মহব্বত (পর্ব- ১৩)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
আল্লাহ্ তা'আলার কাছে দোয়া রিযার পরিপন্থী নয়-
যে দোয়া করে, দোয়ার কারণে সে রিযার মকাম থেকে খারিজ হয় না। এমনিভাবে গোনাহকে খারাপ মনে করা, অপরাধীদের প্রতি ক্রুদ্ধ হওয়া, গোনাহের কারণসমূহকে ঘৃণা করা এবং সেগুলো দূর করার জন্যে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার কর্তব্য পালন করাও রিযার পরিপন্থী নয়। এ ক্ষেত্রে কিছু লোকের বিভ্রান্তি হয়েছে। তারা বলে , গোনাহ, নির্লজ্জ কাজ ও কুফর আল্লাহ তা'আলার ফয়সালা তাকদীর বৈ নয়। অতএব, এগুলোতেও রিযা ও সন্তুষ্টি দরকার। এসব লোক শরীয়তের রহস্য সম্পর্কে অজ্ঞ। দোয়াকে আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্যে এবাদতই সাব্যস্ত করেছেন। সেমতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ও অন্যান্য পয়গাম্বরের অধিক পরিমাণে দোয়া করা এ বিষয়ের প্রমাণ। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) রিযার উচ্চতম মকামে ছিলেন। দোয়া রিযার পরিপন্থী হলে তিনি অধিক পরিমাণে দোয়া কেন করতেন? আল্লাহ তা'আলা কোন কোন বান্দার প্রশংসায় বলেন :
>”আগ্রহ ও ভয় সহকারে তারা আমার কাছে দোয়া করে।” গোনাহকে অপছন্দ করা, তাকে খারাপ মনে করা এবং তাতে রাযী না হওয়াকেও আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্যে এবাদত সাব্যস্ত করেছেন। তিনি গোনাহে সন্তুষ্ট থাকার নিন্দা করেছেন। বলা হয়েছে–
>”তারা পার্থিব জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট এবং তাতেই প্রশান্ত।″
>”তারা পেছনে অবস্থানকারিণী মহিলাদের সাথে থাকতে রাযী হয়েছে। আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন।”
এক মশহুর হাদীসে আছে–
>”যে কোন অসৎকাজে উপস্থিত থাকে, অতঃপর তাতে রাযী থাকে, সে যেন নিজেই সে অসৎ কাজ করে।”
অন্য এক হাদীসে আছে–
>”যে মন্দ কাজের পথ দেখিয়ে দেয়, সে সে ব্যক্তির মত, যে নিজে সেটা করে।”
হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ মানুষ মন্দ কাজ থেকে অনুপস্থিত ও দূরে থাকে। এরপরও তার ততটুকুই গোনাহ হয়, যতটুকু যে মন্দ কাজ করে, তার হয়। শ্রোতারা আরয করল : এটা কিরূপে? তিনি বললেনঃ এটা এভাবে যে, সে যখন সে মন্দ কাজের সংবাদ পায়, তখন তাতে রাযী থাকে।
এক হাদীসে আছে—
"যদি এক ব্যক্তি প্রাচ্যে নিহত হয় এবং অপর ব্যক্তি পাশ্চাত্যে বসে সেই হত্যাকাণ্ডে রায়ী থাকে, তবে সেও এই হত্যাকাণ্ডে অংশীদার হবে।"
কাফের ও পাপাচারীদের সাথে শত্রুতা রাখা ও তাদের অস্বীকার করার ব্যাপারে কোরআন ও হাদীসে অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। আল্লাহ পাক এরশাদ করেন-
>”মুমিনরা মুমিনদের ছাড়া কাফেরদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে না।”
>”হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদী ও খৃস্টানদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।” [অমুসলিমদের বুঝানো হয়েছে]
>”এমনিভাবে আমি কিছু কিছু পাপাচারীকে কিছু কিছু পাপাচারীর সাথে মিলিয়ে দেই।”
হাদীস শরীফে আছে,
>আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুমিনের কাছ থেকে প্রত্যেক মুনাফিকের সাথে শত্রুতা পোষণের অঙ্গীকার নিয়েছেন এবং প্রত্যেক মুনাফিকের কাছ থেকে মুমিনের সাথে শত্রুতা পোষণের অঙ্গীকার নিয়েছেন।”
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন,
>”যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়কে পছন্দ করে এবং তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে , কিয়ামতের দিন তাকে তাদের সাথেই উত্থিত করা হবে।”
এখানে প্রশ্ন হয়, কোরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় রাযী থাকতে হবে। পাপ ও গোনাহ আল্লাহর ফয়সালা ছাড়া হয় না। অতএব, পাপকে খারাপ মনে করা আল্লাহর ফয়সালাকে খারাপ মনে করা নয় কি? এই পরস্পর বিরোধিতার মধ্যে সমন্বয়ের পন্থা কি? একই বস্তুর মধ্যে রিযা ও ঘৃণা কেমন করে একত্রিত হতে পার?
জওয়াব এই যে, যাদের মনে এ বিষয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, তারা অসৎকাজে চুপ থাকাকে রিযা মনে করেছে এবং এর নাম রেখেছে সচ্চরিত্রতা। অথচ এটা নিছক মূর্খতা। আসলে রিযা ও ঘৃণা যখন একই বস্তুতে একই দিক দিয়ে এবং একইভাবে হয়, তখন অবশ্য একটি অপরটির বিপরীত হয়। কিন্তু যদি এক বস্তুতে এক দিক দিয়ে রিযা এবং অন্য দিক দিয়ে ঘৃণা হয়, তবে নিশ্চিতই একটি অপরটির বিপরীত হবে না এবং তা সম্ভব।
উদাহরণতঃ তোমার কোন শত্রু মারা গেল। সে ছিল তোমার অন্য এক শত্রুরও শত্রু এবং সে তোমার সেই শত্রুকে ধ্বংস করতে সচেষ্ট থাকত। বলা বাহুল্য, এমন শত্রুর মৃত্যু তোমার কাছে এ দিক দিয়ে খারাপ লাগবে যে, সে তোমার শত্রু নিধনে সচেষ্ট থাকত। আর এ দিক দিয়ে ভাল মনে হবে যে, তোমার এক শত্রু খতম হয়ে গেছে। এখানে একই শত্রুর মৃত্যু একদিক দিয়ে খারাপ হয় এবং অন্যদিক দিয়ে ভাল হল। এখানে মোটেই পরস্পর বিরোধিতা নেই। এমনিভাবে গোনাহেরও দুটি দিক আছে। একদিক এই যে, গোনাহ আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতায় ও ইচ্ছায় হয়। এদিক দিয়ে এতে রিযা থাকা দরকার যে, যার বস্তু, তিনি তাতে যা ইচ্ছা তাই করবেন। অপরদিক এই যে, গোনাহ বান্দার ‘কসব’ তথা উপার্জন দ্বারা অর্জিত হয় এবং তার বিশেষণ হয়। এটা আল্লাহর কাছে ‘মগযুব’ তথা গযবে পতিত হওয়ার কারণ। এই দৃষ্টিকোণে গোনাহ মন্দ ও নিন্দনীয় ; সুতরাং ঘৃণার যোগ্য।
এ থেকে জানা গেল যে, গোনাহ থেকে বাঁচা এবং গোনাহ ক্ষমা করার জন্যে দোয়া করা আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় রাযী থাকার পরিপন্থী নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা দোয়াকে বান্দার জন্যে এবাদত হিসাবে নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে দোয়ার কারণে অন্তরে অসহায়ত্ব, নম্রতা ও বিনয় সৃষ্টি হয়। তবে অভিযোগের ভঙ্গিতে বিপদ প্রকাশ করা এবং অন্তরে তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে মন্দ জানা রিযার পরিপন্থী।
পরবর্তী পর্ব
গোনাহের কেন্দ্র থেকে পলায়ন

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন