মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (১৫) রূহের বিবরণ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৫)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রূহের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মানবাত্মা যখন দেহ পিঞ্জর হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে, তখন আকাশমণ্ডল হইতে অতি উচ্চৈঃস্বরে তিনবার ডাকিয়া প্রশ্ন করা হয়, “হে আদম সন্তান! বল, তুমি কি পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়া আসিয়াছ, না পৃথিবী তোমাকে পরিত্যাগ করিয়াছে? আর তুমি পৃথিবীকে অর্জন করিয়াছিলে, না পৃথিবী তোমাকে অর্জন করিয়াছিল? আর হে বান্দা! পৃথিবী কি তোমাকে গ্রহণ করিয়াছিল, নাকি তুমিই আল্লাহতায়ালাকে বিস্মিত হইয়া পৃথিবীকে গ্রহণ করিয়াছিলে?”
আবার যখন গোসল দেওয়ার জন্য স্নানের জায়গায় রাখা হয় তখনও গগনমণ্ডল হইতে তিনবার উচ্চৈঃস্বরে আওয়াজ দিয়া বলা হয়, “ওহে আদম সন্তান! তোমার সেই শক্তিমান দেহবল্লরী এখন কোথায়? আর কে-ই বা তোমাকে এত দুর্বল ও অসহায় করিয়াছে? আর তোমার সেই বাকপটু জিহ্বা কোথায়? এখন কেন তুমি নির্বাক হইয়া পড়িয়া রহিয়াছ; আর তোমার সেই তীক্ষ্ণ শ্রবণেন্দ্রীয় কর্ণদ্বয়কে এমন বধির করিয়াছে কে? আর কেইবা নিরেট নিষ্ঠুরের মত তোমাকে স্বীয় বন্ধু-বান্ধব হইতে পৃথক করিয়া দিয়াছে?”
তারপর যখন কাফন পরানো হয়, সেই সময়ও আকাশমণ্ডল হইতে তিনবার অতি উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়া বলা হয়, “হে আদম সন্তান! তুমি যদি বেহেশতি বান্দা হইয়া থাক, তাহা হইলে ইহা সুসংবাদের কথাই বটে, কিন্তু তুমি যদি দোযখী বান্দা হইয়া থাক, তাহা হইলে তোমার জন্যে শত আক্ষেপ! আর হে আদম সন্তান! তোমার প্রতি যদি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট ও রাজি থাকেন, তবেই অতি উত্তম; কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যদি তোমার প্রতি ক্রোধান্বিত হইয়া থাকেন, তবে ইহার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ।” আর তৃতীয়বার বলা হয়, “ওহে আদম সন্তান! তুমি এখন এক দুর্গম ও কন্টকাকীর্ণ পথে যাত্রা করিবে । তুমি চিন্তা করিয়াছ কি? আর সেই দুর্গম পথের সম্বল তোমার আছে কি? আজ তুমি নিজে সুখ-শয্যা পরিত্যাগ করিয়া অতি বিপদ-সঙ্কুল ভয়ঙ্কর স্থানে গমন করিবে, কিন্তু কখনও আর ফিরিয়া আসিতে পারিবে না।”
আবার যখন মৃত ব্যক্তিকে খাটের ওপর রাখা হয়, তখন পূর্বের ন্যায় তিনবার ঘোষণা করা হয়, “ওহে আদম সন্তান! যদি তুমি পুণ্যবান হইয়া থাক, তাহা হইলে তোমার জন্যে শুভসংবাদ। আর দুষ্কর্মশীল হইলে তোমার নিমিত্ত রহিয়াছে দুঃসংবাদ; কিন্তু তুমি যদি আল্লাহ তা'আলার রেজামন্দি হাসিল করিয়া থাক এবং তাওবাহ করিয়া থাক, তাহা হইলে খুব উত্তম করিয়াছ। অন্যথায় তোমার পরিণাম অত্যন্ত মন্দ হইবে।
অতঃপর যখন খাটকে জানাযার নামাযের জন্য সারিবদ্ধ কাতারের সম্মুখে রাখা হয়, তখন আবার পূর্বের ন্যায় ঘোষণা করা হয়, “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার জীবনে ভাল-মন্দ যাহা কিছু সম্পন্ন করিয়াছ এখন সবকিছুই প্রত্যক্ষ করিবে। যদি সৎভাবে ও পুণ্য সঞ্চয়ের ভিতর দিয়া স্বীয় জীবনকে অতিবাহিত করিয়া থাক, তবে তোমার জন্যে রহিয়াছে সুসংবাদ; কিন্তু যদি মন্দভাবে পাপের স্রোতে গা ভাসাইয়া জীবনকে অতিবাহিত করিয়া থাক, তবে তোমার ধ্বংস অবধারিত।”

অতঃপর মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরের পার্শ্বে রাখা হয়, তখন কবর তাহাকে তিনবার ডাকিয়া বলে, “ওহে আদম সন্তান! একদিন আমার পৃষ্ঠপোরি পরমানন্দে হাসিয়া খেলিয়া বেড়াইয়াছ, এখন কাঁদিতে কাঁদিতে আমার অভ্যন্তরে প্রবেশ কর । আর এক কালে আমার পৃষ্ঠদেশে কত আনন্দ ও উৎফুল্ল হৃদয়ে কাল অতিবাহিত করিয়াছিলে, এখন চিন্তিতাবস্থায় আমার মধ্যে প্রবেশ কর, আর এককালে তুমি বেশ বাকপটু ছিলে, কিন্তু এখন নির্বাক ও বিমর্ষ চিত্তে আমার অভ্যন্তরে দাখিল হও।

”তারপর দাফন-কার্য সমাপন করিয়া লোকজন যখন নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে চলিয়া যায়, তখন পরম কৌশলী আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, “ওহে আমার প্রিয় বান্দা! আজ তুমি নির্জন কবরের মাঝে ঘোর অন্ধকারে বন্ধু-বান্ধব ও দোসরহীন একা একা পড়িয়া রহিয়াছ। আত্মীয়-স্বজন সকলেই তোমাকে ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে; কিন্তু এক সময় তুমি তাহাদের জন্য আমার বিধি-নিষেধের গণ্ডি অতিক্রম করিয়া পাপকাজে পরিলিপ্ত হইয়াছিলে এবং আমাকে ভুলিয়া গিয়াছিলে। হে বান্দা! আজ এই দুর্দিনে তোমার প্রতি আমি অত্যন্ত দয়ালু ও মেহেরবান হইব। যাহা দর্শন করিয়া আমার সৃষ্ট জীবসকল বড়ই আশ্চর্যান্বিত হইয়া পড়িবে। হে বান্দা! জানিয়া রাখ, মাতা সন্তানের প্রতি যতটুকু স্নেহশীল ও মায়াময়ী হইয়া থাকে, আমি আমার বান্দার জন্যে তদপেক্ষাও অধিক স্নেহশীল ও দয়ালু।”

পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...