রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ১৩) তওবার ব্যাপারে মানুষের স্তরভেদ



তওবা - (পর্ব - ১৩) 
তওবার ব্যাপারে মানুষের স্তরভেদ 

জানা উচিত যে, তওবার ব্যাপারে তওবাকারীদের চারটি স্তর রয়েছে।

প্রথম স্তর এই যে, গোনাহগার ব্যক্তি গোনাহ থেকে তওবা করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাতে অটল থাকবে। পূর্বে যে সকল ত্রুটি করেছিল, সেগুলো পূরণ করবে এবং পুনরায় সেই সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি ছাড়া গোনাহ করার কথা কল্পনাও করবে না, যেগুলো থেকে মানুষ নবী না হলে অভ্যাসগত ভাবে মুক্ত হয় না। একেই বলা হয় তওবায় অবিচল থাকা এবং এরই নাম “তাওবাতুন্নাসূহ” (খাঁটি তওবা)। এরূপ মনকেই কোরআন পাকে “নাফসে মুতমায়িন্নাহ” (প্ৰশান্ত মন) বলা হয়েছে, যে তার পরওয়ারদেগারের সামনে সন্তুষ্টচিত্তে উপস্থিত হবে এবং পরওয়ারদেগারও তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। নিম্নোক্ত হাদীসে এরূপ তওবাকারীদের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে– “আল্লাহর যিকিরের প্রতি লোভী ব্যক্তিরা অগ্রগামী হয়েছে। যিকির তাদের বোঝা নামিয়ে দিয়েছে। ফলে, তারা কিয়ামতের ময়দানে হালকা-পাতলা হয়ে পৌঁছেছে”। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, তাদের উপর বোঝা ছিল; কিন্তু যিকিরের ফলে তাদের বোঝা নেমে গেছে।


দ্বিতীয় স্তর এমন তওবাকারীর, যে মৌলিক এবাদত পালনে এবং সকল কবীরা গোনাহ বর্জনে সুদৃঢ় থাকে। এতদসত্ত্বেও এমন গোনাহ থেকে মুক্ত নয়, যা ইচ্ছা ব্যতিরেকেই হয়ে যায়। অর্থাৎ, আপন কাজকর্মে এরূপ গোনাহ্ করে ফেলে, পূর্ব থেকে যায় ইচ্ছা থাকে না। যখন সে এ ধরনের গোনাহ্ করে ফেলে, তখন নিজেকে তিরস্কার করে লজ্জিত হয় এবং ভবিষ্যতে এরূপ গোনাহের ধারে-কাছে না যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করে। এরূপ মনকে ‘নাফসে লাওয়ামা' (তিরস্কারকারী মন) বলা সমীচীন। কেননা, অনিচ্ছাকৃত কুকর্মের কারণে এই মন নিজেকে ধিক্কার দেয়। যদিও প্রথম স্তরটি সর্বশ্রেষ্ঠ, কিন্তু এই স্তরও যে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, তাতে দ্বিমতের অবকাশ নেই। অধিকাংশ তওবাকারীর অবস্থা এমনি হয়ে থাকে। কেননা, কুপ্রবৃত্তি মানুষের মজ্জাগত একটি উপাদান। এ থেকে মুক্ত থাকা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু মানুষ চেষ্টা করে পাপের তুলনায় পুণ্য বেশী করতে পারে, যাতে তার পুণ্যের পাল্লা ভারী হয়। এরূপ তওবাকারীর জন্যে আল্লাহ তা'আলা ওয়াদা করেছেন - “যারা ছোটখাটো বিষয় ছাড়া বড় গোনাহ ও অশ্লীল কাজকর্ম থেকে বেঁচে থাকে, তারা ক্ষমা পাবে। নিশ্চয় তোমার পালনকর্তার ক্ষমা বিস্তৃত।”


মানুষ ইচ্ছা ছাড়াই যে সব সগীরা গোনাহ করে ফেলে, সেগুলো “লামাম” তথা ছোটখাটো বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন : “আর তারা, যারা কোন অশ্লীল কর্ম করলে অথবা নিজেদের প্রতি অন্যায় করলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর নিজেদের গোনাহের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে”।

এখানে নিজেদের প্রতি অন্যায় করা সত্ত্বেও যে তাদের প্রশংসা করা হয়েছে, তা এজন্যেই যে, তারা পরবর্তী সময়ে অনুতাপ করেছে এবং নিজেদের তিরস্কৃত করেছে। এরই অনুরূপ স্তরের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে এই হাদীসে, –

“তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম ব্যক্তি, যে গোনাহে লিপ্ত হলে তওবা করে।”

অন্য হাদীসে আছে-

“মুমিন গমের শীষের মত- কখনও গোনাহ থেকে ফিরে আসে আবার কখনও তৎপ্রতি ঝুঁকে পড়ে।”

এক হাদীসে আরও বলা হয়েছে : “কখনও কখনও গোনাহ করা ঈমানদারের জন্যে জরুরী”। এসব রেওয়ায়েত থেকে নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হয় যে, এই পরিমাণ অপরাধের কারণে তওবা ভঙ্গ হয় না এবং এরূপ অপরাধ গোনাহে অবিচলদের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং এরূপ তওবাকারীদেরকে নিরাশ করা ফেকাহবিদদের উচিত নয়। ফেকাহবিদ তো তাকেই বলা হয়, যে মানুষকে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও গোনাহ করার কারণে সৌভাগ্যের স্তরে পৌছার ব্যাপারে হতাশাগ্রস্ত করে না। হাদীসে বর্ণিত আছে—

“সকল আদম সন্তান গোনাহগার। তবে উত্তম গোনাগার তারা, যারা তওবা করে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে।”

আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন- 

“এসব লোকেরা তাদের পুরস্কার দ্বিগুণ পাবে। কারণ, তারা সবর করে এবং পাপকর্মকে সৎকর্মের দ্বারা প্রতিহত করে”। এখানে বলা হয়েছে যে, তারা পাপের পরে পুণ্য করে। এরূপ বলা হয়নি যে, তারা পাপ মোটেই করে না।


তৃতীয় স্তর হল তাদের, যারা তওবা করে কিছুকাল তাতে অটল থাকে। এরপর কোন গোনাহের খাহেশ প্রবল হয়ে যায় এবং তা ইচ্ছাকৃতভাবে করে ফেলে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা যথারীতি এবাদত পালনে সর্বদা তৎপর থাকে এবং খায়েশ থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য গোনাহ বর্জন করে। কেবল এক অথবা দু' গোনাহের ব্যাপারে তারা অক্ষম থাকে এবং এগুলো থেকেও তওবা করার ইচ্ছা মনে মনে পোষণ করে। কিন্তু আজ-কাল করে তা পিছিয়ে দেয়। এরূপ লোকদের শানে আল্লাহ পাক বলেন :

“কিছু লোক তাদের গোনাহ স্বীকার করে। তারা একটি পুণ্যকাজ করে এবং অপরটি পাপকাজ”।

আশা করা যায়, এরূপ লোকদের তওবা আল্লাহ তা'আলা কবুল করবেন। কিন্তু যেহেতু তারা টালবাহানা করে তওবাকে পিছিয়ে দেয়, এ কারণে তাদের পরিণতি বিপজ্জনকও হতে পারে। কে জানে, তওবার আগেই তাদের মৃত্যু এসে যায় কিনা! এরপর আল্লাহর যা ইচ্ছা, তাই প্রকাশ পেতে পারে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আপন কৃপায় তাদের ক্ষতিপূরণ করে নেবেন অথবা তাদের দুর্ভাগ্যই প্রবল হয়ে পড়বে। আল্লাহ বলেন :

“কসম মানুষের এবং যিনি তাকে সুঠাম করেছেন, অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। সে সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সে-ই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষিত করবে।”

সুতরাং বান্দা যখন কোন গোনাহে লিপ্ত হয় এবং গোনাহ থাকে নগদ আর তওবা থাকে বাকীর খাতায়, তখন এটা তার দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে “বান্দা সত্তর বছর পর্যন্ত জান্নাতীদের অনুরূপ আমল করে। ফলে, মানুষ তাকে জান্নাতী বলতে শুরু করে এবং তার মধ্যে ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র অর্ধ হাত ব্যবধান থেকে যায়। কিন্তু ভাগ্যলিপি প্ৰবল হয় এবং সে দোযখীদের মত আমল করতে থাকে এবং অবশেষে দোযখে পতিত হয়।


চতুর্থ স্তর এমন তওবাকারীর, যারা তওবার পর কিছুদিন তাতে অটল থাকে, এরপর এক গোনাহ অথবা অনেক গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং অন্তরে তওবা করার ইচ্ছা থাকে না অথবা গোনাহের জন্যে আফসোস করে না। এরূপ ব্যক্তি গোনাহে অবিচলদের অন্তর্ভুক্ত। এরূপ নফসকে বলা হয় “নাফসে আম্মারা বিসসু” (কুকর্মের আদেশদাতা নফস)। তার পরিণাম মন্দ হওয়ার সমূহ আশংকা রয়েছে। খোদা না করুন, পাপকর্মেই তার জীবনের অবসান ঘটলে সে হবে চরম হতভাগা। পক্ষান্তরে অন্তিম অবস্থা ভাল হলে দোযখ থেকে মুক্তির আশা করা যাবে– যদিও তা কিছুকাল শাস্তি ভোগ করার পর হয়।


পরবর্তী পর্ব

তওবাকারীর গোনাহ হয়ে গেলে কি করবে?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...