মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (৯) মৃত্যুর ইতিহাস


📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৯)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মৃত্যুর ইতিহাস-
পবিত্র হাদীস শরীফে জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তায়ালা মৃত্যুকে পয়দা করিয়া শত আবরণের মধ্যে উহা গোপন করিয়া রাখেন। আকাশমণ্ডল ও ভূমণ্ডল অপেক্ষা প্রকাণ্ড করিয়া উহার আকৃতি গঠন করতঃ উহাকে সত্তরটি শৃংখলে আবদ্ধ করিয়া রাখেন। উহার প্রতিটি শৃংখল প্রায় এক হাজার বৎসরের রাস্তার সমপরিমাণ লম্বা ও দীর্ঘ। ফেরেশতাগণ কখনও উহার পার্শ্ব দিয়া গমন করিতেন না। তবে কি উহার অস্তিত্ব ও অবস্থান সম্বন্ধে তাহারা অবগত ছিলেন না; কিন্তু চতুর্দিক হইতে উহার বিকট ও প্রলয়ঙ্করী চীৎকার শুনিতে পাইতেন।
হযরত আদম (আলাইহিস্সালাম) এর সৃষ্টির পূর্বে সকলেই সে সম্পর্কে অনবগত ছিলেন। হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টিলগ্নে আল্লাহ তায়ালা যখন মালাকুল মউতকে মৃত্যুর কার্যে নিয়োগ করিলেন তখন তিনি প্রার্থনা করিলেন- "হে আল্লাহ! মৃত্যু আবার কি জিনিস?" তখন আল্লাহ তা'য়ালা উক্ত আবরণকে উন্মুক্ত হইতে এবং সমস্ত ফেরেশতাদিগকে উহার প্রতি নজর করিতে নির্দেশ দিলেন। যখন ফেরেশতাগণ উহাকে দেখিবার জন্য দণ্ডায়মান হইল, তখন আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুকে বলিলেন- "হে মৃত্যু! তুমি তোমার সমুদয় পাখা বিস্তার করিয়া তাহাদের মস্তকোপরি উড়িয়া বেড়াও এবং তোমার সমস্ত চক্ষু উন্মিলিত করিয়া তাহাদের প্রতি দৃষ্টিপাত কর। আল্লাহ তা'আলার নির্দেশানুযায়ী যখন মৃত্যু উড়িতে আরম্ভ করিল, তাহা দর্শন করিয়া ফেরেশতাগণ মুর্হিত হইয়া দুই হাজার বৎসর পড়িয়া রহিলেন। তারপর তাহারা চৈতন্য লাভ করিয়া আরজ করিলেন, "হে আল্লাহ! ইহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কোন বস্তু আপনি সৃষ্টি করিয়াছেন কি?" প্রত্যুত্তরে আল্লাহ দতা'আলা বলিলেন, "হে ফেরেশতাগণ!  ইহা আমারই সৃষ্ট এবং ইহা অপেক্ষা আমিই মহীয়ান ও গরীয়ান। প্রতিটি সৃষ্টজীবই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে।" আর আল্লাহ তা'য়ালা হযরত আজরাইল (আঃ) কে বলিলেন, "হে আজরাইল!  আমি তোমাকে সৃষ্টজীবের মৃত্যু নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্বাচন করিলাম।" হযরত আজরাইল (আঃ) প্রার্থনা করিলেন, "হে আল্লাহ ! মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণের শক্তি আমার নাই। কেননা মৃত্যু আমার অপেক্ষা বহুলাংশে শ্ৰেষ্ঠ ও শক্তিশালী।" তখন হযরত আজরাইল (আঃ) আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত শক্তিতে বলীয়ান হইয়া মৃত্যুকে স্বীয় আয়ত্তে আনয়ন করেন।
অতঃপর মৃত্যু আল্লাহ তায়ালার নিকট আরজ করিল, "হে আল্লাহ! আমাকে একবার নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে উচ্চৈঃস্বরে কিছু বলিবার অনুমতি প্রদান করুন। আল্লাহ্ তা'আলার অনুমতি লইয়া মৃত্যু অতি উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিল, "হে সৃষ্টজীব সকল! স্মরণ রাখিও, আমি সেই মুত্যু- যে বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে বিচ্ছেদ সাধন করে, মাতা-কন্যায়, পিতা-পুত্রে, স্বামী-স্ত্রীতে, সবল-দুর্বলে এবং ভ্রাতা-ভগ্নির মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটায়; ঘর-বাড়ী, দালান-কোঠা বিরান ও ধ্বংসস্থূপে পরিণত করে। "আমি অবশ্যই মৃত্যু দান করিব, যদিও তোমরা গগণচুম্বি অট্টালিকায় থাক না কেন। এমন কি কোন জীবই আমার স্বাদ গ্রহণে বঞ্চিত হইবে না।"
যখন কাহারও মৃত্যুর সময় ঘনাইয়া আসে, তখন মৃত্যু স্বীয় বিকট মূর্তিতে মুমূর্ষ ব্যক্তির সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হয়। মুমূর্ষ আত্মা তখন তাহাকে জিজ্ঞাসা করে,  "হে ব্যক্তি! তুমি কে এবং তুমি কি চাও?" প্রত্যুত্তরে সে বলে, "আমি মৃত্যু, আমি তোমাকে পৃথিবী হইতে বাহির করিব, তোমার সন্তানদিগকে অনাথ, এতিম করিব এবং তোমার স্ত্রীকে বিধবা করিব। তোমার ধন-দৌলত, অর্থ-সম্পদ তোমার সেই সকল উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বন্টন করিব, যাহারা তোমাকে পৃথিবীতে পছন্দ করে নাই এবং তুমিও যাহাদের পছন্দ কর নাই। তুমি নিজের জন্য যে সকল সক্কার্য করিয়াছিলে, আজ তাহারাই তোমার উপকারার্থে তোমার দোসর হইবে; আর কিছুই তোমার কোন প্রকার উপকার করিতে সক্ষম হইবে না।" এই সকল কথা শুনিয়া সেই ব্যক্তি তাহার মুখমণ্ডল দেওয়ালের দিকে ফিরায়, কিন্তু মৃত্যুদূতকে সেদিকেও হাজির দেখিতে পায়। পুনরায় সে অন্যদিকে মুখ ফিরায়, কিন্তু সেইদিকেও মৃত্যুকে দেখিতে পায়। পরিশেষে মৃত্যু বলিতে থাকে, "হে আল্লাহর বান্দা! তুমি কি জান না যে, আমিই সেই মৃত্যু যে তোমার চোখের সম্মুখ হইতে তোমার মাতা-পিতার রূহ কবজ করিয়া লইয়াছিলাম। কিন্তু তুমি তখন তাহাদের কোনই উপকার করিতে পার নাই। আজ তদ্রুপ আমি তোমার। সন্তানদের সম্মুখ হইতে তোমার রূহ্ ছিনাইয়া লইয়া অনন্ত জগতে বিলীন হইয়া যাইব; কিন্তু তাহারা তোমার কোনই উপকার করিতে পারিবে না। আমিই সেই মৃত্যু, যে অত্যন্ত শক্তিশালী জাতিসমূহকে ধ্বংস করিয়াছে।"
অতঃপর মৃত্যুদূত তাহাকে জিজ্ঞাসা করে "হে ব্যক্তি! পৃথিবী তোমার সহিত কিরূপ ব্যবহার করিয়াছে?" প্রত্যুত্তরে সে বলে, "আমি পৃথিবীকে ধোকাবাজ, প্রবঞ্চক ও প্রতারক হিসাবেই পাইয়াছি। উহা আমার সহিত সদ্ব্যবহার করে নাই।"  তারপর আল্লাহ তা'আলা মুমূর্ষ ব্যক্তির সম্মুখে পৃথিবীকে কুৎসিত বৃদ্ধা রমণীর আকৃতিতে তুলিয়া ধরিবেন। তখন পৃথিবী মুমূর্ষ ব্যক্তিকে সম্বোধন করিয়া বলিবে, "হে পাপিষ্ঠ নরাধম! তুমি কি আমার বুকে পাপকাজ করিতে কুণ্ঠাবোধ করিয়াছিলে বা লজ্জিত হইয়াছিলে? আর পাপ কর্ম হইতে বাচিয়াছিলে? তুমি আমাকে অন্বেষণ করিয়াছিলে কিন্তু আমি তোমাকে অন্বেষণ করি নাই। তুমি আমার মোহে এতই বিভোর, বিবেকহীন, অন্ধ হইয়া পড়িয়াছিলে যে, হালাল হারামের কখনও পার্থক্য কর নাই। তুমি কি মনে করিয়াছিলে যে, তোমাকে পৃথিবী ছাড়িয়া যাইতে হইবে না? কিন্তু তুমি মনে রাখিও, আমি তোমাকে এবং তোমার কার্যক্রমকে মোটেই পছন্দ করি নাই।"
মুমূর্ষ ব্যক্তি আরও দেখিতে পাইবে যে, তাহার টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত অন্যের হাতে চলিয়া যাইতেছে। তখন উক্ত মালামাল তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিবে,  "হে পাপী নরাধম! তুমি আমাদিগকে অন্যায়ভাবে সঞ্চয় ও সংগ্রহ করিয়াছিলে এবং দরিদ্র-ভিক্ষুককে আমাদের হইতে মোটেই দান-খয়রাত কর নাই। আজ আমরা অন্যের হাতে যাইতেছি। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করিয়াছেন "সেইদিন ধন-সম্পত্তি ও পুত্র-কন্যা কোন উপকার করিতে পারিবে না; কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সমীপে পবিত্র আত্মা লইয়া হাজির হইবে, সে ব্যতীত।"  তখন বান্দা আরজ করিবে, "হে আল্লাহ! আমাকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠাইয়া দিন। তাহা হইলে আমি যথোপযুক্ত সক্কার্য সম্পাদন করিয়া আসিব।" প্রত্যুত্তরে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিবেন "যখন কাহারও মৃত্যু সময় সন্নিকটে আসে (তখনই তাহার রূহ্ কবজ করা হয়) তখন মুহূর্তও আগে পিছে করা হয় না।"
অতঃপর মুমিন লোকের রূহ অত্যন্ত সহজ ও আছানির সহিত কবজ করা হয় আর মুনাফেক ও কাফেরদের রূহ্ খুব যাতনা সহকারে ছিনাইয়া আনা হয়। যেমন আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিয়াছেন "নিশ্চয়ই সৎলোকের আমলনামা ইল্লিন নামক স্থানে এবং বদ লোকদের আমলনামা সিজ্জিন নামক স্থানে রাখা হয়।"
[বিঃ দ্রঃ সিজ্জিন এবং ইল্লিন হইল দুইটি লিখিত রেজিষ্টার। উহাতে সৎলোকদের আমলনামা ও বদলোকদের আমলনামা সংরক্ষিত করা হয়।]

পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...