এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
আল্লাহর প্রতি অনুরাগের অর্থ -
পূর্বেই লিখিত হয়েছে, অনুরাগ, ভীতি ও আগ্রহ মহব্বতের অন্যতম ফল। কিন্তু এসব ফল অবস্থা ভেদে বিভিন্নরূপ হয়ে থাকে। যখন মহব্বতকারী আল্লাহর প্রতাপ ও সৌন্দর্য হৃদয়ঙ্গম করার ব্যাপারে নিজের অক্ষমতা বুঝে নেয় এবং অবস্থাটি প্রবল হয়ে দেখা দেয়, তখন অন্তর তাঁর অন্বেষণে উত্তেজিত থাকে। অন্তরের এই উত্তেজনাকে ‘শওক’ তথা আগ্রহ বলা হয়। যখন মহব্বতকারীর উপর খোদায়ী সৌন্দর্য ও নৈকট্যের আনন্দ প্রবল হয়, তখন অন্তরের এই আনন্দ ও খুশীর ভাবকে ‘উন্স’ তথা অনুরাগ বলা হয়। মহব্বতকারীর দৃষ্টি কখনও মাহবুবের শক্তি, অমুখাপেক্ষিতা, বেপরওয়াভাব ইত্যাদি গুণাবলীর প্রতি নিবদ্ধ থাকে এবং এগুলো জানার কারণে মনে ব্যথা থাকে। অন্তরে এ ধরনের দুঃখের ভাব প্রবল হয়ে গেলে তাকে বলা হয় ‘খওফ’ তথা ভীতি। যার মধ্যে অনুরাগ প্রবল, সে নির্জনতাপ্রিয় হয়ে থাকে। এ কারণেই হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম পাহাড় থেকে অবতরণ করলে কেউ প্রশ্ন করল : আপনি কোত্থেকে আসছেন? তিনি জবাব দিলেন : আল্লাহর প্রতি অনুরাগ থেকে।
যে আল্লাহর প্রতি অনুরাগী হয়, গায়রুল্লাহর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হওয়া তার জন্যে অপরিহার্য। বর্ণিত আছে, হযরত মূসা (আঃ) যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে বাক্যালাপ করেন, তখন কিছুদিন পর্যন্ত মানুষের কথাবার্তা শুনে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়তেন। এর কারণ, মাহবুবের কথা ও তাঁর প্রতি অনুরাগ এত মিষ্ট যে, অন্য বস্তুর মিষ্টতা অন্তর থেকে সম্পূর্ণ বিদূরিত হয়ে যায়। সেমতে আল্লাহ তা'আলা হযরত দাউদ (আঃ)-এর প্রতি ওহী করেন– “হে দাউদ, আমারই আগ্রহী এবং আমারই প্রতি অনুরাগী হোন। অন্যের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হোন।
আবদুল ওয়াহেদ ইবন যায়দ বলেন-
আমি জনৈক দরবেশের কাছে গিয়ে বললাম : তুমি খুব নির্জনতা পছন্দ কর?
সে বলল : মিঞা সাহেব, আপনি যদি নির্জনতার স্বাদ আস্বাদন করেন, তবে নিজেকেও ঘৃণা করতে শুরু করবেন। নির্জনতাই তো এবাদতের মূল শিকড়।
আমি শুধালাম : তুমি নির্জনতার সর্বনিম্ন উপকার কি পেয়েছ?
সে বলল : মানুষের তোষামোদ থেকে মুক্তি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা।
আমি বললাম : মানুষ আল্লাহ তা'আলার প্রতি অনুরাগের মিষ্টতা কখন পায়?
সে বলল : যখন মহব্বত পরিষ্কার এবং আদান-প্রদান খাঁটি হয়।
আমি শুধালাম : মহব্বত কখন পরিষ্কার হয়?
সে বলল : যখন এবাদতে কোন চিন্তা অবশিষ্ট না থাকে।
আল্লাহর প্রতি অনুরাগের বিশেষ আলামত হচ্ছে জনকোলাহলে অস্বস্তিবোধ করা এবং খোদায়ী এবাদতের মিষ্টতা আস্বাদনে তীব্র লোভী হওয়া। এমতাবস্থায় অনুরাগী ব্যক্তি মানুষের সাথে মেলামেশা করলেও এমনভাবে করবে যেন সে জনসমাবেশের মধ্যেও একা। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : অনুরাগী ব্যক্তিরা কেবল দৈহিকভাবে দুনিয়াকে সঙ্গ দেয়। তাঁদের আত্মা উচ্চতম প্রাসাদে নিবদ্ধ। তারা পৃথিবীতে আল্লাহ তা'আলার নায়েব এবং তাঁর ধর্মের প্রতি আহ্বায়ক।
অনুরাগের প্রাবাল্য

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন