যশ ও রিয়া (পর্ব - ১৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
পিপিলিকার চলনের ছেয়েও গোপন রিয়া-
রিয়া দু'প্রকার- ‘জলী’ (প্রকাশ্য) ও ‘খফী’ (গোপন) যে রিয়া সওয়াবের নিয়ত না থাকা সত্ত্বেও মানুষকে আমল করতে উদ্বোদ্ধ করে, এটাই প্রকাশ্য রিয়া। এ প্রকার রিয়া দ্রুত বুঝা যায় এবং রিয়াকারও জেনে নেয় যে সে রিয়া করেছে। এর ছেয়ে সামান্য গোপন সেই রিয়া, যা আমল করার কারণ তো হয় না, কিন্তু সওয়াবের নিয়তে যে আমলটি করা হয় তা এই রিয়ার কারণে সহজ হয়ে যায়। উদাহরণত : এক ব্যক্তি প্রত্যহ তাহাজ্জুদ পড়ে ; কিন্তু কিছুটা কষ্ট ও অবহেলার সাথে পড়ে ; কিন্তু বাড়িতে কোন মেহমান আগমন করলে তাহাজ্জুদ পড়া তার জন্য সহজ ও আনন্দের কাজ হয়ে যায়। সে এটাও জানে যে, সওয়াবের আশা না থাকলে কেবল এই মেহমানকে দেখানোর জন্য সে তাহাজ্জুদ পড়তনা।
এর ছেয়ে অধিক গোপন সেই রিয়া, যা আমলের কারণও হয়না এবং এবং আমলকে সহজও করেনা, এতদসত্বেও তা অন্তরে লুক্বায়িত থাকে। আমলের উপর এর কোন প্রভাব নেই বিধায় আলামত ছাড়া একে জানাও সম্ভবপর নয়। এর সুস্পষ্ট আলামত এই যে, এই রিয়াকারের
আমল সম্পর্কে মানুষ অবগত হলে সে খুশী হয়। যেমন অনেক আবেদ রয়েছে যারা নিষ্টা সহকারে এবং রিয়ায় বিশ্বাস করেনা ; বরং একে খারাপ মনে করে। কিন্তু তাদের এবাদত সম্পর্কে মানুষ অবগত হয, তখন তারা আনন্দ অনুভব করে- যেন এবাদতে পরিশ্রম করা একটি বোঝা অন্তর থেকে নেমে গেল। বলা বাহুল্য, একটি গোপন রিয়া থেকেই এই আনন্দের উৎপত্তি। কারণ অন্তর যদি মানুষের দিকে ভ্রূক্ষেপ না করত, তবে মানুষ অবগত হওয়ার কারণে এই আনন্দ কখনো হতনা।
অতএব জানা গেল যে, পাথরে যেমন আগুন লুকিয়ে থাকে, তেমনি এই রিয়াও অন্তরে প্রচ্ছন্ন ছিল, যার মধ্যে মানুষের অবগতি চমকি পাথরের কাজ করছে এবং আনন্দের চিহ্ন ফুটিয়ে তুলেছে। এর পর এই অবগতির থেকে উদ্বুত আনন্দের স্বাধ যদি আবেদ গ্রহন করে এবং ঘৃনা দ্বারা ক্ষতিপূরণ না করে, তবে এই আনন্দই গোপন রিয়ার শক্তি ও খাদ্য হয়ে যায়।
এর ছেয়ে অধিক গোপন সেই রিয়া, যাতে মানুষের অবগতির খায়েশও থাকেনা ও এবাদত প্রকাশ পেলে আনন্দও হয় না, কিন্তু এতদসত্বেও এটা ভাল মনে হয় যে, মানুষ তাকে দেখামাত্রই প্রথমে সালাম করুক, সসম্ভ্রম ব্যবহার করুক, তার কাজে সন্তুষ্ট থাকুক এবং কেনা বেচায় তার খ্যাতি করুক। এসব ব্যাপারে কেউ ত্রুটি করলে সেটা তার কাছে দুঃসহ কষ্টের কারণ ও অবাস্তব মনে হয়। এমতাবস্থায় সে যেন এই সম্মান ও সম্ভ্রম সেই এবাদতের কারণে চায়, যা সে গোপনে করে এবং কাউকে জানায় না। পূর্বে এই এবাদত না করলে সম্মান প্রদর্শনে মানুষের ত্রুটি তার কাছে অবাস্তব মনে হত না। সুতরাং এই সকল এবাদতে আবেদ কেবল আল্লাহ্ তা'আলার অবগতিতে সন্তুষ্ট থাকেনা বিধায় তার সাথে গোপন রিয়ার সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায়, যা পিপীলিকার চলন থেকেও অধিক গোপন। এই রিয়া যদি সওয়াব বরবাদ করে দেয়, তবে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। সিদ্দীকগণ ছাড়া কেউ এই রিয়া থেকে বাঁচতে পারেনা। সওয়াব বরবাদ করার দলীল হযরত আলী (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই উক্তি-
>"কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা ক্বারীগণকে বলবেন, - তোমাদের জন্য কি লোকেরা পণ্য-দ্রব্যের দাম সস্তা করত না? তোমাদেরকে কি প্রথমে সালাম করত না? তোমাদের অভাব অনটন কি দূর করত না? অতএব আজ তোমাদের জন্য কোন পুরষ্কার নেই। তোমাদের পুরষ্কার তোমরা দুনিয়াতেই আদায় করে নিয়েছ।
এখন প্রশ্ন হয়, এবাদত প্রকাশ হয়ে পড়লে আনন্দিত হয় না- এমন লোক আমরা দেখি না; বরং এ ব্যাপারে প্রত্যেক এবাদতকারী-ই কিছু না কিছু আনন্দ অনুভব করে। অতএব সকল প্রকার আনন্দই কি নিন্দনীয়? না কিছু নিন্দনীয় ও কিছু প্রসংশনীয় আছে? এ প্রশ্নের জবাব এই যে, সকল প্রকার আনন্দই নিন্দনীয় নয়; বরং এবাদত প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আনন্দ পাঁচ প্রকার হতে পারে। তন্মধ্যে চার প্রকার ভাল এবং এক প্রকার মন্দ।
ভাল চার প্রকারের
(১) প্রথম প্রকার এই যে, এবাদত গোপন ও একনিষ্ট থাকুক এটাই আবেদের কাম্য। কিন্তু প্রকাশ হয়ে যাওযার পর আবেদ এই ভেবে আনন্দিত হয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা আমার প্রতি কৃপা ও সদয় ব্যবহার করতে চান, তাই আমার গুনাহসমূহ গোপন করেন এবং অনুগত্য প্রকাশ করে দেন। আমার ইচ্ছা ছিল গুনাহ ও অনুগত্য উভয়টি গোপন থাকুক। অতএব এর ছেয়ে বড় কৃপা আর কি হবে যে, তিনি গুনাহ্ কে ঢেকে রেখেছেন আর এবাদতকে প্রকাশ করে দিয়েছেন। আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের কথা ভেবে আবেদের এহেন আনন্দ খারাপ নয়, বর়ং উত্তম।
যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন,
>"বলুন, আল্লাহর কৃপা ও রহমতে ! অতএব এতেই আনন্দিত হওয়া উচিত।"
এ আনন্দের কারণ এই হল যে, আবেদ জানতে পারল সে আল্লাহ্ তা'আলার একজন প্রিয় বান্দা।
(২) দ্বিতীয় প্রকার এই ভেবে আনন্দিত হওয়া যে, আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়াতে যেমন আমার গুনাহ ঢেকে রেখেছেন এবং এবাদত প্রকাশ করে দিয়েছেন, তেমনি আখেরাতেও করবেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে -
>"আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়াতে যে গুনাহ গোপন রাখেন, আখেরাতেও তাই গোপন রাখেন।"
অতএব, এ আনন্দের কারণ হচ্ছে ভবিষ্যত আল্লাহর প্রিয় হওয়ার আশা।
(৩) তৃতিয় প্রকার এই ভেবে আনন্দিত হওয়া যে, এই অনুগত্য প্রকাশ হইয়া পড়লে মানুষ আমার অনুসরণ করবে এবং এমনি ধরণের অনুগত্য করবে। ফলে আমার সওয়াব আরো বেড়ে যাবে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ মুবারক করেন-
>"যে ব্যক্তি কোন সওয়াবের কাজ করে এবং মানুষ তার অনুসরণ করে, সে অনুসারীদের সমান সওয়াব পেতে থাকে এবং তাদের সওয়াব হ্রাস করা হয়না।"
বলা বাহুল্য, সওয়াব বৃদ্ধির আশা করা আনন্দদায়ক। এ ক্ষেত্রে সংস্লিষ্ট এবাদতকে গোপন করার সওয়াবও পাবে এবং পরে প্রকাশ হয়ে পড়ার কারণেও সওয়াব পাবে।
(৪) চতুর্থ প্রকার এই ভেবে আনন্দিত হওয়া যে, তারা তার এবাদত সম্পর্কে অবগত হয়ে তার প্রশংসা করেছে, তারা আল্লাহ্ তা'আলার মরযী ও পছন্দ অনুযায়ী কাজ করেছে। কারণ তারা অনুগত বান্দাকে প্রিয়পাত্র মনে করেছে। এতে বুঝা যায়, তাদের মন-মেজায অনুগত্যপ্রবণ। নতুবা কতক ঈমানদার এমনও রয়েছে, যারা এবাদতকারীদেরকে দেখলে হিংসা করে, নিন্দা করে এবং রিয়াকারী আখ্যা দিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। সুতরাং প্রসংশা দ্বারা জানা গেল যে, প্রসংশাকারীদের ঈমান সঠিক। এ ক্ষেত্রে এবাদতকারীর আন্তরিকতার আলামত এই যে, মানুষ অন্য কোন এবাদতকারীর প্রসংশা করলেও সে ততটুকু আনন্দিত হয়, যতটুকু নিজের প্রসংশার কারণে হয়।
(৫) পঞ্চম প্রকার আনন্দ যা মন্দ, তা হচ্ছে এই ভেবে আনন্দিত হওয়া যে, এবাদতের কারণে মানুষের মনে আমার মর্যাদা প্রতিষ্টিত হয়ে গেছে। ফলে তারা আমার তারিফ ও তাযীম করতে শুরু করেছে, উঠা বসায় আমাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং আমার প্রয়োজনে সহায়তা করছে। এবাদতকারীর এই প্রকার আনন্দ নিঃসন্দেহে গর্হিত।
পরবর্তী পর্ব-
গোপন ও প্রকাশ্য রিয়ার মধ্যে যেগুলি বাতিল

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন