তওবায় গড়িমসি করার চিকিৎসা
এখন বর্ণিত পাঁচটি কারণের প্রতিকার জানা দরকার। প্রথম কারণ অর্থাৎ শাস্তি অনুপস্থিত থাকার ক্ষেত্রে চিন্তা করবে যে, যা হওয়ার তা অবশ্যই হবে। যা ভবিষ্যত তা অতীত হয়ে যায়। গভীর দৃষ্টিতে দেখলে কিয়ামত সন্নিকটবর্তী। আরও চিন্তা করবে যে, আমরা দুনিয়াতে অনাগত আশংকার কারণে বর্তমানে কষ্ট ও শ্রম স্বীকার করি। উদাহরণতঃ কখনও দরিদ্র হয়ে যাব– এই ভয়ে জল ও স্থলে সফর করি এবং অর্থ উপার্জন করি। যদি কোন বিধর্মী চিকিৎসক কোন রোগীকে বলে দেয় ঠাণ্ডা পানি তোমার জন্যে ক্ষতিকর– এতে তোমার মৃত্যু হয়ে যাবে, তবে রোগীর কাছে ঠাণ্ডা পানি সর্বাধিক সুস্বাদু হলেও মৃত্যুর ভয়ে সে তা পরিত্যাগ করবে। অথচ মৃত্যুকষ্ট এক মুহূর্তের বেশী নয়। এখন চিন্তার বিষয় একজন বিধর্মীর কথায় কিভাবে রোগী সুস্বাদু বস্তু ত্যাগ করে অথচ তার চিকিৎসা যে সত্য ও অব্যর্থ, তার উপর কোন মো'জেযা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সুতরাং সে মনে মনে বলবে- পয়গম্বরগণের উক্তি, যা মো'জেযা দ্বারা সমর্থিত, একজন বিধর্মীর উক্তির চেয়েও কম বিশ্বাসযোগ্য হবে- এটা আমার বিবেকের কাছে গ্রহণীয় নয় অথবা আমার কাছে দোযখের আযাব মৃত্যুযন্ত্রণার তুলনায় হালকা হবে– এটাও মেনে নেয়া যায় না। কিয়ামতের প্রতিটি দিন দুনিয়ার দিনসমূহের তুলনায় পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হবে।
এমনি ধরনের চিন্তাভাবনা দ্বারা দ্বিতীয় কারণেরও চিকিৎসা হতে পারে। অর্থাৎ, গোনাহ করার কারণ যদি আনন্দ উপভোগের প্রাবল্য হয়, তবে জোরপূর্বক তা পরিত্যাগ করবে এবং মনে মনে বলবে– ক্ষণস্থায়ী জীবনের আনন্দকে যখন আমি ত্যাগ করতে পারি না, তখন অনন্তকালীন আনন্দ কিরূপে বিসর্জন দেব? যদি সবরের সামান্য কষ্ট সহ্য করতে না পারি, তবে দোযখের অচিন্তনীয় কষ্ট কিরূপে সহ্য করব?
তৃতীয় কারণ অর্থাৎ তওবায় গড়িমসি করার চিকিৎসা হচ্ছে একথা চিন্তা করা যে, দোযখীরা বেশীর ভাগ এ ফরিয়াদই করবে যে, তারা তওবার সময়কে কেন বিলম্বিত করেছে? এ ছাড়া যে ব্যক্তি গড়িমসি করে, সে তার এখতিয়ার বহির্ভূত বিষয়ের উপর ভিত্তি করে এটা করে যাবে। অর্থাৎ, সে মনে করে নেয় যে, আরও অনেক দিন বাঁচবে। তখন তওবা করে নেবে। প্রশ্ন এই যে, সে জীবিত থাকবে– এটা কিরূপে জানল? তার মরে যাওয়ারও তো সম্ভাবনা রয়েছে। আর যদি জীবিতও থাকে, তবে গোনাহ ত্যাগ না করারও তো সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন এ পর্যন্ত ত্যাগ করতে পারেনি। কারণ, কামনা-বাসনার প্রাবল্য তখনও থেকে যেতে পারে; বরং বেশী দিন অভ্যাসের কারণে তা আরও মযবুত হয়ে যাবে। এসব কারণে যারা গড়িমসি করে, তারা পরিণামে ধ্বংস হয়ে যায়।
উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি একটি বৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত করতে গিয়ে দেখল যে, বৃক্ষটি বেশ মযবুত। কঠিন পরিশ্রম ছাড়া উৎপাটিত করা যাবে না। সে মনে মনে বলল, একে আরও বছর খানেক এমনিতেই রেখে দেই। এরপর উপড়ে ফেলব। সে ভাবেনি যে, যতই দিন যাবে, বৃক্ষের মূল ততই মযবুত হবে এবং সে নিজে যতই বড় হবে, ততই দুর্বল হয়ে পড়বে। দুনিয়াতে এরূপ ব্যক্তির সমান নির্বোধ কেউ হবে না। যখন তার দেহে শক্তি ছিল এবং বৃক্ষ দুর্বল ছিল, তখন সে বৃক্ষটি উপড়ায়নি; বরং এমন সময়ের জন্যে ছেড়ে দিয়েছে, যখন বৃক্ষ হবে ইস্পাতকঠিন এবং সে হবে দুর্বল।
চতুর্থ কারণ অর্থাৎ, আল্লাহর রহমতের ভরসায় গোনাহ করা– এর চিকিৎসা পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়েরই অনুরূপ যে, কেউ নিজের ধনসম্পদ ব্যয় করে নিজেকে এবং পরিবারবর্গকে নিঃস্ব করে দেয় এবং আশা করে যে, আল্লাহ তা'আলা আপন কৃপায় কোন নির্জন জায়গায় ধনভাণ্ডারের সন্ধান বলে দেবেন। এরূপ ধনভান্ডার পাওয়া যদিও সম্ভব, মাঝে মাঝে এরূপ হয়ও, কিন্তু এর উপর ভরসা করে যে নিজের ধনসম্পদ বিনষ্ট করে, সে নিরেট বোকা। এমনিভাবে গোনাহ মাফ হওয়াও সম্ভব। কিন্তু এর উপর ভরসা করা মূর্খতা।
পঞ্চম কারণ অর্থাৎ রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সত্যবাদিতায় সন্দেহ করে গোনাহ করা, এর চিকিৎসা সম্ভব। উদাহরণতঃ সন্দেহকারীকে বলা হবে— আখেরাত সম্পর্কিত যেসব বিষয়কে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) সত্য আখ্যায়িত করেছেন, সেগুলো তোমার মতে সম্ভবপর না, অসম্ভব? যদি সে উত্তরে সন্দেহের কথা জানায়, তবে তাকে বলা উচিত— যদি তুমি আপন গৃহে খাদ্যবস্তু রেখে যাও এবং কোন অচেনা ব্যক্তি এসে তোমাকে বলে : তোমার চলে যাওয়ার পর এ খাদ্যে বিষধর সর্প বিষ ছেড়ে দিয়েছে, তবে তুমি তার সত্যবাদিতায় সন্দেহ করে সেই খাদ্য খাবে, না সুস্বাদু হওয়া সত্ত্বেও ত্যাগ করবে? সে এ জবাবই দিবে যে, আমি এই খাদ্য খাব না। কারণ, আমি চিন্তা করব যদি সে মিথ্যা বলে থাকে, তবে ক্ষতি এতটুকুই হবে যে, খাদ্য খাওয়া হল না। এ ব্যাপারে সবর করা কঠিন হলেও সম্ভবপর। পক্ষান্তরে যদি সে সত্য বলে থাকে, তবে নির্ঘাত আমার মৃত্যু হবে, যা না খেয়ে সবর করার তুলনায় অত্যন্ত কঠিন।
এরপর সন্দেহকারীকে বলা হবে— সোবহানাল্লাহ, একজন অপরিচিত ব্যক্তির কথা তুমি মেনে নিতে পার, যা স্বার্থপরতার বশবর্তী হয়ে বলারও সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু মো'জেযা সমর্থিত হওয়া সত্ত্বেও পয়গম্বরের উক্তি এবং ওলী, পণ্ডিত, দার্শনিক ও সকল সুধী ব্যক্তির বাণী মেনে নিতে তোমার আপত্তি। মূর্খদের সাথে আমাদের কোন কথা নেই। যারা বুদ্ধিমান, তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে কিয়ামতে বিশ্বাস করে না এবং সওয়াব ও আযাবকে সঠিক মনে করে না- যদিও এগুলোর অবস্থা ও প্রকারভেদে মতানৈক্য রয়েছে। যদি তারা সত্যবাদী হয়, তবে তুমি অনন্তকাল আযাব ভোগ করবে। আর যদি তাদের কথা মিথ্যা হয়, তবে তোমার কোন ক্ষতি হবে না; কেবল কতিপয় কামনা-বাসনা থেকে তুমি এ দুনিয়াতে বঞ্চিত থাকবে।
আমাদের এই আলোচনা হযরত আলী (রাঃ)-এর উক্তির অনুরূপ তিনি আখেরাতের ব্যাপারে সন্দেহকারী জনৈক ব্যক্তিকে বলেছিলেন : যদি তোমার কথা ঠিক হয়, তবে আমরা ও তুমি সকলেই বেঁচে যাব। পক্ষান্তরে আমাদের বিশ্বাস সঠিক হলে আমরা রক্ষা পাব এবং তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।
(সমাপ্ত)
প্রথম পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন