নির্জনবাস (পর্ব- ৭)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
নির্জনবাসের উপসংহার—
নির্জনবাসের উপকারিতা ও বিপদাপদ জানার পর একথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নির্জনবাস উত্তম কিংবা উত্তম নয়- সর্বাবস্থায় একথা বলা নিতান্তই ভুল; বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, তার অবস্থা, তার সঙ্গী ও সঙ্গীর অবস্থা দেখা উচিত। আরও দেখা উচিত, মেলামেশার কারণ কি এবং মেলামেশার কারণে কোন্ কোন্ উপকারিতা হাতছাড়া হয়ে যাবে এবং কি উপকার পাওয়া যাবে? এরপর উপকার ও ক্ষতি তুলনা করতে হবে । তখন গিয়ে সত্য বিষয়টি প্রস্ফুটিত হয়ে যাবে এবং কোন্টি উত্তম তা জানা যাবে। এ সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ীর বক্তব্য চূড়ান্ত মীমাংসা। তিনি বলেন : হে ইউনুস, মানুষের কাছে সংকুচিত হয়ে থাকা শত্রুতার কারণ এবং তাদের সাথে অধিক খোলামেলা থাকা অসৎ সঙ্গী সৃষ্টি করে। অতএব এমনভাবে থাকা উচিত, না সংকুচিত, না খোলামেলা। শেখ সা'দী (রহঃ) বলেন "মানুষের সাথে এতটুকু কঠোরতা করো না যে, তোমার কাছ থেকে পালিয়ে যায় এবং এতটুকু নম্রতাও করো না যে, তোমার মাথায় চড়ে বসে" মোট কথা, মেলামেশা ও নির্জনবাসের মধ্যে সমতা আবশ্যক। এটা অবস্থাভেদে বিভিন্ন রূপ হয়ে থাকে এবং উপকারিতা ও বিপদাপদ দেখে নিলে উত্তম পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। এ সম্পর্কে সত্য ঠিক এটাই৷ এছাড়া কেউ কেউ যা বলেছে, তা অসম্পূর্ণ; বরং প্রত্যেকেই এমন বিশেষ অবস্থা উল্লেখ করেছে, যার মধ্যে সে নিজে রয়েছে। অন্য ব্যক্তি, যে এ অবস্থার মধ্যে নয়, তার সম্পর্কে একথা বলা ঠিক হবে? বাহ্যিক শিক্ষায় সুফী ও আলেমের মধ্যে এটাই পার্থক্য। সুফী সেই বক্তব্যই পেশ করে, যে অবস্থার মধ্যে সে নিজে থাকে। এ কারণে মাসআলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে সুফীদের জওয়াব বিভিন্ন হয়। পক্ষান্তরে আলেম বাস্তব ক্ষেত্রে যা সত্য, তাই উদঘাটন করে এবং নিজের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করে না। এ কারণে আলেম যা বলে, তাই সত্য হয়। এতে বিরোধের অবকাশ থাকতে পারে না। কেননা, সত্য সর্বদা একই হবে আর অসত্য অনেক হয়ে থাকে। এসব কারণেই সুফী বুযুর্গগণকে যখন দরবেশী কি, জিজ্ঞেস করা হল, তখন প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন জওয়াব দিলেন। সেই জওয়াব যদিও জওয়াবদাতার অবস্থানুসারে সত্য; কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে সত্য নয়। কেননা, সত্য তো এক ও অভিন্ন হয়ে থাকে। উদাহরণতঃ আবু আবদুল্লাহ্কে দরবেশী কি, জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : নিজের উভয় আস্তিন প্রাচীরে মেরে বলা- আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ্ তা'আলা, এটাই দরবেশী। হযরত জুনায়দ বাগদাদী (রহঃ) এর জওয়াবে বলেনঃ দরবেশ সে ব্যক্তি, যে সওয়াল করে না এবং কারও অসুবিধা সৃষ্টি করে না। তার সাথে কেউ ঝগড়া করলে সে চুপ হয়ে যায়। সহল ইবনে আবদুল্লাহ্ বলেন : দরবেশ সেই ব্যক্তি, যে সওয়াল করে না এবং সঞ্চয় করে না। অন্য এক বুযুর্গ বলেন : দরবেশী হচ্ছে তোমার কাছে কিছু না থাকা। কোন সময় থাকলেও তাকে নিজের মনে না করা। ইবরাহীম খাওয়াস (রহঃ) বলেন দরবেশী হচ্ছে অভিযোগ না করা এবং নেয়ামত প্রকাশ করা। উদ্দেশ্য, যদি একশ' জনকে জিজ্ঞেস করা হয়, তবে একশ'টি ভিন্ন ভিন্ন জওয়াব পাওয়া যাবে। সম্ভবতঃ দু'টি জওয়াবও একরকম হবে না। কিন্তু কোন না কোন দিক দিয়ে সবগুলো জওয়াবই সঠিক হবে। কেননা, প্রত্যেকের জওয়াব তার অবস্থার বর্ণনা হবে। এ কারণেই এ সম্প্রদায়ের দু’ব্যক্তি এমন দেখা যাবে না, যাদের একজন অপরজনকে সুফীবাদে সুদৃঢ় বলে এবং তার প্রশংসা করে; বরং প্রত্যেকেই দাবী করে, সেই প্রকৃত সত্যের সাধক। কিন্তু শিক্ষার নূর যখন চমকে উঠে, তখন সবকিছু বেষ্টন করে নেয় এবং গোপনীয়তার পর্দা ফাঁস করে দেয়। কোন মতবিরোধ থাকতে পারে না। সুফীগণের মতবিরোধের দৃষ্টান্ত হচ্ছে, আমরা সূর্য ঢলে পড়ার সময় আসল ছায়া সম্পর্কে নানাজনের নানা উক্তি প্রত্যক্ষ করেছি। কেউ বলে গ্রীষ্মকালে ছায়া দুকদম হয়। কেউ বলে অর্ধেক কদম হয়। কেউ এতে আপত্তি করে বলে শীতকালে সাত কদম হয়। আবার কেউ পাঁচ কদম বলে। সূফীগণের জওয়াবের অবস্থাও তেমনি। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ শহরের আসল ছায়া দেখে জওয়াব দেয়। এটা সঠিক; কিন্তু অপরের জওয়াবকে ভুল আখ্যা দেয়া অন্যায়। কেননা, সে সারা বিশ্বকে নিজের শহর অথবা তার মত মনে করে নেয়। আলেম ব্যক্তি জানে, ছায়া কি কারণে ছোট বড় হয় এবং বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন হয়? নির্জনবাস ও মেলামেশার ফযীলত সম্পর্কে এতটুকু বর্ণনা করাই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল। এখন যদি কেউ নির্জনবাসকে নিজের জন্যে শ্রেষ্ঠ ও অধিকতর নিরাপদ মনে করে, তবে তার জন্যে নির্জনবাসের আদব কি, তা সংক্ষেপে বর্ণনা করে দিচ্ছি।
প্রথমে নিয়ত করতে হবে, তার দ্বারা যেন অন্যের কোন অনিষ্ট না হয়। দ্বিতীয়, মানুষের যোগদান থেকে নিরাপদ থাকার নিয়ত করবে। তৃতীয়, মুসলমানদের হক আদায়ে ত্রুটি থেকে মুক্তির নিয়ত করবে। চতুর্থ, কায়মনোবাক্যে আল্লাহর এবাদতের জন্যে মুক্ত হওয়ার নিয়ত করবে। এভাবে নিয়ত করার পর নির্জনে এলেম, আমল ও যিকির ফিকিরে আত্মনিয়োগ করবে। মানুষকে অধিক আসা যাওয়া করতে বারণ করবে। নতুবা অধিকাংশ সময় একাগ্রতা হবে না। শহরের খবরাখবর শুনবে না। কেননা, খবরাখবর কানে পড়া এমন, যেমন মাটিতে বীজ পড়া, যা অবশ্যই অংকুরিত হয় এবং শিকড় ও ডালাপালা সৃষ্টি করে। এমনিভাবে খবরও মনের মধ্যে শাখ -প্রশাখা বিস্তার করে এবং নানা কুমন্ত্রণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। কুমন্ত্রণা থেকে অস্তর মুক্ত হওয়া নির্জনবাসের জন্যে অত্যন্ত জরুরী। অল্প জীবিকায় সন্তুষ্ট থাকা উচিত। অধিক জীবিকা পেতে চাইলে বাধ্য হয়ে মেলামেশা করতে হবে। প্রতিবেশীদের জ্বালাতনে সবর করতে হবে। তারা যদি নির্জনবাসের কারণে প্রশংসা করে অথবা মেলামেশা বর্জন করার কারণে তিরস্কার করে, তবে কিছুই শুনবে না এবং আপন ধ্যানে মগ্ন থাকবে। কেননা, এসব বিষয় অল্প শুনলেও অনেক ক্ষতি করে। কোন ওযিফা পাঠ কিংবা যিকির করার সময় মনকে উপস্থিত রাখবে অথবা আল্লাহ্ তা'আলার প্রতাপ, গুণাবলী, ক্রিয়াকর্ম এবং আকাশ ও পৃথিবীর রহস্য সম্পর্কে ফিকির করবে অথবা আমলের সূক্ষ্মতা ও মনের রিপুগুলোর কথা চিন্তা-ভাবনা করবে এবং এগুলোকে দমন করতে সচেষ্ট হবে। গৃহের কোন লোক অথবা একজন সৎসঙ্গীও থাকা বাঞ্ছনীয়, যাতে নির্জনবাসী দিনে এক ঘন্টা তার সাথে মনোরঞ্জন করে এবং উপর্যুপরি মেহনত থেকে স্বস্তি লাভ করে। নির্জনবাসে মৃত্যুকে অধিক স্মরণ করতে হবে। একাকিত্বে মনে বিরক্তি দেখা দিলে মনে করবে, কবরে কে সাথে থাকবে? সেখানেও তো একা থাকতে হবে। যে আল্লাহ্'র যিকির ও মারেফতের সঙ্গ লাভ করে, মৃত্যুর পরও তার এই সঙ্গ বিনষ্ট হয় না; বরং এই সঙ্গের কারণে সে জীবিত ও প্রফুল্ল থাকে যেমন- শহীদদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : "যারা আল্লাহ্'র পথে জেহাদ করে শহীদ হয়, তাদেরকে মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত- পালনকর্তার রিযিকপ্রাপ্ত।" আল্লাহ্ যে অনুগ্রহ তাদেরকে দান করেছেন, তজ্জন্যে তারা প্রফুল্ল। আল্লাহ্'র জন্যে মেহনতকারী ব্যক্তিও মৃত্যুর পর শহীদ হয়। কেননা, সে-ই মুজাহিদ, যে আপন নফস ও খাহেশের বিরুদ্ধে জেহাদ করে। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : নফসের জেহাদই বড় জেহাদ। সাহাবায়ে কেরাম বলেন আমরা ছোট জেহাদ থেকে বড় জেহাদের দিকে প্রত্যাবর্তন করছি; অর্থাৎ, নফসের জেহাদের দিকে।
প্রথম পর্ব
নির্জনবাসের আদব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন