বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ৭) শর্তসহ তওবা কবুল হয়



তওবা - (পর্ব - ৭) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শর্তসহ তওবা কবুল হয়—
নিঃসন্দেহে প্রত্যেক বিশুদ্ধ তওবা কবুল হয়। যারা অন্তশ্চক্ষুর আলোকে দেখে তারা জানে যে, সুস্থ ও নীরোগ অন্তর আল্লাহর কাছে মকবুল হয়ে থাকে এবং প্রকৃতিগতভাবে অন্তর নীরোগ সৃজিত হয়। এর সুস্থতা কেবল গোনাহের অন্ধকার ও মালিন্য আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে বিনষ্ট হয়। অনুশোচনার অনল এ মালিন্যকে ভস্মীভূত করে দেয় এবং সৎকর্মের নূর অন্তরের চেহারা থেকে গোনাহের তিমির দূর করে দেয়। গরম পানি ও সাবান ব্যবহার করলে যেমন কাপড়ের ময়লা পরিষ্কার হয়ে যায়, তেমনি তওবা ও অনুতাপের ফলে অন্তরের নাপাকী দূর হয়ে অন্তর পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। 

অতএব মানুষের উচিত, কেবল অন্তরকে পাক ও সাফ রাখা, যাতে আল্লাহর কাছে মকবুল হয়। কোরআনের ভাষায় এই কবুল হওয়ার নাম সাফল্য। 

বলা হয়েছে–

>“যে অন্তরকে পরিশুদ্ধ রেখেছে, সে সফলতা অর্জন করেছে”।

কারও কারও ধারণা, তওবা বিশুদ্ধ হলেও তা কবুল হয় না। তাদের এই ধারণা এরূপ ধারণার অনুরূপ যে, সূর্য উদিত হলেও অন্ধকার দূর হয় না অথবা সাবান দিয়ে ধৌত করলেও কাপড়ের ময়লা পরিষ্কার হয় না। 

হাঁ, যদি ময়লার স্তর কাপড়ের কলিজার মধ্যে প্রবেশ করে যায়, তবে সাবান দিয়ে তা দূর করা যাবে না। এমনিভাবে উপর্যুপরি গোনাহের কারণে যে অন্তরে মরিচা ও মোহর লেগে যায়, তার তওবা নিষ্ফল। কেউ কেউ মাঝে মাঝে কেবল “তওবা তওবা” বলে থাকে। এরূপ তওবার কোন মূল্য নেই। এটা এমন, যেমন ধোপা মুখে বলে, আমি কাপড় ধোলাই করেছি। তাঁর এই মৌখিক কথায়ই কাপড় পরিষ্কার হয়ে যাবে কি, যে পর্যন্ত কাপড়ের ময়লা ছাড়ানোর কৌশল ব্যবহার না করবে। প্রকৃত তওবা থেকে যারা গা বাঁচাতে চায়, এটা তাদেরই অবস্থা। দুনিয়ার প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত ব্যক্তিদের উপর এ অবস্থাই প্রবল। 

এখন তওবা কবুল হওয়ার পক্ষে কোরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে। 

আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-

>“তিনি আল্লাহ, যিনি আপন বান্দাদের তরফ থেকে তওবা কবুল করেন এবং গোনাহসমূহ মার্জনা করেন”।  

>“আল্লাহ গোনাহ মার্জনাকারী এবং তওবা কবুলকারী”।  

তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে আরও অনেক আয়াত রয়েছে। হাদীস শরীফে আছে, 

>“আল্লাহ তা'আলা বান্দার তওবার কারণে অধিক সন্তুষ্ট হন”। 

বলা বাহুল্য, সন্তুষ্ট হওয়ার মর্তবা কবুল করার ঊর্ধ্বে। 

অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে- 

>“যে ব্যক্তি রাতের বেলায় সকাল পর্যন্ত এবং দিনের বেলায় সন্ধ্যা পর্যন্ত গোনাহ করে, তার তওবা কবুল করার জন্যে আল্লাহ তা'আলা বাহু প্রসারিত করেন। এটা পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে”। 

এখানে বাহু প্রসারিত করার অর্থ তওবা তলব বা কামনা করা বুঝা যায়। যে তলব করে, সে কবুলকারীর ঊর্ধ্বে। কেননা, কোন কোন কবুলকারী তলব করে না কিন্তু তলবকারীর জন্য কবুলকারী হওয়া অপরিহার্য। 


অন্য এক হাদীসে আরও বলা হয়েছে : 

>“যদি তোমরা আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত গোনাহ কর, এরপর অনুতপ্ত হও, তবে অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের তওবা কবুল করবেন”।  

হাদীসে আরও বলা হয়েছে- 

>“মানুষ কোন গোনাহ করে, এরপর এর কারণে জান্নাতে দাখিল হয়ে যায়”  সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন এটা কিরূপে ? তিনি বললেনঃ গোনাহ থেকে তওবা করে তাকেই দৃষ্টিতে রাখে এবং সেই গোনাহ থেকে বিরত থাকে। অবশেষে এর দৌলতে জান্নাতে দাখিল হয়। 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন  :

“যে গোনাহ থেকে তওবা করে, সে সেই ব্যক্তির মত, যার কোন গোনাহ নেই।


বর্ণিত আছে, জনৈক হাবশী রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরয করল  ‘আমি গোনাহ করতাম’ –বলুন, আমার তওবা কবুল হবে কি না? 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন  : অবশ্যই তওবা কবুল হবে। 

লোকটি চলে গেল, এরপর আবার ফিরে এসে আরয করল : ইয়া রসূলাল্লাহ ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমি যখন গোনাহ করতাম, তখন আল্লাহ আমাকে দেখতেন কি না?

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : হাঁ, দেখতেন । 

একথা শুনেই হাবশী এমন সজোরে চীৎকার করে উঠল যে, সাথে সাথে তার প্রাণবায়ু বের হয়ে গেল।

বর্ণিত আছে, যখন আল্লাহ তা'আলা শয়তানকে নিজের দরবার থেকে তাড়িয়ে দিলেন, তখন শয়তান অবকাশ প্রার্থনা করল। আল্লাহ তাকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দিলেন। 

শয়তান বলল,

>“আপনার ইযযতের কসম, যে পর্যন্ত মানুষের দেহে প্রাণ থাকবে, আমি তার অন্তর থেকে বের হব না”। 

এরশাদ হল-

>“আমিও আমার ইযযত ও প্রতাপের কসম খেয়ে বলছি- যে পর্যন্ত মানুষের মধ্যে প্রাণ থাকবে, সে পর্যন্ত তাদের তওবা প্রত্যাখ্যান করব না”। 

অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে– 

>“পুণ্যকাজ মন্দকাজকে বিদূরিত করে। যেমন পানি ময়লাকে বিদূরিত করে”। 

তওবা কবুল হওয়ার বিষয়ে এমনি ধরনের আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে। এ সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তিও কম নয়। 


হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রাঃ) বলেন: 

>“আল্লাহ প্রত্যাবর্তনকারীদেরকে ক্ষমা করেন”। 

আয়াতের মর্ম এই যে, যদি কেউ গোনাহ করার পর তওবা করে এবং এরপরও গোনাহ করে এবং এরপর তওবা করে, তবে আমি তার তওবা কবুল করব। 

তালেক ইবনে হাবীব বলেনঃ আল্লাহ তা'আলার হক আদায় করা বান্দার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু যেহেতু সে সকালে তওবা করে এবং সন্ধ্যায় তওবা করে, তাই ক্ষমার আশা করা যায়। 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) বলেন–> "যে ব্যক্তি কোন অপরাধ করে, সে যদি সেই অপরাধ স্মরণ করে মনে মনে ভীত হয়, তবে সে অপরাধ তার আমলনামা থেকে মিটে যায়"। 

জনৈক বুযুর্গ বলেন মানুষ মাঝে মাঝে গোনাহ করে এবং দীর্ঘকাল পর্যন্ত অনুতাপ করতে থাকে। অবশেষে সে এর দৌলতে জান্নাতে দাখিল হয়ে যায়। তখন শয়তান বলে, চমৎকার হত যদি আমি তাকে গোনাহে লিপ্ত না করতাম। 

এক ব্যক্তি হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ)-কে প্রশ্ন করল : “আমি একটি গোনাহ করেছি, আমার তওবা কবুল হবে কি না”? তিনি প্রথমে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরপর তাকিয়ে লোকটিকে অশ্রুসজল দেখতে পেয়ে বললেন জান্নাতের আটটি দরজা আছে, সবগুলো খুলে এবং বন্ধ হয়; কিন্তু তওবার দরজা কখনও বন্ধ হয় না। সেখানে একজন ফেরেশতা মোতায়েন রয়েছে। তুমি নিরাশ না হয়ে ভাল আমল করে যাও। 

আবদুর রহমান ইবনে আবুল কাসেমের দরবারে একবার কাফেরের তওবা এবং এই আয়াত সম্পর্কে আলোচনা শুরু হল : 

>“যদি তারা বিরত হয়, তবে অতীতে যা হয়েছে, ক্ষমা করা হবে”। 

আবদুর রহমান বললেন : আমি আশা করি আল্লাহর কাছে মুসলমানের অবস্থা কাফেরের তুলনায় ভাল হবে। আমি এই রেওয়ায়েতপ্রাপ্ত হয়েছি যে, মুসলমানের তওবা করা যেন ইসলাম গ্রহণের পর আবার ইসলাম গ্রহণ করা। 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বলেন : আমি তোমাদের কাছে যে হাদীস বর্ণনা করি, তা নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) থেকে শুনে অথবা ঐশীগ্রন্থ থেকে দেখে বর্ণনা করি। 

বান্দা গোনাহ করার পর যদি এক মুহূর্ত অনুতাপ করে, তবে পলক মারারও পূর্বে সেই গোনাহ দূর হয়ে যায়। 

হযরত উমর (রাঃ) বলেনঃ তওবাকারীদের কাছে বস। কারণ, তাদের অন্তর অধিক নম্ৰ থাকে।

জনৈক বুয়ুৰ্গ বলেন যদি আমি তওবা থেকে বঞ্চিত থাকি, তবে এটা আমার জন্যে মাগফেরাত থেকে বঞ্চিত থাকার তুলনায় অধিক ভয়ের কারণ। এরূপ বলার কারণ এই যে, তওবার জন্যে মাগফেরাত অপরিহার্য। তওবা কবুল হলে মাগফেরাত হয়েই যাবে। তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে এতটুকু বর্ণনাই যথেষ্ট । 

এখন কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে যে, এটা তো মুতাযেলা সম্প্রদায়ের কথা যারা বলে যে, তওবা কবুল করা আল্লাহর উপর ওয়াজিব। এর জওয়াব এই যে, আমৱা যে “ওয়াজিব” বলি, তার অর্থ “জরুরী”। যেমন কেউ বলে - সাবান দিয়ে কাপড় ধৌত করলে ময়লা দূর হওয়া ওয়াজিব অথবা পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি পান করলে পিপাসা দূর হওয়া ওয়াজিব, অথবা কাউকে দীর্ঘ সময় পানি পান করতে না দিলে পিপাসা লাগা ওয়াজিব, অথবা কেউ সদাসর্বদা পিপাসার্ত থাকলে তার মরে যাওয়া ওয়াজিব। মুতাযেলা সম্প্রদায় যে অর্থে ওয়াজিব বলে, সে অর্থে এসব বিষয়ের মধ্যে কোনটিই ওয়াজিব নয়। আমাদের উদ্দেশ্য এতটুকু যে, আল্লাহ তা'আলা এবাদতকে গোনাহের কাফফারা করেছেন এবং পাপকে মিটানোর জন্যে পুণ্য সৃষ্টি করেছেন, যেমন পানিকে পিপাসা নিবৃত্ত করার জন্যে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর কুদরতে এর বিপরীত হওয়ারও অবকাশ রয়েছে। 

   সারকথা, আল্লাহর উপর কোনকিছুই ওয়াজিব নয়। কিন্তু তিনি যে বিষয়ের ইচ্ছা করেছেন, তা হওয়া অবশ্যই ওয়াজিব। এখানে আরও একটি প্রশ্ন হতে পারে যে, তওবাকারীদের প্রত্যেকেই তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ করতে থাকে; অথচ যে পানি পান করে, সে পিপাসা নিবৃত্তির ব্যাপারে সন্দেহ করে না। অতএব, তওবাকারী সন্দেহ করবে কেন? জওয়াব এই যে, তওবা বিশুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে যে সকল জরুরী শর্ত রয়েছে, সেগুলো পাওয়া গেল কি না, সন্দেহ সে বিষয়েই হয়ে থাকে । পানি পান করার ক্ষেত্রে এরূপ কোন শর্ত নেই।তওবা বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলী ইনশাআল্লাহ  পরে বর্ণনা করা হবে।

পরবর্তী পর্ব

যে সকল গোনাহ থেকে তওবা করা হয়

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...