বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৩

যশ ও রিয়া - (৫) যশের মহব্বতে ভাল ও মন্দ বিষয়াদি



যশ ও রিয়া (পর্ব - ৫)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যশের মহব্বতে ভাল ও মন্দ বিষয়াদি-
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে জানা গেল,  যশের অর্থ হচ্ছে অন্তরসমুহের মালিক হওয়া ও তাদের উপর ক্ষমতা বিস্তার করা। সুতরাং এর বিধানও ধন-সম্পদের মালিকের বিধানের অনুরূপ। কেননা যশ ও পার্থিব উদ্দেশ্য সমুহের মধ্যে একটি উদ্দেশ্য,  যা মৃত্যুর কারণে নিঃশেষ হয়ে যায়। যেহেতু দুনিয়া আখেরাতের শস্যক্ষেত্র,  তাই দুনিয়াতে উৎপন্ন বস্তুর থেকেই আখেরাতের পাথেয় অর্জন করা সম্ভব। সুতরাং পানাহার ও পোশাকের জন্যে যেমন সামান্য অর্থসম্পদ জরুরী, তেমনি মানুষের সাথে জীবন যাপনের জন্যেও অল্পবিস্থর যশ-খ্যাতির প্রয়োজন। খোরাক একটি অপরিহার্য বস্তু। প্রয়োজন পরিমানে খোরাক সংগ্রহ করা অথবা খোরাক ক্রয় করা অর্থ সংগ্রহ করা এবং এইগুলোকে প্রিয় মনে করা যেমন জায়েয,  তেমনি খেদমতের জন্যে একজন খাদেম,  সাহায্য-সহায়তার জন্যে একজন সফরসঙ্গী,  পথ প্রদর্শনের জন্য একজন ওস্তাদ এবং দুষ্ট লোকের অনিষ্ট ও যুলুম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একজন শাসক থাকাও যায়েজ। 
সুতরাং মালিকের এ বিষয়ে প্রিয় মনে করা যে, খাদেমের মনে তার এমন মহাত্ম্য ও সন্মান থাকুক, যার কারণে সে খেদমত করতে উদ্বুদ্ধ হয় অথবা সফর সঙ্গীর অন্তরে এমন মর্যাদা থাকুক, যারকারণে সে সাহায্য থেকে বিরত না থাকে অথবা ওস্তাদের মনে এমন আসন থাকুক,  যার কারণে সে উত্তমরূপে পদপ্রদর্শন করে অথবা শাসকের মনে এমন সন্মান থাকুক, যার কারণে সে অনিষ্ট দুরিকরণে সম্মত হয়- এসব বিষয়কে প্রিয় মনে করা নাযায়েজ ও নিন্দনীয় নয়। কেননা, 'যশ'  ধনসম্পদের ন্যায় উদ্দেশ্য সাধনের একটি উপায়। উভয়ের মধ্যে তফাৎ নেই। তবে এ সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত এই যে, সয়ং সম্পদ ও যশ-খ্যাতিকে প্রিয় মনে করবেনা ; বরং এ সবের মহব্বতকে এরূপ মনে করবে, যেমন কারো ঘরে শৌচাগার রযেছে এবং সে মল ত্যাগের জন্য এই শৌচাগার থাকাকে প্রিয় মনে করে। সে মনে করে যদি তা মলত্যাগের প্রয়োজন না থাকে, তবে শৌচাগারের সাথেও তার সম্পর্ক থাকবেনা। এই ব্যক্তিকে বাস্তবে পায়খানাকে মহব্বতকারী মনে করা হবেনা। বরং এটা আসল লক্ষ্য অর্জনের উপায়কে মহব্বত করার নামান্তর।

এখন বিষয়টি একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝা দরকার। জনৈক ব্যক্তি তার বিবাহিত স্ত্রীকে একারণে মহব্বত করে যে, প্রয়োজনের সময় সে তার সাথে সহবাস করে। যেমন মলত্যাগের জন্য পায়খানাকে ভাল মনে করা হয়। যদি এইব্যক্তির মধ্যে কামপ্রবৃত্তির তাড়না না থাকে, তবে সে তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিবে ;  যেমন মল ত্যাগের প্রয়োজন না থাকলে কেউ পায়খানায় যায় না। মাঝে মাঝে কেউ কেউ সয়ং স্ত্রীকেই ভালবাসে এবং তার রুপ-লাভণ্যের জন্যে পাগলপারা থাকে। এমনকি যদি কখনো সহবাস নাও হয়, তবুও তাকে তালাক দিতে চায়না। এটা হচ্চে দ্বিতীয় প্রকার মহব্বত। প্রথম প্রকার মহব্বত মহব্বতের অন্তর্ভূক্ত নয়।যশখ্যাতি ও অর্থসম্পদের অবস্থাও তেমনি। এইগুলো দ্বারা দৈহিক উদ্দেশ্য অর্জিত হয় বলে এই গুলোকে মহব্বত করলে কোন অনিষ্ট নেই।  আর যদি সয়ং এগুলোকেই মহব্বত করা হয়- উদ্দেশ্য লাভের উপায় হোক বা না হোক, অথবা প্রয়োজনাতিরিক্ত পরিমাণকে মহব্বত করা হয়, তবে তা নিন্দনীয়। তবে এরুপ মহব্বতকারী ব্যক্তি ফাসেক ও গুনাহগার হবেনা, - যে পর্যন্ত এই মহব্বতের কারণে কোন গুনাহ না করে বসে অথবা ধনসম্পদ ও জাকজমক অর্জন করার জন্যে প্রতারণা, চক্রান্ত, মিথ্যা ইত্যাদি উপায় অবলম্বন না করে। এগুলো অর্জন করার জন্য কোন এবাদতকেও ওসীলা করা যাবেনা। কেননা এবাদতের মাধ্যমে ধন-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি সৃষ্টি করা ধর্মমতে হারাম।
এখন বুঝা দরকার, খাদেম, সফরসঙ্গী, ওস্তাদ ও শাসকের মনে আসন প্রতিষ্ঠিত করার কোন নির্দিষ্ট সীমা আছে কি না কিংবা যতদূর ইচ্ছা তাদেরকে ভক্তি করতে পারবে কিনা ? এর ব্যাখ্যা এই যে, তিন উপায়ে অপরকে ভক্তি করা যায়। তন্মধ্যে দু'টি উপায় বৈধ ও একটি অবৈধ। অবৈধ উপায় এই যে,  অপরকে এমন গুণের ভক্ত করা,  যা নিজের মধ্যে নেই। যেমন তাকে বলা- আমি সাধক,  পরহেজগার, বা সৈয়দ বংশীয় ; অথচ সে কিছুই না। এটা মিথ্যা ও প্রতারণা হওয়ার কারণে হারাম। 
বৈদ উপায় দু'টির মধ্যে একটি হল নিজে যে গুণে গুণাম্বিত,  সে গুণের উপযোগী মর্যাদা চাওয়া। যেমন হজরত ইউসুফ (আঃ) মিসরের শাসনকর্তাকে বলেছিলেন : 'আমাকে দেশের ধন-ভান্ডারে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান'। এতে তিনি শাসনকর্তার অন্তরে নিজের হেফাযতকারী ও বিজ্ঞ হওয়ার গুন কামনা করেছিলেন।শাসনকর্তার এরুপ ব্যক্তির প্রয়োযনও ছিল।
দ্বিতীয় উপায় হল, অপরের দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের কোন দোষ অথবা গুনাহ গোপন রাখা‌ ! এটাও বৈধ ! কেননা পাপ কর্ম গোপন রাখা জায়েয এবং প্রকাশ্যে বলা নাজায়েয। এছারা এতে কোন ধোকা নেই‌ ;  বরং যে বিষয় জানার মধ্যে কোন ফায়দা নেই,  তা না জানানো মাত্র।
অপরের সামনে উত্তমরূপে নামাজ আদায় করা, যাতে সেভক্ত হয়ে যায়- এটাও নিষিদ্ধ। কেননা এটা সরাসরি 'রিয়া'ও 'প্রতারণা'  অতএব এভাবে জাকজমক জাহির করা হারাম।

পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...