শনিবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৩

মহব্বত (পর্ব- ১১) অনুরাগের প্রাবাল্য



মহব্বত (পর্ব- ১১)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অনুরাগের প্রাবাল্য -
অনুরাগ যখন স্থায়ী, প্রবল ও মযবুত হয়ে যায়, তখন তা মোনাজাতে এক প্রকার সন্তুষ্টি ও খোলাখুলি ভাব সৃষ্টি করে, যা মাঝে মাঝে বাহ্যত মন্দ হয়ে থাকে। কারণ, এতে থাকে দুঃসাহস ও নির্ভীকতা। কিন্তু যে ব্যক্তি অনুরাগের স্তরে অবস্থান করে, তার এই খোলাখুলি ভাব সহ্য করে নেওয়া হয়। আর যে ব্যক্তি এই স্তরে অবস্থান না করে কথায় ও কাজে অনুরাগীদের ন্যায় সাহসিকতা দেখায়, সে ধ্বংস হয়ে যায় এবং কুফরের কাছাকাছি চলে যায়। বরখে আসওয়াদের মোনাজাত এর দৃষ্টান্ত। তার সম্পর্কে হযরত মূসা (আঃ)-কে আদেশ করা হয় যে, বনী ইসরাঈলের নিমিত্ত বৃষ্টির দোয়া জন্যে তাকে অনুরোধ কর।
বরখে আসওয়াদের কাহিনী নিম্নরূপ :
বনী ইসরাঈলের দেশে সাত বছর পর্যন্ত অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ বিরাজ করলে হযরত মূসা (আঃ) সত্তরজন লোককে সঙ্গে নিয়ে বৃষ্টির দোয়া করতে বের হন এবং দোয়া করেন। প্রত্যুত্তরে আল্লাহ তা'আলা এই মর্মে ওহী পাঠালেন–
"যারা গোনাহে আচ্ছন্ন, আন্তরিকভাবে পাপিষ্ঠ, বিশ্বাস ছাড়াই দোয়া করে এবং আমার আযাবকে ভয় করে না, তাদের দোয়া আমি কেমন করে কবুল করব?
আপনি আমার এক বান্দার কাছে যান। যার নাম বরখ। তাকে বলুন বাইরে এসে বৃষ্টির জন্যে দোয়া করতে, যাতে আমি কবুল করি।"
হযরত মূসা (আঃ) বরখের খোঁজ নিলে কেউ তার সন্ধান দিতে পারল না। একদিন তিনি জনৈক হাবশী গোলামকে পথিমধ্যে দেখতে পেলেন। তার চক্ষুদ্বয়ের মাঝখানে সেজদার ধূলি লেগেছিল এবং গলায় একটি চাদর জড়ানো ছিল। তিনি খোদা প্রদত্ত নূরের মাধ্যমে তাকে চিনলেন এবং নাম জিজ্ঞেস করলেন : সে বলল : আমার নাম বরখ। হযরত মূসা (আঃ) বললেন : আমি তো দীর্ঘদিন ধরে তোমাকেই খুঁজছি। আমার সঙ্গে চল এবং বৃষ্টির জন্যে দোয়া কর। বরখ তার সঙ্গে বের হল এবং এভাবে দোয়া করল :
"এলাহী, এটা তোমার কাজও নয়, হুকুমও নয়। তোমার কি হল যে, অনাবৃষ্টি সৃষ্টি করে রেখেছ? তোমার নিকটস্থ নদী-নালা শুকিয়ে গেছে কি? না বায়ু তোমার আনুগত্য স্বীকার করছে না? না গোনাহগারদের প্রতি তোমার ক্রোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে? গোনাহগারদের সৃষ্টি করার পূর্বে তুমি ক্ষমাকারী ছিলে না কি? তুমিই তো রহমত সৃষ্টি করেছ এবং অনুগ্রহের আদেশ করছ। এখন কি আমাদেরকে দেখাচ্ছ যে, তোমার কাছ পর্যন্ত কেউ পৌঁছতে পারে না?"
মোটকথা, সে দোয়ার মধ্যে.এমনি ধরনের উচিত-অনুচিত কথাবার্তা বলতে লাগল। অবশেষে বৃষ্টি বর্ষিত হল এবং বনী ইসরাঈল সিক্ত হয়ে গেল। আল্লাহ তা'আলার আদেশে ঘাস গজিয়ে উঠল এবং দ্বিপ্রহর অবধি উরু পর্যন্ত উঁচু হয়ে গেল। এরপর বরখ স্বস্থানে চলে গেল। পরবর্তী সময়ে মূসা (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাত হলে সে বলল : আমি আমার রবের সঙ্গে কেমন বিবাদ করেছি ! তিনি আমার সাথে ইনসাফ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা মূসা (আঃ)-এর কাছে ওহী পাঠালেন–“বরখ আমাকে দিনে তিনবার হাসায়”।
হযরত হাসান বর্ণনা করেন- একবার বসরায় অগ্নিকাণ্ডে অনেক কুঁড়েঘর ভস্মীভূত হয়ে গেল ; কিন্তু সেগুলোর মাঝে একটি কুঁড়েঘর সম্পূর্ণ অক্ষত রয়ে গেল। তখন বসরার গভর্নর ছিলেন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)। তিনি এই অভূতপূর্ব ঘটনার সংবাদ পেয়ে সে কুঁড়েঘরের মালিককে ডেকে পাঠালেন। দেখা গেল সে একজন অশীতিপর বৃদ্ধ। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন : ব্যাপার কি? তোমার কুঁড়েঘর জ্বলেনি কেন? সে বলল : আমি আমার ঘরটি ভস্মীভূত না করার জন্যে আল্লাহ তা'আলাকে কসম দিয়েছিলাম। হযরত আবু মূসা (রাঃ) বললেন : আমি রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)- উনি বলতে শুনেছি,-
"আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোক হবে, যাদের মাথার কেশ থাকবে বিক্ষিপ্ত এবং পোশাক হবে মলিন। কিন্তু তারা আল্লাহ তা'আলাকে কোন বিষয়ে কসম দিলে আল্লাহ তা বাস্তবায়িত করে দেখাবেন।"
হযরত হাসান (রঃ) থেকে আরও বর্ণিত আছে, বসরায় একবার অগ্নিকাণ্ড ঘটলে আবু ওবায়দা খাওয়াস সেখানে আগমন করলেন এবং আগুনের উপর চলতে লাগলেন। বসরার শাসনকর্তা আরয করলেন : দেখুন, আপনি জ্বলে না যান। তিনি বললেন : আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আগুনে না জ্বালানোর জন্যে আমি আল্লাহ পাককে কসম দিয়ে রেখেছি। শাসনকর্তা বললেন : তাহলে আগুনকেও নিভে যাওয়ার জন্যে কসম দিন। তিনি আগুনকে কসম দিলেন এবং তা নিভে গেল।
একদিন আবু হাফস (রঃ) পথ চলছিলেন, এমন সময় এক ধোপা সামনে এল। সে প্রকৃতিস্থ ছিল না। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার উপর কি বিপদ এল? সে বলল : আমার একমাত্র সম্বল গাধাটি হারিয়ে গেছে। এখন আমি কি করি? একথা শুনে আবু হাফস থেমে গেলেন এবং আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরয করলেনঃ তোমার ইযযত ও প্রতাপের কসম, আমি এক পা-ও সামনে এগুব না যে পর্যন্ত তুমি এই ব্যক্তির গাধা তার কাছে পৌছিয়ে না দেবে। একথা বলার সাথে সাথে গাধা সেখানে এসে দাঁড়িয়ে গেল। অতঃপর তিনি সামনে এগুলেন। এগুলো হচ্ছে অনুরাগীদের কর্মকাণ্ড। অন্যদের এরূপ করার অধিকার নেই।
হযরত জুনায়দ বাগদাদী (রহঃ) বলেন : অনুরাগীরা তাদের কথাবার্তায় ও নির্জন মোনাজাতে এমন সব কথা বলেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে কুফর হয়ে থাকে। তারা এগুলো শুনলে অনুরাগীদেরকে সোজা কাফের বলতে শুরু করবে। অথচ এসব বিষয়ে অনুরাগীরা নিজেদের উন্নতি অনুভব করেন। তাদের জন্যেই এসব কথাবার্তা শোভনীয় – অন্যদের জন্যে নয়।
এমনটাও অসম্ভব নয় যে, একই কথার কারণে আল্লাহ তা'আলা এক বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন এবং অন্য বান্দার প্রতি অসন্তুষ্ট। যদি উভয়ের অবস্থান তথা মকাম ভিন্ন ভিন্ন হয়। অন্তর্দৃষ্টি থাকলে কোরআন পাকে এ বিষয়ে অনেক ইশারা-ইঙ্গিত রয়েছে। বলা বাহুল্য, কোরআন পাকের সমস্ত কিস্সা-কাহিনী অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছে শিক্ষা গ্রহণের অমূল্য ইশারা-ইঙ্গিত ছাড়া কিছু নয়। আর যারা স্বল্পবুদ্ধি তাদের কাছে এগুলো নিছক কিসসা-কাহিনী। উদাহরণতঃ প্রথম কিস্সা হচ্ছে হযরত আদম (আঃ) ও অভিশপ্ত ইবলীসের। গোনাহ্ ও বিরুদ্ধাচরণে তারা উভয়েই অংশীদার ছিলেন। কিন্তু যে গোনাহের পর ইবলীস রহমত থেকে বিতাড়িত হল এবং অভিশাপের বেড়ি গলায় পরল, সে গোনাহের পরই হযরত আদম (আঃ) সম্পর্কে এরশাদ হল–“আদম তার পালনকর্তার অবাধ্যতা করল। ফলে, সে পথভ্রষ্ট হল। অতঃপর তার পালনকর্তা তাকে মনোনীত করলেন, তার তওবা কবুল করলেন এবং তাকে পথপ্রদর্শন করলেন।
আল্লাহ তা'আলা রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে এক বান্দার প্রতি মনোনিবেশ করা ও অন্য বান্দা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণে ভর্ৎসনা করেছেন। অথচ তারা উভয়েই ছিল আল্লাহর বান্দা ; কিন্তু তাদের অবস্থান ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এরশাদ হয়েছে - “যে আপনার কাছে সোৎসাহে ও ভয়ার্তচিত্তে আসল, আপনি তাকে অবজ্ঞা করলেন। আর অন্য বান্দা সম্পর্কে বলা হয়েছে – “যে বিত্তশালী, আপনি তার প্রতি মনোযোগী।
অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে এক শ্রেণীর লোকের সাথে বসতে বলা হয়েছে এবং অন্য একশ্রেণীর লোকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আয়াতে আছে -
>“যারা আমার আয়াতসমূহে বিশ্বাস স্থাপন করে, তারা যখন আপনার কাছে আসে, তখন আপনি বলুন, তোমাদের প্রতি সালাম।”
আরও এরশাদ হয়েছে :
>”আপনি নিজেকে তাদের সাথে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যায় সন্তুষ্টি কামনা করে তাদের পালনকর্তাকে ডাকে।”
অন্য এক আয়াতে এভাবে বলা হয়েছে :
>”যারা আমার আয়াত সম্পর্কে প্রলাপোক্তি করে, আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, তখন তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কথায় প্রলাপোক্তি করে। যদি শয়তান আপনাকে ভুলিয়ে দেয়, তবে স্মরণ হওয়ার পর পাপাচারী সম্প্রদায়ের সাথে বসবেন না।”
এমনিভাবে কোন কোন বান্দার পক্ষ থেকে মহব্বতের ছলনা ও গর্ব সহ্য করা হয় এবং কোন কোন বান্দার তরফ থেকে সহ্য করা হয় না। উদাহরণত : হযরত মূসা (আঃ) অনুরাগের আনন্দের ছলে আরয করেছিলেন :
“এগুলো সব তো আপনার পরীক্ষা, যা দ্বারা যাকে ইচ্ছা গোমরাহ করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ দেখান।
যখন হযরত মূসা (আঃ)-কে ফেরাউনের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়, তখন তিনি জওয়াবে ওযর স্বরূপ বললেন : আমার বিরুদ্ধে তাদের একটি অপরাধের দাবী আছে। তাই আমার আশংকা হয়, তারা আমাকে হত্যা করবে। এ ধরনের জওয়াব মূসা (আঃ) ছাড়া অন্যের মুখ দিয়ে বের হলে তা বে-আদবী বলে গণ্য হবে। তবে অনুরাগের স্তরে অবস্থানকারীর প্রতি নম্রতা করা হয়।
অপরদিকে হযরত ইউনুস (আঃ) অনুরাগের স্তরে ছিলেন না। তাই তাঁর তরফ থেকে এর চেয়ে কম অভিমানকেও বরদাশত করা হয়নি এবং তাঁকে শাস্তিস্বরূপ মাছের পেটে বন্দী করা হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর জন্যে এই ঘোষণা হয়ে যায় :
>”যদি তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে নেয়ামত তাকে সামাল না দিত, তবে সে নিন্দিত হয়ে জনশূন্য প্রান্তরে নিক্ষিপ্তই হয়েছিল।”
হযরত হাসান বলেন : এখানে ‘জনশূন্য প্রান্তর’ হল কিয়ামত।
আমাদের রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে তার অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে–
>”অতএব আপনি ধৈর্যধারণ করুন আপনার পালনকর্তার নির্দেশের অপেক্ষায় এবং মৎস্যওয়ালা ইউনুসের মত অধৈর্য হবেন না। সে বিষাদগ্রস্ত অবস্থায় ডাক দিয়েছিল”।

পরবর্তী পর্ব
রিযার স্বরূপ ও ফযীলত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...