শনিবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৩

মহব্বত (পর্ব- ১৪) গোনাহের কেন্দ্র থেকে পলায়ন



 মহব্বত (পর্ব- ১৪)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

গোনাহের কেন্দ্র থেকে পলায়ন
স্বল্পজ্ঞানী ব্যক্তি মনে করে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) মহামারীগ্রস্ত এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে নিষেধ করেছেন। এতে বুঝা যায়, যে এলাকায় গোনাহ প্রকাশ হয়ে পড়ে, সেখান থেকেও পলায়ন না করা উচিত। কেননা, উভয় অবস্থায়ই আল্লাহর ফয়সালা থেকে পলায়ন হবে। এরূপ মনে করা ঠিক নয়। বরং মহামারী প্রকাশ হয়ে পড়লে পলায়ন নিষিদ্ধ করার কারণ এই যে, এর অনুমতি দেয়া হলে সুস্থ লোকজন সকলেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাবে এবং কেবল রোগাক্রান্তরা থেকে যাবে। ফলে, কোন সেবা-শুশ্রূষাকারী না থাকার কারণে তারা ধ্বংসের মুখে পতিত হবে। যদি এই নিষেধাজ্ঞা আল্লাহর ফয়সালা থেকে পলায়নের কারণে হত, তবে যে ব্যক্তি মহীমারীগ্রস্ত এলাকার কাছে পৌঁছে যায়, তাকে সেখান থেকে ফিরে আসার অনুমতি দেয়া হতো না। কেননা, এটাও আল্লাহর ফয়সালা থেকে পলায়নের শামিল। নিষেধাজ্ঞার উপরোক্ত কারণ জানার পর এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, যে এলাকায় গোনাহ প্রকাশ হয়ে পড়ে, সেখান থেকে পলায়ন করা আল্লাহর ফয়সালা থেকে পলায়ন করার অন্তর্ভুক্ত নয়। এমনিভাবে গোনাহে উত্তেজিত করে এমন জায়গার নিন্দা বর্ণনা করা মানুষকে দূরে রাখার জন্যে নিন্দনীয় নয়। পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ প্রায়ই এরূপ স্থান বিশেষের নিন্দা করেছেন।
এমনী একদল বুযুর্গ বাগদাদ শহরের নিন্দায় মুখর ছিলেন। তারা যথাসম্ভব এই শহর থেকে পলায়নের চেষ্টা করতেন। হযরত ইবনে মোবারক (রঃ) বলতেন : আমি পূর্ব ও পশ্চিমের অনেক দেশ ঘুরেছি ; কিন্তু বাগদাদের মত মন্দ শহর কোথাও দেখিনি। লোকেরা জিজ্ঞেস করল : সে শহরটি কেমন? তিনি বললেন : এই শহরে আল্লাহ তা'আলার নেয়ামতের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয় এবং তাঁর প্রতি নাফরমানীকে তুচ্ছ বিষয় গণ্য করা হয়। তিনি যখন খোরাসানে পৌছেন, তখন লোকেরা তাঁকে বাগদাদের অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন : আমি এতে কেবল তিন প্রকার লোক দেখেছি– ক্রুদ্ধ সিপাহী, বেদনাক্লিষ্ট বণিক ও বিস্ময়াবিষ্ট আলেম। তাঁর এই উক্তি কোন গীবত ছিল না। কেননা, তিনি এতে কোন ব্যক্তি বিশেষের নাম উচ্চারণ করেননি এবং কোন বাগদাদীকে লক্ষ্যে পরিণত করেননি ; বরং এতে তার উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সতর্ক করা। মক্কা যাওয়ার পথে তিনি বাগদাদে ষোল দিনের বেশী অবস্থান করতেন না । এ সময়ের মধ্যে তাঁর কাফেলা এগিয়ে যাওয়ার জন্যে তৈরী হয়ে যেত। তিনি এই ষোল দিনের বিনিময়ে ষোল দীনার সদকা করে দিতেন।
কোন কোন বুযুর্গ ইরাককে মন্দ বলতেন। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয ও হযরত কা’বে আহবার (রাঃ) এ দলভুক্ত ছিলেন। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) তাঁর এক গোলামকে জিজ্ঞেস করলেন : তুই কোথায় থাকিস? সে বলল : ইরাকে। তিনি বললেন : সেখানে তোর কাজ কি? আমি শুনেছি, যে ব্যক্তি ইরাকে থাকে, আল্লাহ তা'আলা তার পেছনে কোন বালা লাগিয়ে দেন। হযরত কা’বে আহবার (রাঃ) একদিন ইরাকের আলোচনা প্রসঙ্গে বললেন : এর দশ ভাগের নয় ভাগে পাপাচার রয়েছে, যার কোন প্রতিকার নেই। জনৈক বুযুর্গ আরও বললেন : কল্যাণকে দশ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর নয় ভাগ সিরিয়ায় এবং এক ভাগ ইরাকে স্থান পেয়েছে। আর অনিষ্টের দশ ভাগের নয় ভাগ ইরাকে এবং একভাগ সিরিয়ায় স্থান পেয়েছে।
জনৈক মুহাদ্দিস বলেন : আমি একদিন হযরত ফুযায়ল ইবনে আয়াযের খেদমতে ছিলাম। এমন সময় জনৈক সুফী সম্মুখে এল। তিনি তাকে নিজের সাথে বসিয়ে বললেন : তোমার বাড়ি কোথায় ? সুফী বলল : বাগদাদে। তিনি তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেন : আমাদের কাছে মানুষ দরবেশের ন্যায় পোশাক পরিধান করে আসে ; কিন্তু যখন কোথায় থাক জিজ্ঞেস করা হয়, তখন বলে : যালেমদের বাসায় থাকি।
হযরত আহমদ ইবনে হাম্বল বলতেন : যদি এই সন্তান-সন্ততির সম্পর্ক আমার সাথে না থাকত, তবে আমি এ শহরে থাকতাম না। লোকেরা প্রশ্ন করল, তাহলে কোথায় থাকতেন? তিনি বললেন : পাহাড়ের উপত্যকায়।
এক বুযুর্গকে বাগদাদের অবস্থা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : সেখানকার দরবেশ পাক্কা দরবেশ আর সেখানকার দুষ্ট পাক্কা দুষ্ট।
এসব রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, যে শহরে গোনাহের আধিক্য ও পুণ্যের স্বল্পতা বিরাজমান, যেখানে কেউ আটকা পড়লে তার উচিত হিজরত করা।
আল্লাহ পাক এরশাদ করেন -
>”হিজরত করার জন্যে আল্লাহর ভূ-পৃষ্ঠ কি সুবিস্তৃত ছিল না”? যদি পরিবার-পরিজনের বাধার কারণে কেউ হিজরত করতে সক্ষম না হয়, তবে বিষণ্ন মনেই থাকা উচিত এবং সর্বদা দোয়া করা উচিত - “ইলাহী ! যালেম অধিবাসীদের এই জনপদ থেকে আমাদেরকে বের করে নাও”। এর কারণ এই যে, যেখানে পাপাচারীদের আধিক্য হয়ে যায়, সেখানে ব্যাপক বিপদ আসে, যা ভাল-মন্দ সকলকেই ধ্বংস করে দেয়। আল্লাহ তা'আলার অনুগত বান্দারাও রেহাই পায় না। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন ,-
>”তোমরা এমন ফেতনা থেকে বেঁচে থাক, যা বিশেষভাবে তোমাদের মধ্যে যারা যালেম তাদেরকেই বিপর্যস্ত করবে না।"
মোটকথা, পাপকাজে রিযা সর্বাবস্থায় নয় ; বরং শুধু এ দিক দিয়ে যে ; এটা আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্বন্ধযুক্ত। নতুবা স্বয়ং পাপকাজে রাযী থাকার কোন কারণ নেই। তিন ব্যক্তি তিন স্থানে অবস্থান করে। তাদের একজন দীদারের আগ্রহে মৃত্যুকে পছন্দ করে। দ্বিতীয়জন মাওলার খেদমতের জন্যে জীবিত থাকাকে ভাল মনে করে। তৃতীয়জন বলে : আমি কেবল তাই পছন্দ করি, যা আল্লাহ আমার জন্যে পছন্দ করেন- তা মৃত্যু হোক অথবা জীবন। এই তিন ব্যক্তির মধ্যে কে উত্তম, এ বিষয়ে আলেমগণের মতভেদ রয়েছে।
জনৈক ওলী-আল্লাহকে এই প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেনঃ রিযা বিশিষ্ট ব্যক্তি উত্তম। কেননা , তাদের মধ্যে তার ঝামেলাই সবচেয়ে কম।
একদিন ওয়াহাব ইবনে ওয়ার্দ, সুফিয়ান ছওরী ও ইউসুফ ইবনে বিসা এক জায়গায় সমবেত হলেন। হযরত সুফিয়ান বললেন : অদ্যকার পূর্বে আকস্মিক মৃত্যু আমার কাছে খুব খারাপ মনে হত ; কিন্তু আজ আমি মরে যেতে চাই। ইউসুফ ইবনে বিসাত কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : কারণ, আমি ফেতনাকে ভয় করি।
ইউসুফ ইবনে বিসাত বললেন : আমার কাছে দীর্ঘায়ু হওয়া খারাপ মনে হয় না। আমি আশা করি, সম্ভবত এমন কোন দিন পাওয়া যাবে, যাতে তওবা নসীব হয়ে যাবে এবং কোন নেক আমল করতে পারব।
অতঃপর তাঁরা হযরত ওয়াহাবকে প্রশ্ন করলেন : আপনি এ সম্পর্কে কি বলেন? তিনি বললেনঃ আমি কিছুই পছন্দ করি না। যা কিছু আল্লাহ জাল্লা শানুহুর প্রিয়, তাই আমার প্রিয়– তিনি জীবিত রাখুন অথবা ওফাত দান করুন।
হযরত সুফিয়ান ছওরী উঠে তাঁর কপালে চুম্বন করলেন এবং বললেন : আল্লাহর কসম, এই ব্যক্তি আধ্যাত্মিক।

পরবর্তী পর্ব
আশেকগণের কাহিনী

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...