হকদারের হক পর্ব- ৯
সৌভাগ্যের পরশমণি
ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
প্রতিবেশীদের প্রতি কর্তব্য
প্রতিবেশীদের প্রতি কর্তব্য
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : কোন প্রতিবেশী এমন যাহার মাত্র একটি অধিকার (হক) আছে; এই প্রতিবেশী কাফির। আর কোন প্রতিবেশী এমন যাহার দুইটি অধিকার আছে; এই প্রতিবেশী মুসলমান এবং কোন প্রতিবেশী এইরূপ যে, তাহার তিনটি অধিকার রহিয়াছে। এইরূপও প্রতিবেশী (মুসলমান) আত্মীয়। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ হযরত জিবরাঈল (আ) সর্বদা আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে উপদেশ দিতেন এমনকি পরিশেষে আমি মনে করিতে লাগিলাম যে, প্রতিবেশী আমার পরিত্যক্ত সম্পত্তির অংশীদার হইবে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও পরকালের উপর ঈমান আনিয়াছে, তাহাকে বলিয়া দাও, সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীর সম্মান করে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে দুইজন পরস্পর অভিযোগকারী কিয়ামত দিবস সর্বপ্রথম (আল্লাহর দরবারে) উপস্থিত হইবে, তাহারা দুইজন প্রতিবেশী হইবে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি প্রতিবেশীর কুকুরকে ঢিল মারিয়াছে সে প্রতিবেশীকে কষ্ট দিয়াছে।
লোকে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট আরয করিল : অমুক মহিলা দিবসে (নফল) রোযা রাখে এবং রাত্রিকালে (তাহাজ্জুদ ও নফল) নামায পড়ে। কিন্তু সে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : সে দোযখে যাইবে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : চল্লিশ বাড়ি পর্যন্ত প্রতিবেশীর অধিকার রহিয়াছে। এই হাদীসের ব্যাখ্যায় হযরত ইমাম যুহরী (র) বলেন : নিজ গৃহের সম্মুখের দিকে চল্লিশ ঘর, পশ্চাৎদিকে চল্লিশ ঘর, ডানদিকে চল্লিশ ঘর এবং বামদিকে চল্লিশ ঘর প্রতিবেশী বলিয়া বুঝিতে হইবে।
প্রতিবেশীকে কষ্ট না দিলেই যে তাহার প্রতি কর্তব্য প্রতিপালিত হইল তাহা নহে; বরং তাহাদের সহিত সদ্ব্যবহার, বিপদাপদে সাহায্য এবং উপকার করাও কর্তব্য। কারণ, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, দরিদ্র প্রতিবেশী কিয়ামত দিবস ধনী ব্যক্তির সঙ্গে ঝগড়া করিবে এবং বলিবে : ইয়া আল্লাহ্! তাহাকে জিজ্ঞাসা করুন, সে আমার মঙ্গল করে নাই কেন এবং আমাকে তাহার গৃহে গমন করিতে দেয় নাই কেন।
এক ব্যক্তি ইঁদুরের উপদ্রবে নিতান্ত বিব্রত হইয়া পড়িয়াছিলেন। লোকে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলঃ তুমি বিড়াল পুষিতেছ না কেন? তিনি বলিলেনঃ আমার আশংকা হয় যে, বিড়ালের আওয়াজ শুনিয়া ইঁদুর প্রতিবেশীর গৃহে চলিয়া যাইবে। তাহা হইলে এই হইবে যে, যাহা আমি নিজের জন্য পছন্দ করি না তাহা তাহার জন্য পছন্দ করিলাম।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞাসা করিলেন ঃ প্রতিবেশীর অধিকার কি, তাহা কি তোমরা জান? (প্রতিবেশীর) অধিকার এই-তোমার নিকট সাহায্য চাহিলে সাহায্য করিবে, ধার চাহিলে ধার দিবে, অভাবগ্রস্ত হইলে অভাব মোচন করিবে, পীড়িত হইলে তত্ত্বাবধান করিবে, প্রাণত্যাগ করিলে তাহার জানাযার সঙ্গে যাইবে। আনন্দে অভিনন্দন এবং দুঃখে সমবেদনা জ্ঞাপন করিবে। তোমার গৃহে দেওয়াল উঁচু করিয়া তাহার বাতাস বন্ধ করিবে না। ফল ক্রয় করিলে তাহাকে পাঠাইয়া দাও। পাঠাইতে না পারিলে গোপন রাখ এবং নিজের সন্তানদিগকে ফল হাতে লইয়া বাহিরে যাইতে দিও না, যেন প্রতিবেশীর ছেলে দুঃখিত না হয়। আর স্বীয় রন্ধনশালায় ধূয়া দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দিও না; কিন্তু তাহাকেও যদি খাদ্য প্রেরণ কর (তবে ক্ষতি নাই)।
হুযূর (সা) বলেন : তোমরা কি জান, প্রতিবেশীর অধিকার কি ? সেই আল্লাহর শপথ যাঁহার হাতে আমার প্রাণ, প্রতিবেশীর অধিকার সেই ব্যক্তিই প্রদান করিতে পারে যাহার উপর আল্লাহ্ তা'আলা রহমত বর্ষণ করেন। এইগুলি প্রতিবেশীরও অধিকারসমূহের অন্তর্ভুক্ত-নিজ গৃহ হইতে তাহার গৃহের অভ্যন্তরে উঁকি দিয়া লুকাইয়া দেখিবে না, সে তোমার দেওয়ালের উপর কড়িকাঠ স্থাপন করিলে তাহাকে নিষেধ করিও না এবং তাহার নর্দমা বন্ধ করিও না। তোমার গৃহদ্বারের সম্মুখে সে আবর্জনা ফেলিলে তাহার সহিত ঝগড়া করিও না এবং তাহার যে দোষ শ্রবণ কর তাহা গোপন রাখ। মনে কষ্ট হয়, এমন কোন কথা তাহার নিকট বলিবে না; প্রতিবেশীর স্ত্রীলোকদের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবে না; তাহার দাসীদের প্রতি অধিক দৃষ্টিপাত করিবে না। এইগুলি মুসলমানগণের অধিকারসমূহ হইতে স্বতন্ত্র (অর্থাৎ মুসলমান অমুসলমান নির্বিশেষে সকল প্রতিবেশীর জন্য এই হকসমূহের প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখিতে হইবে)। এইগুলি ভালরূপে স্মরণ রাখিও।
হযরত আবূ যর (রা) বলেনঃ আমার প্রিয় বন্ধু রাসূলে মাকবুল রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উপদেশ প্রদান করিয়া বলেন যে, যখন তুমি কিছু পাক কর তখন উহাতে অধিক পরিমাণ সুরুয়া রাখ এবং উহা হইতে প্রতিবেশীর অংশ প্রেরণ কর। এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবন মুবারক (র)-কে জিজ্ঞাসা করিল : প্রতিবেশী আমার চাকরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। বিনা প্রমাণে তাহাকে প্রহার করিলে পাপী হইব। আর প্রহার না করিলে প্রতিবেশী অসন্তুষ্ট হইবে। স্থির করিতে পারিতেছি না এমতাবস্থায় কি করিব। উত্তরে তিনি বলিলেন : অপেক্ষা কর, চাকর এমন কোন অপরাধ করুক, যাহাতে সে শাসনের উপযুক্ত ও দণ্ডনীয় হয়। তৎপর শাসনে একটু বিলম্ব কর যেন প্রতিবেশী আবার তোমার নিকট অভিযোগ করে। তখন চাকরকে শাস্তি দাও যেন উভয়ের প্রতি তোমার কর্তব্য সামাধা হয়।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন