মন আপন প্রশংসায় আনন্দিত ও নিন্দায় নিস্পৃহ হয় কেন -
জানা উচিত যে চার কারণে অন্তর প্রফুল্ল ও আনন্দিত হয়।
(১) প্রথম কারণটি সর্বাধিক শক্তিশালী। তা এই যে প্রশংসার কারণে মন জানতে পারে যে, সে পূর্ণতা গুন সম্পন্ন। কেননা যে বিষয় দ্বারা প্রশংসা করা হয়, তা প্রকাশ্য অথবা সন্দিগ্ন গুণ হতে পারে। যদি গুণটি প্রকাশ্য ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়, তবে আন্ন্দ কম হয় ; যেমন কারো প্রশংসায় বলা হয়, সে দীর্ঘাকৃতি ও শ্বেতকায়। এটা যদিও একটা পূর্ণতা-গুন কিন্তু মন এ থেকে গাফেল থাকে। ফলে সে মোটেই আনন্দ পায়না। তবে অপর ব্যক্তি বলার কারণে তার চৈতন্যোদয় হয, তখন কিছু না কিছু আনন্দ পায়। আর যদি প্রশংসার বিষয়টি সন্দিগ্ধ হয়, তবে আনন্দ অনেক বেশী হয়। যেমন কারো শিক্ষাদীক্ষা পরহেজগারী অথবা রূপ-লাবণ্যের প্রশংসা করা হয়।মানুষ প্রায় এইসব গুণের ব্যপারে সন্দিহান থাকে এবং কোন না কোনরূপে এই সন্দেহ দূর হয়ে যাওয়ার বাসনা করতে থাকে। এর পর যখন অপরের মুখ থেকে এই ঈপ্সিত বক্তব্য শ্রবণ করে, তখন অসাধারণ আনন্দ অর্জিত হয়। এ কারণে অধিকতর আনন্দ তখন অর্জিত হয়, যখন সব গুণ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ব্যক্তির মুখ থেকে এই প্রশংসা উচ্চারিত হয়।
উদাহরণতঃ কোন ওস্তাদ তার শাগরিদ সম্পর্কে বলে- তুমি বড় মেধাবী, বুদ্ধিমান ও পন্ডিত। এতে শাগরিদের মনে আনন্দ আর ধরেনা। কিংবা খারাপ লাগারও কারণ এটাই। এতে মন তার ত্রুটি সম্পর্কে সচেতনতা লাভ করে পূর্ণতার বিপরীত। সুতরাং পূর্ণতা যেমন প্রিয় ত্রুটি তেমনি অপ্রিয় হয়ে থাকে। অপরের মুখ থেকে যখন ত্রুটি সম্পর্কে অবগত হবে, তখন অবশ্যই তা খারাপ লাগার বিষয়, বিশেষত যখন বিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি নিন্দা করবে।
(২) দ্বিতীয় কারণ এই যে, প্রশংসা দ্বারা জানা যায় প্রশংসা কারীর অন্তর প্রশংসিত ব্যক্তির মালিকানাধীন, বশীভূত ও ভক্ত। অন্তরের মালিকানা লাভ করা সকলেরই প্রিয় ও পছন্দনীয়। যখন জানবে প্রশংসাকারী ব্যক্তি তার ভক্ত এবং তার অন্তর তার ইচ্ছার অনুগামী, তখন নিশ্চিতরূপেই সে আনন্দিত হবে। বিশেষত যদি প্রশংসাকারী ব্যক্তি অধিক ক্ষমতাবান হয় এবং তাকে দিয়ে অধিক কার্যোদ্ধারের সম্ভাবনা থাকে, তবে আনন্দ আরো বেশী হবে।
(৩) আনন্দের তৃতীয় কারণ এরুপ ব্যক্তির প্রশংসা করা, যার কথা সকলেই শুনে এব মুল্য দেয়। কিন্তু এর জন্য সর্ত হল যে, প্রশংসা অথবা নিন্দা জনসমক্ষে হওয়া। সুতরাং সমাবেশ যত বেশী হবে এবং প্রশংসাকারী যত বেশী মান্যবর হবে, আনন্দ তত বেশী হবে। এর বিপরীতে নিন্দা অধিক খারাপ লাগবে।
(৪) চতুর্থ কারণ, প্রশংসা দ্বারা প্রশংসিত ব্যক্তির প্রভাব প্রতিপত্তিশালী হওয়া বুঝা যায়। ফলে প্রশংসাকারী তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যায়- মনের আগ্রহে হোক কিংবা চাপের কারণে হোক। চাপো মানুসের কাছে প্রিয় হয়ে থাকে, কারণ এতে একপ্রকার প্রাবল্য পাওয়া যায়। এ কারণে প্রশংসাকারীর অন্তর প্রশংসার বিষয়বস্তুতে বিশ্বাসী না হলেও প্রশংসিত ব্যক্তি আনন্দিত হয়।
যদি উপরোক্ত চারটি কারণই এক প্রশংসাকারীর মধ্যে একত্রিত হয়ে যায় তবে চরম পর্যায়ের আনন্দ ও স্বাদ অর্জিত হয় ।
প্রশংসা দ্বারা অন্তরের আনন্দ লাভ করার কারণ এবং নিন্দা দনবারা দুঃখিত হওয়ার কারণ সম্পর্কিত এ আলোচনাটির অবতারণা এ জন্য করা হল, যাতে প্রশংসার মহব্বত ও নিন্দার কারণে দুঃখ পাওয়ার চিকিৎসা জানা যায় । কেননা যে রোগের কারণ জানা থাকেনা, তার চিকিৎসাও সম্ভব হয়না। রোগের কারণ দুর করাই চিকিৎসা।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন