মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৩) মালা-ই-আলা (সর্বোচ্চ পরিষদ)



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৩)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

মালা-ই-আলা  (সর্বোচ্চ পরিষদ) 
আল্লাহর সর্বোচ্চ পরিষদের মহামান্য ফেরেশতাদের বর্ণনাই এ পরিচ্ছেদের উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং বলছেনঃ 
 আরশ মুআল্লার বাহক ও তা বেষ্টনকারী পরিষদ আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনায় নিরত থাকেন এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ প্রত্যয় নিয়ে ঈমানদার বান্দাদের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকেন। তাঁরা বলতে থাকেনহে আমাদের প্রভু ! সব কিছুই ঘিরে আছে তোমার জ্ঞান ও করুণা ! (আপনি সবই জানেন ও সবার প্রতি আপনার সহৃদয় সৃষ্টি)। তাই যে বান্দারা আপনার দিকে মুখ ফিরিয়েছে ও আপনার দেখানো সরল পথ অনুসরণ করেছেতাদের আপনি ক্ষমা করুন। তাদের দোযখের আগুন থেকে রেহাই দেন। হে আল্লাহ ! তাদের ও তাদের বাপ-মাস্ত্রী-পুত্রদের যারা ঈমানদার তাদের সবাইকে চিরন্তর জান্নাতের বাসিন্দা করুন। তাদের জান্নাত দানের আপনি ওয়াদা করেছেন। আপনিই সর্বশক্তিমান ও শ্রেষ্ঠতম কুশলী। হে মাবুদ ! তাদের অকল্যাণ থেকে বাঁচায়ে রাখুন। আপনি সেদিন যাদের অকল্যাণ থেকে বাঁচাবেনতার ওপর বড়ই দয়া দেখানো হবে। এটাই চরম সাফল্যপরম অভীষ্ট লাভ।(সূরা মুমিনঃ আয়াতঃ ৭-৯)

রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেনআল্লাহ তায়ালা যখন আরশ থেকে কোন ফরমান জারী করেনতখণ ভয়ে ফেরেশতাদের পাখা ও পালক ঝড়পেটা হতে থাকে। তাতে পাথরে জিঞ্জীর আছড়ানোর মত ঝনৎকার শ্রুত হয়। তারপর যখন তাদের অন্তর থেকে ভয় ও অস্থিরতা দূর হয়তখন একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনআল্লাহ পাক কি নির্দেশ দিলেনতখন কেউ বলে দেনতিনি অমুক সত্যটি প্রকাশ করেছেন এবং তিনিই সর্বোন্নত ও শ্রেষ্ঠতম। 

অন্য এক বর্ণনায় এরূপ বলা হয়েছেআল্লাহ পাক যখন কোন নির্দেশ দেনতখন আরশবাহী ফেরেশতারা তাঁর তাসবীহ পাঠ করতে থাকেন। তারপর তা অনুসরণ করেন আরশের পার্শ্বস্ত মজলিস সদস্যরা। এ ভাবে পর্যায়ক্রমে পার্শ্বষ্থ নিম্নতর আকাশেরএমনকি দুনিয়ার ফেরেশতা পর্যন্ত তাসবীহ পাঠের অনুসরণ করে চলে। অবশেষে আরশের নিম্ন দিকের ফেরেশতারা আরশবাহী ফেরেশতাদের প্রশ্ন করেনপ্রভু তোমাদের কি নির্দেশ দিলেনতখন তাঁরা প্রভুর নির্দেশ বলে দেন এবং তা আবার পর্যায়ক্রমে শ্রুত হয়ে সপ্ত আকাশ পেরিয়ে দুনিয়ার ফেরেশতাদের কাছে পৌঁছে যায়। 

অন্যত্র তিনি বলেনআমি তাহাজ্জুদের জন্যে জেগে উঠে ওজু সেরে আল্লাহ যতখানি তাওফিক দিলেন নামায পড়লাম। নামাযের ভেতরেই তন্দ্রা এল এবং ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন হলামদেখতে পেলামআল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত পবিত্র রূপে জ্যোতির্ময় হয়েছেন। তিনি বলছেনহে হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ! আমি জবাব দিলামহে আমার প্রতিপালক ! আমি উপস্থিত রয়েছি। তিনি প্রশ্ন করলেনসর্বোচ্চ পরিষদের ফেরেশতারা কোন সম্পর্কে আলোচনা করছেআরজ করলামআমার তো জানা নেই। তিনি একে একে তিনবার একই প্রশ্ন করলেন এবং আমিও একই উত্তর দিলাম। 

**** [এখানে একটি কথা উল্লেখ করাটা জরুরী যে, যদি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সর্বোচ্ছ পরিষদের ফেরেশতাদের খবর না জানতেন আল্লাহ্ তা'আলা প্রশ্নইবা কেন করলেন? হয়ত মনে প্রশ্ন জাগতে পারে তাহলে তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জানা নেই কেন বললেন? তার জবাবে বলতে পারি সেটা হল আদব রক্ষা করা। উদাহরণ স্বরুপ বলতে পারি, বিদায় হজ্জের খুতবা দেয়াকালে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবীয়েকেরামের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আজকের এই দিন কোন দিন? সকলে সমস্বরে আরজ করলেন আপনিই ভাল জানেন ইয়া রসূলুল্লাহ্ ! তাহলে জিজ্ঞাসই বা কেন করা হল? তাছারা সাহাবীদের কি জানা ছিলনা সেই দিন আরাফার দিন? জানা না থাকলে আরাফার ময়দানে কেন সমবেত হলেন সবাই? এখানে এটাই হল শিক্ষনীয় আদব। বেয়াদবেরা তার উল্টাটা বুঝবে। তারা বুঝবে জানা থাকলেতো বলে দিতেন।]**** 

***উপরের তারকার ফাকে লাইন কয়টি বইয়ের লিখা নয়, আমার নিজের মতামত প্রকাশ করলাম মাত্র। যারা একমত নহেন তারা এড়িয়ে যান।***

তারপর মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনআমি দেখলামতিনি আমার কাঁধের ওপর হাত রাখলেন এবং আমি তাঁর আঙ্গুলের অগ্রভাগের শীতলতা অন্তর দিয়ে অনুভভ করলাম। তারপর সে কথাগুলো আমার কাছে সুস্পষ্ট হল। তাঁর প্রশ্নের জবাবও আমার জানা হয়ে গেল। অতঃপর আল্লাহ পাক সম্বোধন করলেনহে হাবীব ! আমি জবাব দিলামহে আমার প্রভু ! আমি হাজির আছি। তখন তিনি প্রশ্ন করলেনহে হাবীবউচ্চতম পরিষদ কোন ব্যাপারে আলোচনা করছেআরজ করলামজামাতের (নামাযের) জন্য পথ চলানামজের পর (ইবাদতের জন্য) মসজিদে বসে থাকা এবং কষ্টের ভেতরেও পুরোপুরি ওজু করা।

তিনি আবার প্রশ্ন করলেনএ ছাড়া আর কি আলোচনা করছে তারাআরজ করলামমর্যাদার বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে। প্রশ্ন করলেনসেগুলো কিআরজ করলামমিসকীন খাওয়ানোসবিনয়ে কথা বলা এবং সবার ঘুমের সময়ে ইবাদত করা (তাহাজুজদ পড়া)।

অন্য এক জায়গায় তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন এবং বন্ধুরূপে গ্রহণ করেনতখন জিব্রাঈলকে ডেকে বলেনআমি অমুককে ভালবাসিতুমিও তাকে ভালবাস"। সেমতে জিব্রাঈল তাকে ভালবাসেন। তারপর আকাশমণ্ডলীতে ঘোষণা করে দেয়া হবেঅমুক ব্যক্তি আল্লাহর বন্ধুতাকে সবাই ভালবাস। তাই আকাশের সবাই তাকে ভালবাসবেন। এভাবে তাকে পৃথিবীতেও জনপ্রিয় করা হয়। অর্থাৎ সবার অন্তরে তার ভালবাসা জন্ম নেয়। তেমনি আল্লাহ যখন কাউকে খারাপ ঘৃণা করতে থাকেন। সেমতে জিব্রাঈল তাকে ঘৃণা করবেন। তারপর আকাশ-মণ্ডলীর সবাইকে জানিয়ে দেয়া হবেঅমুক ব্যক্তিকে আল্লাহ পাক ঘৃণা করেনতোমরাও তাকে ঘৃণা কর। তা শুনে সেখানে সবাই তাকে ঘৃণা করবে। অবশেষে সেই ঘৃণা পৃথিবীতেও দেখা দেবে। 

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অন্যত্র বলেনকেউ যদি নামাযের পর মসজিদে বসে থাকেতাকে ফেরেশতারা ততক্ষণ দোয়া করেন যতক্ষণ না সে তাদের র্কষ্ট দেয় এবং অপবিত্র হয়। তাঁরা এ দোয়া করেনহে আমার প্রভু! তাকে ক্ষমা কর। হে আমার প্রভু! তাকে দয়ার দৃষ্টিতে দেখ। 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেনপ্রতি ফজরে দুজন ফেরেশতা নেমে আসেন। একজন বলেনহে আমার প্রভু! দাতা ও (উদার হস্তে) খরচকারীকে তুমি প্রতিদানে আরও বাড়িয়ে দাও। দ্বিতীয় ফেরেশতা বলেনহে আমার প্রভুবখিলকে বাড়িয়ে দিও না এবং তার সম্পদ ধ্বংস কর"। 

উল্লেখ্য যেশরীয়ত থেকে এ কথা প্রমাণিত হয়েছেআল্লাহ পাকের কিছু উত্তম বান্দা রয়েছেন। তাঁরা হলেন উচ্চ মর্যাদার আল্লাহ নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা। যে ব্যক্তি নিজকে পুণ্যবান রূপে গড়ে তোলেন এবং নিজকে সম্পূর্ণ নির্দোষ রেখে পূত চরিত্রের অধিকারী হনএবং মানব সমাজের সংস্কার ও কল্যাণ সাধনে ব্রতী হনসেই ফেরেশতারা তার জন্য সর্বদা দোয়া করতে থাকেন। ফলে তার ওপর রহমত ও বরকত নাযিল হয়। এ ফেরেশতারা আল্লাহর নাফরমান ও ফেতনা সৃষ্টিকারী বান্দাদের ওপর বদ-দোয়া ও অভিসম্পাত দিতে থাকেন। তাদের এ বদ-দোয়া ও অভিসম্পাতের কারণে পরিণামে নাফরমানদের অনুতপ্ত হতে হয়। আর সে কারণেই নিম্নতর আকাশের ও পৃথিবীর বাসিন্দাদের অন্তরে তাদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। খারাপ ব্যবহার করার জন্য ইলহামেও জানানো হয়। তার ফলে পৃথিবীতেও তারা দুর্ব্যবহার পায়নশ্বর দেহ থেকে আত্মা ও বিচ্ছিন্ন হবার পরেও পায়। 

এ ফেরেশতারা আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের ভেতর দূত হিসেবে কাজ করেন। তাঁরা বনি আদমের অন্তরে ভাল কথা জাগিয়ে দেন। তাঁরা যে কোন ভাবে অন্তরের ভাল ভাবগুলো জাগ্রত রাখার ব্যবস্থা করেন। আল্লাহ পাক যেভাবে তাঁদের যেখানে চান সমবেত করে মজলিস বসান। তাঁদের এ মর্যাদা ও অবস্থার জন্য পৃথক পৃথক নামে তাঁদের ডাকেন। কখনও রফীকুল আলা’ (উঁচুস্তরের বন্ধু)কখনও নুদীউল আলা’ (ঊর্ধ্বতম মজলিস) ও কখনও মালা-ই-আলা (উচ্চতম পরিষদ) বলে আখ্যায়িত করেন। পুণ্যবান ও নৈকট্য লাভকারী লোকদের আত্মাও তাদের ভেতর শামিল হয়। আল্লাহ পাক বলেন, 'হে নিশ্চিন্ত আত্মাসমূহ! সানন্দে তোমাদের প্রভুর কাছে চলে এস ও আমার বান্দাদের সাথে গিয়ে মিলিত হও এবং আমার জান্নাতে এসে বাস কর। (সূরা ফাজরঃ আয়াত ২৮-৩০) 

রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনআমি জাফর ইবনে আবু তালিবকে ফেরেশতা রূপে জান্নাতে অন্যান্য ফেরেশতারা সাথে পাখায় ভর করে উড়তে দেখেছি। 

আল্লাহর সব বিধি-বিধান ও সিদ্ধান্ত প্রথমে মালা-ই-আলায় অবতীর্ণ হয়। দুনিয়ার যে সব কাজ তাৎপর্যময় ও কল্যাণধর্মী তা এই মুবারক রাতে নির্ধারিত হয়” আল্লাহর এ বাণী সংশ্লিষ্ট ব্যাপারগুলো উচ্চতম পরিষদে নির্ধারিত হয়ে থাকে। কোন না কোন ভাবে শরা-শরীয়ত এখানেই স্থিরিকৃত হয়। 

স্মরণ রাখা প্রয়োজনউচ্চতম পরিষদে তিন শ্রেণীর সদস্য রয়েছেন। প্রথম শ্রেণীর দায়িত্বে রয়েছে আল্লাহর মংগলময় ব্যবস্থাবলী। মুসা (আঃ)-কে পথ প্রদর্শনের জন্য যে নূর দ্বারা আল্লাহ আগুন সৃষ্টি করেছিলেনতা থেকেই এ শ্রেণীর ফেরেশতাদের তৈরী করে তাতে পবিত্র আত্মাগুলোর সংযোগ ঘটানো হয়েছে। 

দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্ম হয়েছে মৌল উপাদানগুলোর সংঘাতসৃষ্ট সূক্ষ্মতম ও পরম হাল্কা এক বিশেষ তাপ ও দ্যুতি থেকে। তারপর তাকে এমন উঁচু পর্যায়ের আত্মার সংযোগ ঘটানো হয়েছে যা জীব জগতের পংকিল প্রাণ প্রবাহ থেকে স্পষ্টত স্বতন্ত্র হয়ে ধরা দেয়। 

তৃতীয় শ্রেণীর সদস্য হলেন আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী মানবাত্মারা। তাঁরা জীবিতাবস্থায় পুণ্যব্রতের দ্বারা মালা-ই-আলার মর্যাদা পান। অবশেষে তাঁদের আত্মা থেকে দেহরূপ আবরণটুকু খসে পড়লে তাঁরা সেখানে গিয়ে শামিল হন। তখন থেকে তাঁরা মালা-ই-আলার সদস্যরূপে গণ্য হন। 

মালা-ই-আলার আসল কাজ হল প্রতিনিয়ত নিজ প্রভুর দিকে নিবিষ্ট থাকা এবং অন্য কোন ব্যস্ততাকে সেই পথে অন্তরায় হতে না দেয়া। আল্লাহ তা;আলা যে বলেছে ন, “মালা-ই-আলা” সতত আল্লাহর স্তুতি গেয়ে ফিরে ও তাঁর পবিত্রতা বর্ণনায় মুখর থাকে এবং তাঁর ওপর সুদৃঢ় ঈমান রাখে” তার তাৎপর্য এটাই। তা ছাড়া তাঁদের অন্তরকে আল্লাহ খোদায়ী জীবন ব্যবস্থা পছন্দের ও গ্রহণের জন্য প্রস্তুত রাখেন। তেমনি তাঁরা আল্লাহ বিরোধী অন্যায় জীবন ব্যবস্থাকে খারাপ জানেন ও ঘৃণা করেন। তারা ঈমানদারের পাপের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকেন?” আল্লাহর এ বাণীর তাৎপর্য এটাই, যা নিচে বর্ণিত হল।

উচ্চতম পরিষদের সর্বোচ্চ মর্যাদার ফেরেশতারা সেই পূণ্যত্মার চার পাশে নূরের সমাবেশ ঘটান ও তাদের সাথে মেলামেশা করেন। তারপর এরা সবাই মিলে একাত্ম হয়ে যান এবং নাম পান হাজিরাতুর কুদুস’ বা পবিত্র পার্লামেন্ট। 

এ পবিত্র পার্লামেন্টে এরুপ পরামর্শ করা হয় যেবনি আদমের পার্থিব ও অপার্থিব কার্যাবলীর ব্যবস্থাপনার জন্য এবং তাদের সমস্যাবলী দূর করার জন্য কোন এক ব্যক্তিকে পূর্ণত্ব দেয়া ও তার নির্দেশ অন্য সবার ভেতরে প্রতিপাল্য করা প্রয়োজন। সে ব্যক্তিটি হবেন সেই যুগের উত্তম ব্যক্তি। এ পরামর্শ অনুসারেই যোগ্য লোকদের অন্তরে এ ইলহাম (কথা) ঢেলে দেয়া হয় যেসেই ব্যক্তির অনুগত হয়ে তারা এমন এক জাতিতে পরিণত হবে যারা গোটা বনি আদমের সেবায় আত্মনিয়োগের যোগ্যতা অর্জন করবে। এ পরামর্শের প্রেক্ষিতেই এমন বিদ্যার চর্চা বেড়ে যায় ও দীক্ষা চলতে থাকে যা থেকে জাতি সংশোধিত হয় এবং পথের দিশা পায়। 

উক্ত ইলহাম কখনও ওহী হয়ে আসেকখনও স্বপ্নে দেখতে পায়কখনও গায়ব আওয়াজ শোনেকখনও বা হাজিরাতুল কুদুসের প্রতিনিধি সেই ব্যক্তিটির (নবীর) সাথে দেখা করে সরাসরি বলে দেয়। এ কারণেই সেই ব্যক্তিত্বের সহচর ও অনুচররা তাঁকে সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকে। ফলে তাঁর সাফল্য ও মংগলের উপকরণ ও সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাঁর দুশমন ও আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধক সৃষ্টিকারীর ওপর অভিসম্পাত বর্ষিত হয় এবং সেটা তাদের ব্যর্থতা ও দুঃখ-দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মোট কথানবুয়তের অন্যায় মূলনীতির এটা অন্যতম। এ ফেরেশতাদের এরূপ স্বতন্ত্র ও স্থায়ী সিদ্ধান্তকে বলা হয় তাঈদে রূহুল কুদুস’ বা পব্রি পার্লামেন্টের সহায়তাএটা যাঁরা লাভ করেন তাঁরা নানারূপ অলৌকিক কাজ করেন ও মানুষের অসাধ্য কার্যাবলী সাধন করে থাকেন। এটাকেই বরে 'মুজিযা'। 

এ দ্বিবিধ মালা-ই-আলার এক স্তর নীচে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি রয়েছেন। তারা উচ্চতম মর্যাদার অধিকারী না হলেও তাদের প্রের্রণার সূক্ষ্ম ও হাল্কা তাপে সবার ভেতর এক সরল প্রকৃতি জন্ম নেয়। এ সরল প্রকৃতির সৃষ্টিরা শুধু প্রেরণা ও নির্দেশনা লাভের অপেক্ষায় থাকে। তারই প্রভাব স্রষ্টার যোগ্যতা ও প্রভাব গ্রহণের ক্ষমতার ভেতরে যখন সমতা স্থাপিত হয়তখন তারা নিজ অস্তিত্ব ভুলে জান-মাল বাজী রেখে প্রভাবিত কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পশু-পাখী নিজের প্রাকৃতিক প্রয়োজনে যেভাবে ছুটে যায়তেমনি ছুটে যায় তারা ওপর ওয়ালার ইংগিতে। 

সুতরাং তাঁদের কাজই হচ্ছে মানুষ ও জীবজন্তুর ভেতর প্রভাব সৃষ্টি করা। সে সবের ধ্যান-ধারনা ও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে তাঁরা নিজেদের অভিপ্রায় অনুসারে পরিচালিত করেন। যদি কোন পাথর নড়ে কিংবা চঞ্চল হয়কোন বুজুর্গ ফেরেশতা সেটাকে চঞ্চল ও গতিশীল করেন। তেমনি কোন শিকারী যখন নদীতে জাল ফেলেনতখন একদল ফেরেশতা কোন কোন মাছের ভেতর জালে ফেঁসে যাবার ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং কোন মাছকে ভেগে যাবার ভাবনা দান করেন। সেমতে কোন ফেরেশতা রশি টেনে ধরে এবং কোন ফেরেশতা রশি ঢিল দেয়। মাছগুলোও জানে না তাদেরকে কি করছে ও কেন করছে। তাদের মনে যা ইলহাম হয় তা-ই তারা করে যায়। তেমনি দুদল সৈন্য যখন লড়াইয়ে লিপ্ত হয়তখন ফেরেশতারা এসে এক দলের প্রাণে সাহস ও অস্ত্র চালনার শক্তি যোগান এবং অন্য দলের প্রাণে দুর্বলতা ও হাতে শিথিলতা এনে দেন। তাদের উদ্দেশ্য থাকে যার কর্মে যে পরিণতি রয়েছে সেটাকে বাস্তবায়িত করে দেয়া। কখনও তাঁদের ওপর নির্দেশ আসে মানুষকে সুখ-শান্তি কিংবা দুঃখ-দুর্দশা পৌঁছে দেয়ার। তখন তারা সে কাজে আত্মনিয়োগ করে। 

এ ফেরেশতাদের বিপরীত দিকে এমন একটি দল রয়েছে যাদের ভেতর রয়েছে খেলো প্রকৃতির রাগ ও পাপ প্রবণতা। তারা উত্তপ্ত আঁধার থেকে জন্ম নেয়। তাদের বলা হয় শয়তান। এ শয়তানরাই ফেরেশতাদের প্রয়াস ব্যর্থ করার জন্য পাল্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে।

পরবর্তী পর্ব- (চতুর্থ পরিচ্ছেদ)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...