জানা প্রয়োজন, আল্লাহ তা’আলা গোটা সৃষ্ট জগত সৃষ্টির ব্যাপারে পর্যায়ক্রমে তিনটি পন্থা অবলম্বন করেছেন। প্রথমে তিনি অনস্তিত্ব থেকে বস্তুর অস্তিত্ব দান করেছেন। মানে, কোন উপাদান ছাড়াই শূন্যতা থেকে বস্তুতে পূর্ণতা দান করেছেন। সৃষ্টির আদি সম্পর্কে মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করায় তিনি জবাব দিলেন, আদিতে স্রষ্টাই ছিলেন, অন্য কিছু ছিল না ।
দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে তিনি এক সৃষ্টি থেকে অন্য সৃষ্টির পত্তন করলেন। যেমন আদমকে মাটি ও জীনকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন।
***[এখানে একটি কথা উল্লেখ করতে চাই যে, যা লেখক লিখেননি ! নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুরকে সর্ব-প্রথম আল্লাহর নুর থেকে সৃষ্টি করেন ! সেই নুরে মুহম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকেই সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেন। এখানে 'এক সৃষ্টি' বলতে লেখক ইহাই বুঝিয়েছেন।]***
দলীল-প্রমাণ ও যুক্তি-বুদ্ধির মিলিত সিদ্ধান্ত হল এই, গোটা সৃষ্টি জগতকে আল্লাহ পাক কয়েকটি শ্রেণী ও জাতিতে সবিন্যস্ত করে রূপ দিয়েছেন। তারপর সেই জাতি ও শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য সুনির্দিষ্ট করেছেন। যেমন, মানুষের বৈশিষ্ট্য হল বাকবিন্যাস, মসৃণ চর্ম, সরল আকৃতি ও যুক্তি-বুদ্ধি। পক্ষান্তরে অশ্বের বৈশিষ্ট্য হল হ্রেষারব, লোমশ চর্ম, বংকিম আকৃতি ও যুক্তি-বুদ্ধিহীনতা। তেমনি বিষের বৈশিষ্ট্য হল নিধন শক্তি, আদার বৈশিষ্ট্য ঝাঁঝ ও শুষ্কতা এবং কর্পূরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোমলতা ও শীতলতা। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায় খনিজ দ্রব্য, গাছ-পালা, জীবজন্তু এবং অন্যান্য শ্রেণী ও জাতির সৃষ্টিতেও।
আল্লাহর বিধানের বিশেষত্ব এটাই, কোন বস্তু তার নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা গুণ থেকে পৃথক হতে পারে না। একই মানুষের প্রত্যেকেই যেভাবে নিজ বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্র হয়ে আছে। ঠিক এ অবস্থাই প্রতিটি বস্তুর গুণাগুণ ও প্রভাবের । বিশেষ-অবিশেষ সব কিছুর ভেতরেই সাধারণতঃ তার পরিচয় মিলে। কোথাও বিশেষ ভাবে তা প্রতিভাত হয়ে থাকে। বস্তু, উদ্ভিদ, জীবজন্তু ও মানুষ সবার ভেতরেই সাধারণ কিছু গুণাগুণ ও প্রভাবাদি রয়েছে। তেমনি বিশেষ গুণাগুণ ও প্রভাবাদিও বিশেষ ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। সাধারণের দৃষ্টিতে এ বিশেষ বৈশিষ্ট্য ধরা দেয়না। সব কিছুকে তারা সাধারণ বৈশিষ্ট্য একাকার দেখতে পায়। গভীর জ্ঞানই শুধু সেই সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করে সঠিক প্রভাবাদির সাথে তার সম্পর্ক স্থাপনে সমর্থ। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অনেক বস্তুর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করে তার সঠিক প্রভাব নির্ধারণ করে গেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, ‘তালবীবা (খাদ্য বিশেষ) রোগীর জন্য আনন্দ ও শক্তিবর্ধক। কালিজিরা মৃত্যুব্যাধি ছাড়া সব রোগেরই প্রতিষেধক। উটের দুধ ও প্রস্রাব দুটোই হজমের দাওয়াই। শিরাম (বিশেষ বীজ) ঝাঁঝ বিশিষ্ট।
তৃতীয় পর্যায়ে পাই কার্যকারণ রীতির সৃষ্টি। এ রীতিতে প্রতিটি তাঁর প্রবর্তিত প্রাকৃতিক নিয়মে দেখা দেয় এবং যে সৃষ্টি থেকে তিনি যে উদ্দেশ্য সাধন করতে চান তা সে গুণ নিয়েই দেখা দেয়। যেমন মেঘ থেকে তিনি বারিপাত ঘটান। তা থেকে মাটি সজীব করে ফসল ফলান। সে ফসল দ্বারা জীবজন্তু ও মানুষ প্রতিপালন করেন। আবার দেখি, ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হলে তাঁকে বাঁচাবার জন্য তিনি আগুনকে প্রয়োজনীয় শীতলতা দান করলেন। তেমনি আইউব (আঃ)-এর দেহে রোগ জীবাণু পূর্ণ করে অবশেষে তা নির্মূল করার জন্য একটি প্রস্রবণ সৃষ্টি করলেন।
এভাবে দেখি, আল্লাহ তা'আলা দুনিয়াবাসীর দিকে একবার দৃষ্টি দিলেন। তাদের পাপাচার দেখে ক্ষুব্ধ হলেন। তারপর ওহীর মারফৎ এক নবী মনোনীত করে তাঁকে দায়িত্ব দিলেন আল্লাহর শাস্তি ও পুরস্কারের ব্যাপারে তাদের সচেতন করার। অবশেষে তাঁকে নির্দেশ দিলেন শক্তি প্রয়োগের (জেহাদের) মাধ্যমে তাদের পাপের আধাঁরপুরী থেকে উদ্ধার করে পূণ্যলোকে উদ্ভাসিত করতে।
কার্য-কারণ রীতিতে সৃষ্টির ভেতরেই যে সৃজনী শক্তি দিয়ে দেয়া হয় তা যখন পরস্পর সন্নিহিত হয়ে সংঘাতে লিপ্ত হয়, তখন আল্লাহর ইচ্ছায় তা থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়াজাত জিনিস আত্ম প্রকাশ করে। তার ভেতরে কিছু হয় মৌলিক ও কিছু থাকে কৃত্রিম। কৃত্রিমগুলোর ভেতর থাকে কোন প্রাণীর প্রক্রিয়া কিংবা ইচ্ছা অথবা এ দুয়ের ব্যতিক্রমে অন্য কিছু। তাই এ সব প্রতিক্রিয়াজাত জিনিস ও তার ধরনের ভেতরে কার্যকারণ রীতির ব্যতিক্রম বা বিপরীত কিছু দেখা দেয়াটা অন্যায় নয়।
এটা তো সাধারণ রীতি যে, কোন কিছুর অস্তিত্ব লাভের কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে যে গবেষণা করা হয় তা হলে নিঃসন্দেহে তা ভার ও কল্যাণকর প্রতীয়মান হবে। দেখুন, লোহা কাটবে এটাই তার উদ্দেশ্য, তাই তা ভাল। তবে যে মানুষটিকে কাটবে সে মানুষটির জীবন খতম হয়ে যাবে, এ দৃষ্টিতে লোহার কাটবার শক্তিটা নিন্দনীয় হতে পারে। হ্যাঁ, প্রতিক্রিয়া ও প্রকৃতিতে আরও দু’ধরনের মন্দ কথা দিতে পারে। (১) যে কল্যাণের উদ্দেশ্যে তার সৃষ্টি তাতে শূন্যতা দেখা দেয়া। (২) কোন কল্যাণকর প্রভাবের আদৌ অনুপস্থিতি। যখন এ ধরনের মন্দ দেখা দেবার কারণ তৈরী হয়, তখন আল্লাহর অপার করুণা, পরিপূর্ণ ক্ষমতা, সর্বব্যাপী জ্ঞানের দাবী সেই সৃজনী শক্তিগুরোর ও বস্তুনীচয়ের ওপর কবজ, বাসাত, ইহালা ও ইলহামের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করেন এবং সেগুলোকে উদ্দেশ্য অনুসারে পরিচালিত করান।
‘কবজ’ অর্থ হরণ। তার উদাহরণ এই, হাদীসে আছে, দাজ্জাল ঈমানদার ব্যক্তিটিকে দ্বিতীয়বার হত্যার প্রয়াস পাবে। কিন্তু আল্লাহ তার হত্যা করার শক্তি হরণ করবেন। যদিও হত্যার সব হাতিয়ার ও উপকরণ তার বহাল থাকবে।
বাসাত অর্থ অস্বাভাবিক। তার উদাহরণ এই, হযরত আইউব (আঃ)-এর আরোগ্য লাভের জন্য ফেরেশতারা চঞ্চুর ঘায়ে প্রস্রবণ তৈরী করলেন। অথচ কার্যকারণের স্বাভাবিক রীতিতে তা হয় না। তেমনি কোন কোন প্রেমিক বান্দা দ্বারা আল্লাহ জেহাদের ময়দানে এমন কাজ করান যা তার মত লোকের কিংবা তার মত কয়েকজনের পক্ষে আদৌ স্বাভাবিক নয় ।
[এখানে মউলা আলী (রঃ) এর কথা স্বরণযোগ্য। খায়বারের যুদ্ধে তা অনুমাযোগ্য। আমার নিজস্ব মতামত ]
ইহালা অর্থ অসম্ভব বা অলৌকিক। যেমন, হযরত ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হলে আগুন ঠাণ্ডা হয়ে তাঁকে শান্তিতে বাঁচিয়ে রাখলেন।
ইলহাম অর্থ দিব্যজ্ঞান বা অবতীর্ণ জ্ঞান। হযরত খিজির (আঃ) ও মূসার (আঃ) ভ্রমণ বৃত্তান্তটি তার উদাহরণ। নৌকাগুলো ভেংগে দেয়া, ছেলেটি হত্যা করা ও দেয়াল সংস্কার করে দেয়ার কাজ খিজির (আঃ) দিব্যজ্ঞানের নির্দেশে করেছেন। নবীদের ওপর গ্রন্থ ও বিধি-বিধান অবতীর্ণ হওয়াও ইলহামের অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তি বিশেষেরও প্রয়োজনীয় মুহুর্ত তা হাসিল হতে পারে। কখনও প্রয়োজনীয় ব্যক্তি সম্পর্কে অন্যের ইলহাম অর্জিত হতে পারে। কুরআন পাকে কার্যকারণ রীতির এত সব শ্রেণী ও ধরনের বর্ণনা রয়েছে যা অতিক্রম করা কখনও কারও পক্ষে সম্ভব হবে না।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন