মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৪) আল্লাহর অনড় বিধান



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৪)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

আল্লাহর অনড় বিধান -
আল্লাহর প্রকৃতিতে তুমি কোন পরিবর্তন দেখতে পাবেনা(সূরা আহযাবঃ ৬২)
কুরআনের উক্ত আয়াতের ওপর এ অধ্যায়ে আলোচা করা হবে।

এ কথা সুস্পষ্ট যেসৃষ্টি জগতে আল্লাহর কিছু কাজ তাঁর প্রবর্তিত কোন না কোন প্রাকৃতিক শক্তির ভিত্তিতে বিন্যস্ত হয়ে থাকেন। উদ্ধৃতি ও যুক্তিবুদ্ধি উভয় থেকেই এর সমর্থন মিলে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেনআল্লাহ তা'আলা গোটা দুনিয়ার এক মুষ্টি মাটি দিয়ে আদমকে তৈরী করেছেন। এ কারণে আদম সন্তান লালকালো কিংবা দুয়ের মাঝামাঝি বর্ণের এবং নম্র বা রুক্ষ ও ভাল বা মন্দ প্রকৃতির হয়ে থাকে। 
একবার আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে প্রশ্ন করলেনহে আল্লাহর রাসূল ! বাচ্চা কি ভাবে মা কিংবা বাপের অনুরূপ হয়তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জবাব দিলেনযদি বাপের বীর্য অগ্রগামী হয়তা হলে বাপের অনুরূপ হয় এবং মায়ের বীর্য অগ্রগামী হলে মায়ের অনুরূপ হয়। তেমনি সবাই জানেবিষ পানে কিংবা তরবারীর ঘায়ে মানুষকে মৃত্যু ঘটে। মায়ের জরায়ুতে বীর্য প্রবিষ্ট হলে সন্তান জন্ম নেয়। তরকারী ও গাছ পালা কর্ষণ ও পানি সিঞ্চনে উৎপন্ন হয়। ঠিক এ শক্তির উপস্থিতির কারণেই মানুষকে (শরীয়তের) দায়িত্ব চাপানো হয়েছে। আদেশ ও নিষেধের মাধ্যমে তাদের পুরস্কার ও তিরস্কারের যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছে। আল্লাহর সৃষ্ট ও প্রাকৃতিক শক্তি কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত। (১) যে শক্তি জড় উপাদানের গুণাগুণ (তাপশুষ্কতাআর্দ্রতা ইত্যাদি) সৃষ্টি করে। (২) রূপান্তর ও শ্রেণীভেদের ক্ষেত্রে আল্লাহ পাক যে শক্তিকে সক্রিয় রেখেছেন। (৩) যে শক্তি জগজগতে আত্মপ্রকাশের পূর্বে ছায়া জগতে সব কিছুর বিকাশ ঘটায়। (৪) পরিমার্জিত ও পুণ্য চরিত্রের মানুষের জন্য উচ্চতম পরিষদের মনে-প্রাণে দোয়া ও তাদের পরিপন্থীদের জন্য মনে-প্রানে বদ দোয়া থেকে যে শক্তির উদ্ভব হয়। (৫) শরীয়ত তথা আল্লাহর বিধি-নিষেধের শক্তি। যে শক্তির প্রভাবে তার অনুসারীরা সাফল্য অর্জন করে ও উপেক্ষাকারীরা ব্যর্থথার মুখ দেখে (৬) যে শক্তি সৃষ্টির কারণ হয়ে আসে। আল্লাহ পাক কোন কিছু সৃষ্টি হওয়ার নির্দেশ জারী করলে তার কারণটি আগে সৃষ্টি হয়। এ কারণটি শক্তিরূপে সৃষ্টির কাজ দেয়। আল্লাহ চান সৃষ্টিজগতটি কার্যকারণ শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাক। অন্যথায় বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টিজগত ধ্বংস করে দেবে। এ ষষ্ঠ শক্তির উদাহরণ প্রসংগে নবী করিম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার এ বক্তব্য নেয়া যায়, "আল্লাহ যদি চান অমুক ব্যক্তির অমুক স্থানে মৃত্যু হোকতখন তার সেখানে পৌছার একটি কারণ সৃষ্টি হয়ে যায়"। 

এ সব কথা হাদীস ও যুক্তি দ্বারা সুপ্রমাণিত হয়ে আছে।

*** টিকা- [সব কথার সারকথা হল এইআল্লাহ এ সব স্বনির্ধারিত প্রাকৃতিক রীতি বা শক্তির মাধ্যমে কাজ করে থাকেন। কেউ কাউকে তরবারীর আঘাত করলে তিনি মৃত্যু দান করেন। বীর্য ছাড়া সন্তান উৎপাদনের শক্তি আল্লাহর থাকা সত্ত্বেও সেটাকেই তিনি এ জগতে মানব জন্মের মাধ্যম করেছেন।]***

জানা প্রয়োজনযে সব মাধ্যম শক্তির ভিত্তিতে তিনি নিজ মর্জী ও নির্দেশ কার্যকরী করেনকখনও সেগুলো পরস্পর বিরোধী সংঘাতে লিপ্ত হয়। তখন তিনি যে শক্তির প্রাধান্য লাভ অধিকতর মংগলদায়ক মনে করেনসেটাকে জয়ী করেন। হাদীসে যে রয়েছেদাঁড়ি পাল্লা আল্লাহর হাতে রয়েছে এবং যে পাল্লা ভারী করতে চান সেটাই ভারী হয় এবং আল্লাহ যে বলেছেনস্রষ্টা সতত সৃজনশীল কাজে নিরত বা ব্যস্তএ দুটো বক্তব্যের তাৎপর্য এটাই।কখনও শক্তির প্রাধান্য হয় উপকরণের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। কখনও তা হয় কল্যাণ-শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। কখনও সৃষ্টিকে ব্যবস্থাপনার ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন কারনে শক্তির পারস্পরিক দ্বন্দ্বে একটির ওপর অপরটি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। 

আমরা শক্তির দ্বন্দ্বের সময়ে ভালোভাবে জানতে পাইনাকোনটি এ ক্ষেত্রে সঠিক। তবে যেটা জয়ী হয়ে রূপলাভ করেসেটাকে নিঃসন্দেহে সঠিক ভাবতে পারি। এর ভেতরেই কল্যাণ নিহিত। আমার এ বক্তব্যটি ভেবে-চিন্তে দেখলে এর থেকে অনেক সমস্যা ও জটিলতারই সমাধান পাওয়া যাবে। 

***[সকল কর্মই আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছায় সম্পাদন হয়ে থাকে। সুতরাং সর্বাবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছার উপর সন্তুষ্ট থাকাই ইমানদারের উচিত। যেমন ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ্ (আঃ) উনি আগুন থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহর কাছে মিনতি করেননি। বরং সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। সুতরাং সকল পরিনতিতে শোকর গুজার করাই উচিত। তবেই আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব।*** তারকার ভিতরের লাইন কয়টি বইয়ের অংশ নয় ]

গ্রহ-নক্ষত্রের শক্তি সম্পর্কে বলা চলেএর গতিবিধি দ্বারা গরম-ঠাণ্ডা বা দিন-রাতের হ্রাস-বৃদ্ধি হওয়ার মত সাধারণ কাজ অবশ্যই ঘটে থাকে। তেমনি জোয়ার ভাটাও দেখা যায়। হাদীসে আছে, “যখন ভোরে তারা দেখা দেয়সূর্য বিদায় নেয়। অর্থাৎ এটাই রীতি। কিন্তু এ সবের প্রভাবে ধনী-গরীব হওয়াদুঃখ-সুখ পাওয়া কিংবা দুর্ভিক্ষ-মহামারী দেখা দেয়ার কোন শরীয়ত সম্মত প্রমাণ নেই। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বরং এ সব নিয়ে মাথা ঘামাতেও নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জ্যোতিষী হওয়া ও যাদুকর হওয়া একই কথা’ (হারাম পেশা)। আরবের জাহেলরা যে বলতঅমুক গ্রহ বা নক্ষত্রের উদয় বা অস্তের কারণে বৃষ্টি হয়েছেতিনি তার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছেন। 

এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য এইমহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার শরীয়ত এ কথা কোথাও বলেনি যেগ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির ভেতর আল্লাহ এমন কোন শক্তি রাখেননি যা প্রকৃতির বিবর্তনের লীলায় কোনই অংশ রাখে না। তবে এটাও ঠিক যেমহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জ্যোতিষী হতে নিষেধ করেছেন। জ্যোতিষী বা গণকদার জীনদের কাছে জিজ্ঞেস করে করে অজানা খবর জানত। তাই তিনি জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া ও তাদের কথার ওপর বিশ্বাস করাকে অত্যন্ত খারাপ জানতেন। জ্যোতিষীর কার্যকলাপ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলতেনফেরেশতারা যখন আকাশে আল্লাহর কোন সিদ্ধান্ত আলোচনা করেনশয়তান তখন সে খবর আড়ি পেতে শুনে নিয়ে পালায় এবং (ভক্ত) জ্যোতিষীদের তা শুনায়। জ্যোতিষী সেই একটি সত্যের সাথে একশ মিথ্যা মিলিয়ে লোকদের শুনায়। 

আল্লাহ তাআলা বলেনহে ঈমানাদর সমাজ ! যারা কুপরী কাজ করল তাদের মত হয়োনা। আর তোমাদের সেই ভাইদের মত হয়োনা যারা তোমাদের ব্যাপারে বললযদি তারা অভিযানে গিয়ে যুদ্ধে অংশ না নিয়ে আমাদের কাছে থাকততাহলে মারা যেতনানিহত হতনা। 

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনতোমাদের ভাল কাজই শুধু তোমাদের জান্নাত দেবেনা (আল্লাহ ছাড়া)। তিনি আরও বলেনতুমিই তো একমাত্র দয়ালু বন্ধু। তুমি তো দয়ার হাত বাড়িয়েই রয়েছ। মোটকথা জ্যোতিষ শাস্ত্র নিষিদ্ধ করার ভেতর অজস্র কল্যাণকর উদ্দেশ্য রয়েছে।

পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...