রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ১৭) খাহেশের প্রতিকার



তওবা - (পর্ব - ১৭) 
খাহেশের প্রতিকার

রোগী যখন কোন ক্ষতিকর বস্তুর প্রতি অত্যধিক আগ্রহান্বিত হয়, তখন প্রথমে সে সেই বস্তুর ক্ষতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হবে। এরপর সেই বস্তুটিকে তার দৃষ্টি থেকে উধাও করে দিতে হবে। এর পরিবর্তে রোগী অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর কোন বস্তু ব্যবহার করবে, যা আকারে প্রথম বস্তুর অনুরূপ হবে। এরপর দ্বিতীয় বস্তুটিও বর্জন করবে এবং এ বর্জনে সবর করবে। মোটকথা, সবরের তিক্ততা সর্বাবস্থায় অপরিহার্য। গোনাহের প্রতি খাহেশের চিকিৎসাও এমনি ভাবে হওয়া উচিত। উদাহরণতঃ যদি কোন যুবকের কামোত্তেজনা থাকে এবং সে তার চক্ষু, অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম না হয়, তবে প্রথমে তার এই গোনাহের ক্ষতি সম্পর্কে অবহিত হওয়া উচিত। অর্থাৎ, কোরআন ও হাদীসে এ সম্পর্কে যে শাস্তিবাণী বর্ণিত রয়েছে, সেগুলো জেনে নেবে। যখন ভয় বেড়ে যাবে, তখন যে সব কারণে কামভাব উত্তেজিত হয়, সেগুলো থেকে সরে যাবে। যদি কোন কিছু দেখা অথবা সম্মুখে পাওয়ার কারণে কামভাব উত্তেজিত হয়, তবে তার চিকিৎসা সেই বস্তু থেকে পালিয়ে একান্তবাস অবলম্বন করা। আর যদি কামোত্তেজনা সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাদ্যের কারণে হয়, তবে তার চিকিৎসা ক্ষুধার্ত থাকা ও সর্বদা রোযা রাখা।


বলা বাহুল্য, উভয় চিকিৎসা সবরের মুখাপেক্ষী। সবর ভয় ছাড়া, ভয় জ্ঞান ছাড়া এবং জ্ঞান অন্তর্দৃষ্টি ও চিন্তা-ভাবনা ছাড়া অর্জিত হয় না। সুতরাং প্রথমে ওয়াযের মজলিসে হাযির হয়ে একাগ্রচিত্তে ওয়ায শ্রবণ করা উচিত। এরপর যা শুনবে, তা বুঝার জন্যে চিন্তা-ভাবনা করবে। এতে নিঃসন্দেহে ভয় সৃষ্টি হবে। ভয় প্রবল হলে তার সাহায্যে সবর অর্জিত হবে। ফলে, চিকিৎসার আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। এর সাথে সংযুক্ত হবে আল্লাহর তাওফীক।


অতএব, যে ব্যক্তি মনোযোগসহ শ্রবণ করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ ক্রমান্বয়ে তার কাজ সহজ করে দেবেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মনোনিবেশ করবে না এবং ভাল কথাকে মিথ্যা মনে করবে, আল্লাহ ক্রমান্বয়ে তার কাজ কঠিন করে দেবেন।


এখন প্রশ্ন হয় যে, উপরোক্ত বক্তব্যের সারমর্ম ঈমানে গিয়ে ঠেকে। কেননা, সবর ব্যতীত গোনাহ বর্জন করা সম্ভব নয়। সবর ভয় ছাড়া এবং ভয় জ্ঞান ছাড়া অর্জিত হয় না। জ্ঞান তখন অর্জিত হয়, যখন গোনাহের ক্ষতিকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। গোনাহের ক্ষতিকে সত্য বলে বিশ্বাস করা হুবহু আল্লাহ ও রসূলকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। এরই নাম ঈমান। অতএব সারকথা হল, যে ব্যক্তি অব্যাহত গোনাহ করে, সে এজন্যে করে যে, তার ঈমান নেই। এর জওয়াব এই যে, অব্যাহতভাবে গোনাহ করার ফলে ঈমান বিলুপ্ত হয়ে যায় না; বরং ঈমানের দুর্বলতার কারণে এ গোনাহ হয়ে থাকে। কারণ, ঈমানদার মাত্রই একথা স্বীকার করে যে, গোনাহ আল্লাহ থেকে দূরত্বের এবং পারলৌকিক শাস্তির কারণ। এরপরেও একাধিক কারণে মানুষ গোনাহ করে থাকে। 

প্রথম কারণ, যে শাস্তির কথা বলা হয়, তা অনুপস্থিত এবং অদৃশ্য। মানুষ মজ্জাগতভাবে উপস্থিত বস্তু দ্বারা যতটুকু প্রভাবিত হয়, ততটুকু অনুপস্থিত বস্তু দ্বারা হয় না। তাই প্রতিশ্রুত বিষয়ের প্রভাব মানুষের উপর উপস্থিত বিষয়ের তুলনায় দুর্বল হয়ে থাকে।


দ্বিতীয় কারণ, যে খাহেশ তথা কামভাব গোনাহের কারণ, তার আনন্দ ও স্বাদ নগদ হয়ে থাকে। নগদ আনন্দ অনাগত ভয়ের কারণে ত্যাগ করা স্বভাবতই কঠিন হয়ে থাকে। সেমতে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন : “তোমরা আসলে পার্থিব জীবনকে ভালবাস এবং পরকালকে উপেক্ষা কর।”


এ বিষয়টি হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত। বলা হয়েছে—

“অতএব, যে ব্যক্তি মনোযোগসহ শ্রবণ করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ ক্রমান্বয়ে তার কাজ সহজ করে দেবেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মনোনিবেশ করবে না এবং ভাল কথাকে মিথ্যা মনে করবে, আল্লাহ ক্রমান্বয়ে তার কাজ কঠিন করে দেবেন।”

অর্থাৎ, অপ্রিয় বিষয়সমূহ দ্বারা জান্নাতকে এবং কামনা-বাসনা দ্বারা জাহান্নামকে ঘিরে রাখা হয়েছে।

অন্য এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে—“আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম সৃষ্টি করে ফেরেশতা জিবরাঈলকে আদেশ করলেন, গিয়ে দেখে আস। জিবরাঈল জাহান্নাম পরিদর্শন করে আরয করলেন : আপনার ইযযতের কসম, যে কেউ এর অবস্থা শুনবে, সে কখনও এতে প্রবেশ করবে না। এরপর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে কামনা-বাসনা দ্বারা আবৃত করে দিলেন এবং জিবরাঈলকে আদেশ করলেন : এবার গিয়ে দেখে আস। তিনি দেখার পর আরয করলেন : আপনার ইযযতের কসম, এখন আমার আশংকা হয়, কেউ এতে প্রবেশ না করে ক্ষান্ত হবে না। এরপর জান্নাত সৃষ্টি করে জিবরাঈলকে তা দেখতে বলা হল। তিনি দেখার পর আরয করলেন : আপনার ইযযতের কসম, যে কেউ এর অবস্থা শুনবে, সে এতে প্রবেশ করতে চাইবে। এরপর আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে অপ্রিয় বিষয়াদির দ্বারা আবৃত করে জিবরাঈলকে দেখতে বললেন। তিনি দেখে আরয করলেন : এখন আমি আশংকা করি, কেউ এতে প্রবেশ করতে পারবে না । এ থেকে বুঝা গেল, কামনা-বাসনার উপস্থিতি এবং আযাব বিলম্বিত হওয়া এ দুটিই অব্যাহত গোনাহের উন্মুক্ত কারণ; যদিও মূল ঈমান বিদ্যমান থাকে। 


যে রোগী তীব্র পিপাসার কারণে বরফের পানি পান করে, সে মূল চিকিৎসা বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে না এবং পানি তার জন্যে ক্ষতিকর– এ বিষয়টিও অস্বীকার করে না। কিন্তু কামনা-বাসনা প্রবল থাকার কারণে ভবিষ্যত কষ্ট ও ক্ষতি মেনে নেয়া সহজ হয়ে যায়।


তৃতীয় কারণ, গোনাহগার মুমিন ব্যক্তি সর্বদাই তওবার ইচ্ছা পোষণ করে এবং নিজের পাপসমূহকে পুণ্যের দ্বারা মিটিয়ে দিতে চায়। কিন্তু মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার আশা প্রবল থাকার কারণে সে সর্বক্ষণ তওবা বিলম্বিত করে।


চতুর্থ কারণ, মুসলমান মাত্রই বিশ্বাস করে যে, গোনাহ এমন শাস্তির কারণ হয় না, যা মাফ হওয়া অসম্ভব। তাই সে গোনাহ করে এবং আল্লাহর কৃপার উপর ভরসা করে তা মাফ হওয়ার প্রত্যাশা রাখে।


উপরোক্ত চারটি বিষয়ই মূল ঈমান থাকা সত্ত্বেও গোনাহের কারণ হয়ে থাকে। 

হাঁ, মাঝে মাঝে পঞ্চম একটি কারণেও মানুষ গোনাহ করে থাকে, যদ্দরুন মূল ঈমানেই ত্রুটি দেখা দেয়। তা এই যে, গোনাহগার ব্যক্তি মূলত রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সত্যবাদিতায় সন্দেহ পোষণ করে। এরই নাম কুফর।


পরবর্তী পর্ব
তওবায় গড়িমসি করার চিকিৎসা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...