নির্জনবাস (পর্ব- ৫)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
নির্জনবাস সম্পর্কে চূড়ান্ত আলচনা —
প্রকাশ থাকে যে, নির্জনবাস ও মেলামেশা সম্পর্কে মনীষীগণের মতভেদ বিবাহ এবং চিরকৌমার্যব্রতের মধ্যে মতভেদের অনুরূপ। বিবাহ অধ্যায়ে আমরা বর্ণনা করেছি যে, সর্বাবস্থায় একটির শ্রেষ্ঠত্ব অপরটির উপর বলা যায় না; বরং অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে কারও জন্যে বিবাহ এবং কারও জন্যে কৌমার্যব্রত উত্তম। সেমতে বিবাহের বিপদাপদ ও উপকারিতা সমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করে আমরা বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছি। অনুরূপভাবে আমরা আলোচ্য ক্ষেত্রে নির্জনবাসের উপকারিতা লিপিবদ্ধ করছি। নির্জনবাসের উপকারিতা দ্বিবিধ- একটি পার্থিব, অপরটি পারলৌকিক। দ্বিতীয়টির উদাহরণ যেমন- এবাদত ও চিন্তা ভাবনায় মগ্ন থেকে আল্লাহ্ তাআলার আনুগত্য অর্জন করা অথবা মেলামেশার উপর ভিত্তিশীল নিষিদ্ধ বিষয়াদি থেকে আত্মরক্ষা করা, যেমন, রিয়া, পরনিন্দা, সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ থেকে চুপ থাকা, খারাপ সঙ্গীদের মন্দ চরিত্র ও দুষ্ট ক্রিয়াকর্ম নিজের মধ্যে সংক্রমিত হওয়া ইত্যাদি।
পার্থিব উপকারিতার উদাহরণ যেমন- নির্জনতায় কর্ম সম্পাদনে সক্ষম হওয়া, সেমতে পেশাদার ব্যক্তিরা একাকিত্বে তাদের পেশার কাজও খুব করে নেয়, সেসব অনিষ্ট থেকেও বেঁচে থাকে যা মেলামেশার মধ্যে হয়ে থাকে।
উদাহরণতঃ জগতের চাকচিক্যের দিকে তাকানো, মনে-প্রাণে সে দিকে আকৃষ্ট হওয়া, অপরের বস্তুর জন্যে লালায়িত হওয়া, তার বস্তুতে অপরের লালসা করা ইত্যাদি। নির্জনবাসের কারণে মানুষ এসব জাগতিক আপদ থেকে নিরাপদ থাকবে। মোট কথা, এগুলো হচ্ছে নির্জনবাসের উপকারিতা। এক্ষণে আমরা এগুলোকে ছয়টি উপকারিতায় সীমিত করে বিস্তারিত বর্ণনা করছি।
[১] নির্জনবাসের প্রথম উপকারিতা হল- এবাদত ও চিন্তা ভাবনার জন্যে অবসর লাভ করা, মানুষের সাথে বাক্যালাপের পরিবর্তে আল্লাহ্ আআলার সাথে বাক্যালাপ করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ব্যাপারাদিতে এবং মর্ত ও স্বর্গলোকে খোদায়ী রহস্য জানার কাজে আত্মনিয়োগ করার সৌভাগ্য নির্জনবাসের মাধ্যমে নসীব হয়ে থাকে। কেননা, এসব বিষয় অবসর মুহূর্ত চায়। মেলামেশা করলে অবসর মুহূর্ত থাকে না। সুতরাং নির্জনবাসই এসব সৌভাগ্য অর্জনের উপায়। এ কারণেই রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) শুরুতে হেরা পাহাড়ে সকলের কাছ থেকে আলাদা হয়ে নির্জনবাস করতেন। নবুওয়তের নূর পূর্ণাঙ্গ হওয়া পর্যন্ত এটা অব্যাহত থাকে। এর পর সৃষ্টি তাঁর মধ্যে ও আল্লাহ্ তা'আলার মধ্যে আড়াল হত না। বাহ্যিক দেহ দিয়ে তিনি সৃষ্টির সাথে ছিলেন এবং 'অন্তর' দিয়ে আল্লাহ্ তা'লার মধ্যে নিবিষ্ট থাকতেন। মানুষ ধারণা করত, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) তাঁর খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু), কিন্তু তিনি বলে দিলেন, তাঁর সবকিছু আল্লাহ্’র মধ্যে নিমজ্জিত। তিনি বলেনঃ
>“আমি যদি কাউকে খলীল করতাম, তবে আবু বকরকেই খলীল করতাম; কিন্তু তোমাদের সঙ্গী (অর্থাৎ, আমি) আল্লাহ্'র খলীল।”
বাহ্যতঃ মানুষের সাথে মিলে মিশে থাকা এবং অন্তরে মনে-প্রাণে আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট থাকা নবুওয়তের শক্তি ছাড়া অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়। প্রত্যেক দুর্বল ব্যক্তিই যেন নফসের ধোঁকায় এসে এই মর্তবার লালসা না করতে থাকে। তবে কোন কোন ওলীর মর্তবা এতটুকু হয়ে যাওয়া অবান্তর নয়। সেমতে হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রহঃ) বলেন : “আমি ত্রিশ বছর ধরে আল্লাহ্ তা'আলার সাথে কথা বলছি, অথচ মানুষ ধারণা করে, তাদের সাথে কথা বলছি।” এটা সেই ব্যক্তির জন্যে সহজলভ্য, যে আল্লাহর মহব্বতে পূর্ণরূপে নিমজ্জিত হয় এবং তাতে অপরের জন্যে কোন অবকাশ না থাকে। এরূপ হওয়া অসম্ভব নয়। কারণ, যারা মানুষের আশেক, তাদের অবস্থাও এমন হয়ে যায় যে, মানুষের সাথে দেখা করে, কিন্তু কাউকে চেনে না এবং কারও আওয়াযও শুনে না। বিবেকবানদের কাছে পরকালের ব্যাপার খুবই গুরুতর। এর চিন্তায় কারও অবস্থা এরূপ হয়ে যেতে পারে। তবে নির্জনবাস দ্বারা সহায়তা নেয়া অধিকাংশের জন্যে উত্তম। এ কারণেই জনৈক দার্শনিককে জিজ্ঞেস করা হল নির্জনবাসের উদ্দেশ্য কি? তিনি বললেন : নির্জনবাস দ্বারা কাম্য চিন্তা ভাবনার স্থায়িত্ব এবং অন্তরে জ্ঞানের প্রতিষ্ঠা লাভ উদ্দেশ্য, যাতে উৎকৃষ্ট জীবন অর্জিত হয় এবং মারেফতের মিষ্টতা আস্বাদন করা যায়।
জনৈক দরবেশকে বলা হল, নির্জনবাসে আপনার ধৈর্য অত্যধিক। তিনি বললেন : আমি একা থাকি না। পরওয়ারদেগার আমার সাথে উপবিষ্ট থাকেন। আমি যখন চাই, তিনি আমাকে কিছু বলুন, তখন তাঁর কিতাব কোরআন পড়তে শুরু করি। আর যদি চাই, আমি তাঁকে কিছু বলি তবে নামাযে রত হয়ে যাই।
সুফিয়ান ইবনে ওয়ায়না (রহঃ) বলেন : আমি ইবরাহীম ইবনে আদহাম (রহঃ)-কে সিরিয়ার শহরসমূহে দেখে আরজ করলাম খোরাসান একদম ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বললেন : আমি আরাম এখানেই পেয়েছি। আমার ধর্মকর্ম নিয়ে এখানে আমি এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ঘুরাফেরা করছি। আমাকে কেউ দেখলে এ কথা বলে : লোকটি সন্দেহজনক অথবা কোন উষ্ট্রচালক কিংবা মাঝি।
হযরত হাসান বসরী (রহঃ)-কে লোকেরা বললঃ এখানে এক ব্যক্তিকে আমরা যখনই দেখি, একা একটি স্তম্ভের আড়ালে বসে থাকতে দেখি। সে আপনার মজলিসে শরীক হয় না। তিনি বললেনঃ তাকে আবার দেখলে আমাকে জানাবে। সেমতে একদিন তাকে পুনরায় দেখে হযরত হাসানকে জানানো হল। তিনি লোকটির কাছে গিয়ে বললেনঃ
হে আল্লাহর বান্দা, আমার মনে হয় তুমি নির্জনতা পছন্দ কর। কিন্তু মানুষের কাছে বসতে তোমার কিসে বাধা?
লোকটি জওয়াব দিল- আছে কোন ব্যাপার, যে কারণে আমি লোকজনের কাছে বসি না।
হযরত হাসান বসরী বললেনঃ তাহলে লোকে যাকে হাসান বলে তার কাছেই বস।
সে বলল, আমি যে কাজে আছি, তাতে কারও কাছে বসার ফুরসত আমার নেই।
তিনি (হাসান) বললেন মিয়া সাহেব, সে কাজটি কি?
সে বললঃ সকাল সন্ধ্যায় আমার উপর আল্লাহ্ তা'আলার নেয়ামত বর্ষিত হতে থাকে; আর আমি গোনাহ্ করি। তাই আমি উত্তম মনে করেছি যে, নেয়ামতের কারণে আল্লাহ্’র শোকর করব এবং নিজের গোনাহের কারণে তাঁর কাছে মাগফেরাতের আবেদন করব। এ দু’টি কাজের কারণে আমি ফুরসত পাই না।
তিনি (হাসান) বললেন : হে আল্লাহর বান্দা, আমার মতে তুমি হাসানের চেয়ে অধিক সমঝদার। অতএব যে কাজে আছ, তাতেই মগ্ন থাক।
কথিত আছে , হযরত ওয়ায়েস করনী (রহঃ) উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় হারম ইবনে হাব্বান তাঁর খেদমতে হাযির হলেন। তিনি শুধালেন কেন এলে? হারম জওয়াব দিলেনঃ তোমার কাছ থেকে মহব্বত লাভ করার জন্যে এসেছি। ওয়ায়েস বললেন : আমি এমন কাউকে জানি না, যে তার পরওয়ারদেগারকে চেনার পর অন্যের কাছ থেকে মহব্বত লাভ করে।
ফোযায়ল বলেন : “আমি রাত আসতে দেখে আনন্দিত হই যে, এখন পরওয়ারদেগারের সাথে একাকী থাকতে পারব। কিন্তু যখন সকাল হতে দেখি, তখন ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করি। কারণ, এখন লোকজন এসে আমাকে ঘিরে ফেলবে এবং এমন কোন ব্যক্তি আমার কাছে আসবে, যে আমাকে পরওয়ারদেগার থেকে গাফেল করে দেবে।"
আবদুল্লাহ্ ইবনে যায়েদ (রহঃ) বলেন : ভাগ্যবান তারা, যারা দুনিয়াতেও বিলাস করে এবং আখেরাতেও বিলাস করবে। লোকেরা জিজ্ঞেস করল : এটা কিরূপে হবে? তিনি বললেনঃ দুনিয়াতে তো তারা আল্লাহর সাথে সংগোপনে বাক্যালাপ করতেই থাকে, আখেরাতেও তাঁর পড়শী হয়ে থাকবে।
যুন্নুন মিসরী (রহঃ) বলেন, একান্তে পরওয়ারদেগারের সাথে বাক্যালাপ করার মধ্যেই ঈমানদারদের খুশী ও আনন্দ।
জনৈক দার্শনিক বলেন : মানুষ যখন নিজের মধ্যে কোন শ্রেষ্ঠত্বের গুণ খুঁজে পায় না, তখন নিজ থেকেই আতংক অনুভব করে। এ কারণেই মানুষের সাথে মেলামেশা করে এই আতংক দূর করতে চাই। কিন্তু যখন নিজের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের গুণ থাকে, তখন সে নির্জনতা তালাশ করে, যাতে নির্জনতা দ্বারা চিন্তা-ভাবনায় সাহায্য নেয় এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞা প্রকাশ করে। মোট কথা, নির্জনবাসের বড় উপকারিতা হচ্ছে এবাদত ও চিন্তা-ভাবনার ফুরসত পাওয়া।
[২] নির্জনবাসের দ্বিতীয় উপকারিতা হল,- মেলামেশার কারণে মানুষ প্রায়ই সে সকল গোনাহের সম্মুখীন হয়, নির্জনবাসের কারণে যেগুলো থেকে আত্মরক্ষা করা যায়। এরূপ গোনাহ্ চারটি- (1) গীবত(পরনিন্দা), (২) রিয়া, (৩) সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ থেকে চুপ থাকা এবং (৪) স্বভাবের মধ্যে গোপনে গোপনে কুচরিত্র ও অপকর্ম দাখিল হওয়া, যা জাগতিক লোভ-লালসা থেকে উৎপন্ন হয়ে থাকে।
গীবতের অবস্থা হচ্ছে, এর কারণসমূহ জানতে পারলে বুঝতে পারবে, মেলামেশার অবস্থায় এ থেকে বেঁচে থাকা এক দুঃসাধ্য কাজ। সিদ্দীকগণ ছাড়া কেউ এই গীবত থেকে বাঁচতে পারে না। কারণ, এটা সাধারণ মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে, তারা যেখানে সেখানে বসে অপরের গীবত করতে থাকে এবং এতে অসাধারণ আনন্দ ও সুখ অনুভব করে। তারা এর মাধ্যমেই একাকিত্বের আতংক দূর করে থাকে। সুতরাং যদি তুমি মানুষের সাথে মেলামেশা করে তাদের মতই কথাবার্তা বল, তবে তুমি গোনাহ্গার এবং পরওয়ারদেগারের ক্রোধের যোগ্য হয়ে যাবে। আর যদি নিশ্চুপ থাক তবুও গীবতকারী গণ্য হবে। কেননা, যে গীবত শুনে, সে-ও গীবতকারীর মতই দোষী। আর যদি মানুষকে গীবত করতে নিষেধ কর, তবে তারা তোমার দুশমন হয়ে যাবে এবং তোমারই গীবত করতে শুরু করবে। ফলে “করিতে ধুলা দূর, জগত হল ধুলায় ভরপুর” -এর মত পরিস্থিতির উদ্ভব হবে; বরং এটাও আশ্চর্য নয় যে, তারা গীবতের সীমা পেরিয়ে তোমাকে গালিগালাজ করতে থাকবে।
সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ ধর্মের মূলনীতিসমূহের মধ্যে অন্যতম ও ওয়াজিব। যে ব্যক্তি মানুষের সাথে মেলামেশা করবে, সে অবশ্যই খারাপ বিষয়াদি দেখবে। এমতাবস্থায় যদি সে নিশ্চুপ থাকে, তবে নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা'আলার নাফরমান সাব্যস্ত হবে। পক্ষান্তরে নিষেধ করলে নিজেকে নানা ধরনের ক্ষতির লক্ষ্যস্থলে পরিণত করবে; বরং আশ্চর্য নয় যে, যেসব কাজ করতে নিষেধ করবে, তার চেয়ে জঘন্য অপরাধ দেখতে হবে। নির্জনবাসে এসব বিষয় থেকে মুক্ত থাকা যায়। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) একবার খোতবায় বললেন : লোকসকল, তোমরা এই আয়াত পাঠ কর "মুমিনগণ, তোমরা নিজের চরকায় তেল দাও। তোমরা হেদায়াত পেয়ে গেলে যারা পথভ্রষ্ট হয়, তারা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।” কিন্তু একে যথার্থ স্থানে ব্যবহার করো না। আমি রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি “মানুষ যখন মন্দ কাজ দেখে এবং তা পরিবর্তন করে না, তখন আশ্চর্য নয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা সকলকে আযাব দেবেন।"
এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে-
>আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন, এমন কি এ কথাও বলবেন- তুমি যখন মন্দ কাজ দেখেছিলে, তখন নিষেধ করলে না কেন? এর পর যদি আল্লাহ্ বান্দাকে জওয়াব অনুধাবন করান, তবে সে আরজ করবে, ইলাহী, আমি তোমার রহম আশা করতাম এবং মানুষকে ভয় করতাম । এটা তখন, যখন মারপিটের কিংবা অসাধ্য কোন কাজের ভয় করে। এর পরিচয় কঠিন অথচ বিপদ মুক্ত নয়।"
নির্জনবাসে এ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। যে ব্যক্তি সৎ কাজের আদেশ পরীক্ষা করে, সে প্রায়শঃ অনুতপ্ত হয়। কেননা, সৎ কাজের আদেশ একটি ঝুঁকে পড়া প্রাচীর সোজা করার মত বিপদসংকুল কাজ। এরূপ ক্ষেত্রে প্রাচীরটি তার উপরই পড়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। হাঁ, যদি কিছু লোক তাকে সাহায্য করে এবং প্রাচীরটি ধরে রাখে, তবে অবশ্য কোনরূপ ক্ষতি ছাড়াই প্রাচীর সোজা হতে পারে। কিন্তু বর্তমান যুগে সৎ কাজের আদেশে সাহায্যকারী কোথায়? এজন্যেই নির্জনবাস অবলম্বন করা উত্তম।
রিয়া এমন একটি দুরারোগ্য ব্যাধি, যা থেকে বেঁচে থাকা আবদাল ও আওতাদের জন্যেও সুকঠিন- অন্যদের তো কথাই নেই। কেননা, মানুষের সাথে মেলামেশা করলে তাদের আতিথ্য করতে হবে এবং তাদের প্রতি ভদ্রতা ও সৌজন্য প্রদর্শন করতে হবে। যে এগুলো করবে সে রিয়া করবে। যে মানুষকে দেখানোর জন্যে কাজ করবে, সে সেসব গোনাহে পতিত হবে যাতে মানুষ পতিত আছে। ফলে তারা যেমন বরবাদ হয়েছে, সে-ও বরবাদ হবে। এতে কমপক্ষে ক্ষতি হচ্ছে, নেফাক তথা কপটতা অপরিহার্য হয়ে যাবে। উদাহরণতঃ পরস্পরে শত্রু- এমন দু’ব্যক্তির সাথে তুমি মেলামেশা করলে যদি প্রত্যেকের সাথে তার মর্জি মাফিক ব্যবহার না কর, তবে উভয়ের কাছে দুশমন বলে চিহ্নিত হবে। পক্ষান্তরে যদি উভয়ের সাথে তার মর্জি অনুযায়ী কথা বল, তবে তুমি হবে জঘন্যতম সৃষ্টি। কারণ, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন "তোমরা দু'মুখো ব্যক্তিকে সর্বনিকৃষ্ট মানুষ পাবে, যে এক মুখ নিয়ে এদের কাছে যায় এবং অন্য মুখ নিয়ে ওদের কাছে যায়।"
মানুষের সাথে মেলামেশার মধ্যে সাক্ষাতের সময় আগ্রহ ও আনন্দ তো অবশ্যই প্রকাশ করতে হয়। অথচ এটা মূলেই মিথ্যা অথবা অতিরিক্ত পরিমাণটি মিথ্যা হয়ে থাকে। সাক্ষাৎকারীকে তার কুশল জিজ্ঞাসা, তার প্রতি মায়া-মমতা প্রকাশ করাও জরুরী হয়ে থাকে। সুতরাং তুমি যদি কাউকে জিজ্ঞেস কর, আপনি কেমন আছেন? বাড়ীর সকলেই ভাল তো? অথচ তাদের প্রতি কোন মনোযোগই না থাকে, তবে এটা নির্ভেজাল মোনাফেকী। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : তোমাদের কেউ বাড়ী থেকে বের হয়; পথিমধ্যে কোন ব্যক্তি তার প্রয়োজন ব্যক্ত করে বলে, আমার অমুক কাজটি করে দিন। এতে বাহ্যতঃ সে খুব কৃতার্থ হয় যে, তুমি তাকে একটি কাজ করে দিতে বলেছ। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সে কাজটি করে দেয় না। এরূপ ব্যক্তি বাড়ী ফেরার সময় আল্লাহ্ তা'আলাকেও রাগান্বিত করে এবং নিজের দ্বীনকেও বরবাদ করে।
সিররী সকতী (রহঃ) বলেন : যদি আমার কাছে কোন বন্ধু আসে এবং আমি তাকে দেখানোর জন্য নিজের দাড়ি হাতে পরিপাটি করি, তবে আমি আশংকা করি, আমার নাম কোথাও মোনাফেকদের তালিকায় লেখা হয়ে না যায়।
ফোযায়ল একাকী মসজিদে হারামে উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় এক বন্ধু তার কাছে গেল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কেন এলে? বন্ধু বলল : মনোরঞ্জনের জন্যে। তিনি বললেন : এটা তো আতংকের কাজ। কেননা, তুমি আমাকে দেখানোর জন্যে সাজসজ্জা করতে চাও এবং আমি তোমাকে দেখানোর জন্যে সেজেগুজে বসে থাকি। তুমি আমার খাতিরে মিথ্যা বল এবং আমি তোমার খাতিরে মিথ্যা বলি। সুতরাং এর চেয়ে ভাল হয়, তুমি আমার কাছ থেকে চলে যাও, না হয় আমি তোমার কাছ থেকে উঠে পড়ি।
জনৈক আলেম বলেন : আল্লাহ্ তা'আলা যে বান্দাকে মহব্বত করেন, তার কাছে আপন মহব্বত গোপনও রাখতে চান।
তাউস খলীফা হেশামের কাছে গেলেন এবং তাকে বললেন : কেমন আছেন?
হেশাম ক্রুদ্ধ হয়ে বলল : তুমি আমাকে “আমীরুল মুমীনীন” বললে না কেন?
তাউস বললেন : সকল মুসলমান আপনার খেলাফতে একমত নয়। তাই আমার আশংকা হল, আমীরুল মুমীনীন বললে কোথাও আমি মিথ্যাবাদী হয়ে না যাই।
যে ব্যক্তি এভাবে আত্মরক্ষা করতে পারে, সে মানুষের সাথে মেলামেশা করলে দোষ নেই। নতুবা নিজের নাম মোনাফেকদের তালিকায় লেখাতে সম্মত হলে মেলামেশা করুক।
পূর্ববর্তী মনীষীগণ যখন পরস্পরে মিলিত হতেন, তখন কুশল জিজ্ঞেস করা ও জওয়াব দেয়া থেকে বেঁচে থাকতেন। কেননা, তাঁরা ধর্মের অবস্থা জিজ্ঞেস করতেন- দুনিয়ার অবস্থা নয়। সেমতে হাতেম আসাম্ম হামেদ লাফফাফকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার অবস্থা কেমন? তিনি জওয়াব দিলেন ও নিরাপদ ও সুস্থ আছি। হাতেমের কাছে এই জওয়াব ভাল মনে হল না। তিনি বললেন : হামেদ, নিরাপত্তা তো পুলসেরাত পার হওয়ার পর পাওয়া যাবে এবং সুস্থতা জান্নাতে আছে।
হযরত ঈসা (আঃ)-কে যখন কেউ জিজ্ঞেস করত, আজ আপনি কেমন? তিনি বলতেন : এমন আছি, যে বস্তু আশা করি তা এগিয়ে আনতে পারি এবং যে বস্তু ভয় করি তা পিছিয়ে নিতে পারি না। আমলের বদলে বন্ধক আছি। কল্যাণ সম্পূর্ণ অন্যের হাতে। সুতরাং কোন অভাবী আমার চেয়ে অধিক অভাবী নয়।
রবী ইবনে খায়সামকে কেউ এ প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন : দুর্বল গোনাহগার আছি। কিসমতের দানাপানি পূর্ণ করছি এবং মৃত্যুর অপেক্ষা করছি।
হযরত আবু দারদাকে কেউ এ প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন? দোযখ থেকে মুক্তি পেলে ভালই আছি।
সুফিয়ান সওরীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন : তার শোকর তার সামনে করি । এক মন্দ কাজ অন্য মন্দ কাজের সামনে এবং একটি থেকে পলায়ন করে অন্যটির কাছে যাই।
হযরত ওয়ায়েস করনীকে এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন : তার অবস্থা কি জিজ্ঞেস কর, যে সন্ধ্যা হলে সকাল পাবে কিনা জানে না এবং সকাল হলে সন্ধ্যা পাবে কিনা বলতে পারে না।
মালেক ইবনে দীনারকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন : বয়স হ্রাস পাচ্ছে এবং গোনাহ্ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জনৈক দার্শনিককে এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন : পরওয়ারদেগারের রিযিক খাচ্ছি আর তার দুশমন ইবলীসের আনুগত্য করছি।
কেউ মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসে’কে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছেন? তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তি প্রত্যহ আখেরাতের দিকে এক মনযিল অগ্রসর হচ্ছে, তার অবস্থা কি হবে নিজেই বুঝে নাও। হামেদ লাফফাফকে এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন : একটি দিন ও একটি রাত সহীহ সালামতে অতিবাহিত হওয়ার কামনা করছি। প্রশ্নকারী বলল : আপনার কোন দিনই কি সহীহ-সালামতে অতিবাহিত হয় না? তিনি বললেন, যেদিন আল্লাহ তা'আলার কোন নাফরমানী করি না, সেদিনটি সহীহ সালামতে যায়। এক ব্যক্তি মুমূর্ষ অবস্থায় ছিল, তাকে কেউ জিজ্ঞেস করা হল- তোমার অবস্থা কি? সে বলল : সে ব্যক্তির অবস্থা কি হবে, যে দূরদূরান্তের সফর পাথেয় ছাড়াই অতিক্রম করতে চায়, সান্ত্বনাদাতা সাথী ছাড়া কবরে যায় এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাহের সামনে প্রমাণ ব্যতীত উপস্থিত হয়।
হাসসান ইবনে আবী সেনানকে কেউ প্রশ্ন করল : আপনি কেমন? তিনি বললেন, সে ব্যক্তি কেমন হবে, যে মরে যাবে, এরপর পুনরুত্থিত হবে এবং হিসাব-নিকাশের সম্মুখীন হবে। হযরত ইবনে সীরীন (রহঃ) জনৈক নিঃস্ব ছাপোষা ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন : তোমার অবস্থা কি? সে বলল : তার অবস্থা কি হবে, যার ঘাড়ে পাঁচশ দেরহাম ঋণ আছে এবং ঘরে অনেক পোষ্য রয়েছে? ইবনে সীরীন আপন গৃহে গেলেন এবং এক হাজার দেরহাম এনে লোকটিকে দিয়ে বললেন : পাঁচশ’ দেরহাম দিয়ে ঋণ শোধ করবে এবং পাঁচশ দেহাম বাল-বাচ্চাদের জন্যে রেখে দেবে। হযরত ইবনে সীরীনের কাছে তখন এই এক হাজার দেরহাম ছাড়া কিছুই ছিল। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন : আর কোন দিন কারও অবস্থা জিজ্ঞেস করবেন না। কারণ, তিনি আশংকা করলেন, অবস্থা জিজ্ঞেস করার পর সাহায্য করতে না পারলে জিজ্ঞাসা রিয়া ও মোনাফেকী বলে গণ্য হবে।
সারকথা, পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ ধর্মের অবস্থা এবং আল্লাহ্ তা'আলার ব্যাপারে অন্তরের হাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। দুনিয়ার অবস্থা জিজ্ঞেস করলে এবং অন্যের কিছু অভাব-অনটন জানা গেলে তা দূর করার জন্যে সাধ্যমতে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : আমি তাদেরকে জানি, যারা একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করতেন না; কিন্তু একজন অপরজনের সমস্ত বিষয় সম্পত্তি উজাড় করে দিলে দ্বিতীয়জন তাতে বাধ সাধতেন না। এখন আমি এমন লোক দেখি, যারা একে অপরের আতিথ্য ও সমাদর এতদূর করে যে, গৃহের মুরগীর অবস্থা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করতে ছাড়ে ন। কিন্তু একজন যদি অকপট হয়ে অপরজনের এক পয়সাও নিতে চায়, তবে সে কখনও তা দেয় না। এটা রিয়া ও মোনাফেকী ছাড়া আর কি? এর আলামত হল, যখন দু’ব্যক্তি পরস্পরে সাক্ষাৎ করে তখন একজন বলে ‘মেযাজ শরীফ'- অপরজন বলে, আপনার মেযাজ লতীফ? প্রথমজন জওয়াবের অপেক্ষা করে না এবং দ্বিতীয়জন তার প্রশ্নের জওয়াব দেয় না; বরং নিজের প্রশ্ন পেশ করে। এর কারণ এটাই যে, তারা উভয়ই জানে, এটা নিছক একটা লোকদেখানো লৌকিকতার ব্যাপার।
মাঝে মাঝে অন্তরে থাকে হিংসা-দ্বেষ, কিন্তু মুখে জিজ্ঞেস করা হয় কুশল। হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন : পূর্ববর্তীরা ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলতেন এবং তখন বলতেন, যখন অন্তর সুস্থ থাকত। এখন বলা হয়, আপনি কেমন, খোদা তা'আলা আপনাকে সুস্থ রাখুন, আপনার মেযাজ মোবারক কেমন? আল্লাহ্ আপনাকে ভাল রাখুন ইত্যাদি। চিন্তা করলে দেখা যাবে, এগুলো সব বেদআতের পথে আমদানী করা হয়েছে সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশে নয়। এতে কেউ অসন্তুষ্ট হয় হোক। এরূপ বলার কারণ, তুমি যদি সাক্ষাত হওয়া মাত্রই অপরকে বল মেযাজ শরীফ, তবে এটা বেদআত। এক ব্যক্তি আবু বকর ইবনে আইয়াশকে প্রশ্ন করল। মেযাজ শরীফ? তিনি তাকে জওয়াব দিলেন না এবং বললেন : আমাকে এই বেদআত থেকে মাফ রাখ। মোট কথা, মেলামেশা প্রায়ই লৌকিকতা, রিয়া ও মোনাফেকী থেকে মুক্ত হয় না। এগুলোর মধ্যে কোনটি নিষিদ্ধ ও হারাম এবং কোনটি মকরূহ, নির্জনবাসের কারণে এসব অনিষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া যায় । কেননা, যে ব্যক্তি মানুষের সাথে মেলামেশা করে ও অভ্যাসে তাদের সাথে শরীক হয় না, মানুষ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হবে এবং তাকে অসহনীয় মনে করবে। তারা তার গীবত করবে এবং তাকে কষ্ট দিতে উদ্যত হবে। ফলে তাদের ধর্মকর্ম এ ব্যক্তির কারণে বরবাদ হবে। অন্যের ক্রিয়াকর্ম ও চরিত্র দেখে তার মধ্যে সেই ক্রিয়াকর্মের প্রভাব প্রতিফলিত হওয়া একটি গোপন ব্যাধি, যা বুদ্ধিমানরাও টের পায় না- গাফেলদের তো কথাই নেই। উদাহরণতঃ যদি কেউ কোন ফাসেক পাপাচারী ব্যক্তির কাছে অনেক দিন বসে, তবে তার মনের অবস্থা পূর্বের তুলনায় বদলে যাবে । অর্থাৎ, তার কাছে বসার পূর্বে তার মনে যতটুকু ঘৃণা ছিল এখন ততটুকু থাকবে না। কেননা , মন্দ কাজ দেখতে দেখতে মানের কাছে তা সহজ হয়ে যায় এবং তা যে মন্দ, তা মন থেকে মুছে যেতে থাকে। মানুষ মন্দ কাজকে গুরুতর মনে করে বলেই তা থেকে বিরত থাকে। বার বার দেখার কারণে যখন তা গুরুতর থাকে না, তখন বাধাদানকারী শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মানুষ স্বয়ং সেই মন্দ কাজ করতে সম্মত হয়ে যায়। যখন মানুষ অনেক দিন পর্যন্ত অন্যকে কবীরা গোনাহ করতে দেখে, সে সগীরা গোনাহ তার দৃষ্টিতে তুচ্ছ হয়ে যায়। এ কারণেই যে ব্যক্তি ধনীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে, সে তার উপর আল্লাহর নেয়ামতকে কম মনে করে। ধনীর সংসর্গ অবলম্বন করার কারণই হচ্ছে নিজের কাছে যা আছে তা কম মনে করা। পক্ষান্তরে ফকীরের সংসর্গ অবলম্বন করার কারণ হচ্ছে আল্লাহ তাআলা যে সকল নেয়ামত দান করেছেন, সেগুলোকে বড় মনে করা। অনুগত ও অবাধ্যদের দিকে তাকানোর প্রভাবও তেমনি। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি কেবল সাহাবী ও তাবেয়ীগণের দিকেই তাকায় যে, তারা এবাদত কিভাবে করেছেন, কিরূপে দুনিয়া থেকে আলাদা রয়েছেন, সে নিজেকে সব সময় সামান্য এবং নিজের এবাদতকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে। ফলে সে পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা অবশ্যই করবে। যে ব্যক্তি দুনিয়াদারদের অবস্থা দেখবে, অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি তাদের বিমুখতা, দুনিয়াতে ডুবে থাকা এবং গোনাহে অভ্যস্ত হওয়া, সে নিজের মধ্যে সৎ কাজের সামান্য আগ্রহ পেলেও তার কারণে নিজেকে বড় মনে করবে। এটাই ধ্বংসের পথ। মন বদলে যাওয়ার জন্য কেবল ভাল-মন্দ বিষয় শ্রবণ করা যথেষ্ট দেখার কোন প্রয়োজনই হয় না।
[৩] নির্জনবাসের তৃতীয় উপকারিতা হচ্ছে, এর বদৌলতে গোলযোগ ও কলহ-বিবাদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এগুলোতে জড়িত না হওয়ার ফলে ধর্ম ও প্রাণ উভয়ই নিরাপদ থাকে। গোলযোগ ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে খুব কম শহরই মুক্ত। তাই যে কেউ জনপদ থেকে আলাদা থাকবে, সে গালযোগ ইত্যাদি থেকেও নিরাপদ থাকবে।
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনে আছ (রাঃ) বলেন, রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফেতনা ও গোলযোগের আলোচনা প্রসঙ্গে বললেন- এক সময় আসবে, যখন মানুষের অঙ্গীকার বিনষ্ট হয়ে যাবে, বিশ্বস্ততা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং এমন হয়ে যাবে, অতঃপর তিনি হাতের অঙ্গুলিসমূহ একটি অপরটির ভিতরে রেখে দিলেন। আমি আরজ করলাম : এমন দুঃসময়ে আপনি আমাকে কি করতে বলেন? তিনি বললেন : আপন গৃহে বসে থাক, মুখ বন্ধ রাখ, যা জান তা কর, যা জান না তা বর্জন কর এবং বিশিষ্ট লোকদের পথ অনুসরণ কর- জনসাধারণের পথ বর্জন কর।
হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
>"সেদিন নিকটবর্তী, যখন মুসলমানের উত্তম মাল হবে ছাগল-ভেড়ার পাল। সে এগুলোকে পাহাড়ের চূড়ায় ও বৃষ্টিপাতের জায়গায় নিয়ে ফিরবে এবং নিজের ধর্ম নিয়ে গোলযোগ থেকে পলায়ন করবে।"
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মসউদ (রাঃ) -এর রেওয়ায়েতে নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন,-
>"সত্বরই এমন দিন আসবে, যখন ধার্মিকের ধর্ম নিরাপদ থাকবে না। কিন্তু যে তার ধর্মকে নিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে, এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে এবং এক গর্ত থেকে অন্য গর্তে শৃগালের ন্যায় পালিয়ে ফিরবে, তার ধর্ম বেঁচে যাবে।"
লোকেরা আরজ করল : ইয়া রসূলাল্লাহ, এরূপ কখন হবে? তিনি বললেন :
>"যখন আল্লাহর নাফরমানী ছাড়া জীবিকা অর্জিত হবে না। এ সময় এলে কৌমার্যব্রত পালন করা ওয়াজিব হবে।" প্রশ্ন হল, আপনি আমাদেরকে বিবাহ করার আদেশ দিয়েছেন। কৌমার্যব্রত কিরূপে ওয়াজিব হবে? তিনি বললেন :
>"সে সময় এলে মানুষের ধ্বংস তার পিতামাতার হাতে হবে; পিতামাতা না থাকলে স্ত্রী-সন্তানের হাতে এবং তারাও না থাকলে আত্মীয়-স্বজনের হাতে হবে।"
লোকেরা আরজ করল : এটা কিরূপে? তিনি বললেনঃ
>"তারা তাকে দারিদ্র্যের জন্যে ভর্ৎসনা করবে। ফলে সে সাধ্যাতীত কাজ করবে, যা পরিণামে তার ধ্বংসের কারণ হবে।"
এ হাদীসটি যদিও কৌমার্যব্রত সম্পর্কে, কিন্তু নির্জনবাসও এ থেকে মুক্ত থাকে না এবং জীবিকা উপার্জন গোনাহ ছাড়া করতে পারে না। আমি একথা বলি না যে, হাদীসে যে যমানার কথা বলা হয়েছে, তার সময় এটাই; বরং এটা সময়ের আগেই হয়ে গেছে। এ জন্যেই হযরত সুফিয়ান সওরীর এই উক্তি প্রসিদ্ধ যে, আল্লাহর কসম, নির্জনবাস ওয়াজিব হয়ে গেছে।
হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেনঃ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফেতনা ও “হরজের দিনগুলোর কথা বললে আমি আরজ করলাম : হরজ কি? তিনি বললেন :
>"যখন মানুষ তার সঙ্গীর তরফ থেকে নিরাপদ থাকবে না।"
আমি আরজ করলাম : যদি আমি সে সময় পাই তবে আপনি আমাকে কি করতে বলেন ? তিনি বললেন :
>"নিজের প্রাণ ও হাত বিরত রাখ এবং গৃহের মধ্যে দাখিল হয়ে যাও।"
আমি বললাম : যদি কোন ব্যক্তি গৃহের মধ্যে আমার কাছে চলে আসে? তিনি বললেন :
?"আপন কক্ষে ঢুকে পড়"।
আমি বললাম : যদি কেউ কক্ষের মধ্যেও এসে পড়ে? তিনি বললেন :
>"মসজিদে দাখিল হয়ে যাও এবং এমনিভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখ।"
আমীর মোয়াবিয়ার রাজত্বকালে হযরত সা'দ (রাঃ)-কে যখন লোকেরা যুদ্ধে বের হতে বলল, তখন তিনি জওয়াব দিলেন : আমি যুদ্ধে যাব না। হাঁ, এক শর্তে যেতে পারি তোমরা যদি আমাকে এমন তরবারি দাও, যে চোখে দেখে এবং মুখে বলে। সে কাফের দেখলে আমাকে বলে দেবে এবং আমি তাকে হত্যা করব। আর ঈমানদার দেখলে বলবে- সে ঈমানদার। আমি তাকে হত্যা করব না। তিনি আরও বললেন : আমাদের ও তোমাদের দৃষ্টান্ত এমন যেমন কিছু লোক উন্মুক্ত পথে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ ধূলিঝড় শুরু হয়ে গেল। ফলে পথ চেনার জো রইল না। কেউ বলল : পথ ডান দিকে৷ কেউ কেউ সেদিকেই চলা শুরু করল এবং হতাশ হয়ে ঘুরাফেরা করল। আবার কেউ বলল : পথ বাম দিকে। কেউ কেউ সে দিকে গিয়ে বিফল মনোরথ হল। কিছু লোক সেখানেই অবস্থান করল এবং ঝড় থেমে যাওয়া পর্যন্ত সবর করল। ঝড় থেমে যাওয়ার পর সঠিক পথ তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল। মোট কথা, হযরত সা’দ ও অন্য কতক সাহাবী গোলযোগে শরীক হলেন না এবং ফেতনা দমিত না হওয়া পর্যন্ত মানুষের সাথে মেলামেশা করলেন না।
বর্ণিত আছে, হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) সংবাদ পেলেন, হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) ইরাকের পথে রওয়ানা হয়েছেন। তিনিও রওয়ানা হলেন এবং তিন মনযিল দূরে তাঁর সাথে মিলিত হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আপনি কোথায় যাচ্ছেন? হযরত ইমাম বললেন ইরাক। অতঃপর তিনি ইরাক থেকে আগত চিঠিপত্র ও প্রতিজ্ঞাপত্র তাঁকে দেখালেন। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) বললেন : আপনি এসব চিঠি ও প্রতিজ্ঞাপত্রের উপর ভরসা করে ইরাক যাবেন না। কিন্তু হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) মানলেন না। হযরত ইবনে ওমর বললেন : আমি আপনাকে একটি হাদীস শুনাচ্ছি। হযরত জিবরাঈল (আঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এসে তাঁকে দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্য থেকে একটি পছন্দ করতে বললেন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আখেরাত পছন্দ করলেন। আপনি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কলিজার টুকরা। আল্লাহর কসম, আপনাদের মধ্য থেকে কেউ দুনিয়ার শাসক হবে না। আপনার জন্যে যা মঙ্গলজনক, তাই আপনাকে দুনিয়া থেকে আলাদা করে রেখেছে। কিন্তু হযরত হোসাইন (রাঃ) ফিরে যেতে অস্বীকার করলেন। ইবনে ওমর (রাঃ) তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন এবং বললেনঃ হে শহীদ, আপনাকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করছি। তখন দশ হাজার সাহাবায়ে কেরাম জীবিত ছিলেন; কিন্তু ফেতনার দিনগুলোতে চল্লিশ জনের বেশী সাহাবী এতে শরীক হওয়ার সাহস করেননি।
তাউস (রহঃ) আপন গৃহে বসে রইলেন। লোকেরা কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : দিনকাল খারাপ হয়ে গেছে এবং শাসকরা জুলুম করতে শুরু করেছে। এসব দেখে বসে আছি।
হযরত ওরওয়া (রাঃ) আকীকে অট্টালিকা নির্মাণ করে সেখানে বসে রইলেন। লোকেরা বলল : আপনি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর মসজিদ ত্যাগ করে অট্টালিকায় বসে আছেন? তিনি বললেনঃ আমি দেখলাম, তোমাদের মসজিদসমূহে ক্রীড়া-কৌতুক হয়, বাজারে এবং গলিতে অশ্লীল অনর্থক কাজ-কারবার চলে। তাই এ পথ অবলম্বন করেছি। এতে এসব বিষয় থেকে মুক্তি আছে। এসব বক্তব্য থেকে বুঝা যায়, নির্জনবাসের এক উপকারিতা হচ্ছে কলহবিবাদ ও গোলযোগ থেকে নিরাপদ থাকা।
[৪] নির্জনবাসের চতুর্থ উপকারিতা হচ্ছে, এতে মানুষের জ্বালাতন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। অর্থাৎ, মানুষ কখনও তোমাকে গীবত করে জ্বালাতন করে, কখনও কুধারণাবশতঃ অপবাদ আরোপ করে এবং কখনও এমন প্রার্থনা করে, যা পূর্ণ করা তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ মেলামেশা করলে তোমার ক্রিয়াকর্ম ও কথাবার্তা তাদের দৃষ্টির সামনে থাকে। যে কাজ ও কথার স্বরূপ তারা সম্যক উপলব্ধি করতে পারে না, তা স্মরণে রাখে এবং অনিষ্টের সুযোগ পেলেই তা প্রকাশ করে দেয়। সুতরাং তুমি যদি নির্জনে থাক, তবে এসব বিষয় থেকে বেঁচে থাকার প্রয়োজন হবে না। যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে। এতে সন্দেহ নেই যে, যে ব্যক্তি মানুষের সাথে মেলামেশা করবে এবং তাদের ক্রিয়াকর্মে শরীক হবে, তার দুশমন অবশ্যই থাকবে। সে গোপনে ষড়যন্ত্র করবে। কেননা, যে অত্যধিক দুনিয়ালোভী, সে অপরকেও নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। নির্জনবাসে এসব বিষয় থেকে মুক্ত থাকা যায়। যারা নির্জনবাস অবলম্বন করেছেন, তাদের উক্তি থেকেও এরূপ আভাস পাওয়া যায়।
হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন মানুষকে পরীক্ষা করে নাও, যাতে তাকে শত্রু মনে না কর।
হযরত ওমর (র) বলেন : নির্জনবাসে কুসঙ্গী থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
আবদুল্লাহ্ ইবনে যোবায়র (রাঃ)-কে কেউ বলল ব্যাপার কি, আপনি মদীনা মোনাওয়ারায় গমন করেন না? তিনি বললেন এখন সেখানে যারা রয়ে গেছে, তারা নেয়ামত দেখে হিংসা করে অথবা অপরের কষ্ট দেখে আনন্দিত হয়।
ইবনে সাম্মাক (রহঃ) বলেন : আমার এক বন্ধু আমাকে পত্রে এই বিষয়বস্তু লেখেছে- মানুষ আগে ওষুধ ছিল, যদ্দ্বারা আমরা চিকিৎসা করতাম। কিন্তু এখন মানুষ এমন ব্যাধি হয়ে গেছে, যার কোন চিকিৎসা নেই। অতএব তাদের কাছ থেকে পলায়ন কর, যেমন সিংহ দেখে পলায়ন করে থাক।
জনৈক আরব সদাসর্বদা একটি বৃক্ষের কাছে থাকত এবং বলত : আমার এই সঙ্গী তিনটি স্বভাব রাখে। আমি কথা বললে সে তা অপরের কানে পৌছায় না। আমি তার গায়ে থুথু নিক্ষেপ করলেও সে বরদাশত করে। আমি অশালীন কাজ করলে সে ক্রুদ্ধ হয় না।
হযরত হাসান বলেন : আমি হজ্জব্রত পালনের ইচ্ছা করলে খ্যাতনামা ওলীআল্লাহ্ সাবেত বানানী সংবাদ পেয়ে বললেন : আমি আপনার সাথে হজ্জে যেতে চাই। আমি বললাম : মিয়া সাহেব, আল্লাহর দেয়া পর্দার মধ্যে থাকাই আমাদের জন্য উত্তম। আমার আশংকা হয়, এক সাথে থাকলে একের কাছে অপরের এমন অবস্থা প্রকাশ হয়ে পড়বে, যাতে শত্রুতা সৃষ্টি হতে পারে।
এসব উক্তি থেকে নির্জনবাসের আর একটি উপকারিতা জানা যায়। তা হল দ্বীনদারী, সৌজন্য, চরিত্র, ফকিরী ইত্যাদির সুনাম অক্ষুণ্ণ থাকে এবং দোষ গোপন থাকে। মানুষ তার দ্বীন ও দুনিয়ার ক্রিয়াকর্মে এমন দোষ অবশ্যই রাখে, যা গোপন রাখাই ইহকাল ও পরকালে তার জন্যে উপযুক্ত। এই দোষ প্রকাশ হয়ে পড়লে নিরাপত্তা বাকী থাকে না।
হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন : আগেকার লোক কাঁটাবিহীন পত্র ছিল; কিন্তু আজকালকার লোক পত্রবিহীন কাঁটা। হযরত আবু দারদার যমানা ছিল প্রথম শতাব্দীর শেষ ভাগ। তখন যদি এই অবস্থা হয়, তবে তাঁর পরবর্তীকালে অবস্থা যে আরও শোচনীয় হবে, তা বলাই বাহুল্য।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : আমি মালেক ইবনে দীনারের খেদমতে পৌঁছে দেখি তিনি একাকী বসে আছেন। একটি কুকুর তাঁর ঊরুতে মাথা রেখে শুয়ে আছে। আমি কুকুরটিকে তাড়াতে চাইলে তিনি বললেন : একে কিছু বলো না। সে কাউকে কষ্ট দেয় না। সে কুসঙ্গীর চেয়ে উত্তম।
হযরত আবু দারদা (রাঃ) আরও বলেন আল্লাহকে ভয় কর এবং লোকজন থেকে বেঁচে থাক। কেননা, তারা উটে আরোহণ করলে উটের পিঠ ক্ষতবিক্ষত করে দেয়, ঘোড়ায় সওয়ার হলে তার কোমর ব্যথিত করে এবং ঈমানদারদের অন্তরে স্থান করলে তাকে বিনষ্ট করে দেয়।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : পরিচিতজনের সংখ্যা হ্রাস কর। তোমার অন্তর ও দ্বীনদারী নিরাপদ থাকবে। হক হালকা হবে। কারণ, পরিচিতজন যত বেশী হবে, হকও ততই বেশী হবে এবং সকল হক আদায় করা দুঃসাধ্য হবে।
অন্য এক বুযুর্গ বলেন : যাকে চেন, তার কাছে অপরিচিত হয়ে যাও এবং যাকে চেন না, তার সাথে আর পরিচয় করো না।
[৫] নির্জনবাসের পঞ্চম উপকারিতা হচ্ছে, এর ফলে কেউ তোমার কাছে কিছু আশা করবে না এবং তুমিও অন্যের কাছে আশা করবে না। মানুষের আশা ছিন্ন হওয়া একটি নেহায়েত উপকারী বিষয়। কেননা, মানুষকে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট করা সম্ভবপর নয়। কাজেই নিজের সংশোধনে ব্যাপৃত থাকাই উত্তম। নিম্নতম ও সহজ হক হচ্ছে জানাযায় যাওয়া, অসুখে-বিসুখে হাল জিজ্ঞেস করা, ওলীমা ও বিবাহ মজলিসে উপস্থিত হওয়া। এগুলোর মধ্যে আছে অনর্থক সময় নষ্ট করা এবং বিপদাপদের সম্মুখীন হওয়া। মাঝে মাঝে এমনও হয়, মানুষ এগুলোর মধ্যে কতক হক আদায় করতে সক্ষম হয়। ওযর যদিও গ্রহণীয় হয়ে থাকে, কিন্তু কতক ওযর প্রকাশ করার যোগ্য হয় না। ফলে হকদার এ কথাই বলে, তুমি অমুকের হক আদায় করেছ এবং আমার হক আদায় করনি। এটাই শত্রুতার কারণ হয়ে যায়। সেমতে বলা হয়, যে ব্যক্তি রোগীর হাল জিজ্ঞেস করে না, সে চায়, রোগী মারা যাক, যাতে আরোগ্য লাভের পর তার কাছে লজ্জিত হতে না হয়। যে ব্যক্তি কারও সুখে-দুঃখে শরীক হয় না তার প্রতি সকলেই সন্তুষ্ট থাকে; কিন্তু যে একজনের কাজে শরীক হয় এবং অন্য জনের কাজে শরীক হয় না, তাকে কেউ ভাল বলে না। যদি কেউ দিবারাত্র সর্বক্ষণ হক আদায়ে ব্যাপৃত থাকে, তবুও সকল হক আদায় করতে পারবে না। যার দ্বীন অথবা দুনিয়ার কোন ব্যস্ততা আছে, সে কিরূপে সকল হক আদায় করবে? হযরত আমর ইবনে আছ (রাঃ) বলেন : বন্ধু-বান্ধব বেশী থাকার মানে কর্জদাতা বেশী থাকা; অর্থাৎ, বন্ধু-বান্ধব যত বেশী হবে, তত বেশী হক আদায় করতে হবে। অন্যের কাছ থেকে তোমার আশা বিচ্ছিন্ন হওয়াও কম উপকারী বিষয় নয়। কেননা, যে ব্যক্তি দুনিয়ার বাহার ও সাজসজ্জা দেখে, তার বাসনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। বাসনা থেকে লালসার উৎপত্তি হয়। অধিকাংশ লালসায় ব্যর্থতা ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না। ফলে কষ্ট ভোগ করতে হয়। নির্জনবাস অবলম্বন করলে দেখার সুযোগ হবে না। ফলে লোভ-লালসাও হবে না। এ কারণে আল্লাহ্ বলেনঃ
>"বিভিন্ন মানুষকে আমি যে ভোগ্যসামগ্রী দান করেছি, তুমি তার দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করো না ।"
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন
>"তার দিকে তাকাও, যে তোমার চেয়ে কম এবং তার দিকে তাকিয়ো না, যে তোমার চেয়ে বেশী। এটা তোমার উপর আল্লাহর নেয়ামতকে তুচ্ছ মনে না করার পক্ষে সহায়ক৷"
আওন ইবনে আবদুল্লাহ্ বলেন আমি প্রথমে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছে বসতাম। ফলে সর্বদা মনঃক্ষুণ্ন ও উদাস থাকতাম। এরপর আমি ফকীরদের সংসর্গ অবলম্বন করলাম। এখন বেশ সুখে আছি।
কথিত আছে, মুয্নী (রহঃ) একদিন ফুসতাতের জামে মসজিদের দরজা দিয়ে বের হচ্ছিলেন, এমন সময় ইবনে আবদুল হাকাম তার বাহিনী সমভিব্যাহারে সেখান দিয়ে গমন করল। মুযানী তার অবস্থা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। অতঃপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেনঃ
>"আমি তোমাদের একজনকে অন্যজনের জন্যে পরীক্ষা করেছি তোমরা সবর কর কি না তা দেখার জন্যে।"
মুযানী বললেন : হাঁ আমি সবর করব। তিনি ছিলেন নিঃস্ব ব্যক্তি। মোট কথা, যে আপন গৃহে থাকে, সে এ ধরনের পরীক্ষায় পড়ে না।
[৬] নির্জনবাসের ষষ্ঠ উপকারিতা হচ্ছে, এতে অভদ্র ও নির্বোধদেরকে দেখা এবং তাদের নির্বুদ্ধিতার কষ্টভোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এরূপ লোকদেরকে দেখা যেন অর্ধেক অন্ধত্ব। আ’মাশকে কেউ জিজ্ঞেস করলঃ আপনার চক্ষু ঝলসে গেছে কেন ? তিনি বললেন : ঝগড়াটে লোকেদেরকে দেখার কারণে।
কথিত আছে, ইমাম আবু হানীফাও আ'মাশের কাছে গিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন : হাদীসে আছে, আল্লাহ্ তা'আলা যার দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেন, এর বিনিময়ে তাকে দৃষ্টিশক্তির চেয়ে উত্তম বস্তু দান করেন। আপনি বিনিময়ে কি পেয়েছেন? আ'মাশ রসিকতার ভঙ্গিতে বললেন : চোখের বিনিময়ে আমাকে এই দিয়েছেন যে, আমাকে ভারী লোকদের দেখা থেকে রক্ষা করেছেন। আপনিও তাদের একজন।
ইবনে সীরীন বর্ণনা করেন, আমাকে এক ব্যক্তি বলেছিল, একবার ভারী ব্যক্তিকে দেখে সে বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল। প্রথমোক্ত উপকারিতা বাদে বাকীগুলো জাগতিক উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু ধর্মের সাথেও এগুলোর সম্পর্ক হতে পারে। কেননা, মানুষ যখন ভারী লোককে দেখে কষ্ট পাবে, তখন তার গীবত করতে শুরু করবে। এটা পরিণামে ধর্মের জন্যে অনিষ্টকর। নির্জনবাসে এসব অনিষ্ট থেকে মুক্ত থাকা যায়।
পরবর্তী পর্ব-

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন