📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১০)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
মালাকুল মউত যেরূপে রূহ কবজ করে-
সলবি নামক গ্রন্থে হযরত মোকাতেল (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, "আল্লাহ তায়ালা মালাকুল মউত ফেরেশতার জন্য সপ্তম বা চতুর্থ আকাশে সত্তর হাজার স্তম্ভের উপর একটি নূরের সিংহাসন সংস্থাপন করিয়াছেন। মালাকুল মউতের চারিখানা পাখা আছে। এবং তাহার সমস্ত দেহে মানব-দানব, পশু-পাখী, কীট-পতঙ্গ ইত্যাদির সংখ্যানুপাতে জিহ্বা ও চক্ষু রহিয়াছে। অর্থাৎ এমন কোন প্রাণী নাই, যাহার নিমিত্ত তাহার শরীরে মুখ, হাত ও চক্ষু নাই। সেখান হইতেই তিনি তাহাদের রূহ কবজ করেন।"
একদিন হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন যে, মালাকুল মউতের উত্তরে, দক্ষিণে, সম্মুখে, পশ্চাতে, উপরে ও নীচে সর্বমোট ছয়খানা মুখমণ্ডল রহিয়াছে। তখন সাহাবাগণ আরজ করিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! সেই ছয়খানা মুখের তাৎপর্য ও রহস্য কি?" প্রত্যুত্তরে নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, "মালাকুল মউত তাহার উত্তর মুখ দিয়া পশ্চিম দেশীয় প্রাণীদের রূহ কবজ করেন; আর দক্ষিণ মুখ দিয়া পূর্ব দেশীয় প্রাণীদের রূহ কবজ করেন। পশ্চাতের মুখ দিয়া পাপী ও দোযখীদের আত্মা কবজ করেন। আর সম্মুখের মুখ দিয়া আমার মুমিন উম্মতদের রূহ কবজ করেন। তিনি মস্তকোপরি মুখ দিয়া আকাশমণ্ডলের অধিবাসীদের রূহ কবজ করেন এবং পদতলের মুখ দিয়া জ্বিন ও দানবদের আত্মা ছিনাইয়া আনেন।"
হযরত রাসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন যে, "মালাকুল মউত হাতের দ্বারা প্রাণীর রূহ কবজ করেন এবং চক্ষু দ্বারা তিনি প্রাণীর প্রতি দৃষ্টিপাত করেন।" এমনিভাবে সর্ব স্থানের সৃষ্টজীবের আত্মা কবজ করা হইয়া থাকে। যখন পৃথিবীর বুকে কেহ মৃত্যুবরণ করে, তখনই মালাকুল মউতের দেহস্থিত একটি চক্ষু বিলীন হইয়া যায়।
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, মালাকুল মউত মাত্র চারিটি মুখমণ্ডলের অধিকারী। তিনি মস্তকোপরী মুখমণ্ডলের দ্বারা নবী ও ফেরেশতাদের আত্মা কবজ করেন। আর সম্মুখস্থ মুখমন্ডলের দ্বারা মুমিন বান্দাদের রূহ কবজ করেন। পশ্চাদমুখী মুখমণ্ডলের দ্বারা ধর্মদ্রোহী কাফেরদের আত্মা সংহার করেন। আর পদতলস্থ মুখমণ্ডল দ্বারা মানুষের মহাশত্রু শয়তান ও জিন্নাতদের আত্মা সংহার করেন। তাহার একখানি পা জাহান্নামের উপরিস্থিত পুলসিরাতের উপর এবং অপরখানি বেহেশতের উদ্যানস্থিত সিংহাসনের উপর অবস্থিত।
হাদীস শরীফে আছে যে, মালাকুল মউতের আকৃতি এতই বিশাল যে, যদি সমুদয় নদ-নদী ও সাগর-মহাসাগরের পানিরাশি তাহার মাথার উপর বর্ষিত হইত, তথাপি একবিন্দু পানিও ভূমিতে পতিত হইত না আরও বলা হইয়াছে যে, মালাকুল মউতের সম্মুখে এই পৃথিবীর জীবসমূহ এতই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যে, যেন একখানি খাদ্যের বরতন বিভিন্ন উপাদানে সজ্জিত করিয়া তাহার সম্মুখে রাখা হইয়াছে এবং তিনি স্বীয় ইচ্ছা অনুসারে তন্মধ্য হইতে ভক্ষণ করিতে পারেন। পৃথিবীর যাবতীয় সৃষ্টজীব তাহার সম্মুখে ঠিক তেমনই পড়িয়া রহিয়াছে। তিনি পৃথিবীকে এমনভাবে উলট-পালট করিতে পারেন, যেন কেহ হাতের তালুতে রৌপ্যমুদ্রা লইয়া উলট-পালট করিয়া থাকে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মালাকুল মউত নবী ও রাসূল (আলাইহিস্সালাম) ব্যতীত অন্য কাহারও রূহ কবজ করিবার জন্য পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন না। অন্যান্য জীব জানোয়ারদের প্রাণ সংহারের জন্য তাহার অনেক সহকর্মী রহিয়াছে। হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা যখন যাবতীয় সৃষ্টজীব ধ্বংস করিয়া ফেলিবেন, তখন হযরত আজরাইল (আঃ) এর দেহে মাত্র আটটি চক্ষু অবশিষ্ট থাকিবে, আর সবই বিলীন হইয়া যাইবে। সেইগুলি থাকিবে হযরত জিব্রাইল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ), হযরত ইস্রাফিল (আঃ) ও স্বয়ং হযরত আজরাইল (আঃ)-এর জন্য এবং আরশ-বহনকারী ও তত্ত্বাবধায়ক চারিজন বিশিষ্ট ফেরেশতার জন্য।
আর মালাকুল মউত কিরূপে বুঝিতে পারেন যে, কাহার মৃত্যু ঘনাইয়া আসিয়াছে? এই সম্বন্ধে বলা হইয়াছে যে, যখন কাহারও রোগ-শোক ও মৃত্যুর পরোয়ানা মালাকুল মউতের সম্মুখে উপস্থিত করা হয়, তখন তিনি আল্লাহ পাকের দরবারে আরজ করেন, "হে আল্লাহ! আমি কিরূপে, কোথায় এবং কখন এই বান্দার আত্মা কবজ করিব, - তাহা বলিয়া দিন।" তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন, "হে মালাকুল মউত! মৃত্যুর গোপনীয় সংবাদ কেবল আমার জন্য সুনির্দিষ্ট রহিয়াছে, আমি ব্যতীত অন্য কেহই সে সম্বন্ধে অবগত নহে। তবে হাঁ, যখন সময় ঘনাইয়া আসিবে, তখন আমিই তোমাকে পরিজ্ঞাত করাইব এবং তুমি উহার স্পষ্ট নিদর্শন প্রত্যক্ষ করিবে। তাহা এই যে, যখন কাহারও মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, তখন শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেস্তা হাজির হইয়া বলিবে, "অমুকের পুত্র অমুকের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হইয়া গিয়াছে।" অতঃপর কৃতকর্ম ও খাদ্যদ্রব্যের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতা আসিয়া বলিবে অমুকের পুত্র অমুকের কর্মশক্তি ও খাদ্যদ্রব্য ফুরাইয়া গিয়াছে। তারপর মালাকুল মউতের নিকটস্থ ডাইরিতে পুণ্যবান ব্যক্তির নামের চতুর্দিকে উজ্জ্বল নূরের সুবর্ণ রেখা প্রকাশিত হয় এবং বদকার ব্যক্তির নামের চতুর্দিকে কৃষ্ণবর্ণের রেখা প্রকাশিত হয়। পরিশেষে আরশের নিম্নস্থিত প্রকাণ্ড বৃক্ষ হইতে তাহার নাম অঙ্কিত একটি পাতা মালাকুল মউতের সম্মুখে ঝরিয়া পড়ে এবং তখনই তিনি সেই ব্যক্তির রূহ কবজ করেন।
হযরত কা'ব ইবনে আহ্বার (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা আরশের নিম্নভাগে একটি সুবৃহৎ বৃক্ষ পয়দা করিয়াছেন। উক্ত বৃক্ষে যাবতীয় জীবের সংখ্যানুপাতে পাতা রহিয়াছে। কাহারও মৃত্যুর চল্লিশ দিন পূর্বেই তাহার নামাঙ্কিত পাতাটি হযরত আজরাইল (আঃ) এর বক্ষের উপর ঝরিয়া পড়ে। তখন তিনি তাঁহার সহকর্মীদিগকে উক্ত ব্যক্তির রূহ কবজ করিতে নির্দেশ করেন। এরূপভাবে চল্লিশ দিন পূর্বেই উক্ত ব্যক্তি আকাশমণ্ডলে মৃত বলিয়া ঘোষিত হয়।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, হযরত মিকাইল (আঃ) আল্লাহ তায়ালার নিকট হইতে একখানি সহিফা বা লিখিত পত্র লইয়া হযরত আজরাইল (আঃ) এর নিকট উপস্থিত হন। উহাতে মৃত ব্যক্তির নাম-ধাম, তাহার মৃত্যুর স্থান ও মৃত্যুর কারণ ইত্যাদি লিপিবদ্ধ থাকে। আর হযরত আবু লাইস্ সমরকন্দি বর্ণনা করিয়াছেন যে, কাহারও মৃত্যুর সময় ঘনাইয়া আসিলে আরশে মোয়াল্লার নিম্নস্থান হইতে সবুজ বা সাদা রংয়ের একবিন্দু পানি তাহার নামের উপর টপকাইয়া পড়ে। সেই পানিবিন্দু সবুজ হইলে উক্ত ব্যক্তি বদ্-বখত বলিয়া বিবেচিত হয় এবং পানিবিন্দু সাদা হইলে সে নেকবখত হিসাবে বিবেচিত হয়, আর অত্যন্ত আসানীর সহিত তাহার রূহ কবজ করা হয়।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন