বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৩

যশ ও রিয়া - (৭) যশখ্যাতির চিকিৎসা



যশ ও রিয়া (পর্ব - ৭)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যশখ্যাতির চিকিৎসা 
প্রকাশ তাকে যে, যে ব্যক্তির অন্তরকে যশ-প্রীতি আচ্ছন্ন করে নেয়, সে সর্ব প্রযত্নে এ বিষয়েই ব্যাপৃত থাকে যে, মানুষের সহৃদয়তা যেন হাতছারা না হয় এবং তাদের সাথে বন্ধুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। সে কথায় ও কাজে কর্মে সর্বদা খেয়াল রাখে, যাতে মানুষের মধ্যে তার মর্যাদা বেড়ে যায়। বাস্তবে এ বিষয়টি নিফাকের বীজ এবং অনর্থের মূল। এর ফলে ক্রমে ক্রমে এবাদতের প্রতি অবহেলা প্রদর্শিত হতে থাকে, রিয়ার প্রভাব বেড়ে যায় এবং মানুষের মন আকৃষ্ট করার জন্য নিষিদ্ধ বিষয়াদিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ কারণে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন, -  
>"গৌরব ও ধন-সম্পদের মোহ নিফাক উতপন্ন করে"। 
কেননা নিফাক বলা হয় মানুষের বাহ্যিক অবস্থা তথা ;  কথা ও কাজ তার অন্তরে বিপরীত হওয়াকে। সুতরাং যে ব্যক্তি অন্তরে মর্যাদার আসন প্রতিষ্টিত করতে ইচ্ছুক, সে নিফাক সহকারে তাদের সন্মুখীত হবে। এবং মনের উপর জোর দিয়ে উত্তম স্বভাব তাদের সামনে পেশ করবে। অথচ সে এসব স্বভাব থেকে মুক্ত। এ থেকে যানা গেল যে, যশপ্রীতি বিনাশকারী বিষয় সমুহের অন্যতম। তাই এর চিকিৎসা জরুরী। কেননা এই রোগটি ধন-সম্পদের মহব্বতের ন্যায় একটি মজ্জাগত রোগ।
যশপ্রীতির চিকিৎসা দু'টি- একটি জ্ঞানগত ও অপরটি কর্মগত।
জ্ঞানগত চিকিৎসা এই যে, যে কারণে যশলাভের মোহ সৃষ্টি হয়েছে, তা জানতে হবে। বলা বাহুল্য, এর কারণ হচ্ছে মানুষের দেহ ও মনের উপর ক্ষমতা অর্জন করে। মানুষ যদি এ বিষয়টি অর্জন করতে সক্ষমও হয়ে যায়,  তবে চিন্তা করা দরকার মৃত্যুই এর শেষ সীমা। মৃত্যুর পর এটা কোন উপকারে আসেনা। এটি "বাকিয়াতে সালেহাত" তথা অক্ষয় সৎকর্ম সমুহের অন্তর্ভুক্ত নয় যে,  মৃত্যর পরও এর কার্যকারিতা অবশিষ্ট থাকবে। ধরে নেয়া যাক, যদি পূর্ব-পশ্চিমের সকল মানুষ এক ব্যক্তিকে সেজদা করতে থাকে এবং পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত সকলেই সেজদারত থাকে তবু না সেজদাকারীরা থাকবে,  না সয়ং সেই ব্যক্তি থাকবে ;  বরং তারা সকলেই একদিন অন্যেন্য মহাপুরুষের ন্যায় মাটির সাথে মিশে যাবে। সুতরাং এমন ক্ষয়িষ্ণু বিষয়ের জন্য অনন্ত ও অক্ষয় জীবন লাভের মাধ্যমে ধর্মকে বিসর্জন দেয়া মোটেই উচিৎ নয়। সত্যিকার পূর্নতা কি- এ বিষয়টি যে বুঝে নিয়েছে, তার দৃ্ষ্টিতে যশখ্যাতি নিতান্ত তুচ্ছ বিষয়। কিন্তু এটা বুজতে সেই সক্ষম, যে আখেরাতে উপস্থিতিকে চোখে সন্মুখে দেখে,  দুনিয়াকে হেয় মনে করে এবং মৃত্যুকে মনে করে যে এসে গেছে। হযরত হাসান বসরীর অবস্থা তেমনি ছিল। তিনি হজরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহঃ)-কে এক পত্রে লিখেছেন : আপনার বিশ্বাস করা উচিৎ যে, আপনি মরে গেচেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজও এ ব্যাপারে পেছনে ছিলেন না। তিনি জওয়াবে লিখলেন ধারণা করা উচিৎ যে, আপনি দুনিয়াতে কখনো আসেননি- চিরকাল আখেরাতেই রয়েছেন। বলাবাহুল্য, এই বুযুর্গ গণের দৃষ্টি আখেরাতেই নিবন্ধ ছিল। ফলে তারা দুনিয়াতে যশখ্যাতি ও ধনসম্পদকে হেয় মনে করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ লোকের দৃষ্টি শক্তি দুর্বল। তারা কেবল দুনিয়াকেই দেখে। এবং পরিনতির খেয়াল করেনা। তাই আল্লাহ্ তা'আলা তাদের সম্পর্কে ইরশাদ করেন, -
>"কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবণকে প্রধান্য দাও ;  অথচ আখেরাত হল উৎকৃ্ষ্টতর স্থায়ী"।
আরো বলা হয়েছে, - 
>"কখনো নয় ;  বরং তোমরা দুনিয়াকে ভালবাস এবং আখেরাতকে পরিত্যগ কর"।
সুতরাং যার অবস্তা এরুপ তার উচিৎ যশপ্রীতির বিপদাপদকে জানা। এবং দুনিয়াতে যশশালী ব্যক্তিরা যে সকল বিপদের সন্মুখীন হয়, সেগুলো চিন্তা করা।
দুনিয়াতে যশশালী ব্যক্তিমাত্রই হিংসার পাত্র হয়ে থাকে। মানুষ তার ক্ষতিসাধনের সর্বদা সচেষ্ট থাকে। সে-ও সর্বক্ষন আশংকা করতে থাকে যে, কোথাও মানুষের অন্তর থেকে তার মর্যাদা বিলিন হয়ে যায়। কেননা মানুষের অন্তর সর্বদা পরিবর্তনঅীল। কখনো একদিকে ও কখনো অন্যদিকে থাকে। এক সময় যাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হয়, অন্য সময় তাকেই জুতার মালা দিতে কসুর করা হয়না। সুতরাং যে ব্যক্তি মানুষের মনের উপর ভরষা করে, সে যেন সমুদ্রের তরঙ্গমালার উপর গৃহ নির্মান করে। অতএব আপন যশখ্যাতি সংরক্ষনের চিন্তা, হিংসাকারীদের চক্রান্ত প্রতিহত করা এবং শত্রুদের শত্রুতা নিবারণ করা- জাগতিক এসব আপদ বিপদের কারণে যশখ্যাতির আনন্দ সর্বদাই মলিন থাকে। দুনিয়াতে মানুষ এ থেকে যতটুকু সুখ আশা করে, তার ছেয়ে অনেক বেশী বিপদাশংকায় জড়িত থাকে। আসল উদ্দেশ্য যে আখেরাতের উপকার তারতো কোন প্রশ্নই উঠেনা।
যশখ্যাতির কর্মগত চিকিৎসা হল, এমন কাজ করা যাতে মানুষ তিরস্কারের যোগ্য হয়ে পড়ে এবং অপরের দৃ্ষ্টিতে ঘৃণাহ্য হয়ে যায়। এতে করে জনপ্রিয় হওয়ার নেশা কেটে যাবে।এছারা মানুষের কাছে অখ্যাত মন্দ সাব্যস্ত হওয়ার দিনটিকে পছন্দ করে নিতে এবং কেবল আল্লাহর প্রিয় হওয়াতেই সন্তুষ্ট থাকবে। এটা 'মালামতী' সম্প্রদায়ের অনুসৃত পদ্ধতি। তারা যশখ্যাতির বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এমন গুনাহ ও কুকর্ম করে থাকে,  মানুষের দৃষ্টিতে পুরাপুরি অসন্মানের পাত্র হয়ে যায়। কিন্তু এ উপায় পথপ্রদর্শক ও ধর্মীয় নেতাদের জন্য জায়েয নয়। কেননা তাদের 
কীর্তিকলাপ দেখে মুসলমানদের মনে শৈথিল্য আসবে। এছাড়া যে ব্যক্তি অনুসৃত নেতা নয়, তার জন্যও বিশেষ এই চিকিৎসার খাতিরে হারাম কাজ করা জায়েয নয় ; বরং তার জন্য বৈধ কাজ সমুহের মধ্যে এমন কাজ করে জায়েয যা দ্বারা মানুষের মধ্যে তার মূল্য হ্রাস পায়।
উদাহরণতঃ বর্ণিত আছে যে জনৈক বাদশাহ এক দরবেশের কাছে যাওয়ার ইচ্ছা করলেন। যখন দরবেশ শুনল বাদশা তার আস্তানার কাছাকাছি এসে গেছেন, তখন সে খাদ্য ও শাক আনিয়ে গোগ্রাসে খেতে শুরু করল। বাদশা তাকে এভাবে খেতে দেখে তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লেন এবং সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। দরবেশ বলল আল্লাহ পাকের হাজার শোকর, তিনি বাদশাকে আমার কাছথেকে সরিয়ে দিয়েছেন। কোন কোন বুযুর্গ এমন রঙ্গিন পিয়ালার শরবত পান করেছেন, যা দেখে লোকেরা তাকে শরাবখোর মনেকরে চলে যেত যদিও এরকম করা ফেকা শাস্ত্রের দৃষ্টিতে জায়েয নয় ;  কিন্তু বুজুর্গগন অন্তরের সংশোধন অন্য কোন কাজের মধ্যে পাননি বলে বাধ্য হয়ে এরুপ করেন। পরে  অবশ্য তারা এই বাড়াবাড়ির ক্ষতিপুরণ করে নেন। 

বর্ণিত আছে জনৈক বুযুর্গ ব্যক্তি সংসার নির্লিপ্ততায় মশগুল হলে লোকজন তার কাছে ভিড় করতে শুরো করে। তিনি এ থেকে আত্মরক্ষার জন্য একদিন হাম্মামে গেলেন এবং অন্য এক ব্যক্তির বস্ত্র পরিধান করে বাইরে এলেন এবং প্রকাশ্য রাস্থায় দাড়িয়ে গেলেন। লোকেরা চুরি যাওয়া বস্ত্র চিনতে পেরে তাকে ধরল এবং চোর চোর বলে খুব মারপিট করল। এরপর থেকে কোন লোক সেই বুযর্গের আস্থানায় গেলনা। 

পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...