বুধবার, ১৫ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (২০) দেহ হইতে রূহ্ কবজের বিবরণ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২০)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

দেহ হইতে রূহ্ কবজের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, “বান্দার জান কবজের সময় যখন তাহার বাকশক্তি লোপ পাইয়া যায়, তখন তাহার নিকট একের পর এক পাঁচজন ফেরেশতা আগমন করেন। 
সর্বাগ্রে খাদ্য সরবরাহকারী ফেরেশতা সালাম প্রদান করিয়া বলেন, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার খাদ্য সংস্থানের কাজে নিযুক্ত ছিলাম, কিন্তু এখন আমি তোমার জন্য পৃথিবীর সমুদয় প্রান্ত তালাস করিয়াও একমুষ্টি অন্ন সংগ্রহ করিতে পারি নাই। অতএব আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছি।” 
তারপর দ্বিতীয় ফেরেশতা সালাম করিয়া বলে, ‘ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি ছিলাম তোমার পানীয় সরবরাহের কার্যে নিযুক্ত। কিন্তু আজ আমি সমস্ত পৃথিবী অন্বেষণ করিয়াও এক ফোটা পানীয় জল সংগ্রহ করিতে পারি নাই; সুতরাং আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছি।” অতঃপর 
তৃতীয় ফেরেশতা সালাম করিয়া বলে, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার উভয় পায়ের তত্ত্বাবধানের কাজে নিযুক্ত ছিলাম, কিন্তু আজ সমস্ত পৃথিবী পরিভ্রমণ করিয়াও তোমার জন্য এক কদম পরিমাণ স্থানও পাইলাম না। অতএব আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছি।” অনুরূপভাবে 
চতুর্থ ফেরেশতা সালাম প্রদান করিয়া বলে, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ কাজে নিযুক্ত ছিলাম; কিন্তু আজ পৃথিবীর সমস্ত প্রান্ত খুঁজিয়াও তোমার জন্য সামান্য পরিমাণ নিঃশ্বাসও পাইলাম না। অতএব আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছি।” 
পরিশেষে পঞ্চম ফেরেশতা উপস্থিত হইয়া সালাম প্রদান করিয়া বলে, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার জীবন মৃত্যুর কাজে নিযুক্ত ছিলাম; কিন্তু আজ তোমার জন্য পৃথিবীর সমুদয় প্রান্ত তালাস করিয়াও সামান্য পরিমাণ সময়ও পাইলাম না; সুতরাং আমি তোমার নিকট হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিতেছি।” 
তারপর কেরামান কাতেবীন ফেরেশতাদ্বয় উপস্থিত হইয়া সালাম প্রদান করিয়া বলে, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমরা তোমার জন্য নেকী ও পাপ লিখিবার কাজে নিযুক্ত ছিলাম! কিন্তু আজ সমস্ত পৃথিবীর সমুদয় প্রান্ত তালাস করিয়াও তোমার কোন পাপপুণ্য পাইলাম না। অতএব আমরা তোমার নিকট হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিতেছি।” এইকথা বলিবার পর তাঁহারা কালো বর্ণের একখানি লিখিত পত্র তাহার সামনে উপস্থিত করিয়া বলিবে, “হে আল্লাহর বান্দা! তুমি ইহার প্রতি লক্ষ্য কর।” উহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিবামাত্র তাহার সমস্ত শরীর বাহিয়া ঘর্ম নির্গত হইবে এবং কেহ যেন উক্ত লিখিত পত্র পাঠ না করিতে পারে, তজ্জন্য সে ডাইনে এবং বামে বারবার সতর্ক দৃষ্টিপাত করিতে থাকিবে। তারপর কেরামান কাতেবীন ফেরেশতাদ্বয় প্রস্থান করিবে। 
কেরামান কাতেবীন ফেরেশতাদ্বয় প্রস্থান করার সাথে সাথে আজরাইল ফেরেশতা তাহার ডানদিকে রহমতের ফেরেশতা ও বামদিকে আযাবের ফেরেশতা সহকারে আগমন করিবেন। তাহাদের মধ্যে কেহবা রূহ্‌কে অত্যন্ত জোরে টানিতে থাকিবে আবার কেহবা খুব শান্তির সহিত রূহকে বাহির করিবে। মৃতব্যক্তি যদি পুণ্যবান হয় তবে রহমতের ফেরেশতাদিগকে ডাকা হইবে৷ তখন তাহারা মৃতব্যক্তির রূহসহকারে শূন্যে আরোহণ করিবেন। দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তখন বলিবেন, “ওহে ফেরেশতাগণ! উক্ত রূহকে মৃতের শরীরের মধ্যে পুনরায় প্রবেশ করাও, যেন সে শরীরের অবস্থা নিজে প্রত্যক্ষ করিতে সক্ষম হয়।” তারপর ফেরেশতাগণ রূহকে গৃহের মধ্যস্থলে রাখিবে। তখন মৃতের রূহ তাহার জন্য শোকসন্তপ্ত ও বেখেয়াল লোকদিগকে চিনিতে পারিবে, কিন্তু কোন কিছুই বলিতে পারিবে না। তারপর জানাযা সম্পাদনের পর মৃতদেহ গোর দিবামাত্রই আল্লাহ তা'আলার রহমতে মৃতব্যক্তির শরীরে আত্মার বিকাশ ঘটিতে থাকিবে। এ সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। 
(ক) কেহ বলেন, “শরীরের মধ্যেই রূহ প্রবেশ করে, যেমন পৃথিবীতে ছিল। তখন তাহাকে বসান হয় এবং জিজ্ঞাসা করা হয়।” 
(খ) আবার কেহ বলেন , “রূহ শরীরেই প্রবেশ করে, কিন্তু তারপরে কি হয়, তাহা অজ্ঞাত৷” 
(গ) কেহ বলেন, “রূহকেই প্রশ্ন করা হয়, শরীরকে নহে।” 
(ঘ) কেহ বলেন, “রূহ দেহের মধ্যেই বক্ষ পর্যন্ত বিরাজ করে।” 
(ঙ) আবার কেহ বলেন, “রূহ্ বা আত্মা শরীর অথবা কাফনের মধ্যে বিরাজ করে।” তবে প্রত্যেক মতের সপক্ষে হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইতে হাদীস বর্ণিত রহিয়াছে।" 
আলেমগণের সহীহ্ মত এই যে, কবরের আযাব সত্য। তবে ইহার প্রকার ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। প্রখ্যাত ফকীহ আবু লায়েস (রহঃ) বলিয়াছেন, “যে ব্যক্তি কবরের আযাব হইতে রেহাই পাইতে চায়, সে যেন চারিটি কার্য সম্পাদন করে এবং চারিটি কার্য বর্জন করে। পালনীয় চারিটি কার্য হইল যে, 
(ক) নিয়ম মত নামায আদায় করা, 
(খ) দান-খয়রাত করা, 
(গ) পবিত্র কোরআন শরীফ পাঠ করা এবং 
(ঘ) অধিক পরিমাণে তাসবীহ পাঠ করা। 
তাহা হইলে অবশ্যই এই কাজগুলির বরকতে বিভিন্ন প্রকার গোর আযাব হইতে পরিত্রাণ পাওয়া যাইবে।

আর বর্জনীয় চারিটি কার্য হইল, (ক) মিথ্যা বলা (খ) কাহারও গীবত গাওয়া, (গ) চোগলখুরী করা এবং (ঘ) প্রস্রাব হইতে শরীরকে পাক না রাখা ইত্যাদি ।” 
জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “তোমরা প্রস্রাব হইতে পবিত্র থাক, কারণ অধিকাংশ কবর আযাব ইহার জন্যেই হইয়া থাকে”।
কবরে  মনকির ও নকীর নামক অত্যন্ত কৃষ্ণবর্ণ, নির্দয়-নিষ্ঠুর আরক্তিম লোচন, বজ্রের ন্যায় ভীষণ আওয়াজকারী, বিদ্যুতের ন্যায় চোখের জ্যোতি বিনষ্টকারী এবং মাটি ভেদকারী ও দীর্ঘ নখবিশিষ্ট ভয়ংকর আকৃতির দুইজন ফেরেশতা কবরে প্রবেশ করিবে এবং মৃত ব্যক্তিকে নাড়িয়া চাড়িয়া ও বসাইয়া জিজ্ঞাসা করিবে - “মান রাব্বুকা” অর্থাৎ তোমার প্রতিপালক কে? “ওয়ামা দ্বিনুকা” অর্থাৎ তোমার ধর্মের নাম কি? “ওয়ামান নাবিয়্যুকা” অর্থাৎ তোমার নবী কে? প্রত্যুত্তরে নেককার বান্দাগণ বলিবেনI “রাব্বিয়াল্লাহু” অর্থাৎ আল্লাহ। আমার প্রতিপালক আল্লাহ্। “ওয়াদ্বিনি ইসলামু” অর্থাৎ আমার ধর্ম ইসলাম। “ওয়া নাবিয়্যি মুহাম্মাদুন” অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার নবী। এই উত্তরে ফেরেশতাদ্বয় পরিতুষ্ট হইয়া তাহাকে বলিবে, “হে আল্লাহর প্রিয় বান্দা” ! তুমি সেই নতুন বরের মত আরামে শুইয়া থাক  যাহাকে তাহার অতি প্রিয়জন ছাড়া কেহ জাগরিত করে না।” তারপর তাহার মাথার কিনারা দিয়া বেহেশতের দিকে জানালা খোলা হইবে, যাহা দ্বারা সেই ব্যক্তি বেহেশতের বাগান, আরামের স্থান ইত্যাদি যাহা কিছু তাহাকে বেহেশৃতে প্রদান করা হইবে, সবকিছুই দেখিবে। পরিশেষে উভয় ফেরেশতা তাহার রূহ্ লইয়া কবর হইতে বাহির হইয়া যাইবে এবং আরশে মোয়াল্লার নীচে ঝুলন্ত প্রদীপে উহা রাখিবে। 
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতে হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত আছে যে, জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “আল্লাহ্ তায়ালা এরশাদ করেন- ‘আমার বান্দাগণের মধ্য হইতে যাহাদিগকে আমি ক্ষমা করিতে ইচ্ছা করি তাহাদের গুনাহসমূহকে শরীরের রোগ-শোক অথবা দারিদ্র্যতার নিষ্পেষণে, অথবা দুঃখ-কষ্টে নিপতিত করিয়া দেই। এর পরও যদি গুনাহরাশি বাকী থাকে, তবে তাহার মৃত্যুকষ্ট কঠিন করিয়া দেই যাহাতে সে নিষ্পাপ অবস্থায় আমার সহিত সাক্ষাত করিতে সক্ষম হয়। 'আর আল্লাহ তায়ালা স্বীয় মান-সম্মান ও প্রতিপত্তির শপথ করিয়া বলিয়াছেন, 'আমার বান্দাগণের মধ্যে যাহাদের গুনাহরাশি আমি মার্জনা করিতে চাইনা, তাহাদিগকে এই পৃথিবীতেই তাহাদের কৃতকর্মের প্রতিফলস্বরূপ সুস্থ-সবল ও আনন্দমুখর এবং অঢেল পরিমাণে ভোগ্যপণ্য প্রদান করিয়া সুখ-শান্তিতে নিমগ্ন রাখি। তারপরও যদি কিছুটা পুণ্য অবশিষ্ট থাকিয়া যায়, তবে তাহার মৃত্যুকষ্ট লাঘব করিয়া থাকি।”
হযরত আওয়াদ (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, “একদিন আমরা হযরত আয়েশা (রাঃ) এর নিকট বসিয়াছিলাম। এমন সময় অকস্মাৎ একটি তাঁবু ছিড়িয়া একজন লোকের উপর পতিত হইলে আমরা সকলেই হাস্য সংবরণ করিতে পারিলাম না। তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলিলেন, আমি জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে বলিতে শুনিয়াছি যে, মুমিন বান্দার শরীরে কাঁটা প্রবেশ করিলেও আল্লাহ তায়ালা তাহার পাপ মার্জনা করিয়া দেন এবং উচ্চ মর্যাদা প্রদান করেন।
জনৈক বুযর্গ বলিয়াছেন, “নিরোগ দেহ উৎকৃষ্ট নহে এবং বিপদশূন্য ধন-সম্পদও উৎকৃষ্ট নহে।” জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “যখন কাহারও ‘মরজগৎ’ ত্যাগ করিয়া পরজগতে যাওয়ার সময় নিকটবর্তী হয়, তখন সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল চেহারাসম্পন্ন একদল ফেরেশ্তা বেহেশতী কাফন ও সুগন্ধি লইয়া তাহার দৃষ্টিপথে বসিয়া থাকে। তারপর মৃত্যুদূত তাহার মাথার পার্শ্বে বসিয়া আরজ করে, হে প্রশান্ত আত্মা ! আল্লাহর রহমত ও রেজামন্দির জন্য অতি সত্বর বাহির হইয়া আস।” রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “তখন রূহ্ বাহির হইয়া আসে এবং তাহার মুখ হইতে পানির ফোটা পড়িতে থাকে, যেমন মশক হইতে পতিত হয়। তারপর ফেরেশতাগণ তাহার রূহ্‌কে সযত্নে ধরিয়া উক্ত কাফনের মধ্যে রাখে এবং উহা হইতে মেশকের সুগন্ধ বাহির হয়। অবশেষে ফেরেশতাগণ যখন তাহার রূহ লইয়া বেহেশত রাজ্যে আরোহণ করিতে থাকে, তখন অন্যান্য ফেরেশতাগণ জিজ্ঞাসা করে, এই উৎকৃষ্ট সুগন্ধি কোথা হইতে আসিতেছে? প্রত্যুত্তরে বলা হয়, অমুকের পুত্র অমুকের রূহ্ হইতে এই সুগন্ধি বাহির হইতেছে। তখন ফেরেশতাগণ তাহাকে উত্তম নামে সম্বোধন করে। আর যখন ফেরেশতাগণ রূহ সহকারে প্রথম আসমানের দ্বারদেশে উপনীত হয়, তখনই সপ্ত আকাশের সাতটি দরওয়াজা খুলিয়া যায় এবং প্রত্যেক আসমান হইতে কিছু সংখ্যক ফেরেশতা তাহার শুভ গমনার্থে অভ্যর্থনার জন্য অগ্রসর হয়। এইভাবে সপ্তাকাশে আরোহণ করিলে আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে " উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করা হয়, “হে ফেরেশ্তাগণ! তাহার আমলনামা- 'ঈল্লিন’ নামক স্থানে রাখ এবং তাহার শরীরকে মাটিতে মিশাইয়া দাও। কারণ তাহাকে আমি মাটি হইতেই পয়দা করিয়াছি, এ মাটিতেই ফিরাইয়া আনিব এবং সেই মাটি হইতেই পুনরুত্থান করিব।” তখন ফেরেশ্তাগণ রূহকে শরীরের সহিত মিশ্রিত করিয়া দেয়। তারপর মনকীর নকীর নামক দুইজন ফেরেশতা আগমন করেন এবং মৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেন, “হে আল্লাহর বান্দা ! বল, তোমার মাবুদ কে? তোমার নবী কে? এবং তোমার ধর্ম কি?” তারপর হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি ইঙ্গিত করিয়া বলেন, হে আল্লাহর বান্দা! এ প্রেরিত পুরুষ সম্বন্ধে তোমার অভিমত কি? মুমিন বান্দাগণ প্রত্যুত্তরে বলেন, “তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। তাঁহার উপরই আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআন শরীফ নাযিল করিয়াছেন। এইজন্য আমি ইহাকে সত্য জানিয়া ঈমান আনয়ন করিয়াছি।” তখন উদাত্ত কণ্ঠে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেন , “হে ফেরেশতাগণ! আমার বান্দা সত্য কথাই বলিয়াছে। অতএব তাহাকে বেহেশ্তী লেবাসে সুসজ্জিত করিয়া বেহেশতী বিছানা পাতিয়া দাও। আর তাহার জন্য বেহেশতের দিকে একটি দরওয়াজা খুলিয়া দাও , যাহাতে বেহেশতী সুগন্ধি তাহার কবরে প্রবেশ করিতে পারে। আর দৃষ্টিশক্তির শেষ সীমা পর্যন্ত তাহার কবরকে প্রশস্ত করিয়া দাও।” 

হযরত রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও এরশাদ করিয়াছেন যে, “তখন একজন গৌরকান্তি বিশিষ্ট সুন্দর সুপুরুষ আগমন করিবেন এবং তাঁহার শরীর হইতে সুগন্ধ বাহির হইবে। তিনি বলিবেন, ‘হে আল্লাহর বান্দা ! তোমার সৃষ্টিকর্তা তোমাকে যে সকল সুসংবাদ প্রদান করিয়াছেন, আমিও তোমাকে সেইসব সুসংবাদ প্রদান করিতেছি। উক্ত বান্দা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিবে ‘আপনি কে? আল্লাহ তা'আলা আপনার উপর শান্তি বর্ষিত করুন। আপনার মত সুন্দর সুপুরুষ আর কাহাকেও দেখি নাই।' প্রত্যুত্তরে তিনি বলিবেন, ‘আমি তোমার নেক আমল!’  

আর যখন কাফেরের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়, তখনও আকাশ হইতে ফেরেশ্তাগণ দোযখের পোশাক লইয়া তাহার দৃষ্টি সীমার মধ্যে বসিয়া থাকে। তারপর মৃত্যুদূত তাহার পার্শ্বে উপবেশন করে এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তাহার পাপাত্মাকে জোরপূর্বক অত্যন্ত যন্ত্রণাসহকারে ছিনাইয়া আনে। যেমন শিক কাবাব হইতে শিক বাহির করা হয়। তারপর ফেরেশ্তাগণ কাফেরের পাপাত্মাকে খুব প্রহার করিয়া দোযখের পোশাকে আচ্ছাদিত করিয়া দেয়। তখন আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী অবস্থিত যাবতীয় প্রাণী ও বস্তু নিয়া তাহাকে অভিসম্পাত করে। তাহাদের লানত বাণী মানব-দানব ছাড়া সকলেই শ্রবণ করে। আর কাফেরের রূহ্ লইয়া ফেরেশ্তাগণ ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করিবামাত্রই আকাশের সমস্ত দরজাগুলি বন্ধ হইয়া যায় এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে ঘোষণা করা হয়, ‘হে ফেরেশ্তাগণ! এই কাফেরের রূহকে কবরের মধ্যে পুঁতিয়া রাখ।' তখন তাহারা তাহাকে কবরের মধ্যে পুঁতিয়া রাখিয়া বিদায় হইয়া যায়। তারপর মনকির নকীর ফেরেশ্তাদ্বয় ভীষণ আকার ধারণ করতঃ সেখানে আগমন করে। তাহাদের কণ্ঠস্বর মেঘের গর্জনের মত ভয়ঙ্কর ও ভীতিপ্রদ হইবে এবং চক্ষুদ্বয়ের জ্যোতি বিদ্যুতের মত প্রখর ও তীর্যক হইবে। তাহারা দাঁত, নখ দ্বারা মাটিভেদ করিয়া কবরে প্রবেশ করিবে এবং বিধর্মী কাফেরকে উপবেশন করাইয়া জিজ্ঞাসা করিবে; ‘হে আল্লাহর বান্দা ! বল, তোমার রব কে?’ প্রত্যুত্তরে সে বলিবে ‘হায় ! হায় ! আমি সে সম্বন্ধে কিছুই অবগত নই।' তাহারা আবার জিজ্ঞাসা করিবে, 'তুমি নিজের জ্ঞান দ্বারা ও পবিত্র কোরআন শরীফ পাঠ করিয়া তাহা জানিয়া লও নাই কেন?' অতঃপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ঘোষণা করা হইবে, ‘হে ফেরেশ্তাগণ! তাহাকে ভীষণ হাতুরী দ্বারা বেদম পিটাইতে থাক।' হাতুরীটি এমন ভারী হইবে যে, সমস্ত মাখলুকাত মিলিয়াও উহা স্থানান্তরিত করিতে সক্ষম হইবে না। উহাতে তাহার কবর আগুনে লালে লাল হইয়া যাইবে এবং কবরটি এতই সৎকীর্ণ হইয়া যাইবে যে, একবাহু অন্যবাহুতে প্রবেশ করিয়া যাইবে। তারপর অত্যন্ত দুর্গন্ধময় ও কুৎসিত চেহারাবিশিষ্ট একব্যক্তি তাহার সন্নিধানে আসিয়া বলিবে, ‘আল্লাহ তা'আলা আমার দ্বারা তোমার প্রভূত ক্ষতি সাধন করুন। আল্লাহর শপথ, তুমি পৃথিবীতে পাপকাজ ছাড়া ভাল কাজ কর নাই। আল্লাহর এবাদতে তুমি অত্যন্ত অলস ছিলে, কিন্তু পাপ ও মন্দ কাজে তুমি অত্যন্ত কর্মঠ ও চপল ছিলে।’ মৃতব্যক্তি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবে, ‘হে বন্ধু ! তুমি কে? তোমার মত কুৎসিত লোক ইহজগতে আমি কাহাকেও দেখি নাই।' উত্তরে সে বলিবে, 'আমি তোমার পাপকার্যসমূহ। তারপর তাহার কবর হইতে দোযখের দিকে একটি সুরঙ্গ পথ খুলিয়া দেওয়া হইবে। যাহাদ্বারা সে তাহার দোযখের আবাস দেখিতে পাইবে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মুমিন বান্দাকে কবরে মাত্র সাতদিন পর্যন্ত পরীক্ষা ও আজমায়েশ করা হয় এবং কাফের বান্দাকে কবরে চল্লিশ দিন পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়। 
হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন যে, ‘যাহারা শুক্রবার দিবসে কিংবা রাত্রিতে মৃত্যুমুখে পতিত হয়, আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে গোর আযাব হইতে অনেকাংশে রক্ষা করিয়া থাকেন।'
হযরত আবু উমামা বাহেলী (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, যখন কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে এবং তাহাকে কবরে রাখা হয়, তখন একজন ফেরেশ্তা তাহার মস্তকের পার্শ্বে বসিয়া আযাব করিতে শুরু করে। উক্ত ফেরেশতা একবার লৌহদণ্ড দ্বারা প্রহার করিবামাত্র তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া যায় এবং সম্পূর্ণ কবরটি আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলিতে থাকে। পুনরায় সেই ফেরেশতা আল্লাহ তা'লার আদেশে ‘উঠ’ বলিবা-মাত্র সে সুস্থ সবল দেহে উঠিয়া বসে এবং এমন উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার আরম্ভ করে যে, আকাশ ও পাতালের মধ্যস্থিত মানব-দানব ছাড়া অন্য সবকিছুই সেই চীৎকার শুনিতে পায়। সে ফেরেশ্তাকে জিজ্ঞাসা করে, হে আল্লাহর ফেরেশতা ! তুমি আমাকে এহেন কঠিন আযাব প্রদান করিতেছ কেন? আমি নামায আদায় করিয়াছি, যাকাত আদায় করিয়াছি, রমজান মাসের রোযা রাখিয়াছি এবং বিভিন্ন পুণ্যকর্ম সম্পাদন করিয়াছি। প্রত্যুত্তরে ফেরেশতা বলিবে, 'হে আল্লাহর বান্দা ! একদিন তুমি কোন এক অত্যাচারিত ব্যক্তির নিকট দিয়া গমন করিতেছিলে এবং সে অত্যাচারিত হইয়া তোমার নিকট সাহায্য ভিক্ষা করিয়াছিল, কিন্তু তখন তুমি উহা উপেক্ষা করিয়াছিলে। আর একদিন তুমি প্রস্রাব হইতে সঠিকভাবে পাক না হইয়াই নামায পড়িয়াছিলে।' 
এই প্রসঙ্গে হযরত রাসূল মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “যে ব্যক্তি মজলুম বা অত্যাচারিতের সাহায্যার্থে অগ্রসর হইবে না, তাহাকে কবরের মধ্যে একশত আগুনের দোররা মারা হইবে।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, জনাব রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা চারিটি সম্প্রদায়কে নূরের মিম্বরের উপর উপবেশন করাইবেন এবং নিজ রহমতের ছায়ার নীচে দাখিল করাইবেন। সাহাবাগণ আরজ করিলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল  তাহারা কোন শ্রেণীর লোক?’ মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিলেন, 'যাহারা ক্ষুধার্তকে অনুদান করিয়াছে এবং ধর্মযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিয়াছে, দুর্বলকে সাহায্য করিয়াছে আর মজলুম ও অত্যাচারীতের ডাকে সাড়া দিয়াছে!’  
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, ‘যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখিয়া মাটি চাপা দেওয়া হয় আর তাহার সন্তান- সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজন ‘হে কুলশীল সর্দার!' বলিয়া তাহাকে সম্বোধন করিতে থাকে, তখন কবরের জন্য নির্ধারিত ফেরেশতা তাহাকে প্রশ্ন করে, ‘হে আল্লাহর বান্দা ! তুমি উহাদের কথা শুনিতেছ কি?’ প্রত্যুত্তরে সে বলে, 'হাঁ'। পুনরায় জিজ্ঞাসা করে, 'আচ্ছা তুমি কি প্রকৃতই সম্ভ্রান্ত নেতা ছিলে? উত্তরে আল্লাহর বান্দা বলে, “না না, আমি কস্মিন কালেও তদ্রূপ ছিলাম না। বরঞ্চ তাহারা মিথ্যাকথা বলিতেছে। আমি মহাধিরাজ আল্লাহর নিকৃষ্টতম বান্দা ছিলাম মাত্র।' তখন মৃতব্যক্তি নিতান্ত পরিতাপ সহকারে পুনরায় বলে, ‘হায় তাহারা যদি আর কিছুই না বলিত, তাহা হইলে কতই না ভাল হইত্।'  অতঃপর তাহার কবর এতই সংকীর্ণ হইয়া যায় যে, এক দিকের পাঁজর অন্য পাজরে প্রবেশ করে এবং মৃতব্যক্তি চীৎকার করিয়া বলে ‘হায় ! হায় ! ইহা হাড় ভাঙ্গার জায়গা, লজ্জা ও অনুশোচনার জায়গা এবং কঠিন প্রশ্নের জায়গা।' 
অনুরূপভাবে রজব মাসের প্রথম শুক্রবার রাত্রিতে (লাইলাতুল রাগায়েব) আল্লাহ পাক ফেরেশ্তাদিগকে ডাকিয়া বলেন, “হে ফেরেশ্তাগণ ! তোমরা সাক্ষী থাক, আমি তাহার গুনাহসমূহ মার্জনা করিয়া দিলাম। কারণ সে এই রাত্রিতে আমার উপাসনায় অতিবাহিত করিয়াছিল।” 

পরবর্তী পর্ব
মনকির নকীরের পূর্ববর্তী ফেরেশতার বিবরণ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...