নির্জনবাস (পর্ব- ৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
নির্জনবাসের পক্ষে যুক্তি প্রমাণ—
(১) নির্জনবাসের সপক্ষদের নির্জনবাসের পক্ষে প্রথম দলীল এই আয়াত, যাতে আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উক্তি উদ্ধৃত করেছেন
>"আমি পৃথক হচ্ছি তোমাদের থেকে এবং আল্লাহ ছাড়া যাদের তোমরা এবাদত কর তাদের থেকে। আমি আমার পালনকর্তার এবাদত করি।"
আর এক আয়াতে আছে
>"অতঃপর যখন সে পৃথক হয়ে গেল তাদের থেকে এবং আল্লাহ্ ছাড়া তাদের উপাস্যদের থেকে, তখন আমি দিলাম তাকে ইসহাক ও ইয়াকুব এবং আমি প্রত্যেককে করেছি নবী।"
এ থেকে বুঝা যায়, হযরত ইবরাহীম (আঃ) নির্জনবাসের কারণে এই নেয়ামত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এ দলীলটিও অগ্রাহ্য, কেননা- কাফেরদের সাথে মেলামেশার একমাত্র উপকারিতা হচ্ছে তাদেরকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেয়া। যখন এ ব্যাপারে নিরাশ হতে হয় এবং জানা যায়, তারা দাওয়াত মানবে না, তখন তাদেরকে ত্যাগ করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। আমাদের আলোচনা মুসলমানদের সাথে মেলামেশা সম্পর্কে। তাদের সাথে মেলামেশায় বরকত হয়। সেমতে বর্ণিত আছে, কেউ রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করল : ইয়া । রসূলাল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম), আপনি মাটির আবৃত পাত্র থেকে ওযু করা অধিক পছন্দ করেন; না সেসব চৌবাচ্চা থেকে, যেগুলো থেকে মানুষ ওযু করে থাকে? তিনি বললেন : পানির চৌবাচ্চা থেকে ওযু করা অধিক পছন্দ করি, যাতে মুসলমানদের হাতের বরকত হাসিল হয়। আরও বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন কা'বা গৃহের তওয়াফ করেন, তখন যমযম কূপের কাছে গেলেন তার পানি পান করার উদ্দেশ্যে। এমন সময় দেখলেন, চামড়ার পাত্রে খেজুর ভিজানো আছে। মানুষ সেগুলো হাতে পিষে দিয়েছে এবং তাই হাতে নিয়ে পান করছে। তিনি বললেনঃ আমাকে এখান থেকে পান করাও। হযরত আব্বাস (রাঃ) বললেন : এগুলো হাতে পেষা নবীয। আপনি বললে গৃহে রক্ষিত ও আবৃত মৃৎপাত্র থেকে পরিষ্কার শরবত এনে দেই। তিনি বললেন : আমাকে এখান থেকেই পান করাও, যেখান থেকে সকলে পান করে। আমি মুসলমানদের হাতের বরকত চাই। সার কথা, কাফের ও প্রতিমাদের থেকে পৃথক হওয়ার অর্থ এই নয় যে, মুসলমানদের কাছ থেকেও পৃথক হওয়া উচিত। অথচ তাদের সাথে মেলামেশা করলে অনেক বরকত লাভ হয়।
(২) নির্জনবাসের পক্ষে দ্বিতীয় দলীল হল,- হযরত মূসা (আলাইহিস্সালাম) তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন-"যদি তোমরা আমার কথায় বিশ্বাস না কর, তবে আমা থেকে পৃথক হয়ে যাও। আসহাবে কাহফের প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন - যখন তোমরা তাদের থেকে এবং তাদের উপাস্যদের থেকে পৃথক হয়ে গেছ, তখন আশ্রয় গ্রহণ কর গুহায়। তোমাদের রব তোমাদের জন্যে কিছু রহমত ছড়িয়ে দেবেন। এতে নির্জনবাসের আদেশ করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর যখন কোয়ায়শরা নির্যাতন চালায়, তখন তিনি তাদের থেকে আলাদা হয়ে পার্বত্য উপত্যকায় চলে যান এবং নিজের বিশেষ সহচরগণকে নির্জনবাস অবলম্বন ও আবিসিনিয়ায় হিজরত করার আদেশ দেন। সেমতে সকলেই হিজরত করেন। পরবর্তীকালে যখন মুসলমানদের বিজয় সূচিত হল, তখন সকলেই মদীনা মুনাওয়ারায় তাঁর সাথে মিলিত হন। এ প্রমাণের মধ্যেও একথাই বিধৃত হয়েছে যে, কাফেরদের কাছ থেকে নিরাশ হয়েই তারা নির্জনবাস অবলম্বন করেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) মুসলমানদের কাছ থেকে নির্জনে চলে যাননি। আসহাবে কাহফের সদস্যবর্গও একে অপরের কাছ থেকে নির্জনবাস অবলম্বন করেননি; অথচ তারা সকলেই ঈমানদার ছিলেন; বরং তারা কাফেরদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে ছিলেন। সুতরাং তাদের নির্জনবাস প্রমাণ হতে পারে না।
(৩) নির্জনবাসের পক্ষে তৃতীয় দলীল হল,- রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে একবার ওকবা ইবনে আমের জোহানী জিজ্ঞেস করলঃ ইয়া রসূলাল্লাহ ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মুক্তির উপায় কি? তিনি বললেন- আপন গৃহে আবদ্ধ থাক, মুখ বন্ধ রাখ এবং পাপের জন্যে কান্নাকাটি কর। অন্য এক ব্যক্তি আরজ করল, কোন্ ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ? তিনি বললেন ও ঈমানদার, জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জেহাদকারী। প্রশ্ন হল, এর পর কে? তিনি বললেন : সে ব্যক্তি, যে পাহাড়ের কোন গুহায় আলাদা বসে আল্লাহর এবাদত করে এবং মানুষকে তার অনিষ্ট থেকে বাঁচায়।
এক হাদীসে বলা হয়েছে - আল্লাহ্ তা'আলা পরহেযগার, মালদার, গোপন বান্দাকে পছন্দ করেন। এসব হাদীসও প্রমাণ হতে পারে না। কেননা, ওকবা ইবনে আমেরকে উপরোক্ত রূপ জওয়াব দেয়ার কারণ ছিল, তিনি নবুওয়তের নূর দ্বারা বুঝে নেন যে, তার জন্যে ঘরে বসে থাকা মেলামেশা করার তুলনায় অধিক উপযুক্ত ও নিরাপদ। এ কারণেই সকল সাহাবীকে তিনি এই আদেশ দেননি। প্রায়ই এমন হয় যে, কোন ব্যক্তির পক্ষে নির্জনবাসের মধ্যেই নিরাপত্তা নিহিত থাকে- মেলামেশায় নয়। যেমন কারও পক্ষে জেহাদে যাওয়ার চেয়ে গৃহে বসে থাকা ভাল হয়। এর অর্থ এরূপ হয় না যে, জেহাদ বর্জন করা উত্তম। মানুষের সাথে মেলামেশা সাধনা ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন, যে মানুষের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের দেয়া কষ্টে সবর করে, সে তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ, যে মানুষের সাথে মেলামেশা করে না, এবং তাদের কষ্টে সবর করে না। এমনিভাবে হাদীসে সেই ব্যক্তির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যে স্বভাবগতভাবে দুষ্ট। মানুষ তার সাথে মেলামেশা করে কষ্ট পায়। আল্লাহ্ পরহেযগার, ধনী, গোপন বান্দাকে পছন্দ করেন- এই হাদীসে পরিচয়হীন মেলামেশা করতে এবং খ্যাতি থেকে বেঁচে থাকতে ইশারা করা হয়েছে। নির্জনবাসের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। কেননা, অনেক সংসারত্যাগীকে দুনিয়ার মানুষ চেনে এবং অনেক মেলামেশাকারী অখ্যাতই থেকে যায়।
(৪) নির্জনবাসের পক্ষে চতুর্থ দলীল হল,- রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে বললেন : তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম কে, আমি কি তা বলব না ? তাঁরা আরজ করলেন : অবশ্যই। আপনি এরশাদ করুন। তিনি হাতে পশ্চিম দিকে ইশারা করে বললেন : সে ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে আল্লাহর পথে আপন ঘোড়ার লাগাম ধরে নিজে ধাওয়া করার অথবা অপরের তার প্রতি ধাওয়া করার প্রতীক্ষায় থাকে। আমি তোমাদেরকে সে ব্যক্তির কথাও বলছি, যে তার পরে উত্তম। অতঃপর তিনি হেজাযের দিকে হাতে ইশারা করে বললেন ও তার পরে সে-ই সর্বশ্রেষ্ঠ, যে ছাগলের পালে নামায আদায় করে, যাকাত দেয়, নিজের মালের মধ্যে আল্লাহর হক চেনে এবং মানুষের অনিষ্ট থেকে একান্তে বাস করে।
উভয় পক্ষের প্রমাণাদি বর্ণনা করার পর এখন আমরা বলছি, সন্তোষজনক প্রমাণ কোন পক্ষেই পাওয়া যায়নি। তাই সত্য ফুটিয়ে তোলার উদ্দেশে নির্জনবাসের উপকারিতা ও প্রয়োজনাদি পুংখানুপুংখরূপে খতিয়ে দেখা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে।
পরবর্তী পর্ব-

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন