বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০২৩

যশ ও রিয়া - (১২) রিয়ার বিভিন্ন স্থর



যশ ও রিয়া (পর্ব - ১২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রিয়ার বিভিন্ন স্থর
জানা উচিত যে, রিয়ার চারটি স্তর রয়েছে।
(১) প্রথম স্তর হল,  সওয়াবের ইচ্ছা মোটেই না থাকা। উদাহরণত: এক ব্যক্তি জনসমক্ষে নামাজ পড়ে এবং একাকী হলে পড়েনা; বরং মাঝে মাঝে উযু ছাড়াই মানুষের সাথে দাড়িয়ে যায়। এরুপ ব্যক্তির ইচ্ছা কেবল রিয়া-ই রিয়া। ফলে সে আল্লাহ'র কাছে গযবের যোগ্য। রিয়ার এই স্তরটি কঠোরতর। 
(২) দ্বিতীয় স্তর হল সওয়াবের ইচ্ছা থাকবে, কিন্তু তা খুব দুর্বল। এমনকি একান্তে থাকলে এ ইচ্ছা এতটুকু থাকেনা যে, তার কারণে সেই আমলটি করে। এরুপ ব্যাক্তি প্রথমোক্ত ব্যক্তির কাছাকাছি। কেননা তার এমন ইচ্ছা নেই, যার কারণে আমলটি করতে পারে। এরুপ ইচ্ছা থাকা-না থাকা সমান।
(৩০ তৃতীয় স্তর হল, সওয়াবের ইচ্ছা এবং রিয়ার ইচ্ছা উভয়টি সমান থাকা। ফলে উভয় ইচ্ছা একত্রিত হলে সে আমল করে এবং একটি অনুপস্থিত থাকলে আমল করেনা। এরুপ ব্যক্তির অবস্থা এমন যে, সে যতটুকু নষ্ট করে ততটুকু গড়ে। ফলে আশা করা যায় যে, তার সওয়াব হবেনা অথবা যে পরিমান আযাব হবে,  সেই পরিমাণ সওয়াব হবে। হাদীসসমূহের বাহ্যিক অর্থ থেকে জানা যায় যে, এরূপ ব্যক্তিও আযাব থেকে বাঁচতে পারবেনা।
(৪) চতুর্থ স্থর হল, রিয়ার ইচ্ছা দুর্বল এবং সওয়াবের ইচ্ছা প্রবাল হওয়া। অর্থৎ মানুষ তার আমল জানতে পারলে তার স্ফূর্তি ও আনন্দ বেড়ে যায়। কিন্তু একাকী অবস্থায় এবাদত বর্জন করেনা। আমাদের ধারণায় এরূপ ব্যক্তির মূল সওয়াব বাতিল হবেনা। বরং কিছুটা হ্রাস পাবে অথবা রিয়া পরিমানে আযাব হবে এবং সওয়াবের ইচ্ছা পরিমানে সওয়াব হবে।

আল্লাহ'র এবাদত ও অনুগত্য দ্বারা রিয়া করা হলে সেদিকে লক্ষ্য করে রিয়ার দু'টি স্তর রয়েছে- মূল এবাদত দ্বারা রিয়া করা ও এবাদতের গুণ দ্বারা রিয়া করা। প্রথম স্থরের রিয়া অত্যন্ত মন্দ। এর তিনটি সোপান রয়েছে।
(১) প্রথম সোপান হল : মূল ঈমান দ্বারাই রিয়া করা, এরূপ রিয়াকার অনন্তকাল দোযকে বাস করবে। এ রিয়াকার সেই ব্যক্তি যে মূখে কলেমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করে, কিন্তু অন্তরে তাকে মিথ্যা বলে বিশ্বাস করে। নিছক লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে মুসলমানী প্রকাশ করে। কুরআন পাকের একাধিক জায়গায় আল্লাহ্ তা'আলা এ রিয়াকারদের অবস্থা বর্ণনা করেছেন। এক যায়গায় এরশাদ হয়েছে, 
>“হে রসূল ! যখন মুনাফেকরা আপনার কাছে আসে, তখন বলে : আমরা সাক্ষ্য দেই যে, -  আপনি অবশ্যই আল্লাহ'র রসূল। আল্লাহ্ জানেন যে, আপনি তার রসূল। আল্লাহ্ সাক্ষ্য দেন যে,  মুনাফেকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী”।
অর্থাৎ তাদের উক্তি তাদের আন্তরিক বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে : 
>“কোন কোন লোকের কথা পার্থিব জীবনে আপনাকে অবাক করবে। সে তার মনের কথার উপর আল্লাহ তা'আলাকে সাক্ষী করে;  অথচ সে কঠোর তার্কিক। যখন সে প্রস্থান করে, তখন চেষ্টা করে- পৃথিবীতে গোলযোগ সৃষ্টি করতে, শস্যক্ষেত্র বিনাশ করতে এবং প্রাণহানি ঘঠাতে। আল্লাহ গোলযোগ পছন্ধ করেন না।"
অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে, - 
>“যখন তোমাদের সাথে মিলিত হয,  তখন ওরা বলে : আমরা ঈমান এনেছি। আর যখন একান্তে যায, তখন তোমাদের উপর ক্রোধে অংগুলি চর্বন করে।"
আরো বলা হয়েছে : 
>“তারা লোক-দেখানো আমল করে। আল্লাহ-কে খুব কমই স্মরণ করে। তারা মানুষের মধ্যে দুদুল্যমান- না এই দলে, না ঐ দলে”।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে নিফাক অনেক বেশি ছিল। তখন কিছু লোক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বাহ্যত মুসলমান হয়ে যেত। বর্তমানে কম হলেও এর ধরণ ও নমুনা অনেক রয়েছে। উদাহরণত : কিছু লোক ধর্মদ্রোহীদের উক্তির দিকে ঝুকে পড়ে মনে মনে দোযক, জান্নাত ও কিয়ামত অস্বীকার করে অথবা শরীয়ত ও শরীয়তের বিধানাবলীকে বিধর্মীদের উক্তি অনুযায়ী অবশ্য পালনীয় মনে করে না। অথচ মুখে এর বিপরীত বর্ণনা করে। এ শ্রেনীর লোকও মুনাফেক ও রিয়াকার। এরা অনন্তকাল দোযকে থাকবে। কেননা এর ছেয়ে বড় কোন নিফাক নেই। এরা প্রকাশ্য কাফেরের চেয়েও মন্দ। কারণ কাফের বাইরেও শত্রু এবং ভিতরেও বেঈমান। কিন্তু এদের অবস্থা এইযে,  এরা মুখে আল্লাহ্ আল্লাহ বলে কিন্তু বগলে ছুরি লুকিয়ে রাখে।
(২) দ্বিতীয় সোপান হচ্ছে : মূল ঈমান স্বীকার করে মৌলিক এবাদত দ্বারা রিয়া করা। এ স্থরটিও আল্লাহ্ তা'আলার খুব অপছন্দনীয়। এর দৃষ্টান্ত এই যে, এক ব্যক্তি জন সমাবেশে উপস্থিত রয়েছে, এমন সময় নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গেল। সকলেই যখন নামাজ পড়ল, তখন সেও পড়ে নিল। অথচ একাকী নামাজ না পড়াই তার অভ্যাস। অথবা রমজান মাসে রোজা রাখল। কিন্তু যাতে রোজা রাখতে না হয, সেজন্য মানুষের কাছ থেকে দুরে চলে যাওয়ার ইচ্ছা রাখে। অথবা জুমআর নামাজের জন্য মসজিদে যায় ; কিন্তু লোকের নিন্দার আশংকা না থাকলে কখনো যেতনা। অথবা জেহাদ কিংবা হজ্জ কেবল মানুষের ভয়ে করে- মনের আগ্রহে নয়। এ ধরণের রিয়াকারের মধ্যে মূল ঈমান প্রতিষ্টিত থাকে, সে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কিছুকে উপাস্য মনে করে না। কেউ অন্য কিছুকে সেজদা করতে বললে সে করবে না। কিন্তু অলসতার কারণে আল্লাহর এবাদত করেনা। এবং জন সমাবেশে করলে খুশী হয়। অতএব আল্লাহর কাছে মর্যাদা লাভের ছেয়ে মানুষের কাছে মর্যাদা লাভ তার কাছে ভাল মনে হয়। তার কাছে মানুষের মন্দ বলার ভয় আল্লাহর আযাবের ভয়ের ছেয়েও বেশী। মানুষের প্রশংসার প্রতি তার আগ্রহ আল্লাহর সওয়াবের প্রতি আগ্রহের তুলনায় বেশী। বলা বাহুল্য এই ধরণের বিশ্বাস চরম মূর্খতা ছাড়া কিছুই নয়। এরূপ ব্যক্তি মূল ঈমানে বিশ্বাসী হলেও আল্লাহর গযবে পতিত হওয়ার যোগ্য।
(৩) তৃতীয় সোপান হচ্ছে : নফল ও মুস্তাহাব এবাদত দ্বারা রিয়া করা, যেই গুলি বর্জন করলে কেউ গুনাহ্-গার হয় না। কিন্তু একাকী থাকলে এর সওয়াব লাভ করতে সচেষ্ট হয় না এবং রিয়ার কারণে পালন করে। উদাহরণত নামাজের জামাতে শরীক হওয়া, রোগীর কুশল জিজ্ঞাসা করা, জানাজায় শরীক হওয়া, রাতে তাহায্যুত পড়া, আশুরার রোজা রাখা অথবা সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা। রিয়াকার এই সব এবাদত মানুষের নিন্দার ভয়ে অথবা মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে পালন করে। আল্লাহ্ তা'আলা জানেন যে,  একাকী হলে তারা ফরয সমুহের বেশী কিছু করত না। এ ধরণের রিয়াকার মন্দ হলেও পূর্ববর্তী সোপান সমূহের তুলনায় কম মন্দ।
এবাদতের গুণাবলীতেও রিযা হয়ে থাকে। উদাহরণত এক ব্যক্তি একাকী অবস্থায় নামাজ পড়লে দ্রুত গতিতে এবং কম সময়ে নামাজ সমাপ্ত করে নেয় কিন্তু জনসমক্ষে নামাজ পড়লে রুকু সেজদা উত্তম রূপে করে এবং সর্বাঁঙ্গীন সুন্দর রূপে নামাজ আদায় করে। হযরত ইবনে মাসুদ (রঃ) বলেন : যে ব্যক্তি এরূপ করে, সে তার পরোয়ারদেগারকে হেয় প্রতিপন্ন করে। অর্থাত নির্জন অবস্থায়ও যে আল্লাহ্ তা'আলা তার কর্ম সম্বন্ধে অবহিত আছেন, সে বিষয়ে পরোয় করেনা।

পরবর্তী পর্ব-
পিপিলিকার চলনের ছেয়েও গোপন রিয়া

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...