রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ১২) বান্দার হক সম্পর্কিত তওবা



তওবা - (পর্ব - ১২)
বান্দার হক সম্পর্কিত তওবা

পক্ষান্তরে যে সকল গোনাহ বান্দার হক সম্পর্কিত, সেগুলোতেও আল্লাহ তা'আলার হক থাকে। কারণ, আল্লাহ তা'আলা বান্দার সাথে যুলুম তথা অন্যায় আচরণ করতে নিষেধ করেছেন। 


অতএব, যে ব্যক্তি অপরের প্রতি যুলুম করে, সে প্রথমে আল্লাহ তা'আলার বিরোধিতা করে। এ ধরনের গোনাহে আল্লাহর হক পূরণ করার উপায় হচ্ছে অনুতাপ ও দুঃখ করা এবং ভবিষ্যতে এরূপ গোনাহ না করা। এ ছাড়া, এ ধরনের গোনাহের বিপরীত পুণ্যকাজ করা। 

উদাহরণতঃ কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে তার প্রতি অনুগ্রহ করা। কারও ধন-সম্পদ ছিনিয়ে থাকলে তার কাফফারা স্বরূপ নিজের হালাল ধন-সম্পদ খয়রাত করা। কারও গীবত ও তিরস্কার করে থাকলে তার প্রশংসা কীর্তন করা। কোন মানুষকে হত্যা করে থাকলে ক্রীতদাস মুক্ত করা। কেননা, এটাও এক ধরনের জীবন দান।


তবে বান্দার হক সম্পর্কিত গোনাহসমূহে কেবল অনুতাপ করা এবং বিপরীত সৎকর্ম করাই যথেষ্ট নয়; বরং এ ক্ষেত্রে বান্দার হক আদায় করাও জরুরী। যদি বান্দার হক প্রাণনাশের সাথে সম্পর্ক হয়, যেমন কাউকে ভুলক্রমে খুন করে থাকলে তার তওবা হচ্ছে রক্ত বিনিময় আদায় করা। প্রাপক ব্যক্তিবর্গকে রক্তবিনিময় না দেয়া পর্যন্ত খুনী ব্যক্তি অপরাধমুক্ত হবে না।


আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে খুন করে থাকে, তবে এর তওবা “কেসাস” তথা খুনের বদলে খুন দ্বারাই গ্রহণীয় হবে। 


যদি হত্যার ব্যাপারটি অজানা থাকে, তবে হত্যাকারীর জন্যে ওয়াজিব নিহত ব্যক্তির ওলীর কাছে হত্যার কথা স্বীকার করা এবং আত্মসমর্পণ করা। এরপর সে ক্ষমা করুক অথবা হত্যার বদলে হত্যা করুক। এ ছাড়া, হত্যাকারী কিছুতেই পাপমুক্ত হবে না। 


এখানে হত্যার বিষয় গোপন করা সম্পূর্ণ নাজায়েয। কিন্তু যিনা, চুরি, মদ্যপান ইত্যাদি আল্লাহর হক সম্পর্কিত গোনাহের ক্ষেত্রে তওবার জন্যে গোপনীয়তা ফাঁস করা এবং শাস্তির জন্যে ওলীর কাছে আত্মসমর্পণ করা জরুরী নয়; বরং এসব ক্ষেত্রে ওয়াজিব হচ্ছে আল্লাহ যেমন গোপন রেখেছেন, তেমনি গোপন থাকতে দেয়া এবং নিজের শাস্তি নিজেই সাব্যস্ত করা। যেমন, পাপমোচনের জন্যে নানা রকম সাধনায় রত হওয়া। কেননা, আল্লাহর হক কেবল তওবা ও অনুতাপ দ্বারা মাফ হতে পরে। যদি এসব ক্ষেত্রে তওবাকারী আপন গোনাহ আদালতে পেশ করে শাস্তি গ্রহণ করে, তবে তওবা সঠিক ও যথার্থ হবে এবং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে!


হাদীসে বর্ণিত আছে যে, মায়েয ইবনে মালেক (র.) রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনার খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলেন: ইয়া রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আমি নিজের উপর ভয়ানক যুলুম করেছি। আমি যিনা করেছি। হুযুর, আমাকে পাপমুক্ত করুন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তার কথায় কর্ণপাত করলেন না। দ্বিতীয় দিন তিনি এসে আবারও সে কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহেওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) এবারও তার কথা কানে তুললেন না। যখন তৃতীয় দিন এসে একই কথা আরয করলেন, তখন রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তার জন্যে গর্ত খনন করালেন এবং পাথর মেরে মেরে তার জীবনের অবসান ঘটালেন। তার সম্পর্কে মুসলমানরা দু'দলে বিভক্ত হয়ে গেল। এক দল বলছিল : মায়েযের মৃত্যু পাপে পরিবেষ্টিত অবস্থায় হয়েছে। পক্ষান্তরে অপর দলের অভিমত ছিল মায়েযের তওবার মত খাঁটি কোন তওবা নেই। 


রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) দ্বিতীয় দলের সমর্থন করে বললেনঃ মায়েয এমন তওবা করেছে, যা সমগ্র উম্মতের মধ্যে বিভাজ্য হতে পারে।


অনুরূপভাবে খামেদিয়া মহিলার ঘটনাও সুবিদিত। সে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)- উনার খেদমতে হাযির হয়ে আরয করল : আমি যিনা করেছি। আপনি আমাকে পবিত্র করুন। তিনি তার কথা শুনেও শুনলেন না। পরদিন সে আবার আরয করল : আপনি আমাকে পবিত্র করেন না কেন? আপনি কি আমাকে মায়েযের মত মনে করেন? আল্লাহর কসম, আমার তো গর্ভও হয়ে গেছে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করলেন: তোমার গর্ভস্থ সন্তান ভূমিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে “হদ” তথা আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি দেয়া যাবে না। এরপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে সে তাকে একটি কাপড়ে জড়িয়ে উপস্থিত করল এবং আরয করল : হুযুর ! আমার সন্তান হয়ে গেছে ! এবার আমাকে শাস্তি দিয়ে পবিত্র করুন। 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যাও, তোমার সন্তান যখন দুধ খাওয়া ছেড়ে দিবে, তখন দেখা যাবে। অতঃপর শিশুটি যখন দুধ খাওয়া ছেড়ে খাদ্য খেতে শুরু করল, তখন খামেদিয়া তাকে নিয়ে আবার উপস্থিত হল। শিশুর হাতে তখন একখণ্ড রুটি ছিল ! খামেদিয়া আরয করল : ইয়া রসূলাল্লাহ ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) সে দুধ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে এবং রুটি খেতে শুরু করেছে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) শিশুটিকে একজন মুসলমানের হাতে সমর্পণ করলেন এবং খামেদিয়ার জন্য গর্ত খনন করালেন। অতঃপর তাকে লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়ার জন্য মুসলমানদেরকে আদেশ দিলেন। খালেদ ইবনে ওলীদ এসে যখন তার মাথায় একটি পাথর ছুঁড়ে মারলেন, তখন রক্তের ছিটা এসে তার মুখমণ্ডলে পতিত হল। তিনি উত্তেজিত হয়ে খামেদিয়াকে গালি দিলেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তার গালি শুনে বললেন : খালেদ গালি দিয়ো না। সেই আল্লাহর কসম, যার কবযায় আমার প্রাণ, এই মহিলা এমন তওবা করেছে যে, জরিমানা আদায়কারীর মত পাপিষ্ঠ ব্যক্তি এরূপ তওবা করলে তারও মাগফেরাত হয়ে যাবে। (হাদীসে “মক্স” শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ সেই জরিমানা, যা উশর আদায়কারী মানুষের কাছ থেকে গ্রহণ করত। এরূপ জরিমানা আদায়কারী সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, সে জান্নাতী হবে না।)

বান্দার হকসমূহের মধ্যে যদি কারও ধনসম্পদ চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা, আত্মসাৎ, ঠকানো ইত্যাদির মাধ্যমে বিনষ্ট করে, তবে এ থেকে তওবা করার বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। এতে প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সকলেই সমান। অর্থাৎ সকলকেই তওবা করতে হবে। সুতরাং জীবনের শুরু থেকে তওবার দিন পর্যন্ত পাই পাই করে হিসাব করবে এবং দেখবে তার যিম্মায় কার কত পাওনা হয়েছে। এরপর এসব পাওনা নামে নামে লিপিবদ্ধ করবে এবং পাওনাদারদের খোঁজে বাড়ী থেকে বের হয়ে পড়বে। অতঃপর তাদের কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেবে। অথবা যার যা পাওনা, তা শোধ করে দেবে। যদি যথাসাধ্য চেষ্টার পর সকল পাওনাদার অথবা তাদের ওয়ারিসদেরকে তালাশ করা সম্ভব না হয়, তবে বিপুল পরিমাণে সৎকর্ম করবে, যাতে কিয়ামতের দিন এসব সৎকর্মের সওয়াব দিয়ে পাওনাদারদের পাওনা শোধ করা যায়। সুতরাং মানুষের পাওনার পরিমাণ অনুযায়ী সৎকর্ম করা চাই। যদি সৎকর্ম দ্বারা সকল পাওনা শোধ না হয়, তবে পাওনাদারদের গোনাহ তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। ফলে, সে অপরের গোনাহের বদলে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে। যদি কারও ধনসম্পদে হালাল ও হারাম মিশে যায়, তবে আন্দাজ করে হারাম মাল বের করে খয়রাত করে দেবে।


কুৎসা রটনা, গীবত ইত্যাদির মাধ্যমে অপরের মনে কষ্ট দিলে তার তওবা হল, যাদের মনে কষ্ট দিয়ে থাকবে তাদের প্রত্যেককে তালাশ করে মাফ করিয়ে নেয়া। যদি তাদের কেউ মারা গিয়ে থাকে অথবা নিরুদ্দেশ থাকে, তবে তার তওবা এ ছাড়া কিছুই নয় যে, পুণ্যকর্ম অনেক করবে, যাতে কিয়ামতে বিনিময়ে দিতে পারে। যাকে তালাশ করে পাওয়া যায়, সে যদি মনের খুশীতে মাফ করে দেয়, তবে এটা তার অপরাধের কাফফারা হয়ে যাবে। কিন্তু যে অপরাধ করেছে এবং মুখে যা যা বলেছে, তা মাফ চাওয়ার সময় বর্ণনা করা ওয়াজিব। অস্পষ্ট মাফ করানো যথেষ্ট হবে না। কেননা, এমনও হয় যে, নিজের উপর অপরের বাড়াবাড়ির কথা জানার পর মাফ করতে মন চায় না এবং কিয়ামতেই বিনিময় নেয়ার কথা চিন্তা করা হয়। তবে যদি এমন কোন অপরাধ করে থাকে, যা বর্ণনা করলে প্রতিপক্ষ মনে ব্যথা পাবে, তবে বুঝতে হবে মাফ করানোর পথ রুদ্ধ। তবে এটা সম্ভব যে, অস্পষ্ট মাফ করিয়ে নিবে এবং পরে যে ত্রুটি থেকে যাবে,তা পুণ্য কর্মের দ্বারা পূরণ করে নেবে। অপরাধ উল্লেখ করার পর প্রতিপক্ষ যদি মাফ করতে সম্মত না হয়, তবে শাস্তি অপরাধীর ঘাড়ে থেকে যাবে। কেননা, প্রতিপক্ষের হক এখনও বহাল রয়েছে। এমতাবস্থায় অপরাধীর উচিত তার সাথে নম্র ব্যবহার করা, তার খেদমত করা এবং তার প্রতি ভালবাসা ও সৌহার্দ প্রকাশ করা। এতে প্রতিপক্ষের মন তার প্রতি নরম হবে। কেননা, কথায় বলে, মানুষ অনুগ্রহের দাস। ফলে, শেষ পর্যন্ত সে মাফ করতে সম্মত হয়ে যাবে। যদি এরপরও মাফ না করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে, তবে তার নম্রতা ও সদ্ব্যবহার মাঠে মারা যাবে না; বরং এগুলো পুণ্যকর্ম হয়ে যাবে, যা দ্বারা কিয়ামতে বিনিময় দেখা যাবে।


বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের মধ্যে এক ব্যক্তি ৯৯টি খুন করেছিল। অতঃপর সে মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করল : বর্তমান যুগে সর্ববৃহৎ আলেম কে? লোকেরা বলল : অমুক সন্ন্যাসী। সে তার কাছে গেল এবং বলল : আমি ৯৯টি খুন করেছি। আমার তওবা কবুল হবে কি? সন্ন্যাসী জওয়াব দিল না। সে সন্ন্যাসীকেও হত্যা করে খুনের সংখ্যা একশতে উন্নীত করে নিল। সে পুনরায় লোকদেরকে জিজ্ঞেস করল : এখন সেরা আলেম কে? লোকেরা জনৈক আলেমের নাম বললে সে তার কাছে গেল এবং বলল : আমি একশ' জনকে হত্যা করেছি। আমার তওবা কবুল হবে কি না? আলেম বলল : তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে কোন বাধা নেই। যখনই তওবা করবে, কবুল হবে। তুমি অমুক জায়গায় যাও। সেখানে কিছু লোক আল্লাহর এবাদতে নিয়োজিত রয়েছে। তুমিও তাদের সাথে এবাদতে মগ্ন থাক এবং কখনও দেশে ফিরে যেয়ো না। লোকটি অর্ধেক পথ অতিক্রম করতেই মৃত্যু এসে তার সামনে উপস্থিত হল। তখন রহমত ও আযাবের ফেরেশতারা আগমন করল! তাদের মধ্যে বিতর্ক হল। রহমতের ফেরেশতারা বলল : এ ব্যক্তি তওবা করে এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হয়ে এসেছে। সুতরাং তার রূহ কবয করার অধিকার আমাদের। আযাবের ফেরেশতারা বলল : সে কোন দিন কোন ভাল কাজ করেনি। তাই আমরাই তার রূহের হকদার। ইতিমধ্যে জনৈক ফেরেশতা মানুষের বেশে সেখানে উপস্থিত হল। ফেরেশতাদের উভয় পক্ষ তাকে তাদের ব্যাপারে সালিস করে নিল। সে বললঃ এই ব্যক্তির উভয় দিকের দূরত্ব মেপে নেয়া উচিত। যেদিকের দূরত্ব কম হবে, তাকে সেই দিকের গণ্য করতে হবে। দূরত্ব মেপে দেখা গেল, যেদিকে সে যেতে চেয়েছিল, সেদিকের দূরত্ব অর্ধ হাত কম।ফলে, রহমতের ফেরেশতারাই তার রূহ কবয করে নিল। এ থেকে জানা গেল, মুক্তি তখনই পাওয়া যাবে, যখন সৎকর্মের পাল্লা ভারী হবে যদিও তা সামান্যই হয়। এ কারণেই তওবাকারীর জন্যে অধিক পরিমাণে সৎকর্ম করা জরুরী।


ভবিষ্যতকালের জন্যে তওবাকারীর উচিত আল্লাহ তা'আলার সাথে সেই গোনাহ না করার পাকাপোক্ত অঙ্গীকার করা। 

উদাহরণতঃ রোগী রুগ্নাবস্থায় জানতে পারল যে, অমুক ফল তার জন্যে ক্ষতিকর। অতঃপর সে দৃঢ় সংকল্প করল যে, সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কখনও সেই ফল খাবে না। তার এই সংকল্প তখন তো পাকাপোক্তই হয়ে থাকে- যদিও অন্য সময় খাহেশ প্রবল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অতএব, তওবা করার সময় তওবাকারী পাকাপোক্ত সংকল্প করবে। নতুবা তাকে তওবাকারী বলা হবে না। তার এই সংকল্প শুরুতে তখন পূর্ণ হবে, যখন সে নির্জনবাস, নীরবতা, স্বল্প আহার, স্বল্প নিদ্রা ও হালাল খাদ্য অবলম্বন করবে। যদি তার কাছে উত্তরাধিকার সূত্রে হালাল উপার্জন বিদ্যমান থাকে অথবা সে জীবন যাপন উপযোগী কোন পেশা করে, তবে এ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। কেননা, হারাম খাদ্য সকল গোনাহের মূল। হারাম ভক্ষণে অবিচল থাকলে তওবাকারী হবে কিরূপে? যদি তওবাকারী নির্জনবাস অবলম্বন না করে, তবে তওবায় “ইস্তেকামাত” তথা দৃঢ়তা পূর্ণাঙ্গ হবে। কেবল কিছুসংখ্যক গোনাহ যথা মদ, যিনা ও ছিনতাই থেকে তওবা করবে! এটা সর্বাবস্থায় তওবা নয়; বরং কারও কারও মতে এরূপ তওবা জায়েযই নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কতক গোনাহ পরিত্যাগ করা মোটেই উপকারী নয়। কেননা, আমরা জানি, গোনাহ বেশী হলে আযাব বেশী এবং কম হলে আযাব কম হবে। পক্ষান্তরে একদল উপরোক্ত তওবাকে জায়েয বলে থাকে। এর অর্থ এরূপ যে, কতক গোনাহ থেকে তওবা করেই মুক্তি ও সাফল্য অর্জন করা যায়। কেননা, মুক্তি ও সাফল্য বাহ্যত দু'-তিনটি গোনাহ ত্যাগ করলেই অর্জিত হয় না। তবে আল্লাহ তা'আলার গোপন ক্ষমা-রহস্য আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়।

কতক গোনাহ থেকে তওবা করার তিনটি সম্ভাব্য প্রকার রয়েছে। --

প্রথম প্রকার হল শুধু কবীরা গোনাহ থেকে তওবা করা এবং সগীরা গোনাহ থেকে না করা ! এটা সম্ভব। কেননা, তওবাকারী জানে, কবীরা গোনাহ আল্লাহর কাছে গুরুতর। এ কারণে তিনি দ্রুত ক্রুদ্ধ হন। পক্ষান্তরে সগীরা গোনাহে ক্ষমা পাওয়ার আশা প্রবল। এই জানার কারণে এটা সম্ভব যে, সে কেবল বড় গোনাহ থেকে তওবা করবে এবং তজ্জন্য অনুতপ্ত হবে। পূর্ববর্তী যুগে অনেক তওবাকারী অতিক্রান্ত হয়েছে; অথচ তাদের মধ্যে কেউ নিষ্পাপ ছিল না। এ থেকে বুঝা যায়, তওবার জন্যে নিষ্পাপ হওয়া জরুরী নয়।


দ্বিতীয় প্রকার হল কতক কবীরা গোনাহ থেকে তওবা করা এবং কতক থেকে না করা। এটাও বাস্তবসম্মত। কেননা, মানুষ বিশ্বাস করে, কবীরা গোনাহসমূহের মধ্যে স্তরভেদ রয়েছে। কিছু কবীরা গোনাহ তীব্র এবং কিছু অপেক্ষাকৃত হাল্‌কা। উদাহরণতঃ কেউ হত্যা, লুণ্ঠন, যুলুম ও অপরের অধিকার হরণ থেকে এই মনে করে তওবা করে যে, এগুলো বান্দার হক, যা কখনও মাফ হবে না। পক্ষান্তরে আল্লাহর হক থেকে তওবা করে না এই বিশ্বাসের কারণে যে, এটা ক্ষমাযোগ্য।


তৃতীয় প্রকার হল, একাধিক সগীরা গোনাহ থেকে তওবা করা। কিন্তু কবীরা গোনাহ থেকে জানা সত্ত্বেও তওবা না করা এবং অবিচল থাকা। যেমন, কেউ মাহরাম নয়— এমন নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত অথবা গীবত থেকে তওবা করে, কিন্তু মদ্যপান থেকে তওবা করে না। এটাও সম্ভবপর। কেননা, প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তি গোনাহকে ভয় করে এবং স্বীয় কার্যকলাপের জন্যে অনুতপ্ত হয়। কেউ কম, কেউ বেশী। গোনাহে যে পরিমাণে আনন্দ পাওয়া যায়, সেই পরিমাণে ভয় কম হয়। ফলে, অধিক আনন্দদায়ক গোনাহে আনন্দ প্রবল এবং ভয় দুর্বল হয়ে থাকে। পাপাচারী ব্যক্তি কখনও এমন মাদকাসক্ত হয় যে, সবর করতে পারে না; কিন্তু গীবত, পরনিন্দা ও পরনারীর প্রতি তাকানোর খাহেশ তার মধ্যে মোটেই থাকে না। তার মধ্যে খোদাভীতি এমন থাকে, যা দ্বারা দুর্বল আগ্রহের মূলোৎপাটন করতে পারে কিন্তু প্রবল আগ্রহে পারে না। এই ভয়ের কারণে সে এমন কাজকর্ম বর্জন করে, যার প্রতি আগ্রহ কম। সে মনে মনে বলে, যদি শয়তান কতক গোনাহে আমাকে কাবু করে ফেলে, তবে তারই কাবুতে থাকা আমার জন্যে উচিত হবে না; বরং কতক গোনাহে তার সাথে জেহাদ করে আমাকে বিজয়ী হতে হবে। হয়তো এই বিজয় আমার অন্য গোনাহের জন্যে কাফ্ফারা হয়ে যাবে। পাপাচারীর মনে এই ধারণা না থাকলে তার নামায পড়া ও রোযা রাখার কারণ বোধগম্য হয় না। যদি তাকে বলা হয় : তুমি যে নামায পড়, তা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে হলে নাজায়েয, আর আল্লাহর জন্যে হলে পাপাচারকে আল্লাহর জন্যে বর্জন কর, তবে সে এর জবাবে একথাই বলবে যে, আল্লাহ আমাকে দুটি আদেশ দিয়েছেন। যদি আমি উভয়টি অমান্য করি, তবে দুটি আযাব ভোগ করতে হবে। আমি একটি আদেশ পালনের ক্ষেত্রে শয়তানকে পরাভূত করার শক্তি রাখি এবং অপরটি পালনে শয়তানকে পরাস্ত করতে অক্ষম। তাই যে বিষয়ে শক্তি আছে, সে জেহাদ করে আমি শয়তানকে ব্যর্থ করে দেই। আমি আশা করি, আল্লাহ তা'আলা এই জেহাদকে সে গোনাহের কাফফারা করে দেবেন, যাতে আমি অক্ষম। মোটকথা, এটা নিঃসন্দেহে সম্ভবপর; বরং প্রত্যেক মুসলমানের অবস্থা তাই। এমন মুসলমান কে, যার মধ্যে এবাদত ও গোনাহের সহ-অবস্থান নেই? এর কারণ উপরোক্ত বক্তব্য ছাড়া আর কিছুই নয় ।


এখানে প্রশ্ন হয়, যদি কোন ব্যক্তি যিনা করে, এরপর সে পুরুষত্ব হারিয়ে ফেলে এবং তদবস্থায় যিনা থেকে তওবা করে, তবে তার তওবা দুরস্ত হবে কি না? এর জওয়াব এই যে, তওবা দুরস্ত হবে না। কেননা, তওবা এমন অনুতাপকে বলা হয়, যা থেকে এমন কাজ বর্জন করার সংকল্প উৎপন্ন হয়, যা করার ক্ষমতা তওবাকারীর রয়েছে। আর যে কাজ করার ক্ষমতাই নেই, তা তো আপনা-আপনিই অন্তর্হিত হয়ে যায়, বর্জন করার কারণে অন্তর্হিত হয় না। হ্যাঁ, পুরুষত্ব হারানোর পর যদি সে যিনার ক্ষতি সম্পর্কে সম্যক অবগতি লাভ করে এবং তজ্জন্যে তার মধ্যে এমন দুঃখ ও অনুতাপ উথলে উঠে যে, তার মধ্যে পুরুষত্ব থাকলেও তা এই অনুতাপের সামনে পরাভূত হয়ে যেত, তবে এমতাবস্থায় আশা করা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা তাকে মাফ করে দেবেন এবং এই অনুতাপ তার কাফফারা হয়ে যাবে। সারকথা এই যে, অন্তর থেকে গোনাহের অন্ধকার দূর হওয়ার জন্যে দুটি বিষয় দরকার— এক, অনুতাপের জ্বালা এবং দুই, গোনাহ বর্জনের জন্যে ভবিষ্যতে কঠোর সাধনা। বর্ণিত ক্ষেত্রে পুরুষত্বহীনতার কারণে সাধনা হতে পারে না। কিন্তু যদি অনুতাপই এমন শক্তিশালী হয় যে, সাধনা ছাড়াই গোনাহের অন্ধকার দূর করে দেয়, তবে এটা অসম্ভব নয়। অন্যথায় বলতে হবে, তওবাকারীর তওবা তখন কবুল হয়, যখন সে তওবার পর কিছুদিন জীবিত থাকে এবং এই দিনগুলোতে কয়েকবার সেই গোনাহের ব্যাপারে নফসের বিরুদ্ধে জেহাদ করে নেয়। কিন্তু শরীয়তের কোথাও এরূপ শর্ত বুঝা যায় না। 


পরবর্তী পর্ব

তওবার ব্যাপারে মানুষের স্তরভেদ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...