বুধবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১১) সংখ্যাও সুরক্ষিত হয়



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ১১)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)
যার কাজ তার সাথেই থাকে-
সংখ্যাও সুরক্ষিত হয়- আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
আমি প্রত্যেক মানুষের কাজ তার গলায় ঝুলিয়ে রেখেছি। কিয়ামতের দিন সেগুলো গ্রন্থাকারে তাদের সামনে খুলে ধরব। তারপর বলবপড়ে নাও তোমার কাজের ফিরিস্তি। এটাই তোমার হিসেব-নিকেশের জন্য যথেষ্ট (সূরা বনী ইস্রাঈলঃ আয়াতঃ ১৩-১৪)
মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ তা'আলা থেকে বর্ণনা করেন, “কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনএই হল তোমাদের আমলনামা। আমি এটা সযত্নে সুরক্ষিত রেখেছি। এরই বিনিময় তুমি পাবে। তাই সুফল যে পাবেআল্লাহর কাছে তার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কুফল যে পাবেতার নিজেকেই ধিক্কার দেয়া উচিত 
তিনি আরও বলেনপ্রবৃত্তির বাসনা-কামনা জাগে। অংগ-প্রত্যংগ হয় তা বাস্তবায়িত করেনয় তো মিথ্যা করে দেয়। 

জেনে রাখুনমানুষ স্বেচ্ছায় যে কাজগুলো করে সেগুলো এবং তার ভেতর দানা বেঁধে থাকা অভ্যেস ও চরিত্রগুলো তার সব কিছুর উৎস ক্ষেত্র মানবিক প্রাণ থেকে নির্গত হয়ে সেখানেই আবার ফিরে এসে সঞ্চিত ও সুরক্ষিত হয়ে থাকে। এখন প্রশ্ন থেকে যায়প্রাণ থেকে সেগুলোর সৃষ্টি হয় কি ভাবেএর কারণগুলো আমি আগেই বলে এসেছি। তা এইমানব দেহের অভ্যন্তরে ফেরেশতা প্রকৃতি ও পশু প্রকৃতির এবং এ দুয়ের সংঘাত ও সংমিশ্রণে সৃষ্ট অন্যান্য প্রকৃতির প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। মানুষের স্বভাবগত প্রবণতাফেরেশতা ও পশু প্রকৃতির প্রভাব এবং এ ধরনের যে সব কারণ মানুষের কাজের প্রেরণা জোগায়সবগুলোই মানব প্রকৃতি থেকে আত্মপ্রকাশ করে এবং সেখানেই নিহিত থাকে। সুতরাং বুঝা গেলমানুষের মূল প্রাণই সব কিছুর উৎসভূমি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে তার থেকেই সবার জন্ম। 

এর জ্বলন্ত উদাহরণ নিন। শিশু যদি শুরুতেই খুব দুর্বল প্রকৃতির হয়তা হলে যে কোন মনস্তত্ত্ববিদ সহজেই বলে দেবেনযদি এ শিশু এখনকার প্রকৃতি নিয়ে যুবক হয়তা হলে অবশ্যই তার নারীসুলভ স্বভাবআচরণ ও কীর্তিকলাপ দেখা দেবে। তেমনি যে কোন দেহতাত্ত্বিক ডাক্তারও জানেঅমুক শিশু তার জন্ম লগ্নের প্রকৃতি অনুসারে যুবক হলে এবং লালন-পালনের সময়ের কোন অসুখ বিসুখ ইত্যাদি দেখা না দিলেসে চতুর ও সাহসী হবে কিংবা বোকা ও দুর্বল চিত্ত হবে। 

তখন প্রশ্ন থাকেকাজগুলো নির্গত হয়ে মূল প্রাণে আবার ফিরে আসে কেনতার কারণ এইমানুষ যখন কোন কাজ বেশী করেতখন এরূপ অভ্যস্ত হয় যেবিনা চিন্তা-ভাবনায় স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে তার থেকে সে কাজ হয়ে থাকে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়তার অন্তর উক্ত কাজের রঙে রঞ্জিত হয়ে গেছে। এ সহজাত প্রভাব সমগোত্রীয় অন্যান্য কাজকেও আকৃষ্ট করে থাকে। হোক সে প্রভাব যত সূক্ষ্ম বা হাল্কা। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিম্ন হাদীসটি এ বক্তব্যের সমর্থন জানাবেঃ 
বিভ্রান্তির চিন্তা ও প্রবণতা মানুষের অন্তরকে মাদুরের বুননীর মত ঘিরে নেয়। যে অন্তর তার প্রভাব গ্রহণ করেতার ওপর একটি কালো দাগ পড়ে যায়। পক্ষান্তরে যে অন্তর তা গ্রহণ করে নাতার ওপর একটা সাদা দাগ পড়ে। এভাবে দাগ পড়ে দুঅন্তরের অবস্থা এই দাঁড়ায়একটি সাদা মর্মরের মত ঝকঝকে ও তেলতেলে হয়ে যায়। ফলে তাতে আর কখনও কোন খারাপ প্রভাবে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না। অপরটি এরূপ মসীবর্ণ ও পিচ্ছিল হয় যে তাতে খেয়াল খুশীল চরিতার্থতা ছাড়া ভালমন্দের কোন তারতম্য বোধই অবশিষ্ট থাকে না 

এখন প্রশ্ন থেকে যায়কাজ কি করে সঙ্গে জড়িয়ে থাকেতার কারণ এইমানবিক প্রবৃত্তি (অন্তর) গোড়ার দিকে সাদা ও পরিচ্ছন্ন এক পাত্র রূপে তৈরি হয়। কোনরূপ চিহ্ন বা রঙ তাতে থাকে না। তারপর শক্তি তাকে চালিত করে কাজের দিকে এবং দিন দিন সেদিকে সে এগিয়ে চলে। এ ক্ষেত্রে তার প্রতিটি পশ্চাতের অবস্থা পরবর্তী অবস্থার কারণ হয় এবং কার্য সৃষ্টি করেই কারণ লোপ পায়। এ কার্যকারণ ব্রতটি ধারাবাহিক চলতে থাকে এবং কখনও তাতে আগেরটি পেছনে ও পেছনেরটি আগে আসার জো-নেই। তাই আজ যে অন্তর বর্তমানতাতে অতীতের প্রতিটি কারণের প্রভাব বিদ্যমান। যদিও বিভিন্ন বাহ্যিক ব্যস্ততার কারণে অন্তরে তার পূর্ণ উপলব্ধি থাকে না। 

শুধু দুটো অবস্থাতেই এ প্রভাব হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এককার্য সৃষ্টির মূলে যে শক্তিটি সক্রিয় যদি সেটা বিলুপ্ত হয়। যেমন বৃদ্ধ ও রুগ্নের অবস্থার কথা আমি বলে এসেছি যেতাদের বিশেষ কর্ম প্রবণতাই বিলুপ্ত হয়। দুইযদি উপর থেকে কোন (দৈব) প্রভাব এসে কারো বিশেষ প্রবণতাটি বৃদ্ধ ও রুগ্নের মতই বিলুপ্ত করে দেয়। এ অবস্থা সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেনঃ 

নিশ্চয় ভাল কাজ মন্দ কাজকে বিলুপ্ত করে (সূরা হুদঃ আয়াতঃ ১১৪)
তিনি আরও বলেনঃ 
যদি তুমি শির্ক করতোমার ভাল কাজ বরবাদ হবে। 

***[উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে যে আল্লাহ্ তালআলা সমস্ত রসূলদেরকে ওহি করেছিলেন যেন নিজ নিজ  উম্মতদেরকে যেন এই কথা বলে দেন- "যদি তুমি শির্ক কর এবং এর উপর থেকে থাক তোমার সকল ভাল কর্ম নিষ্ফল সাব্যস্থ হবে" এই আয়াতের প্রকৃত মর্ম হৃদয়ঙ্গম হওয়ার জন্য পূর্বের আয়াতও জানাটা জরুরী।]*** তারকার মধ্যস্থিত লাইন কয়টি বইয়ের অংশ নয় আমার নিজের মত প্রকাশ করলাম। 

এখন প্রশ্ন থাকেকাজগুলো কেন সুরক্ষিত রাখা হবেএর জবাব আমি (শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহঃ) নিজে যতটুকু বুঝতে পেরেছি তা হল এইউর্ধলোকের ব্যবস্থাপনার দান অনুসারে উন্নততর স্বরূপ জগতের স্তরে প্রত্যেকটি মানুষের আসল রূপ প্রকাশ পায়। আল্লাহকে প্রভু মেনে আসার কাহিনীতে যে সত্তারা উপস্থিত ছিল এরা তারাই। তারপর যখন সে সত্তা রূপ জগতে এসে দেহ ধারণকরেতখন স্বরূপ ও রূপ যুক্ত ও একাত্ম হয়। তাই যখন কোন ব্যক্তি ভাল কাজ করেতখন স্বতঃস্ফুর্ত ভাবেই তার স্বরূপ খুশীতে উজ্জ্বল হয় কিংবা স্বরূপের সাথে কাজটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। মৃত্যুর পর বিচার দিবসে কখনও দেখা যাবে তার কাজগুলো যত্নে সুরক্ষিত রয়েছে। আমলনামা পাঠের তাৎপর্য এটাই। কখনও বা দেখা যাবেকাজগুলো তার অংগ-প্রত্যংগে জড়িয়ে রয়েছে। হাত-পা সাক্ষী দেবে কথাটির তাৎপর্যই তাই। 

এও একটা কথা যেকাজের আকৃতি ও প্রকৃতিই তাদের পার্থিব ও অপার্থিব ফলাফল সাফ সাফ বলে দেয়। মানে তাদের দেখেই ফলাফল বুঝা যায়। ফেরেশতারা কখনও তাদের আকৃতি ও প্রকৃতি সৃষ্টিতে দ্বিধান্বিত হয়ে বিলম্ব করে থাকে। তখন আল্লাহর ফরমানী আসেযা আছে তাই হুবহু চিত্রিত কর (তোমাদের গবেষণার প্রয়োজন নেই)। 

ইমামা গাজ্জালী (রঃ) বলেন, “সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যত সব বস্তু সৃষ্টির জন্য আল্লাহ পাক পরিমাপ নির্ধারিত করেছেনতা সবই আদি সৃষ্টিটিতে লিখে নিয়েছেন। আল্লাহর সেই আদি সৃষ্টিটিকে কখনও লওহে মাহফুজ’ কখনও কিতাবে মুবীন’ কখনও বা ইমামে মুবীন’ নামে কুরআনে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এগুলোর অর্থ যথাক্রমে সুরক্ষিত পাত’ ‘সুস্পষ্ট গ্রন্থ’ ও সুস্পষ্ট চালক। সৃষ্টি জগতে যা কিছু হয়েছে কিংবা হবেসবই লওহে মাহফুজে এরূপ ভাবে অংকিত রয়েছে যা সাধারণ চোখে দেখার সাধ্য নেই। 

আপনি মনে করবেন না যেলওহে মাহফুজ লোহার পাত কিংবা কাঠ বা হাড়ের তক্তা। কিতাবে মুবিনকেও কাগজের কোন বই ভাববেন না। বরং আপনার মনে রাখতে হবেআল্লাহর অস্তিত্ব ও গুণাবলীর যেরূপ কোন তুলনা নেইএ তক্তা ও গ্রন্থেরও তেমনি কোন তুলনা নেই।যদি আপনি তার কোন কাছাকাছি তুলনা নিয়ে বুঝতে চান তো সেটাকে হাফেজে কুরআনের অন্তর ও মেধার মতই একটা কিছু ভাবতে পারেন। কারণহাফেজের মন মগজে কুরআন এরূপ সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকে যেযখনই সে পাঠ করেপরিস্কারভাবে লেখাগুলো দেখতে পায়। অথচ অপর কেউ সে রেখা দেখে না। তেমনি লওহে মাহফুজের সব বস্তুর আল্লাহ নির্ধারিত পরমাপের রেকর্ড এমন ভাবে লিখে রাখা হয়েছে যা লিখক ব্যতীত অন্য কেউ দেখতে পায় না 

ইমাম গাজ্জালীর (রঃ) বক্তব্য এখানেই শেষ হল। মানুষের আমল’ সুরক্ষিত রাখার সপক্ষে এও এক যুক্তি যেসে ভাল বা মন্দ যাই করুক না কেনঅধিকাংশ সময়ে তা তার স্মরণে পড়ে এবং স্বভাবতই সে ভাল কাজের পুরস্কারের আশা ও মন্দ কাজের জন্য শাস্তির আশংকা রাখে।

 

পরবর্তী পর্ব (দ্বাদশ পরিচ্ছেদ)


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...