিষ্কার করার যোগ্য থাকে না। তখন মনে হয় যেন আয়নাটি মরিচা দ্বারাই নির্মিত হয়েছে। সুতরাং আয়না পরিষ্কার করার জন্যে যেমন ভবিষ্যতে বাষ্প ও ময়লা পড়তে না দেয়াই যথেষ্ট নয়; বরং চেহারা দেখার জন্যে পূর্বের বাষ্প ও ময়লা দূর করা জরুরী তেমনিভাবে অন্তর পরিষ্কার করার জন্যেও ভবিষ্যতে কামনার অনুসরণ ত্যাগ করা যথেষ্ট নয়; বরং অতীত গোনাহের কারণে অন্তরে যে অন্ধকার ছেয়ে গেছে, তাও দূর করা জরুরি। গোনাহের কারণে যেমন অন্তরে অন্ধকার নেমে আসে, তেমনি এরাদত করা ও কামনা বর্জনের কারণে নূর সৃষ্টি হয়, যার ফলস্বরূপ সেই অন্ধকার দূর হয়ে যায়। এক হাদীসে এ বিষয়ের প্রতিই ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে। 

>”অসৎ কর্মের পেছনে সৎকর্ম কর। সৎকর্ম অসৎ কর্মকে মিটিয়ে দেয়”। 

এ থেকে জানা গেল যে, সর্বাবস্থায় অন্তর থেকে গোনাহের চিহ্ন মিটিয়ে ফেলার প্রয়োজন রয়েছে।


এখন সর্বাবস্থায় তওবা ওয়াজিব হওয়ার অর্থ কি, তা জানা দরকার।

প্রকাশ থাকে যে, ওয়াজিবের অর্থ দ্বিবিধ। 

এক ওয়াজিব শরীয়তের বিধিবিধানে সুবিদিত। এতে সকলেই শরীক। যেমন নামায, রোযা ইত্যাদি। পূর্ণতায় স্তর এই ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত নয়।

দ্বিতীয় ওয়াজিব আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ করার জন্যে জরুরী। 

আমরা এতক্ষণ যে সব বিষয় থেকে তওবা করার কথা লিখেছি, সেগুলো সমস্তই এই নৈকট্যের স্তরে পৌঁছার জন্যে জরুরী। বিষয়টি একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝা দরকার। 

আমরা বলি, নফল নামাযের জন্যে উযু ওয়াজিব। এর অর্থ এই যে, যে ব্যক্তি নফল নামায পড়তে চায়, তার জন্যে উযু জরুরী। কিন্তু যে ব্যক্তি নফলই পড়তে চায় না, তার জন্যে নফলের কারণে উযু ওয়াজিব নয়। অথবা আমৱা বলি, চক্ষু, কর্ণ, হাত, পা মানুষের অস্তিত্বের জন্যে শর্ত ও জরুরী। অর্থাৎ, যদি কেউ পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে চায়, তবে তার জন্যে এসব অঙ্গ থাকা অত্যাবশ্যক। কিন্তু যদি কোন ব্যক্তি কেবল মাংসপিণ্ডের জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, তবে এরূপ জীবনের এসব অঙ্গ থাকা জরুরী নয়।

সুতরাং শরীয়তের যেসব মূল ওয়াজিব সকলের উপর ওয়াজিব, তা দ্বারা কেবল নাজাত তথা মুক্তি পাওয়া যায়। নিরেট মুক্তিকে কেবল মাংসপিন্ডের জীবন মনে করা উচিত। এটি ছাড়া অন্য আরও যেসকল সৌভাগ্য রয়েছে, সেগুলোকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অনুরূপ জ্ঞান করা দরকার। মুক্তির অলংকার ও সাজসজ্জা সেগুলোই। এগুলোর জন্যেই পয়গম্বর, ওলী ও আলেমগণ আজীবন সাধনা করেছেন এবং পার্থিব সুখ-শান্তি ও আনন্দ পুরোপুরি বিসর্জন দিয়েছেন। 


সেমতে হযরত ঈসা (আঃ) একবার মাথার নিচে পাথর রেখে শয়ন করেছিলেন। শয়তান হাযির হয়ে আরয করল, আপনি তো দুনিয়া বর্জন করেছিলেন। এখন এ কি করলেন? 

তিনি বললেনঃ “তুই দুনিয়া বর্জনের খেলাফ কি দেখলি”? শয়তান বলল  : পাথরকে বালিশ করা দুনিয়ার সুখ। মাটিতে মাথা রাখেন না কেন? তিনি তৎক্ষণাৎ মাথার নিচ থেকে পাথরটি বের করে ফেলে দিলেন এবং মাটিতে মাথা রেখে শয়ন করলেন। 

হযরত ঈসা (আঃ)-এর এ কাজটি ছিল দুনিয়ার এ সুখ থেকে তওবা। এখন জিজ্ঞাসা এই যে, তিনি কি জানতেন না যে, মাটিতে মাথা রাখা শরীয়তের সাধারণ বিধানে ওয়াজিব নয়? 

এমনিভাবে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নকশাযুক্ত চাদৱকে নামাযে বিঘ্ন সৃষ্টিকরী পেয়ে খুলে ফেলেছিলেন এবং জুতার নতুন ফিতাকে মনোযোগ আকৃষ্ট করতে দেখে তার স্থলে পুরাডন ফিতা লাগিয়ে নিয়েছিলেন। তার কি জানা ছিল না যে, এসব বিষয় শরীয়তে ওয়াজিব নয়? জানা থাকলে এগুলো বর্জন করলেন কেন?

এ থেকে বুঝা গেল যে, তিনি এসব বিষয়কে অন্তরে প্রতিশ্রুত  “মকামে মাহমুদ” (প্রশংসিত মর্তবা) পর্যন্ত পৌঁছার পথে কার্যকর অন্তরায় অনুভব করার কারণে বর্জন করেছিলেন। 


হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) দুধ পান করার পর যখন জানতে পারলেন, তা অবৈধ উপায়ে অর্জিত ছিল, তখন কণ্ঠনালীতে অঙ্গুলি ঢুকিয়ে খুব বমি করলেন। ফলে তাঁর প্রাণবায়ু নির্গত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তিনি কি ফেকাহ শাস্ত্রের এই বিধান জানতেন না যে, ভুলক্রমে পান করার মধ্যে গোনাহ নেই এবং পান করা বস্তু পেট থেকে বের করা ওয়াজিব নয়? 

তা হলে তিনি এই পান করা থেকে রুজু করলেন কেন এবং পেটকে যথাসম্ভব খালি করতে চাইলেন কেন? 

এর কারণ এটাই ছিল যে, তিনি জানতেন জনসাধারণের বিধান এবং আখেরাত পথের বিপদ ভিন্ন ভিন্ন। অতএব, এ সকল মহাপুরুষের অবস্থা চিন্তা করা দরকার। তাঁরা আল্লাহ, তাঁর পথ, তার শাস্তি এবং গোপন বিভ্রান্তি সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ছিলেন। 

মোটকথা, এসব রহস্য সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানে, আধ্যাত্ম পথে চলার জন্যে প্রত্যেক ব্যক্তির উপর প্রতি মুহূর্তে নির্ভেজাল তওবা করা ওয়াজিব। 

নূহ (আঃ)-এর মত দীর্ঘজীবী হলেও তৎক্ষণাৎ ও অবিলম্বে তওবা করবে। 

আবূ সোলায়মান দারানী বলেন : যদি বুদ্ধিমান ব্যক্তি অবশিষ্ট জীবন কেবল এজন্যে দুঃখ করে যে, তার অতীত জীবন এবাদত ছাড়াই বিনষ্ট হয়ে গেছে, তবে আমৃত্যু এ দুঃখ তার জন্যে সমীচীন হবে। সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি অবশিষ্ট জীবনও অতীত জীবনের ন্যায় কুকর্মে অতিবাহিত করে, তবে তার কি অবস্থা হবে ? 

বুদ্ধিমান ব্যক্তি যদি কোন সুবর্ণ সুযোগ পায়, এরপর তা অহেতুক বিনষ্ট হয়ে যায়, তবে এজন্যে সে অবশ্যই দুঃখ করে। আর যদি সেই সুযোগ বিনষ্ট হওয়ার সাথে সাথে স্বয়ং ব্যক্তিরও ধ্বংস অনিবার্য হয়, তবে দুঃখ আরও বেশী হবে। 

মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একটি উৎকৃষ্ট সুযোগ, যার কোন বিকল্প নেই। কারণ, এতে মানুষ নিজের চিরন্তন সৌভাগ্য গড়ে নিতে পারে এবং সার্বক্ষণিক দুর্ভাগ্য থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে। এরপর মানুষ যদি এই সুযোগ হেলায় নষ্ট করে দেয়, তবে সেটা খুবই ক্ষতির বিষয় হবে।

আর যদি এই সুযোগকে আল্লাহর নাফরমানীতে বিনষ্ট করে, তবে সরাসরি নিজের ধ্বংসই ডেকে আনে। 

এরপরও যদি মানুষ এই বিপদের জন্যে দুঃখ না করে, তবে এটা হবে মূর্খতা, যা সকল বিপদের মধ্যে বৃহত্তম বিপদ। কিছু মূর্খতার বিপদ বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি জানতে পারে না। কেননা, গাফলতির স্বপ্ন তার মধ্যে ও তার জ্ঞানের মধ্যে অন্তরায় হয়ে যায়। 

পরিতাপের বিষয়, সকল মানুষই এই গাফলতির স্বপ্নে বিভোর যখন মৃত্যু আসবে, তখন স্বপ্নভঙ্গ হবে। তখন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি তার বিপদ টের পাবে। কিন্তু তখন ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়। বেদনা ও নৈরাশ্য ছাড়া কিছুই পাওয়া যাবে না ।

জনৈক সাধক বলেন : মালাকুল মওত যখন কোন মানুষের সামনে আবির্ভূত হয়ে বলে দেয়, তোমার জীবন আর মাত্র এক মুহূর্ত বাকী, এতে এক নিমেষেরও বিলম্ব হবে না, তখন সে এত দুঃখিত ও অনুতপ্ত হয় যে, এক মুহূর্ত সময় পাওয়ার জন্যে যদি সে সমগ্র পৃথিবীর মালিক হত, তবে তাও অকাতরে দিয়ে দিত, যাতে সে সেই বাড়তি মুহূর্তের মধ্যে নিজের দোষত্রুটির ক্ষতিপূরণ করে নেয়। কিন্তু তখন অবকাশ কোথায় আর ? কোরআন পাকের নিম্নোক্ত আয়াতে এ বিষয়বস্তুর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে–

>"তোমাদের কারও কাছে মৃত্যু আসার পূর্বে সে বলে, পরওয়ারদেগার ! আমাকে সামান্য সময় অবকাশ দিলে না কেন, যাতে আমি দান-খয়রাত করতাম এবং সৎকর্মীদের একজন হতাম”। 

আল্লাহ কখনও অবকাশ দিবেন না কাউকে যখন তার মৃত্যু এসে পড়বে। সামান্য সময়ের অর্থ হল মানুষের সামনে মালাকুল মওতের আবির্ভাব। তখন মানুষ বলে : হে মালাকুল মওত, আমাকে একদিনের সময় দাও, যাতে আমি পরওয়ারদেগারের কাছে ক্ষমা চাই এবং তওবা করি। মালাকুল মওত জওয়াব দেয়, তুই এতগুলো দিন অকারণে বরবাদ করেছিস, এখন একদিন কোথায় পাবে ? এরপর মানুষ বলে, এক মুহূর্তেরই অবকাশ দাও । মালাকুল মওত বলে তুই অনেক মুহূর্ত বিনষ্ট করেছিস। এখন এক মুহূর্তও দেয়া হবে না। 

এরপর মানুষের সামনে তওবার দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং প্রাণবায়ু কণ্ঠনালীতে এসে পড়ে। বুকে গড়গড় শব্দ হয়। এসব আতঙ্কের কারণে আসল ঈমান টলমল করতে থাকে। এরপর তাকদীর ভাল হলে আত্মা তাওহীদের উপর নির্গত হয়। একেই বলে “শুভ খাতেমা"। 

পক্ষান্তরে তাকদীর মন্দ হলে সন্দেহ ও অস্থিরতার উপর আত্মা নির্গত হয়। এটা হচ্ছে “অশুভ খাতেমা”। এই অশুভ খাতেমা সম্পর্কেই আল্লাহ পাক এরশাদ করেন - 

>“তাদের জন্যে তওবা নেই, যারা আমৃত্যু মন্দ কাজ করে যায়। এমনকি, যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়, তখন বলে, আমি এখন তওবা করছি”।  

অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে, – 

>“আল্লাহর কাছে তাদের তওবা কবুল হবে, যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে, এরপর অনতিবিলম্বে তওবা করে।" 

এর অর্থ এই যে, তওবার সময় ও গোনাহের সময় লাগালাগি হতে হবে। অর্থাৎ, গোনাহ হয়ে গেলে তৎক্ষণাৎ তজ্জন্যে অনুতাপ করবে এবং সাথে সাথে সৎকর্ম করবে। বেশী দিন অতিবাহিত হয়ে গেলে গোনাহের কারণে অন্তরে মরিচা ধরে যেতে পারে, যা মিটানো সম্ভব না-ও হতে পারে। 

এ কারণেই রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন– “মন্দকাজের পশ্চাতেই সৎকাজ কর। সৎকাজ মন্দ কাজকে মিটিয়ে দেবে”।

হযরত লোকমান (আঃ) তাঁর পুত্রকে বলেন প্রিয় বৎস, তওবায় বিলম্ব করো না। কেননা, মৃত্যু হঠাৎ এসে যায়। যে ব্যক্তি অনতিবিলম্বে তওবা করে না, সে দুটি বিপদে জড়িত থাকে। 

এক, গোনাহের কাল দাগ যদি একের পর এক অন্তরে পড়তে থাকে, তবে মরিচা ও মোহর লেগে যাবে এবং তা মিটানোর যোগ্য থাকবে না। 

দুই, যদি এ সময়ের মধ্যে রোগ অথবা মৃত্যুর কবলে পড়ে যায়, তবে ক্ষতিপূরণের অবকাশ থাকবে না। এছাড়া অন্তর মানুষের কাছে আল্লাহ তা'আলার আমানত। এমনিভাবে জীবনও তাঁরই আমানত। অতএব, যে ব্যক্তি আমানতে খেয়ানত করবে, তার পরিণাম ভয়াবহ।


জনৈক দরবেশ বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা মানুষকে দুটি রহস্যের কথা এলহামের মাধ্যমে শুনিয়ে দেন। 

এক, যখন মানুষ জননীর গর্ভ থেকে নির্গত হয়, তখন তাকে বলা হয়  “হে বান্দা ! আমি তোমাকে পাকসাফ অবস্থায় দুনিয়াতে পাঠিয়েছি”। তোমার আয়ুষ্কাল তোমার কাছে আমানত। এখন আমি দেখব তুমি কিভাবে এই আমানতের হেফাযত কর এবং আমার সাথে কি অবস্থায় সাক্ষাৎ কর”।

দুই, যখন মানুষের আত্মা নির্গত হয়, তখন বলা হয়, “হে বান্দা ! আমি যে আমানত তোমার কাছে রেখেছিলাম, তুমি এ সময় পর্যন্ত তার হেফাযত করেছ কি ? তুমি তোমার অঙ্গীকার পূর্ণ করে থাকলে আমিও আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর তুমি অঙ্গীকার ভঙ্গ করে থাকলে আমি শাস্তি দেব। 

নিম্নোক্ত আয়াতে এদিকেই ইশারা করা হয়েছে- 

>“তোমরা আমার অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমি তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করব ।



পরবর্তী পর্ব

শর্তসহ তওবা কবুল হয়

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...