জেনে রাখুন, মানুষ স্বেচ্ছায় যে কাজগুলো করে সেগুলো এবং তার ভেতর দানা বেঁধে থাকা অভ্যেস ও চরিত্রগুলো তার সব কিছুর উৎস ক্ষেত্র মানবিক প্রাণ থেকে নির্গত হয়ে সেখানেই আবার ফিরে এসে সঞ্চিত ও সুরক্ষিত হয়ে থাকে। এখন প্রশ্ন থেকে যায়, প্রাণ থেকে সেগুলোর সৃষ্টি হয় কি ভাবে? এর কারণগুলো আমি আগেই বলে এসেছি। তা এই, মানব দেহের অভ্যন্তরে ফেরেশতা প্রকৃতি ও পশু প্রকৃতির এবং এ দুয়ের সংঘাত ও সংমিশ্রণে সৃষ্ট অন্যান্য প্রকৃতির প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। মানুষের স্বভাবগত প্রবণতা, ফেরেশতা ও পশু প্রকৃতির প্রভাব এবং এ ধরনের যে সব কারণ মানুষের কাজের প্রেরণা জোগায়, সবগুলোই মানব প্রকৃতি থেকে আত্মপ্রকাশ করে এবং সেখানেই নিহিত থাকে। সুতরাং বুঝা গেল, মানুষের মূল প্রাণই সব কিছুর উৎসভূমি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে তার থেকেই সবার জন্ম।
এর জ্বলন্ত উদাহরণ নিন। শিশু যদি শুরুতেই খুব দুর্বল প্রকৃতির হয়, তা হলে যে কোন মনস্তত্ত্ববিদ সহজেই বলে দেবেন, যদি এ শিশু এখনকার প্রকৃতি নিয়ে যুবক হয়, তা হলে অবশ্যই তার নারীসুলভ স্বভাব, আচরণ ও কীর্তিকলাপ দেখা দেবে। তেমনি যে কোন দেহতাত্ত্বিক ডাক্তারও জানে, অমুক শিশু তার জন্ম লগ্নের প্রকৃতি অনুসারে যুবক হলে এবং লালন-পালনের সময়ের কোন অসুখ বিসুখ ইত্যাদি দেখা না দিলে, সে চতুর ও সাহসী হবে কিংবা বোকা ও দুর্বল চিত্ত হবে।
এখন প্রশ্ন থেকে যায়, কাজ কি করে সঙ্গে জড়িয়ে থাকে? তার কারণ এই, মানবিক প্রবৃত্তি (অন্তর) গোড়ার দিকে সাদা ও পরিচ্ছন্ন এক পাত্র রূপে তৈরি হয়। কোনরূপ চিহ্ন বা রঙ তাতে থাকে না। তারপর শক্তি তাকে চালিত করে কাজের দিকে এবং দিন দিন সেদিকে সে এগিয়ে চলে। এ ক্ষেত্রে তার প্রতিটি পশ্চাতের অবস্থা পরবর্তী অবস্থার কারণ হয় এবং কার্য সৃষ্টি করেই কারণ লোপ পায়। এ কার্যকারণ ব্রতটি ধারাবাহিক চলতে থাকে এবং কখনও তাতে আগেরটি পেছনে ও পেছনেরটি আগে আসার জো-নেই। তাই আজ যে অন্তর বর্তমান, তাতে অতীতের প্রতিটি কারণের প্রভাব বিদ্যমান। যদিও বিভিন্ন বাহ্যিক ব্যস্ততার কারণে অন্তরে তার পূর্ণ উপলব্ধি থাকে না।
এখন প্রশ্ন থাকে, কাজগুলো কেন সুরক্ষিত রাখা হবে? এর জবাব আমি (শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহঃ) নিজে যতটুকু বুঝতে পেরেছি তা হল এই, উর্ধলোকের ব্যবস্থাপনার দান অনুসারে উন্নততর স্বরূপ জগতের স্তরে প্রত্যেকটি মানুষের আসল রূপ প্রকাশ পায়। আল্লাহকে প্রভু মেনে আসার কাহিনীতে যে সত্তারা উপস্থিত ছিল এরা তারাই। তারপর যখন সে সত্তা রূপ জগতে এসে দেহ ধারণকরে, তখন স্বরূপ ও রূপ যুক্ত ও একাত্ম হয়। তাই যখন কোন ব্যক্তি ভাল কাজ করে, তখন স্বতঃস্ফুর্ত ভাবেই তার স্বরূপ খুশীতে উজ্জ্বল হয় কিংবা স্বরূপের সাথে কাজটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। মৃত্যুর পর বিচার দিবসে কখনও দেখা যাবে তার কাজগুলো যত্নে সুরক্ষিত রয়েছে। আমলনামা পাঠের তাৎপর্য এটাই। কখনও বা দেখা যাবে, কাজগুলো তার অংগ-প্রত্যংগে জড়িয়ে রয়েছে। হাত-পা সাক্ষী দেবে কথাটির তাৎপর্যই তাই।
এও একটা কথা যে, কাজের আকৃতি ও প্রকৃতিই তাদের পার্থিব ও অপার্থিব ফলাফল সাফ সাফ বলে দেয়। মানে তাদের দেখেই ফলাফল বুঝা যায়। ফেরেশতারা কখনও তাদের আকৃতি ও প্রকৃতি সৃষ্টিতে দ্বিধান্বিত হয়ে বিলম্ব করে থাকে। তখন আল্লাহর ফরমানী আসে, যা আছে তাই হুবহু চিত্রিত কর (তোমাদের গবেষণার প্রয়োজন নেই)।
ইমামা গাজ্জালী (রঃ) বলেন, “সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যত সব বস্তু সৃষ্টির জন্য আল্লাহ পাক পরিমাপ নির্ধারিত করেছেন, তা সবই আদি সৃষ্টিটিতে লিখে নিয়েছেন। আল্লাহর সেই আদি সৃষ্টিটিকে কখনও ‘লওহে মাহফুজ’ কখনও ‘কিতাবে মুবীন’ কখনও বা ‘ইমামে মুবীন’ নামে কুরআনে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এগুলোর অর্থ যথাক্রমে ‘সুরক্ষিত পাত’ ‘সুস্পষ্ট গ্রন্থ’ ও ‘সুস্পষ্ট চালক’। সৃষ্টি জগতে যা কিছু হয়েছে কিংবা হবে, সবই লওহে মাহফুজে এরূপ ভাবে অংকিত রয়েছে যা সাধারণ চোখে দেখার সাধ্য নেই।
আপনি মনে করবেন না যে, লওহে মাহফুজ লোহার পাত কিংবা কাঠ বা হাড়ের তক্তা। কিতাবে মুবিনকেও কাগজের কোন বই ভাববেন না। বরং আপনার মনে রাখতে হবে, আল্লাহর অস্তিত্ব ও গুণাবলীর যেরূপ কোন তুলনা নেই, এ তক্তা ও গ্রন্থেরও তেমনি কোন তুলনা নেই।যদি আপনি তার কোন কাছাকাছি তুলনা নিয়ে বুঝতে চান তো সেটাকে হাফেজে কুরআনের অন্তর ও মেধার মতই একটা কিছু ভাবতে পারেন। কারণ, হাফেজের মন মগজে কুরআন এরূপ সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকে যে, যখনই সে পাঠ করে, পরিস্কারভাবে লেখাগুলো দেখতে পায়। অথচ অপর কেউ সে রেখা দেখে না। তেমনি লওহে মাহফুজের সব বস্তুর আল্লাহ নির্ধারিত পরমাপের রেকর্ড এমন ভাবে লিখে রাখা হয়েছে যা লিখক ব্যতীত অন্য কেউ দেখতে পায় না”।
ইমাম গাজ্জালীর (রঃ) বক্তব্য এখানেই শেষ হল। মানুষের ‘আমল’ সুরক্ষিত রাখার সপক্ষে এও এক যুক্তি যে, সে ভাল বা মন্দ যাই করুক না কেন, অধিকাংশ সময়ে তা তার স্মরণে পড়ে এবং স্বভাবতই সে ভাল কাজের পুরস্কারের আশা ও মন্দ কাজের জন্য শাস্তির আশংকা রাখে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন