রবিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (৫) জ্ঞানদানের শ্রেষ্টত্ব




জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ৫)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জ্ঞানদানের শ্রেষ্টত্ব—
এসম্পর্কিত আয়াত :
>"এবং যাতে সতর্ক করে তাদের সম্প্রদায়কে, যখন তাদের কাছে ফিরে আসে, যাতে সম্প্রদায়ের লোকেরা সংযমী হয়"
এ আয়াতে সতর্ক করার অর্থ জ্ঞান দান ও পথ প্রদর্শন।
>"যখন আল্লাহর কিতাব অধিকারীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলেন একে মানুষের জন্য অবশ্যই বর্ণনা করবে এবং গোপন করবেনা"
এতে বলা হয়েছে, জ্ঞানের শিক্ষা দান ওয়াজেব।
>"এবং তাদের একটি দল জেনে শুনে সত্য গোপন করে।" এতে বর্ণিত হয়েছে যে, জ্ঞান গোপন করা হারাম। যেমন সাক্ষ্য গোপন করার জন্য বলা হয়েছে :
"যে সাক্ষ্য গোপন করে সে পাপিষ্ট"।
>"তার চেয়ে সুন্দর কথা কার, যে আল্লাহর প্রতি আহবান করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে।"
>"তোমার পালনকর্তার পথের দিকে আহবান কর প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।"

জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের উক্তি—
হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু বলেন,যে ব্যক্তি কোন হাদিস বর্ণনা করে এবং তদনুযায়ী কাজ করে, সে সেইসব লোকের সমান সওয়াব পাবে, যারা সে কাজটি সম্পাদন করবে।
>হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) বলেন : আমি যখন জ্ঞান অর্জন করছিলাম, তখন হীন ছিলাম। এখন আমার কাছে লোকজন জ্ঞান লাভ করতে শুরু করলে আমি সন্মানের অধিকারী হয়ে গেছি।
>ইবনে আবী মুলাইকা বলেন : আমি হযরত ইবনে আব্বাসের সমতুল্য কাউকে দেখিনি। তার মুখাকৃতি সর্বোত্তম, কথাবার্তা প্রান্জল এবং ফতোয়া সর্বাধিক জ্ঞানবহ।
>ইবনে মোবারক বলেন : আমার কাছে সেই ব্যাক্তি আশ্চর্যজনক, যে জ্ঞান অন্বেষন করেনা। কারণ তার মন তাকে কোন মাহাত্ম্যের প্রতি আহবান করেনা।
>জনৈক দার্শনিক বলেন : দু ব্যক্তির প্রতি আমার মনে যে দয়ার উদ্রেক হয়, তা অন্য কারো প্রতি হয়না। - (১) সে ব্যক্তি, যে জ্ঞান অন্বেষন করে কিন্তু বুঝেনা (২) সে ব্যক্তি যে বুঝে ; কিন্তু জ্ঞান অন্বেষন করেনা।
>হযরত আবু দারদা (রঃ) বলেন : একটি মাসআলা শিক্ষা করা আমার মতে সারা রাত জেগে নফল পড়া অপেক্ষা উত্তম। তিনি আরো বলেন : জ্ঞানী ব্যক্তি ও জ্ঞান অন্বেষনকারী কল্যাণের অংশিদার। অন্য সকলেই কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। তিনি আরো বলেন : জ্ঞানী হও অথবা জ্ঞান অন্বেষনকারী হও অথবা শ্রোতা হও, চতুর্থ কোন কিছু হয়োনা, তা হলে ধংশ হয়ে যাবে।
>হযরত আতা (রহঃ) বলেন : জ্ঞানের একটি মজলিশ ক্রীড়া-কৌতুকের সত্তরটি মজলিশের কাফপারা হয়ে যায়।
>হযরত ওমর (রঃ) বলেন : হাজার রাত জাগরণকারী রোজাদার আবেদের মরে যাওয়া এমন জ্ঞানী ব্যাক্তির তুলনায় কম, যে আল্লাহ্ তা'আলার হালাল ও হারাম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ।
>ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন জ্ঞান অন্বেষন করা নফলের ছেয়ে উত্তম।
>ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন : আমি ইমাম মালেকের কাছে পাঠাব্যেশরত ছিলাম এমন সময় যোহরের সময় হল। আমি নামাজের জন্য কিতাব বন্ধ করলে তিনি বললেন : ওহে, যার জন্য তুমি উঠেছ, সেটা এর ছেয়ে উত্তম নয়, যাতে তুমি ছিলে। তবে নিয়ত দুরস্ত হওয়া শর্ত।
>হযরত আবু দারদা (রঃ) বলেন যে ব্যাক্তি মনে করে জ্ঞান অন্বেষন করা জেহাদ নয়, সে বুদ্ধি বিবেচনায় অপক্ষ।

জ্ঞান দানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে হাদীস
জ্ঞান দানের শ্রেষ্টত্ব সম্পর্কে বহু হাদীস বর্ণিত রয়েছে-
রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>"আল্লাহ্ তা'আলা কোন জ্ঞানী ব্যক্তিকে জ্ঞান দান করে তার কাছ থেকে সে অঙ্গীকারও নিয়েছেন, যেমন পয়গম্বরগণের কাছ থেকে নিয়েছেন। অর্থাত তারা অবশ্যই তা বর্ণনা করবে এবং গোপন করবেনা।"
রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) মুয়ায ইবনে জাবালকে ইয়েমেন প্রেরন করার সময় বললেন :
>"যদি আল্লাহ্ তা'আলা তোমার দ্বারা একটি লোককেও পথ প্রদর্শন করে, তবে এটা হবে তোমার জন্যে দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছু অপেক্ষা উত্তম।"
> "যে ব্যক্তি অন্যদের শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে জ্ঞানের একটি অধ্যায় শিক্ষা করবে তাকে অবশ্যই পয়গম্বর ও সিদ্দিকের সওয়াব দান করা হবে।"
হযরত ঈসা আলাইহিস্সালাম এর উক্তি বর্ণিত আছে,
>"যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে তদনুযায়ী আমল করে এবং মানুষকে তা শিক্ষা দান করে, সে আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্বে মহান বলে বিবেচিত হয়।"
>" কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাআলা এবাদতকারী ও জেহাদকারীদেরকে বলবেন : জান্নাতে যাও। আলেম তথা জ্ঞানী ব্যক্তি বলবেন : ইলাহী ! তারা আমাদের জ্ঞানের বদৌলতে এবাদত ও জেহাদ করেছে; অর্থাত সন্মান পাওযার যোগ্য আমরা। আল্লাহ্ তা'আলা বলবেন : তোমরা আমার কাছে কোন কোন ফেরেশতার সমতুল্য। তোমরা সুপারিশ কর তোমাদের সুপারিশ মন্জুর করা হবে। অতঃপর তারা সুপারিশ করবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। এই মর্তবা সেই জ্ঞানের, যাহা শিক্ষাদানের মাধ্যমে অপরের কাছে পৌঁছায়। সে জ্ঞানের নয়, যা কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে সীমিত থাকে এবং অন্যের কাছে পৌঁছায় না।
রসুলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন :
>"আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে জ্ঞান দান করার পর তা ছিনিয়ে নিয়ে যান না। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়ার মাধ্যমে জ্ঞানও তুলে নেন।"
সেমতে কোন জ্ঞানী ব্যক্তি দুনিয়া থেকে চলে গেলে তার সাথে জ্ঞানও চলে যায়। অবশেষে মূর্খ নেতৃবর্গ ছাড়া কেউ অবশিষ্ট থাকেনা। এই মূর্খদের কাছে কিছু জিজ্ঞেস করলে তারা না জেনে না শুনে ফতোয়া দেয়। ফলে নিজেরাও বিপথগামী হয় এবং অপরকেও বিপথগামী করে।

পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...