হকদারের হক পর্ব- (১২)
সন্তান-সন্তুতির প্রতি কর্তব্য
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট নিবেদন করিল : আমি কাহার সহিত ইহসান (ইহসান অর্থ সদ্ব্যবহার, উপকার ও হিত সাধন) করিব? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন: মাতাপিতার সহিত। সে ব্যক্তি নিবেদন করিল : তাঁহারা তো মরিয়া গিয়াছেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন: সন্তানের সহিত ইহসান কর। কারণ সন্তানেরও পিতার তুল্য হক রহিয়াছে। সন্তানের হকসমূহের মধ্যে ইহাও একটি যে, মন্দ স্বভাবের কারণে তাহাকে অবাধ্য করিয়া তুলিবে না। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি স্বীয় পুত্রকে অবাধ্যতার দিকে পরিচালিত না করে আল্লাহ্ তাহার উপর রহমত বর্ষণ করেন।
হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: ছেলে সাতদিনের হইলে তাহার আকীকা কর ও নাম রাখ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কর। ছয় বৎসরের হইলে আদব শিক্ষা দাও। নয় বৎসরের হইলে তাহার বিছানা পৃথক করিয়া দাও এবং তের বৎসর বয়সের হইলে নামাযের জন্য তাহাকে প্রহার কর। ষোল বৎসর হইলে তাহাকে বিবাহ করাও এবং তাহার হস্তধারণপূর্বক বলিয়া দাও-আমি তোমাকে শিক্ষা দিয়াছি, তোমাকে লালন-পালন করিয়াছি, তোমাকে বিবাহ করাইয়া দিয়াছি। এখন দুনিয়াতে তোমার ফিতনা হইতে এবং আখিরাতে তোমার আযাব হইতে আমি আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি।
সন্তান-সন্ততির অন্যতম হক এই যে, দান, উপহার এবং স্নেহ-অনুগ্রহ প্রদানে সকলের প্রতি সমতা রক্ষা করিবে। ছোট শিশুকে স্নেহ ও চুম্বন করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত হাসান (রা)-কে চুম্বন করিতেন। আকরা ইবনে হাবিস বলেন: আমার দশ পুত্র আছে। আমি কখনও কাহাকেও চুম্বন করি নাই। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি দয়া করে না তাহার উপর আল্লাহ্ তা'আলার দয়া অবতীর্ণ হইবে না। একবার রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মিম্বরের উপর ছিলেন এমন সময় হযরত হাসান (রা) পড়িয়া গেলেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তৎক্ষণাৎ মিম্বর হইতে অবতরণপূর্বক তাঁহাকে উঠাইয়া লইলেন এবং এই আয়াত পাঠ করিলেন-"নিশ্চয়ই তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ফিতনা ব্যতীত কিছুই নহে"। একবার রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নামায পড়িতেছিলেন। যখন তিনি সিজদায় গেলেন তখন ইমাম হাসান হুসাইন (রা) হুযূরের পবিত্র স্কন্ধের উপরে পা রাখিলেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সিজদায় এত বিলম্ব করিলেন যে, সাহাবায়ে কিরাম (রা) মনে করিতে লাগিলেন, হয়ত ওহী অবতীর্ণ হইতেছে; এইজন্যই তিনি এত দীর্ঘ সিজদা করিতেছেন। সালাম ফিরাইলে সাহাবায়ে কিরাম (রা) নিবেদন করিলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! সিজদায় কি ওহী অবতীর্ণ হইয়াছিল? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : না! হুসাইন (রা) আমাকে উট বানাইয়া ছিল। আমি তাহাকে সরাইয়া দিতে চাহিলাম না।মোটকথা, সন্তান-সন্ততির হক অপেক্ষা মাতাপিতার হকের প্রতি অত্যধিক তাকীদ দেওয়া হইয়াছে। কারণ, তাহাদিগকে সম্মান করা সন্তান-সন্ততির উপর ওয়াজিব। আল্লাহ্ তা'আলা মাতাপিতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে তাঁহার নিজের ইবাদতের সঙ্গে বর্ণনা করিয়া বলেন : "আপনার প্রভু চরম নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন যে, তাঁহাকে ছাড়া তোমরা আর কাহারও ইবাদত করিও না এবং মাতাপিতার সহিত ইহসান করিও"।
মাতাপিতার হক এত গুরুত্বপূর্ণ যে, তজ্জন্য দুইটি বিষয় ওয়াজিব হইয়া পড়িয়াছে। (১) যে খাদ্য সন্দেহযুক্ত, কিন্তু হারাম নহে, মাতাপিতা সন্তানকে তাহা আহার করিতে বলিলে তাঁহাদের আদেশে উহা গ্রহণ করা অধিকাংশ আলিমের মতে সন্তানের প্রতি ওয়াজিব। কারণ, সন্দেহযুক্ত দ্রব্য হইতে পরহিয করা অপেক্ষা মাতাপিতার আদেশ পালন করিয়া তাঁহাদিগকে সন্তুষ্ট করা অধিক কর্তব্য। (২) মাতাপিতার অনুমতি ব্যতিত কোন সফর করা উচিত নহে। কিন্তু সফর সন্তানের উপর ফরয হইয়া থাকিলে, যেমন নিজ দেশে উপযুক্ত আলিম বিদ্যমান না থাকিলে নামায, রোযা প্রভৃতি ফরয বিষয়ক শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে সফর করা আবশ্যক হইয়া পড়িলে, তাঁহাদের বিনা অনুমতিতে সফরে যাওয়া দুরস্ত আছে। হজ্জ ফরয হইলেও মাতাপিতার অনুমতি লইয়া যাওয়াই সঙ্গত। কারণ, উহাতে কিছু বিলম্ব করা জায়েয আছে।
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট জিহাদে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করিলে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞাসা করিলেনঃ তোমার মাতা আছেন কি? সে ব্যক্তি নিবেদন করিল : হ্যাঁ। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ তাহার নিকট যাইয়া বস; কেননা তাহার পায়ের নিচে তোমার বেহেশত। এক ব্যক্তি ইয়েমেন হইতে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া জিহাদে গমনের অনুমতি প্রার্থনা করিলে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ তোমার মাতাপিতা আছেন কি? সে ব্যক্তি বলিল : জি হ্যাঁ, আছেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : তবে যাও, প্রথমে তাঁহাদের অনুমতি গ্রহণ কর। তাঁহারা অনুমতি না দিলে তাঁহাদের নির্দেশ মানিয়া চল। কারণ, তাওহীদের পর কোন নৈকট্য ও ইবাদত আল্লাহ্ তা'আলার নিকট তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট নহে।
জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার হক প্রায় পিতার হকের সমান। কারণ, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, পুত্রের উপর পিতার হক যেরূপ ভ্রাতার উপর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার হকও তদ্রূপ।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন