✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)
এ কথা সুস্পষ্ট যে, সৃষ্টি জগতে আল্লাহর কিছু কাজ তাঁর প্রবর্তিত কোন না কোন প্রাকৃতিক শক্তির ভিত্তিতে বিন্যস্ত হয়ে থাকেন। উদ্ধৃতি ও যুক্তিবুদ্ধি উভয় থেকেই এর সমর্থন মিলে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা গোটা দুনিয়ার এক মুষ্টি মাটি দিয়ে আদমকে তৈরী করেছেন। এ কারণে আদম সন্তান লাল, কালো কিংবা দুয়ের মাঝামাঝি বর্ণের এবং নম্র বা রুক্ষ ও ভাল বা মন্দ প্রকৃতির হয়ে থাকে।
এ সব কথা হাদীস ও যুক্তি দ্বারা সুপ্রমাণিত হয়ে আছে।–
*** টিকা- [সব কথার সারকথা হল এই, আল্লাহ এ সব স্বনির্ধারিত প্রাকৃতিক রীতি বা শক্তির মাধ্যমে কাজ করে থাকেন। কেউ কাউকে তরবারীর আঘাত করলে তিনি মৃত্যু দান করেন। বীর্য ছাড়া সন্তান উৎপাদনের শক্তি আল্লাহর থাকা সত্ত্বেও সেটাকেই তিনি এ জগতে মানব জন্মের মাধ্যম করেছেন।]***
জানা প্রয়োজন, যে সব মাধ্যম শক্তির ভিত্তিতে তিনি নিজ মর্জী ও নির্দেশ কার্যকরী করেন, কখনও সেগুলো পরস্পর বিরোধী সংঘাতে লিপ্ত হয়। তখন তিনি যে শক্তির প্রাধান্য লাভ অধিকতর মংগলদায়ক মনে করেন, সেটাকে জয়ী করেন। হাদীসে যে রয়েছে, দাঁড়ি পাল্লা আল্লাহর হাতে রয়েছে এবং যে পাল্লা ভারী করতে চান সেটাই ভারী হয় এবং আল্লাহ যে বলেছেন, স্রষ্টা সতত সৃজনশীল কাজে নিরত বা ব্যস্ত, এ দুটো বক্তব্যের তাৎপর্য এটাই।কখনও শক্তির প্রাধান্য হয় উপকরণের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। কখনও তা হয় কল্যাণ-শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। কখনও সৃষ্টিকে ব্যবস্থাপনার ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন কারনে শক্তির পারস্পরিক দ্বন্দ্বে একটির ওপর অপরটি প্রাধান্য পেয়ে থাকে।
গ্রহ-নক্ষত্রের শক্তি সম্পর্কে বলা চলে, এর গতিবিধি দ্বারা গরম-ঠাণ্ডা বা দিন-রাতের হ্রাস-বৃদ্ধি হওয়ার মত সাধারণ কাজ অবশ্যই ঘটে থাকে। তেমনি জোয়ার ভাটাও দেখা যায়। হাদীসে আছে, “যখন ভোরে তারা দেখা দেয়, সূর্য বিদায় নেয়”। অর্থাৎ এটাই রীতি। কিন্তু এ সবের প্রভাবে ধনী-গরীব হওয়া, দুঃখ-সুখ পাওয়া কিংবা দুর্ভিক্ষ-মহামারী দেখা দেয়ার কোন শরীয়ত সম্মত প্রমাণ নেই। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বরং এ সব নিয়ে মাথা ঘামাতেও নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জ্যোতিষী হওয়া ও যাদুকর হওয়া একই কথা’ (হারাম পেশা)। আরবের জাহেলরা যে বলত, অমুক গ্রহ বা নক্ষত্রের উদয় বা অস্তের কারণে বৃষ্টি হয়েছে, তিনি তার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছেন।
এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য এই, মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার শরীয়ত এ কথা কোথাও বলেনি যে, গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির ভেতর আল্লাহ এমন কোন শক্তি রাখেননি যা প্রকৃতির বিবর্তনের লীলায় কোনই অংশ রাখে না। তবে এটাও ঠিক যে, মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জ্যোতিষী হতে নিষেধ করেছেন। জ্যোতিষী বা গণকদার জীনদের কাছে জিজ্ঞেস করে করে অজানা খবর জানত। তাই তিনি জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া ও তাদের কথার ওপর বিশ্বাস করাকে অত্যন্ত খারাপ জানতেন। জ্যোতিষীর কার্যকলাপ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলতেন, ফেরেশতারা যখন আকাশে আল্লাহর কোন সিদ্ধান্ত আলোচনা করেন, শয়তান তখন সে খবর আড়ি পেতে শুনে নিয়ে পালায় এবং (ভক্ত) জ্যোতিষীদের তা শুনায়। জ্যোতিষী সেই একটি সত্যের সাথে একশ মিথ্যা মিলিয়ে লোকদের শুনায়।
আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে ঈমানাদর সমাজ ! যারা কুপরী কাজ করল তাদের মত হয়োনা। আর তোমাদের সেই ভাইদের মত হয়োনা যারা তোমাদের ব্যাপারে বলল, যদি তারা অভিযানে গিয়ে যুদ্ধে অংশ না নিয়ে আমাদের কাছে থাকত, তা’হলে মারা যেতনা, নিহত হতনা।
মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তোমাদের ভাল কাজই শুধু তোমাদের জান্নাত দেবেনা (আল্লাহ ছাড়া)। তিনি আরও বলেন, তুমিই তো একমাত্র দয়ালু বন্ধু। তুমি তো দয়ার হাত বাড়িয়েই রয়েছ। মোটকথা জ্যোতিষ শাস্ত্র নিষিদ্ধ করার ভেতর অজস্র কল্যাণকর উদ্দেশ্য রয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন