সাধারণ মুসলমানের প্রতি কর্তব্য
(১) প্রথম কর্তব্য : নিজের নিকট যাহা অপছন্দনীয় তাহা অপর মুসলমানের জন্যও পছন্দ না করা। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"সমগ্র মুসলমান একটি মানব-দেহস্বরূপ। ইহার (দেহের) একটি অঙ্গ ব্যথা পাইলে সমস্ত অঙ্গ ইহা অনুভব করে এবং সমস্ত অঙ্গই ব্যথিত হইয়া থাকে।" তিনি অন্যত্র বলেন:
"যে ব্যক্তি দোযখ হইতে রক্ষা পাইতে চাহে সে যেন কালেমা শাহাদাতের উপর (বিশ্বাস রাখিয়া) মৃত্যুরবণ করে এবং নিজে যেরূপ ব্যবহার অন্যের নিকট হইতে পছন্দ করে না তদ্রুপ ব্যবহার যেন সে নিজে অপরের সহিত না করে।"
হযরত মূসা (আ) আল্লাহর নিকট জিজ্ঞাসা করিলেনঃ ইয়া আল্লাহ্ ! আপনার বান্দাগণের মধ্যে বড় সুবিচারক কে? উত্তর হইল : যে ব্যক্তি স্বয়ং নিজের উপর সুবিচার করে।
(২) দ্বিতীয় কর্তব্য : হস্ত ও রসনা দ্বারা অপর মুসলমানকে কষ্ট না দেওয়া। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞাসা করিলেনঃ হে লোকগণ ! মুসলমান কে, তোমরা জান কি? তাঁহারা উত্তর করিলেনঃ আল্লাহ্ ও আল্লাহর রাসূল উত্তম জানেন। তিনি বলিলেন :
"সেই ব্যক্তি মুসলমান যাহার হস্ত ও রসনা হইতে অপর মুসলমান নিরাপদে থাকে।" লোকে নিবেদন করিল : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ ! কোন্ ব্যক্তি মুমিন? তিনি বলিলেনঃ
"সেই ব্যক্তি মু'মিন যাহা হইতে অন্যান্য মু'মিন নিজেদের প্রাণ ও ধন সম্বন্ধে নিশ্চিত থাকিতে পারে।" তাঁহারা আবার নিবেদন করিল : মুহাজির কে? তিনি বলিলেনঃ
"সেই ব্যক্তি মুহাজির যে মন্দ কার্য পরিত্যাগ করিয়াছে।" রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"কোন মুসলমানের জন্য স্বীয় চক্ষু দ্বারা এমনভাবে ইশারা করা দুরস্ত নহে, যাহাতে অপর মুসলমান ব্যথা পায় এবং এমন কোন কার্য করাও দুরস্ত নহে যাহার কারণে অপর মুসলমান চিন্তান্বিত ও ভীত হয়।"
হযরত মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, দোযখীদিগকে আল্লাহ্ পাঁচড়া রোগে আক্রান্ত করিবেন। তাহারা এত চুলকাইবে যে (তাহাদের মাংস খসিয়া) হাড় বাহির হইয়া পড়িবে। তখন আহ্বানকারী ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিবে : পরিশ্রম ও কষ্ট কিরূপ হইতেছে? তাহারা উত্তর দিবে : অত্যন্ত কঠিন ও ভীষণ। তখন তাহাদিগকে বলা হইবে : তোমরা দুনিয়াতে মুসলমানদিগকে কষ্ট দিতে এই কারণেই তোমাদের এই শাস্তি। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : আমি বেহেশতে এক ব্যক্তিকে যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে বিচরণ করিতে দেখিলাম।এই আমোদ-প্রমোদের অধিকার তাহার এই কারণে ভাগ্যে ঘটিয়াছে যে, যেন কাহারও কষ্ট না হয় এইজন্য সে রাস্তা হইতে একটি বৃক্ষ কাটিয়া ফেলিয়াছিল।
(৩) তৃতীয়ত কর্তব্যঃ কাহারও সহিত অহংকার না করা। কারণ অহংকারকারিগণকে আল্লাহ্ পছন্দ করেন না। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : বিনয়ী হওয়ার জন্য আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হইয়াছে যেন কেহই কাহারও উপর অহংকার না করে। এই জন্য রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বিধবাগণ ও মিসকীনদের নিকট গমন করিতেন এবং তাহাদের অভাব পূরণ করিতেন।
ফলকথা, কাহারও প্রতি অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা উচিত নহে। সম্ভবতঃ সে ব্যক্তি আল্লাহর একজন প্রিয়পাত্র। কিন্তু তুমি তাহা জান না। আল্লাহ্ তাহার অনেক প্রিয়পাত্রকে গোপন রাখিয়াছেন যেন লোকজন তাঁহাদের সহিত মেলামেশা করিতে না পারে।
(৪) চতুর্থ কর্তব্য : কোন মুসলমান সম্বন্ধে পরোক্ষ নিন্দুকের কথায় কর্ণপাত না করা। কারণ সৎলোকের কথা শ্রবণ করা উচিত। পরোক্ষ নিন্দাকারী ফাসিক। হাদীস শরীফে আছে যে, কোন পরোক্ষ নিন্দাকারী বেহেশতে প্রবেশ করিবে না।
যে ব্যক্তি তোমার সম্মুখে অপরের নিন্দা করে, সে অপর লোকের নিকট তোমারও দুর্ণাম করিবে। পরোক্ষ নিন্দুক হইতে দূরে থাকিবে এবং তাহাকে মিথ্যাবাদী বলিয়া জ্ঞান করিবে।
(৫) পঞ্চম কর্তব্য : তিনদিনের অধিক কোন প্রিয়জনের সহিত কথাবার্তা বন্ধ না রাখা। কারণ রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন যে,
"তিনদিনের অধিক কোন মুসলমান ভ্রাতার সহিত কথাবার্তা বন্ধ রাখা দুরস্ত নহে। তাহাদের মধ্যে যে ব্যক্তি প্রথমে সালাম দেয় সে ব্যক্তিই উত্তম।" হযরত ইক্রামা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ্ হযরত ইউসুফ (আঃ) কে বলেন : "আমি তোমার নাম ও মর্যাদা এই জন্য বৃদ্ধি করিয়াছি যে, তুমি তোমার ভাইদের অপরাধ ক্ষমা করিয়া দিয়াছ।" হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছে :
"তুমি তোমার মুসলমান ভ্রাতার অপরাধ ক্ষমা করিলে আল্লাহ্ তোমার মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করিবেন।"
(৬) ষষ্ঠ কর্তব্য : সৎ-অসৎ সকলের সহিত সদ্ব্যবহার করা ও তাহাদের উপকার করা। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে "যাহার সহিত সম্ভব হয় সদ্ব্যবহার ও মঙ্গল কর, যদিও সে উহার উপযোগী নহে। কিন্তু তুমি উহা করার উপযোগী।" হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছে :
"ঈমানের পরই সৃষ্টের সহিত সৌহার্দ্য স্থাপন করা এবং সৎ-অসৎ নির্বিশেষে সকলের মঙ্গল সাধন করা আসল বুদ্ধিমত্তার কাজ।"
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, কোন ব্যক্তি কথা-বার্তা বলার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর হস্ত ধারণ করিলে সে ব্যক্তি নিজে হাত ছাড়িবার পূর্বে তিনি তাহার হস্ত ছাড়িতেন না এবং কেহ রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সহিত আলাপ করিলে তিনি সম্পূর্ণরূপে তাহার দিকে মনোনিবেশ করিতেন ও কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ধৈর্য ধারণ করিয়া থাকিতেন।
(৭) সপ্তম কর্তব্য : বয়োজ্যেষ্ঠগণকে সম্মান ও কনিষ্ঠগণকে স্নেহ করা। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
"যে ব্যক্তি বয়োজ্যেষ্ঠগণকে সম্মান করে না এবং কনিষ্ঠদিগকে দয়া ও স্নেহ করে না সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নহে। কারণ, শুভ্র কেশের প্রতি সম্মান আল্লাহ্ প্রতি সম্মান।" তিনি আরও বলেনঃ
"যে যুবক বয়োজ্যেষ্ঠগণের সম্মান করে, আল্লাহ্ সে যুবকগণকে তাহার বার্ধক্যের সময় তাহাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের তওফীক প্রদান করিবেন।" ইহা দীর্ঘায়ুর শুভ সংবাদ। বয়োজ্যেষ্ঠগণের প্রতি যুবকের সম্মান প্রদর্শন প্রমাণ করে যে, সে যুবকও দীর্ঘায়ু লাভ করিবে এবং বয়োজ্যেষ্ঠগণের প্রতি সে যে সম্মান প্রদর্শন করিত, উহার উত্তম বিনিময় পাইবে। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সফর হইতে ফিরিয়া আসিলে সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) তাহাদের অল্প বয়স্ক ছেলেদিগকে লইয়া তাঁহার খিদমতে হাজির হইতেন। তিনি বালকদিগকে স্বীয় বাহনের উপর উঠাইয়া কাহাকেও সম্মুখে বসাইতেন, কাহাকেও পিছনে বসাইতেন। সম্মুখের বালক গর্ব করিয়া বলিতঃ দেখ, রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে সম্মুখে বসাইয়াছেন এবং তোমাকে পশ্চাতে বসাইয়াছেন। নামকরণ ও দু'আর জন্য একটি শিশু ছেলেকে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে হাজির করা হইল। তিনি শিশুটিকে কোলে তুলিয়া লইলেন। এরূপ স্থলে যদি কোন শিশু তাহার পবিত্র ক্রোড়ে পেশাব করিতে আরম্ভ করিত, তখন লোকে শোরগোল করিয়া শিশুটিকে তাহার কোল হইতে উঠাইয়া লইতে চাহিলে তিনি তাহাকে বাধা দিয়া বলিতেনঃ তাঁহাকে এই অবস্থায় থাকিয়া পেশাব করিতে দাও। তাহার পেশাব বন্ধ করিও না। শিশুর অভিভাবকের সম্মুখে তিনি সেই পেশাবযুক্ত কাপড় ধৌত করিতেন না। কারণ, হয়ত সে মনে কষ্ট পাইতে পারে। লোকটি বাহির হইয়া গেলে তিনি উহা ধুইয়া লইতেন। শিশু ছেলে দুগ্ধপোষ্য হইলে তাহার পেশাবযুক্ত বস্ত্র তিনি হালকাভাবে ধৌত করিতেন।
(৮) অষ্টম কর্তব্য : সকল মুসলমানের সহিত প্রফুল্ল বদনে সাক্ষাত করা এবং তাহাদের সহিত প্রফুল্ল থাকা। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
"আল্লাহ্ প্রফুল্লবদন ও সরলচিত্ত ব্যক্তিকে ভালবাসেন।" তিনি আরও বলেন : "যে নেক কার্যের দরুন পাপ মার্জনা করা হয় উহা সরল ব্যবহার, প্রফুল্লবদন ও মিষ্ট ভাষণ।"
হযরত আনাস (রা) বলেন যে, এক গরীব স্ত্রীলোক রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পথরোধ করিয়া দাঁড়াইয়া নিবেদন করিলঃ আপনার খেদমতে আমার কিছু বলিবার আছে। হুযূর বলিলেনঃ এই গলির মধ্যে যেখানে ইচ্ছা বসিয়া পড়, আমিও বসিব। স্ত্রীলোকটি একস্থানে বসিল, হুযুরও বসিলেন। তাহার সকল বক্তব্য শেষ না করা পর্যন্ত তিনি তথায় বসিয়া রহিলেন।
(৯) নবম কর্তব্য : কোন মুসলমানের সহিত প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ না করা। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে,
"তিনটি দোষ যাহার মধ্যে আছে সে ব্যক্তি যদিও নামায পড়ে এবং রোযা রাখে তথাপি সে মুনাফিক। তিনটি দোষ এই (১) মিথ্যা বলা, (২) প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা এবং (৩) আমানত খেয়ানত করা।"
(১০) দশম কর্তব্য : প্রত্যেককে তাহার পদমর্যাদা অনুযায়ী সম্মান করা। যে ব্যক্তি সমাজে সম্মানিত তাহাকে যথেষ্ট সম্মান করিবে। কোন ব্যক্তিকে আড়ম্বরপূর্ণ পরিচ্ছদে অশ্বে আরোহিত এবং পরিপাটিপূর্ণ অবস্থায় দেখিলে বুঝিতে হইবে, তিনি একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি। হযরত আয়েশা (রাঃ) এক সফরে আহারে বসিয়াছেন। এমন সময় এক ফকীর আসিয়া উপস্থিত হইলে তিনি বলিলেন : তাহাকে একটি রুটি দিয়া দাও। কিন্তু তখনই এক অশ্বারোহী আসিয়া উপস্থিত হইলে তাঁহাকে ডাকিয়া বসাইতে বলিলেন। উপস্থিত লোকগণ বলিলেন : আপনি ফকীরকে ত্যাগ করিয়া আমীরকে ডাকিয়া আনিলেন! হযরত আয়েশা (রা) বলিলেন : আল্লাহ্ প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন মর্যাদা দান করিয়াছেন। সেই মর্যাদার প্রাপ্য হক পালনের প্রতি আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত। ফকীর এক রুটিতেই সন্তুষ্ট হইয়া থাকে, আমীরের সহিত এইরূপ আচরণ সমীচীন নহে। তাঁহার সহিত এইরূপ ব্যবহার করিতে হইবে যাহাতে তিনি সন্তুষ্ট হন। হাদীস শরীফে আছে :
"কোন সম্প্রদায়ের সম্মানিত ব্যক্তি তোমার নিকট আগমন করিলে তাঁহার সম্মান কর।"
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবার শরীফে কোন সম্মানী ব্যক্তি আগমন করিলে তিনি তাঁহাদিগকে নিজের পবিত্র চাদর পাতিয়া বসাইতেন। তাঁহার বৃদ্ধা দুধ মাতা একদা তাঁহার নিকট আগমন করিলে তিনি তাঁহাকে নিজের চাদর বিছাইয়া বসিতে দিলেন এবং বলিলেন : মারহাবা, মাতা : আপনার যাহা ইচ্ছা বলুন, আমি প্রদান করিব। তৎপর গনীমতের মালের যে অংশ তিনি পাইয়াছিলেন তাহা সম্পূর্ণ তাঁহাকে প্রদান করিলেন। পুণ্যশীলা ভাগ্যবতী মহিলা উহা হযরত উসমান (রাঃ)-র নিকট এক লক্ষ দিরহাম মূল্যে বিক্রয় করিয়া ফেলিলেন।
(১১) একাদশ কর্তব্য : মুসলমানদের মধ্যে পরস্পর বিবাদ-মীমাংসা করিয়া দেওয়ার চেষ্টা করা। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ কোন কার্য রোযা, নামায ও সাদৃকা হইতে উত্তম, আমি তোমাদিগকে বলিয়া দিব কি ? লোকেরা নিবেদন করিল: অনুগ্রহপূর্বক বলুন। তিনি বলিলেন :
"মুসলমানদের মধ্যে (পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ হইলে) মীমাংসা করিয়া দেওয়া।" হযরত আনাস (রা) বলেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বসিয়া নিজে নিজে হাসিতে ছিলেন। হযরত উমর (রা) তখন নিবেদন করিলেন : আমার পিতামাতা আপনার প্রতি উৎসর্গ হউক, হুযূরের হাসিবার কারণ জানিতে পারি কি ? হুযূর বলিলেন
"কিয়ামত দিবস আমার উম্মতের মধ্য হইতে দুই ব্যক্তি মহাপ্রতাপশালী আল্লাহ্ তা'আলার সম্মুখে নতজানু হইয়া থাকিবে। তাহাদের একজন বলিবে : ইয়া আল্লাহ্! এই ব্যক্তি আমার উপর অত্যাচার করিয়াছে; ইহার বিচার করুন। বিবাদীকে আল্লাহ্ বলিলেন : তাহার প্রাপ্য দিয়া দাও। সে (বিবাদী) নিবেদন করিবেঃ ইয়া আল্লাহ! আমার সমস্ত পূণ্য তো অন্য দাবীদারগণ লইয়া গিয়াছে। আমার নিকট এখন কিছু নাই। বাদীকে আল্লাহ্ বলিবেন : এখন তুমি কি করিবে? তাহার নিকট তো কোন নেকী নাই। বাদী বলিবে : আমার গুনাহ্ তাহাকে অর্পণ করুন। তখন বাদীর গুনাহ্ বিবাদীর মাথায় চাপাইয়া দেওয়া হইবে। কিন্তু ইহাতেও বাদীর প্রাপ্য আদায় হইবে না। এতটুকু বলিয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রোদন করিলেন এবং বলিলেন : ইহাই একটি ভীষণ দিন, যখন প্রত্যেকে স্বীয় পাপের বোঝা দূরে সরাইতে চাহিবে (অতঃপর পূর্বের কথা আরম্ভ করিয়া হুযূর বলিলেন) : সেই সময় পরম করুণাময় আল্লাহ্ বলিবেন : মস্তক উত্তোলন কর; বলত তুমি কি দেখিতেছ? সে নিবেদন করিবে : ইয়া আল্লাহ! রৌপ্যনির্মিত নগর দেখিতেছি। ইহাতে মহামূল্য রত্ন ও মণিমুক্তা খচিত স্বর্ণের প্রাসাদসমূহ দৃষ্টিগোচর হইতেছে। (ইয়া আল্লাহ্) কোন নবী, শহীদ কিংবা সিদ্দীক কি ইহার অধিকারী? আল্লাহ্ বলিবেনঃ যে ব্যক্তি ইহার মূল্য দিবে সেই ইহার মালিক হইবে। বাদী নিবেদন করিবে। : হে বিশ্বপ্রভু! ইহার মূল্য কাহারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব? আল্লাহ্ বলিবেন : তুমি দিতে পার। বাদী বলিবে : ইয়া আল্লাহ্! কিরূপে দিতে পারি? উত্তর হইবে : তুমি তোমার এই ভ্রাতার অপরাধ ক্ষমা করিয়া দিলে ইহার মূল্য দেওয়া হইল। বাদী (আনন্দে আত্মহারা হইয়া নিবেদন করিবে : হে করুণাময়! আমি তাহার অপরাধ ক্ষমা করিয়া দিলাম। তখন আদেশ হইবে : উঠ ও তাহার হস্ত ধারণ কর এবং তোমরা উভয়ে বেহেশতে চলিয়া যাও। এতটুকু বলিয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : আল্লাহ্কে ভয় কর এবং মানুষের মধ্যে পরস্পর সন্ধি করিয়া দাও। কারণ, আল্লাহ কিয়ামত দিবস মুসলমানদের মধ্যে সন্ধি করিয়া দিবেন।
(১২) দ্বাদশ কর্তব্য : মুসলমানের সকল ত্রুটি ও গোপনীয় দোষ গোপন রাখা। কারণ, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি এই জগতে মুসলমানগণের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখিবে, কিয়ামত দিবস আল্লাহ্ তাহার গুনাগুলি গোপন রাখিবেন। হযরত আবূবকর (রাঃ) বলেন : আমি যখন কাহাকেও গ্রেফতার করি, সে চোরই হউক কিংবা শরাব-খোরই হউক, তখন আমি এই আশা পোষণ করিয়া থাকি যে, আল্লাহ্ যেন তাহার অশ্লীল পাপ গোপন রাখেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"হে লোকগণ! তোমরা কেবল মুখে কালেমা পড়িয়াছ : এখনও তোমাদের অন্তরে ঈমান আসে নাই। লোকদের গীবত (পরোক্ষ নিন্দা) করিও না, তাহাদের গোপনীয় দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করিও না। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ-ত্রুটি ব্যক্ত করে, আল্লাহ্ তাহার দোষ-ত্রুটি ব্যক্ত করিয়া দেন যাহাতে সে অপদস্ত হয়, যদিও তাহার গৃহে হউক।"
হযরত ইব্ন মাসউদ (রা) বলেনঃ আমার স্মরণ আছে, যখন সর্বপ্রথম লোকে এক ব্যক্তিকে চুরি কার্যে গ্রেফতার করিয়া তাহার হাত কাটিবার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট আনয়ন করিল, তখন হুযূরের নূরানী চেহারার বর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেল। লোকে জিজ্ঞাসা করিল : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আপনি এই কার্যে অসন্তুষ্ট হইয়াছেন? হুযুর বলিলেনঃ কেন হইব না? আপন ভ্রাতার সহিত শত্রুতা সাধনে আমি শয়তানের সাহায্যকারী কেন হইব? তোমরা যদি চাহ যে, আল্লাহ্ তোমাদিগকে ক্ষমা করেন ও তোমাদের গুনাহ্ গোপন রাখেন এবং মার্জনা করেন তবে তোমরাও লোকের গুনাহ গোপন রাখ। কারণ, বিচারকের সম্মুখে অপরাধী পৌছিলে যথাবিহিত দণ্ডবিধান ব্যতীত উপায়ান্তর থাকিবে না। হযরত উমর (রাঃ) এক রজনীতে নগরের অবস্থা পরিদর্শনের জন্য বাহির হইলেন, এমন সময় তিনি এক গৃহ হইতে গানের আওয়াজ শুনিতে পাইলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি ছাদের উপর দিয়া গৃহে প্রবেশ করতঃ দেখিত পাইলেন, জনৈক পুরুষ এক কূলটা রমণীর সহিত মদ্য পান করিতেছে। তখন তিনি বলিলেন হে আল্লাহর দুশমন! তুমি ধারণা করিয়াছিলে তোমার এই পাপ আল্লাহ্ গোপন রাখিবেন। তখন সে ব্যক্তি নিবেদন করিল : হে আমীরুল মু'মিনীন! তাড়াতাড়ি করিবেন না। আমি যদি একটি পাপ করিয়া থাকি, আপনি কিন্তু তিনটি পাপ করিলেন । আল্লাহ্ বলেন :
“তোমরা পরস্পর দোষ অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইও না”। আপনি অপরের দোষ অনুসন্ধান করিয়াছেন। আল্লাহ্ বলেন-“তোমরা গৃহের দ্বার দিয়া গৃহে প্রবেশ কর”। কিন্তু আমার গৃহের কপাট বন্ধ দেখিয়া আপনি ছাদের উপর দিয়া গৃহে প্রবেশ করিয়াছেন। আল্লাহ্ বলেন, "যতক্ষণ পর্যন্ত গৃহস্বামীর অনুমতি না পাও এবং গৃহের অধিবাসীদিগকে সালাম না কর ততক্ষণ তোমার নিজ গৃহ ভিন্ন অপরের গৃহে প্রবেশ করিও না"। অথচ আপনি বিনা অনুমতিতে আমার গৃহে প্রবেশ করিয়াছেন এবং সালামও দেন নাই। হযরত উমর (রাঃ) বলিলেন : আমি ক্ষমা করিলে তুমি তওবা করিবে কি? সে নিবেদন করিল : হ্যাঁ, তওবা করিব এবং আর কখনও এমন কাজের নিকটবর্তী হইব না। তিনি ক্ষমা করিলেন এবং সে তওবা করিল।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"যে ব্যক্তি কান পাতিয়া কাহারও এমন কথা শ্রবণ করে যাহা তাহাকে ব্যতীত (অপরের নিকট) বলা হইতেছে, কিয়ামত দিবস সীসা গলাইয়া তাহার কানে ঢালিয়া দেওয়া হইবে"।
(১৩) ত্রয়োদশ কর্তব্য : মিথ্যা অপবাদের স্থান হইতে দূরে থাকা যেন মুসলমানের অন্তর তোমার প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা হইতে এবং তাহাদের রসনা তোমার দোষ রটনা হইতে রক্ষা পায়। কেননা, যে ব্যক্তি কোন পাপের কারণ হয় সে সেই পাপের অংশীদার হইয়া পড়ে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি স্বীয় মাতাপিতাকে গালি দেয়, সে কেমন? লোকে নিবেদন করিল : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! এমন কাজ কে করিবে, যে নিজের মাতাপিতাকে গালি দিবে? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন :
"যে ব্যক্তি অপর কাহারও মাতাপিতাকে গালি দেয় এবং তদুত্তরে সেই ব্যক্তি তাহার মাতাপিতাকে গালি দেয়, তবে সে যেন নিজের মাতাপিতাকেই গালি দিল।"
হযরত উমর (রা) বলেন যে, যে স্থানে বসিলে লোকে দোষারোপ করিতে পারে এমন স্থানে বসিলে যদি তোমার প্রতি কেহ মন্দ ধারণা পোষণ করে তবে তাহাকে তিরস্কার করা তোমার জন্য দুরস্ত নহে।
কোন এক রমযান মাসের শেষভাগে একদা রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উম্মুল মু'মিনীন হযরত সুফিয়া (রা) সহিত মসজিদে আলাপ করিতেছিলেন। এমন সময় তথায় একজন লোক আসিয়া পড়িল। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) লোকটিকে ডাকিয়া বলিলেনঃ তিনি আমার স্ত্রী। হযরত সুফিয়া (রাঃ) নিবেদন করিলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! লোকে অপরের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করিতে পারে; কিন্তু আপনার প্রতি (মন্দ ধারণা পোষণ) করিতে পারে না। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ শয়তান মানবদেহে এমনভাবে চলাফেরা করিতে পারে যেমন শিরা-উপশিরার রক্ত চলাচল করিয়া থাকে।
হযরত উমর (রা) জনৈকা স্ত্রীলোকের সহিত এক পুরুষকে পথিমধ্যে আলাপ করিতে দেখিয়া তাহাকে দুররা মারিলেন। লোকটি নিবেদন করিলঃ ইয়া আমীরুল মু'মিনীন! এই মহিলা আমার স্ত্রী। হযরত উমর (রা) বলিলেন : তবে তুমি এমন স্থানে কেন আলাপ করিতেছ না যেখানে কেহ দেখিতে না পায়?
(১৪) চতুর্দশ কর্তব্য : পদমর্যাদাশীল ও ক্ষমতাবান হইলে অপরের জন্য সুপারিশ করিতে দ্বিধা না করা।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে সম্বোধন করিয়া বলেন : তোমাদের কেহ আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করিলে আমার ইচ্ছা হয় তৎক্ষণাৎ দিয়া দেই। কিন্তু এইজন্য বিলম্ব করিয়া থাকি যে, তোমাদের মধ্যে কেহ তজ্জন্য সুপারিশ করিয়া উহার বিনিময় প্রাপ্ত হও। অতএব তোমরা সুপারিশ কর এবং সওয়াব অর্জন কর। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন :
"কোন সদকা মৌখিক সদকা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট নহে। নিবেদন করা হইল : ইয়া রাসূলুল্লাহ! মৌখিক সদকা কি? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : সেই সুপারিশ যাহা কাহারও প্রাণরক্ষা করে, কাহারও উপকার করে অথবা কাহাকেও কষ্ট হইতে রক্ষা করে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে স্থানে কেহ কোন মুসলমানকে গালি দেয় এবং তাহকে অপমান করিবার প্রয়াস পায় সেখানে যে ব্যক্তি উক্ত মুসলমানের সাহায্য করিবে আল্লাহ্ উক্ত সাহায্যকারীকে এমন স্থানে সাহায্য করিবেন, যেখানে সে সাহায্যের জন্য একান্তভাবে মুখাপেক্ষী হইবে। আর কেহ কোন মুসলমানকে অপমান করিতে উদ্যত হইলে যে মুসলমান তাহার সাহায্য করে না আল্লাহ্ এইরূপ ব্যক্তিকে এমন স্থানে অপমানিত ও ধ্বংস করিবেন যে স্থানে সাহায্যের জন্য সে নিতান্ত প্রত্যাশী হইয়া থাকিবে।
(১৬) ষোড়শ কর্তব্য : ঘটনাচক্রে কোন অসৎ লোকের সংসর্গে আবদ্ধ হইয়া পড়িলে অব্যাহতি হওয়া না পর্যন্ত তাহার সহিত শিষ্টাচার রক্ষা করিয়া চলা এবং সামনাসামনি তাহার সহিত কঠোর ও কর্কশ ব্যবহার না করা।হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) "তাহারা ভাল দ্বারা মন্দের প্রতিশোধ করিয়া থাকে।” আয়াতের তফসীরে সালাম ও ভদ্র ব্যবহার দ্বারা অসত্যের প্রতিদান দেওয়াকে বুঝাইয়াছেন। হযরত আয়েশা (রা) বলেন : এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবার শরীফে হাযির হওয়ার অনুমতি চাহিল। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ তাহাকে অনুমতি দাও। আর এই লোকটি তাহার কওমের মধ্যে অত্যন্ত অসৎ। সেই ব্যক্তি দরবারে আগমন করিলে হুযূর (সা) তাহার সহিত এমন ব্যবহার করিলেন যাহাতে তাহাকে হুযূরের নিকট খুব মর্যাদাবান বলিয়া আমার মনে হইল। লোকটি বাহির হইয়া গেলে আমি নিবেদন করিলাম : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আপনি অসৎ লোকটিকে অসৎ বলিয়াও বর্ণনা করিলেন, আবার তাহার এত খাতিরও করিলেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : হে আয়েশা (রা)! কিয়ামত দিবস সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট হইবে যাহার ক্ষতির আশংকায় লোকে তাহাকে খাতির করিয়া থাকে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, অশ্লীলভাষী লোকদের কটুবাক্য হইতে নিজের মান-সম্ভ্রম রক্ষার জন্য ব্যয় করা হয় তাহা সকার মধ্যে গণ্য। হযরত আবূ দারদা (রা) বলেন : এমন অনেক লোক আছে যাহাদের সম্মুখে আমরা প্রফুল্ল বদনে থাকি। কিন্তু আমাদের অন্তর তাহাদিগকে লানত করিতে থাকে।
(১৭) সপ্তদশ কর্তব্য : দরিদ্রগণের সহিত সঙ্গদান করা ও তাহাদের সহিত বন্ধুত্ব রাখা এবং আমীরদের সহিত সংসর্গ পরিত্যাগ করা।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : মৃতদের নিকটে বসিও না। সাহাবায়ে কিরাম (রা) নিবেদন করিলেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! তাহারা কে ? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : আমীর লোক হযরত সুলাইমান (আ) স্বীয় রাজ্যের যেখানে দরিদ্র লোক দেখিতে পাইতেন সেখানেই তাহাদের সহিত বসিয়া পড়িতেন এবং বলিতেন : মিসকীন মিসকীনগণের পার্শ্বে বসিল। হযরত ঈসা (আ)-কে ‘ইয়া মিসকীন' বলিয়া সম্বোধন করিলে তিনি যত সন্তুষ্ট হইতেন অপর কোন নামেই তত সন্তুষ্ট হইতেন না।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দু'আ করিতেন : ইয়া আল্লাহ্! আমাকে আজীবন মিসকীন রাখিয়েন। যখন আমাকে মৃত্যু দান করিবেন, মিসকীন অবস্থায় মৃত্যু দান করিয়েন। আর যখন পুনরুত্থান করিবেন, মিসকীনদের সঙ্গে আমাকে পুনরুত্থান করিয়েন। হযরত মূসা (আ) নিবেদন করিলেনঃ ইয়া আল্লাহ্! কোথায় আপনাকে অন্বেষণ করিব ? উত্তর আসিল : ভগ্নহৃদয় লোকদের নিকট ।
(১৮) অষ্টাদশ কর্তব্য : মুসলমানের মন সন্তুষ্ট করিতে ও তাহাদের অভাব মোচন করিতে চেষ্টা করা।রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের অভাব মোচন করিল সে যেন সমস্ত জীবন আল্লাহ্র খেদমত করিল। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের চক্ষু উজ্জ্বল করিবে কিয়ামত দিবস আল্লাহ্ তাহার চক্ষু উজ্জ্বল করিবেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেনঃ যে ব্যক্তি দিবাভাগে বা রাত্রিকালে এক ঘন্টা সময় কোন মুসলমানের অভাব মোচনের জন্য ব্যয় করে, তাহার অভাব মোচন হউক, বা না হউক এই এক ঘণ্টাকাল তাহার জন্য দুই মাস মসজিদে অবস্থানপূর্বক একমাত্র আল্লাহ্র ইবাদতে লিপ্ত থাকা অপেক্ষা উত্তম। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি কোন বিষণ্ন লোককে শান্তি প্রদান করে বা অত্যাচারিত লোককে অত্যাচার হইতে রক্ষা করে, আল্লাহ্ তাহাকে তিয়াত্তরটি ক্ষমা প্রদান করিবেন। হুযূর (সা) বলেনঃ তোমরা আপন ভাইকে সাহায্য কর; সে অত্যাচারী হউক কিংবা অত্যাচারিত হউক। সাহাবায়ে কিরাম (রা) নিবেদন করিলেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! অত্যাচারী হইলে তাহাকে কিরূপে সাহায্য করিবে ? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ কোন মুসলমানের মন সন্তুষ্ট করা অপেক্ষা কোন ইবাদতই আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় নহে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : দুইটি স্বভাব অপেক্ষা নিকৃষ্ট পাপ আর নাই । আল্লাহর সহিত শরীক করা এবং মানুষকে কষ্ট দেওয়া। আর দুইটি স্বভাব অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ইবাদত আর নাই-আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ণ করা এবং মানুষকে আরাম প্রদান করা। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : মুসলমানের ব্যথায় যে ব্যক্তি ব্যথিত না হয় সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নহে।
হযরত ফুযায়ল (র)-কে ক্রন্দন করিতে দেখিয়া লোকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন : তিনি বলিলেন : ঐ সকল নিঃস্ব মুসলমানের জন্য আমি ক্রন্দন করিতেছি যাহারা আমার উপর অত্যাচার করিয়াছে। কিয়ামতের ময়দানে তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করা হইবে-তোমরা অত্যচার করিয়াছিলে কেন ? তখন তাহারা অপদস্থ হইবে এবং তাহাদের কোন ওযর-আপত্তিই গৃহীত হইবে না। হযরত মারূফ কাযী (র) বলেন : যে ব্যক্তি প্রত্যহ তিনবার প্রার্থনা করিবে ইয়া আল্লাহ্! মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মতের অবস্থা ভাল করিয়া দাও। ইয়া আল্লাহ্! মুহাম্মদ (সা)-এর উম্মতের প্রতি দয়া বর্ষণ কর। ইয়া আল্লাহ্! মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মতকে সচ্ছলতা দান কর। তাহার নাম আবদালগণের মধ্যে লিখিত হইবে।
(১৯) ঊনবিংশ কর্তব্য : কোন মুসলমানের নিকট পৌছামাত্র কথা বলিবার পূর্বে সর্বাগ্রে সালাম মুসাফাহা করা। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, সালামের পূর্বে কেহ কথা বলিলে সে সালাম না করা পর্যন্ত তাহার উত্তর দিবে না। এক ব্যক্তি সালাম ব্যতীত রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হইলেই তিনি তাহাকে আদেশ করিলেন তুমি বাহির হইয়া যাও এবং সালাম করিয়া পুনরায় প্রবেশ কর।
হযরত আনাস (রা) বলেন : আমি আট বৎসর রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খিদমত করার পর তিনি আমাকে বলিলেন-হে আনাস! তাহারা (অর্থাৎ ওযু গোসল) উত্তমরূপে করিও যেন তাহার আয়ূ দীর্ঘ হয়। আর কোন মুসলমানের নিকট পৌছামাত্র অগ্রে তাহাকে সালাম কর যেন তোমার সওয়াব বৃদ্ধি পায় এবং যখন নিজ গৃহে প্রবেশ কর তখন নিজ পরিবারের লোকদিগকে সালাম কর। তাহাতে তোমার গৃহে প্রচুর মঙ্গল হইবে।
একব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া বলিল : সালামুন আলাইকুম। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : তাহার জন্য দশটি সওয়াব লিখিত হইবে। দ্বিতীয় ব্যক্তি উপস্থিত হইয়া বলিল : সালামুন আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ তাহার জন্য বিশটি সওয়াব লিখিত হইবে। তৃতীয় ব্যক্তি আসিয়া বলিলঃ সালামুন আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ তাহার জন্য ত্রিশটি সওয়াব লিখিত হইবে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"গৃহে প্রবেশকালে সালাম কর এবং বাহির হওয়ারকালেও সালাম কর। পূর্বের সালাম পরের সালাম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট নহে"। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"দুই মুসলমান যখন পরস্পর মুসাফাহা করে তখন সত্তরটি রহমত তাহাদের মধ্যে ভাগ করিয়া দেওয়া হয়। তন্মন্ধে যে ব্যক্তি অধিকতর প্রফুল্লবদনে মিলিত হয় তাহার অংশে ঊনসত্তরটি রহমত পড়ে। আর যখন দুইজন মুসলমান পরস্পর সালাম করে তখন একশতটি রহমত তাহাদের মধ্যে ভাগ করিয়া দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি অগ্রে সালাম করে তাহার ভাগে নব্বইটি এবং যে ব্যক্তি সালামের জওয়াব দেয় তাহার ভাগে দশটি রহমত পড়ে।
বুযর্গগণের হস্ত চুম্বন করা সুন্নত। হযরত আবূ উবায়দা ইন জাররাহ (রা) আমীরুল মুমেনীন হযরত উমর ফারুক (রা) হস্ত চুম্বন করিয়াছিলেন। হযরত আনাস (রা) বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম আমরা কোন বন্ধুর নিকট গমন করিলে (তাহার সম্মানার্থে মস্তক অবনত করতঃ) পৃষ্ঠদেশ বাঁকাইব কি? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন-না। আমি আবার নিবেদন করিলাম তাহার হস্ত চুম্বন করিব কি? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন-না। আবার নিবেদন করিলাম-মুসাফাহা করিব কি ? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন -হ্যাঁ। কিন্তু কোন প্রাপ্তবয়স্ক বন্ধু বিদেশ ভ্রমণ হইতে প্রত্যাবর্তন করিলে তাহাকে চুম্বন ও আলিঙ্গন করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সম্মানার্থে কেহ দণ্ডায়মান হইলে তিনি সন্তুষ্ট হইতেন না।
হযরত আনাস (রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অপেক্ষা অধিক প্রিয় আমাদের আর কেহ ছিলেন না। তাঁহার (সম্মানের) জন্য আমরা দণ্ডায়মান হইতাম না। আমরা জানিতাম এই কার্যে তিনি অসন্তুষ্ট হইতেন। কিন্তু যেখানে দাঁড়াইবার প্রথা হইয়া গিয়াছে, সেখানে সোজা দাঁড়াইয়া সম্মান প্রদর্শনে কোন ক্ষতি নাই। কাহারও সম্মুখে জোড়হস্তে দণ্ডায়মান হওয়া নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ লোক তাহার সম্মুখে জোড়হস্তে দাঁড়াইয়া থাকুক আর সে নিজে বসিয়া থাকুক, ইহা যে ব্যক্তি পছন্দ করে, তাহাকে বলিয়া দাও, সে যেন দোযখে নিজের স্থান করিয়া লয়।
(২০) বিংশতি কর্তব্য : হাঁচিদাতার উত্তর দেওয়া। হযরত ইব্ন মাসউদ (রা) বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমাদিগকে শিক্ষা দিয়াছেন--হাঁচিদাতা 'আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন' বলিবে ও শ্রবণকারী ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলিবে এবং আবার সেই ব্যক্তি (হাঁচিদাতা) “ইয়ারহামুকাল্লাহ লী ওয়ালাকুম বলিবে। কিন্তু যে ব্যক্তি হাঁচির পর ‘আল্হামদুলিল্লাহ' বলিবে না সে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ' দু'আ পাওয়ার অধিকারী হইবে না।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) হাঁচি দিবার আওয়ায দমন করিয়া অনুচ্চস্বর হাঁচিতেন এবং হাঁচির সময় মুখের উপর হাত রাখিতেন। পায়খানা বা প্রস্রাব করিবার সময় কাহারও হাঁচি আসিলে 'আলহামদু লিল্লাহ' মনে মনে বলিবে। হযরত ইবরাহীম নখঈ (রা) বলেন যে, এই সময় মুখে বলিলেও কোন ক্ষতি নাই।
হযরত কা'বুল আহবার (র) বলেন যে, হযরত মূসা (আ) নিবেদন করিয়াছিলেন : ইয়া আল্লাহ্! আপনি কি নিকটে যে, আস্তে কথা বলিব অথবা আপনি কি দূরে যে, উচ্চস্বরে কথা বলিব? উত্তর আসিল : যে ব্যক্তি আমাকে স্মরণ করে আমি তাহার সঙ্গে থাকি। তিনি আবার নিবেদন করিলেন ইয়া ইলাহী! আমার বিভিন্ন অবস্থা হইয়া থাকে; যেমন স্ত্রী-সহবাস ও পায়খানা-প্রসাবজনিত অপবিত্রাবস্থা। এমতাবস্থায় আপনাকে স্মরণ করা বে-আদবী। উত্তর আসিল : সকল অবস্থায় আমাকে স্মরণ কর এবং কোনরূপ আশংকা করিও না।
(২১) একবিংশতি কর্তব্য : বন্ধু-বান্ধব না হইলেও পরিচিত রুগ্ন ব্যক্তির তত্ত্বাবধান করা।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি রুগ্ন ব্যক্তির তত্ত্বাবধান করিবে সে বেহেশতে যাইবে এবং তত্ত্বাবধান করিয়া প্রত্যাবর্তনের সময় তাহার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত দু'আ করিবার উদ্দেশ্যে সত্তর হাযার ফেরেশতা নিযুক্ত হইয়া থাকে।
পীড়িত ব্যক্তিকে দেখিবার সুন্নত তরীকা এই : স্বীয় হস্ত পীড়িত ব্যক্তির হস্ত বা ললাটের উপর রাখিবে, অবস্থাদি জিজ্ঞাসা করিবে এবং এই দু'আ পড়িবে।
بسم الله الرحمن الرحيم - أعيدك بالله الأحد الصمد الذي لم يلد ولم يولد – ولم يكن له كفوا أحد من شر ما تجد
পরম করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহর নামে আরম্ভ করিতেছি। তুমি যে কষ্ট অনুভব করিতেছ তাহা হইতে আমি তোমার জন্য একক ও অভাবশূণ্য আল্লাহর আশ্রয় ভিক্ষা করিতেছি, যিনি কাহাকেও জন্ম দেন নাই এবং নিজেও কাহার কর্তৃক জাত নহেন এবং যাহার কোনাই সমকক্ষ নাই ।
হযরত উসমান (রা) বলেন যে, একবার তিনি পীড়িত হইলে রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কয়েকবার তশরীফ আনয়ন করতঃ উপরি-উক্ত দু'য়াই পাঠ করিয়াছিলেন, নিম্নলিখিত দু'আ পাঠ করা,
أعوذ بعزة الله وقدرته من شر ما أجد
আমি যে কষ্ট অনুভব করিতেছি তাহা হইতে আল্লাহর ইযযত ও ক্ষমতার আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি।
এবং ‘কেমন আছ’ বলিয়া কেহ জিজ্ঞাসা করিলে আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ না করা পীড়িত ব্যক্তির জন্য সুন্নত।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, কোন লোক পীড়িত হইলে তাহার উপর আল্লাহ্ দুইজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন। তাঁহারা লক্ষ্য করেন, কেহ খোঁজ-খবর লইতে আসিলে পীড়িত ব্যক্তি শোকর করে, না অভিযোগ করে। সে যদি শোকর করে এবং বলে ‘আল হামদুলিল্লাহ', ভাল আছি তবে আল্লাহ বলেন : এখন আমার প্রতি কর্তব্য এই-যদি আমার বান্দাকে ইহলোক হইতে উঠাইয়া লই, তবে রহমতের সহিত উঠাইয়া লইব এবং বেহেশতে স্থান দিব। আর যদি আরোগ্য দান করি তবে এই পীড়ার কারণে তাহার গুনাহসমূহ ক্ষমা করিয়া দিব। যে রক্ত-মাংস পীড়ার পূর্বে তাহার দেহে ছিল এখন তাহাকে তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট রক্ত-মাংস দান করিব।
হযরত আলী (রা) বলেন যে, পেটে বেদনা হইলে স্বীয় স্ত্রীর মোহরের অর্থ হইতে কিছু লইয়া তদ্বারা মধু ক্রয়পূর্বক বৃষ্টির পানিতে মিশাইয়া পান করিলে উক্ত বেদনা আরোগ্য হয়। কারণ আল্লাহ্ বৃষ্টির পানিতে মুবারক, মধুকে রোগ নিরাময়ক এবং স্ত্রীর ক্ষমাকৃত মোহরকে প্রিয় ও সুস্বাদু করিয়াছেন। এই তিন জিনিসের সমন্বয় সাধিত হইলে নিঃসন্দেহে রোগ উপশম হইবে।
ফলকথা, অভিযোগ ও অধৈর্য প্রকাশ না করা এবং পীড়ার কারণে পাপ মোচনের আশা রাখা পীড়িত ব্যক্তির কর্তব্য। ঔষধ সেবনকালে ঔষধের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্র উপর ভরসা রাখিতে হইবে, ঔষধের উপর নহে।
পীড়িত ব্যক্তির তত্ত্বাবধানের নিয়ম : পীড়িত ব্যক্তির গৃহ-দ্বারে যাইয়া অনুমতি চাহিবে। দরজার সম্মুখে না দাঁড়াইয়া একপার্শ্বে দাঁড়াইবে। ধীরে ধীরে দ্বারে আঘাত করিবে। ‘হে গোলাম’ বলিয়া ডাকাডাকি করিবে না। ভিতর হইতে কেহ 'কে' বলিয়া জিজ্ঞাসা করিলে 'আমি' বলিয়া উত্তর দিবে না; (বরং নিজের পরিচয় প্রকাশ করিবে)। ‘হে গোলাম’, ওহে বয়’ ইত্যাদি বলিয়া ডাকাডাকির পরিবর্তে সশব্দে ‘সুবহানাল্লাহ’ ও 'আলহামদুলিল্লাহ' বলিবে। এই নিয়ম কেবল রোগীর গৃহে প্রবেশকালে প্রতিপাল্য নহে; বরং সর্বত্রই গৃহে প্রবেশের অনুমতি চাওয়া অথবা আগমন-বার্তা জানাইবার জন্য এই নিয়ম পালন করিবে।
রোগীর নিকট অধিকক্ষণ বসিয়া থাকিবে না। রোগীর অবস্থা সম্বন্ধে অধিক প্রশ্ন করিয়া তাহাকে বিরক্ত করিবে না। রোগ আরোগ্যের জন্য দু'আ করিবে। রোগীকে দেখিয়া নিজে দুঃখিত ও ব্যথিত হইয়াছ বলিয়া প্রকাশ করিবে। গৃহের অভ্যন্তরে প্রকোষ্ঠসমূহ ও দেয়ালের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবে না ।
(২২) দ্বাবিংশ কর্তব্য : জানাযার সহিত গমন করা। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি জানাযার সহিত গমন করে সে এক কীরাত সওয়াব পাইয়া থাকে। দাফন করা পর্যন্ত দণ্ডায়মান থাকিলে দুই কীরাত সওয়াব পাওয়া যাইবে এবং প্রত্যেক কিরাত ওহুদ পর্বতের সমান হইবে।
জানাযার সহিত গমনের নিয়ম: জানাযার সহিত গমনকালে নীরব থাকিবে, হাসিবে না। উপদেশ গ্রহণ করিবে, নিজ মৃত্যুর কথা স্মরণ করিবে। হযরত আমাশ (রা) বলেন: যখন আমরা জানাযার অনুগমন করিতাম তখন বুঝিতাম না যে, কাহার নিকট শোক প্রকাশ করিব। কারণ, প্রত্যেককে অন্যজন হইতে অধিক বিষণ্ণ বলিয়া মনে হইত।
কতিপয় লোক এক মৃতের জন্য শোক প্রকাশ করিতেছিল। ইহা দেখিয়া এক বুযর্গ বলিলেন : নিজের চিন্তা কর। কারণ, মৃত ব্যক্তি তিনটি বিপদ কাটাইয়া গিয়াছে। সে (১) মালাকুল মওতের চেহারা দর্শন করিয়াছে, (২) মৃত্যু-যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছে এবং (৩) অন্তিমকালের ভীতি অতিক্রম করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ তিনটি বস্তু মৃত ব্যক্তির পশ্চাতে গমন করে- (১) বন্ধু-বান্ধব, (২) ধন-সম্পদ ও (৩) আমল (কর্ম)। বন্ধু-বান্ধব ও ধন-সম্পদ তো ফিরিয়া আসে, আমল তাহার সঙ্গে থাকিয়া যায়।
(২৩) ত্রয়োবিংশ কর্তব্য : কবর যিয়ারতে যাওয়া, মৃতদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করা এবং নিজে উপদেশ গ্রহণ করা।
চিন্তা করিবে, এই সকল লোক আমার পূর্বে ইহলোক ত্যাগ করিয়াছে। আমাকেও অতিসত্বর যাইতে হইবে এবং মাটির নিচে শয়ন করিতে হইবে।
হযরত সুফিয়ান সওরী (র) বলেন: যে ব্যক্তি কবরকে অধিক স্মরণ করিবে তাহার কবর বেহেশেতের উদ্যানসমূহের একটি উদ্যান হইবে। আর যে ব্যক্তি কবরকে ভুলিয়া যাইবে তাহার কবর দোযখের গহ্বরসমূহের একটি গহ্বর হইবে।
হযরত রাবী— ইব্ন খসীম (র) তাবেঈগণের মধ্যে একজন বুযর্গ ছিলেন। তাহার মাযার তূষ নগরে অবস্থিত। তিনি স্বীয় বাসগৃহে একটি কবর খনন করিয়া লইয়াছিলেন। যখনই আল্লাহর স্মরণ হইতে তাঁহার মনে কথঞ্চিত উদাসীনতা উপলব্ধি করিতেন তখনই তিনি কবরে যাইয়া শয়ন করিতেন। কিছুক্ষণ পর বলিতেন : ইয়া ইলাহী! আমাকে পুনরায় দুনিয়াতে প্রেরণ কর যাহাতে আমি নিজে পাপসমূহের সংশোধন ও প্রায়াশ্চিত্ত করিয়া লইতে পারি। তৎপর কবর হইতে উঠিয়া বলিতেন : হে রাবী'! আল্লাহ্ তোমাকে পুনরায় দুনিয়াতে পাঠাইয়াছেন। যত্নবান হও সেই সময়ের পূর্বে যখন তুমি আর দুনিয়ায় আগমনের অনুমতি পাইবে না।
হযরত উমর (রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কবরস্থানে গমনপূর্বক একটি কবরের নিকট বসিলেন এবং খুব ক্রন্দন করিলেন : আমি হুযূরের নিকট ছিলাম। আমি নিবেদন করিলাম ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আপনি রোদন করেন কেন? হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, ইহা আমার আম্মার কবর। আমি তাঁহার কবর যিয়ারত করিতে এবং তাঁহার জন্য ক্ষমা চাহিতে আল্লাহর অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলাম। আল্লাহ্ কবর যিয়ারতের অনুমতি দিলেন। সন্তানসুলভ ভালবাসা হৃদয়ে উথলিয়া উঠিয়াছে; এইজন্য রোদন করিতেছি।
ইসলামের দৃষ্টিতে এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের যে কর্তব্য রহিয়াছে তাহা উপরে বর্ণিত হইল। এতদ্ব্যতীত প্রতিবেশীর প্রতি স্বতন্ত্র কর্তব্য রহিয়াছে।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন