মহব্বত (পর্ব- ৫)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
মহব্বত ও মারেফতে মানুষের বিভিন্ন অবস্থা -
সকল ঈমানদার ঈমানে অভিন্ন হলেও মহব্বতে বিভিন্ন। কেননা, দুনিয়াতে মহব্বত ও মারেফত বিভিন্ন হয়ে থাকে। অধিকাংশ মানুষ আল্লাহ তা'আলার নামসমূহ ও গুণাবলীর মধ্য থেকে যা শুনে, তাই শিখে মুখস্থ করে নেয়। এর বেশী তারা কিছু জানে না। কেউ কেউ এসব নাম ও গুণের অর্থ এমন কল্পনা করে, যা থেকে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র। বলা বাহুল্য, এরা পথভ্রষ্ট। আবার কেউ কেউ বাস্তব বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয় না এবং এসবের কোন অসার অর্থ কল্পনা করে না; বরং সরলভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং যাবতীয় আলোচনা থেকে আত্মরক্ষা করে।সত্যি বলতে কি, এরাই “আসহাবে ইয়ামীন”! আর যারা প্রত্যেক নাম ও গুণের স্বরূপ সম্পর্কে যথার্থ অবগতি লাভ করে, তারা নৈকট্যশীল। আল্লাহ তা'আলা এই তিন প্রকার মানুষের কথা এ আয়াতে বর্ণনা করেছেন : “যদি তারা হয় নৈকট্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত, তবে তাদের জন্যে রয়েছে সুখ, রূযী ও নেয়ামতের বাগান। আর যদি তারা হয় আসহাবে ইয়ামীনদের অন্তর্ভুক্ত, তবে তাদের তরফ থেকে আপনার প্রতি সালাম। আর যদি তারা হয় পথভ্রষ্ট মিথ্যারোপকারীদের অন্তর্ভুক্ত, তবে তাদের আপ্যায়ন করা হবে উত্তপ্ত পানির দ্বারা এবং প্রবেশ করানো হবে জাহান্নামে।”
এক্ষণে আমরা একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে মহব্বতের বিভিন্নতা ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস পাব।উদাহরণতঃ শাফেঈ মতাবলম্বীরা হযরত ইমাম শাফেঈকে মহব্বত করে। এ মহব্বতে ফেকাহবিদ, আলেম ও জনসাধারণ সকলেই অংশীদার। কারণ, তাঁর জ্ঞান-গরিমা, ধর্মপরায়ণতা, সচ্চরিত্রতা ও প্রশংসনীয় স্বভাব সম্পর্কে সবাই অবগত।কিন্তু সকলের অবগতি সমান নয়।জনসাধারণ তাঁর গুণ-গরিমা সংক্ষেপে এবং ফেকাহবিদগণ বিস্তারিতভাবে জানে।এ কারণে ফেকাহবিদদের মহব্বতও জনসাধারণের তুলনায় অনেক বেশী হবে। এমনিভাবে গোটা এ বিশ্ব আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি ও কারিগরীর জ্বলন্ত নমুনা। সাধারণ মানুষ এ বিষয়টি কেরল বিশ্বাস করে এবং এ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। কিন্তু অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ এ সম্পর্কে বিস্তারিত ওয়াকিফহাল। এমনকি, তারা সামান্য একটি মাছির ভেতরে এমন সব আশ্চর্য নিদর্শন দেখে, যা শুনে জ্ঞান-বুদ্ধি হতবাক হয়ে যায়। একারণেই তাদের অন্তরে আল্লাহ তা'আলার মাহাত্ম্য, প্রতাপ ও পূর্ণতার গুণাবলী অধিক পরিমাণে জাগরূক থাকে। ফলে, তাদের মহব্বতও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে।
মহব্বতের যে পাঁচটি কারণ আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি, সেগুলোর পার্থক্যের কারণে মহব্বতে পার্থক্য হয়ে থাকে। উদাহরণতঃ যদি কেউ আল্লাহ তা'আলাকে এ কারণে মহব্বত করে যে, তিনি অনুগ্রহকারী ও নেয়ামতদাতা, তবে তার এই মহব্বত হবে দুর্বল। কেননা, অনুগ্রহের পরিবর্তনে এ মহব্বত পরিবর্তন অনিবার্য। ফলে, বিপদাপদে পতিত হওয়ার সময় এ মহব্বত তেমন থাকে না, যেমন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় থাকে। আর যদি কোন ব্যক্তি এ কারণে মহব্বত রাখে যে, আল্লাহর পবিত্র সত্তা মহব্বতেরই যোগ্য, সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্য সকলই তাঁর অর্জিত রয়েছে, তবে তার মহব্বত অনুগ্রহের পরিবর্তনের কারণে কখনও পরিবর্তিত হবে না; বরং সদাসর্বদা একই রূপ থাকবে। মোটকথা, এসব কারণে আল্লাহ তা'আলার মহব্বতে মানুষের অবস্থা বিভিন্ন হয় এবং এই বিভিন্নতার ভিত্তিতে পারলৌকিক সৌভাগ্যে পার্থক্য হয়।
পরবর্তী পর্ব
আল্লাহর মারেফতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির ত্রুটি
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন