শুক্রবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৩

মহব্বত (পর্ব- ৮) আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি আগ্রহের প্রমাণ





 মহব্বত (পর্ব- ৮)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি আগ্রহের প্রমাণ -
অসংখ্য হাদীস ও মনীষীগণের উক্তিতেও আল্লাহ তা'আলার প্রতি আগ্রহের প্রমাণ পাওয়া যায়। সেমতে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) থেকে এ দোয়া বর্ণিত আছে :
>“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি আপনার আদেশের পর সম্মতি, মৃত্যুর পর সুখী জীবন, আপনার প্রিয় মুখমন্ডলের প্রতি দৃষ্টিপাত এবং আপনার সাক্ষাতের প্রতি আগ্রহ।”
হযরত আবুদ্দারদা (রঃ) হযরত কা'ব আহবারকে বললেন : আমাকে তাওরাতের কোন একটি আয়াত শুনাও। তিনি বললেন : “আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন- সজ্জনগণ আমার সাক্ষাতের প্রতি খুব আগ্রহ দেখায়, আর আমি তাদের সাক্ষাতের প্রতি অধিক আগ্রহী।” তিনি আরও বললেন : তাওরাতে এই আয়াতের কাছাকাছি আরও উল্লিখিত আছে,-
>“যে ব্যক্তি আমাকে অন্বেষণ করবে, সে আমাকে পাবে। আর যে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে অন্বেষণ করবে, সে আমাকে পাবে না।”
হযরত আবুদ্দারদা বললেন : “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনাকেও এরূপ বলতে শুনেছি।”
বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা হযরত দাউদ (আঃ)-কে বললেনঃ “হে দাউদ, পৃথিবীর অধিবাসীদেরকে শুনিয়ে দিন, যে আমাকে মহব্বত করবে, আমি তার হাবীব। যে আমার কাছে বসবে, আমি তার সহচর। যে আমার যিকর দ্বারা প্রীতি অর্জন করবে, আমি তার প্রিয়জন। যে আমার সাথে থাকবে, আমি তার সাথী। যে আমাকে অবলম্বন করবে, আমি তাকে অবলম্বন করব। যে আমার কথা মানবে, আমি তার কথা মানব। যে আমাকে মহব্বত করে, তার মহব্বত আমার খুব জানা হয়ে যায়। ফলে, আমি তাকে নিজের জন্যে কবুল করে নিই। তাকে এমন মহব্বত করি, আমার সৃষ্টির কেউ তার উপর অগ্রণী থাকে না। যে আমাকে সত্যি সত্যি অন্বেষণ করে, সে আমাকে পায়। আর যে অন্যকে অন্বেষণ করে, সে আমাকে পায় না।”
হে পৃথিবীর অধিবাসীরা, তোমরা এখন দুনিয়ার মাধ্যমে প্রতারিত হচ্ছ। একে পরিত্যাগ কর এবং আমার সম্মান, সংসর্গ ও সান্নিধ্যের দিকে অগ্রসর হও আমার সাথে বন্ধুত্ব কর, আমি তোমাদের সাথে বন্ধুত্ব করব। কেননা, আমি আমার বন্ধুদের খমীর ইবরাহীম খলীলুল্লাহ, মূসা কলীমুল্লাহ এবং মুহাম্মদ সফীউল্লাহর খমীর থেকে তৈরী করেছি। আমি আমার প্রতি আগ্রহীদের অন্তর নিজের নূর দ্বারা নির্মাণ করেছি এবং আমার প্রতাপ দ্বারা তাদেরকে লালিত করেছি।”
জনৈক বুযুর্গ বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা জনৈক সিদ্দীককে প্রত্যাদেশ করেন যে, আমার কিছু সংখ্যক বিশিষ্ট বান্দা আমার সাথে মহব্বতের সম্পর্ক রাখে, আমিও তাদের সাথে মহব্বতের সম্পর্ক রাখি। তারা আমার প্রতি আগ্রহী, আমিও তাদের প্রতি আগ্রহী। তারা আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাদেরকে স্মরণ করি। তারা আমার দিকে তাকায়, আমিও তাদের দিকে তাকাই। যদি তুমিও তাদের পদাংক অনুসরণ কর, তবে আমি তোমাকে মহব্বত করব। আর যদি তাদের পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমি তোমার প্রতি ক্রুদ্ধ হব!
সিদ্দীক ব্যক্তি আরয করলেন : ইলাহী, আপনার এই সকল বান্দার পরিচয় কি?
এরশাদ হল-
“তারা দিনের বেলায় ছায়ার প্রতি এমন উৎসুক থাকে, যেমন- রাখাল তার ছাগলের প্রতি উৎসুক থাকে। তারা সূর্যাস্তের জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে; যেমন পশুপাখি সন্ধ্যায় তাদের বাসায় ফেরার জন্যে আগ্রহী হয়। অতঃপর যখন রাত এসে যায়, অন্ধকার গাঢ় হয়ে যায়, শয্যা বিছানো হয়, রহস্য উন্মোচিত এবং দোস্ত দোস্তের সাথে মিলিত হয়, তখন তারা আমার উদ্দেশে পা বাড়ায়, কপাল বিছায়, আমার কালামের মাধ্যমে আমার কাছে মোনাজাত করে এবং আমার নেয়ামতের উপর আমাকে খোশামোদ করে। তাদের কেউ চিৎকার করে, কেউ কান্নাকাটি করে এবং কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তাদের কেউ আগ্রহী হয়ে দাঁড়ানো, কেউ বসা, কেউ রুকুকারী, কেউ সেজদাকারী। তারা আমার কারণে যা যা সহ্য করে এবং আমার কাছে অভিযোগ করে, তা সমস্তই গ্রহণ করে নিই। সর্বপ্রথম আমি তাদেরকে তিনটি বস্তু দান করব।
(১) আমার নূর তাদের অন্তরে ঢেলে দেব। ফলে তারা আমার অবস্থা বর্ণনা করবে; যেমন আমি তাদের অবস্থা সম্পর্কে খবর দেই।
(২) নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে, যদি সবই তাদের মোকাবেলা করে, তবে আমি তাদের খাতিরে এগুলোকে কম মনে করব।
(৩) আমি আমার পবিত্র মুখমণ্ডল তাদের দিকে ফিরিয়ে দেব। তুমি তো জান, আমি যার দিকে মুখ করি, তাকে কত কিছু দেই!
হযরত দাউদ (আঃ) -এর ঘটনাবলীতে আরও উল্লিখিত আছে, আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে তাঁকে বললেন : হে দাউদ, জান্নাতকে কত স্মরণ করবেন অথচ আমার কাছে আসার প্রতি আগ্রহের আবেদন করবেন না? হযরত দাউদ (আঃ) আরয করলেন : ইলাহী, আপনার প্রতি আগ্রহী কারা? এরশাদ হল, তারা আমার আগ্রহী, যাদেরকে আমি সর্বপ্রকার মলিনতা থেকে পবিত্র করে দিয়েছি এবং ভয় সম্পর্কে অবহিত করেছি। তাদের অন্তরে আমার দিকে ছিদ্র করে দিয়েছি। সেই ছিদ্রপথে তারা আমাকে দেখে। আমি তাদের অন্তরকে হাতে নিয়ে আকাশের উপর রাখি। এরপর শ্রেষ্ঠ ফেরেশতাদেরকে ডাকি। তারা সমবেত হয়ে আমাকে সেজদা করে। তখন আমি তাদেরকে বলি : আমি তোমাদেরকে সেজদার জন্য ডাকিনি; বরং আমি তোমাদেরকে আমার প্রতি আগ্রহীদের নিষ্কলুষ অন্তর দেখাতে চাই এবং তাদের নিয়ে গর্ব করতে চাই। তাদের অন্তর আকাশে ফেরেশতাদেরকে এমন নূর দান করে, যেমন সূর্য পৃথিবীবাসীকে কিরণ দান করে। হে দাউদ, আমি আগ্রহীদের অন্তর আপন “রেযা” দ্বারা তৈরী করেছি। নিজের চেহারার নূর দ্বারা তাদের লালন করেছি। তাদের দেহকে পৃথিবীতে আমার লক্ষ্যস্থল নির্ধারণ করেছি। তারা অন্তরের পথ দিয়ে আমাকে দেখে এবং তাদের আগ্রহ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়।
হযরত দাউদ আরয করলেন : ইলাহী, আপনার আশেকদের সাথে আমার সাক্ষাত ঘটিয়ে দেন। আদেশ হলঃ লেবাননের পাহাড়ে চলে যান। সেখানে চৌদ্দজন লোকের সাক্ষাত পাবেন। তাদের মধ্যে রয়েছে যুবক, বৃদ্ধ ও প্রৌঢ় সকল প্রকার লোক। তাদের কাছে পৌঁছে আমার সালাম বলে বলবেন যে, আল্লাহর কাছে তোমরা নিজেদের প্রয়োজন ব্যক্ত করো না কেন? তোমাদের পালনকর্তা সালাম জানিয়ে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করছেন- তোমরা তো আমার বন্ধু, মনোনীত ও ওলী। আমি তোমাদের আনন্দে আনন্দিত হই এবং তোমাদের মহব্বতের দিকে অগ্রগামী হই।
হযরত দাউদ (আঃ) নির্দেশ অনুযায়ী লেবানন পাহাড়ে গিয়ে তাদেরকে (১৪ ওলি) একটি ঝরণার কাছে আল্লাহ্ তা'আলার মাহাত্ম্য ঘোষণায় রত দেখলেন। তারা হযরত দাউদ (আঃ)-কে দেখেই প্রস্থানোদ্যত হলেন। হযরত দাউদ (আঃ) বললেন : ভাইসব, আমি আল্লাহর রসূল। তাঁর একটি পয়গাম নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছি। অতঃপর তারা তাঁর দিকে মুখ করে কান পেতে শুনতে লাগলেন। হযরত দাউদ (আঃ) বলতে লাগলেন : আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে এই পয়গাম দিচ্ছেন, তোমরা তোমাদের নিজ নিজ প্রয়োজন তাঁর কাছে ব্যক্ত করবে, তাঁকে ডাকবে, যাতে তিনি তোমাদের কণ্ঠস্বর শুনেন। তোমরা তাঁর বন্ধু ও ওলী। তোমাদের খুশীতে তিনি খুশী হন। স্নেহময়ী জননী যেমন তার সন্তানদের দেখাশুনা করে, তেমনি তিনি প্রতি মুহূর্তে তোমাদের দেখাশুনা করেন।
একথা শুনে তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। তাদের প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা দোয়া করল।
(১) বৃদ্ধ দোয়ায় বলল : ইলাহী, আমরা আপনার বান্দা এবং বান্দার সন্তান-সন্ততি। অতীত জীবনে আমরা যে পরিমাণ আপনাকে স্মরণ করিনি, আমাদেরকে সে পরিমাণ ক্ষমা করুন।
(২) দ্বিতীয় জন বলল : ইলাহী, আপনি পবিত্র। আমরা দাসানুদাস। আপনার মধ্যে ও আমাদের মধ্যে যে ব্যাপার রয়েছে তাতে সুদৃষ্টি দান করুন।
(৩) তৃতীয় জন বলল ; আপনি পবিত্র। আমরা কি আপনার কাছে দোয়া করার দুঃসাহস করব? আপনি জানেন, আমাদের নিজের কোন প্রয়োজন নেই। তবে সর্বদা আপনার পথে প্রতিষ্ঠিত থাকার তৌফিক দান করুন। এতটুকু অনুগ্রহ আমাদের প্রতি করুন।
(৪) চতুর্থ ব্যক্তি বলল : ইলাহী, আপনার সন্তুষ্টি অন্বেষণে আমরা ত্রুটি করেছি। আপনি নিজের কৃপায় এ কাজে আমাদের সাহায্য করুন।
(৫) পঞ্চম ব্যক্তি বলল : আল্লাহ, আপনি আমাদেরকে বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার মাহাত্ম্য সম্পর্কে চিন্তা করার গৌরব দান করেছেন। অতএব, যে ব্যক্তি আপনার মাহাত্ম্যে মশগুল, সে কি আপনার সাথে কথা বলার ধৃষ্টতা দেখাতে পারে? আপনি আমাদেরকে আপন নূরের নিকটবর্তী করুন- এটাই ছিল আমাদের মকছদ।
(৬) ষষ্ঠ ব্যক্তি বলল : ইলাহী, আপনি মহান। আপনি আপনার ওলীদের নিকটে থাকেন। তাই আপনার কাছে দোয়া করার সাহস আমরা পাই না।
(৭) সপ্তম ব্যক্তি বলল : আল্লাহ, আপনি আমাদের অন্তরকে যিকিরের পথ প্রদর্শন করেছেন এবং আপনাতে মশগুল হওয়ার ধ্যান দান করেছেন। এই নেয়ামতের শোকরে আমাদের পক্ষ থেকে যে ত্রুটি হয়েছে, তা ক্ষমা করুন।
(৮) অষ্টম ব্যক্তি বলল : আল্লাহ, আমাদের প্রয়োজন তো আপনি জানেনই। সেটা হচ্ছে কেবল আপনার দিকে দেখা।
(৯) নবম ব্যক্তি বলল : ইলাহী, দাস তার প্রভুর সামনে দুঃসাহস দেখাতে পারে না। যেহেতু আপন কৃপায় আমাদেরকে দোয়ার আদেশ করেছেন, তাই আরয করছি আমাদেরকে সেই নূর দান করুন, যা দ্বারা নভোমণ্ডলের অন্ধকার স্তরসমূহে পথ পাওয়া যায।
(১০) দশম ব্যক্তি বলল : হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে আপনাকেই চাই। আমাদের প্রতি মনোযোগী হোন এবং সর্বদা আমাদের কাছে থাকুন।
(১১) একাদশ ব্যক্তি বলল : ইলাহী, আপনি আমাদেরকে যে নেয়ামত - দান করেছেন, আমরা তা পূর্ণ করার আবেদন করি।
(১২) দ্বাদশ ব্যক্তি বলল : এলাহী, আপনার সৃষ্টির মধ্য থেকে আমাদের কোন বস্তুর প্রয়োজন নেই। কেবল কৃপাদৃষ্টি করে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন।
(১৩) ত্রয়োদশ ব্যক্তি বলল : এলাহী, আমার আবেদন এই যে, দুনিয়াকে দেখার ব্যাপারে আমার চক্ষুকে অন্ধ করুন এবং আখেরাতে মশগুল হওয়ার ব্যাপারে আমার অন্তরকে অন্ধ করুন।
(১৪) চতুর্দশ ব্যক্তি বলল : ইলাহী, আমি জানি আপনি ওলীদেরকে ভালবাসেন। অতএব, আমাদের প্রতি এতটুকু অনুগ্রহ করুন যে, আমাদের অন্তরকে সবকিছু থেকে ফিরিয়ে কেবল আপনাতে মশগুল করে দেন।
আল্লাহ তা'আলা দাউদ (আঃ)-এর কাছে ওহী পাঠালেন : তাদেরকে বলেদিন, আমি তোমাদের সকল কথাবার্তা শুনেছি। তোমরা যা যা কামনা করেছ, আমি সবই কবুল করলাম। তোমরা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও এবং ভূগর্ভে কুঠরী তৈরী করে নাও। আমি তোমাদের ও আমার মধ্যবর্তী যবনিকা সরিয়ে দিতে চাই যাতে তোমরা আমার নূর ও প্রতাপ দর্শন কর। হযরত দাউদ (আঃ) আরয করলেনঃ ইলাহী, এরা এই পর্যায়ে কেমন করে উন্নীত হল? এরশাদ হল “তারা আমার প্রতি সুধারণা পোষণ করে এবং দুনিয়া ও দুনিয়াবাসীদেরকে ত্যাগ করে আমার সাথে একাকী থাকে।

পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...