মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (১৪) মানুষের ঈমান নষ্ট করিতে শয়তানের চেষ্টা

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৪)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মানুষের ঈমান নষ্ট করিতে শয়তানের চেষ্টা-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, জান কবজের সময় শয়তান মৃত্যুর পথযাত্রীকে সম্বোধন করিয়া বলে, “হে বান্দা! তুমি যদি এই অসহ্য যন্ত্রণা হইতে নিস্তার লাভ করিতে ইচ্ছা কর, তবে ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া দুইজন খোদার অস্তিত্ব স্বীকার কর।” এই সঙ্কট মুহূর্ত ঈমান রক্ষা করা বড়ই বিপজ্জনক হইয়া পড়ে। এইজন্য বলিতেছি, হে বন্ধুগণ! সেই বিপদ ও সঙ্কট হইতে উদ্ধার পাইতে হইলে অধিক পরিমাণে অশ্রু বর্ষণ সহকারে রাত্রি জাগরণ করিয়া রুকু-সিজদায় মশগুল হউন এবং আল্লাহ পাকের দরবারে কান্নাকাটি করুন। 
হযরত ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) কে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিলেন, “হুযুর! কোন কাজে ঈমান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশী?” প্রত্যুত্তরে তিনি বলিলেন, “(১) ঈমানের শুকরিয়া আদায় না করিলে, (২) জীবনের শেষ মুহূর্তকে ভয় না করিলে এবং (৩) আল্লাহ তায়ালার বান্দাদের উপর জুলুম ও অত্যাচার করিলে ঈমান নাশের সম্ভাবনা থাকে।”
তিনি আরও বলিয়াছেন, “যাহাদের মধ্যে এই তিনটি দোষ বিদ্যমান, আমার মনে হয় তাহারা সকলেই বেঈমান হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইবে; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যদি কাহারও ভাগ্যবলে ঈমান বিনষ্ট না করেন, তবে সে ঠিক থাকিবে।” এইজন্য আমরা সর্বান্তঃকরণে আল্লাহ তা'আলার নিকট এই সকল অপকর্ম হইতে ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, জান কবজের সময় মুমূর্ষু ব্যক্তি পিপাসায় ও হৃৎপিণ্ডের যন্ত্রণায় অত্যন্ত কাতর ও অস্থির হইয়া যায়। এমন সময় শয়তান বান্দার ঈমান নষ্ট করিবার জন্য সচেষ্ট হয়। সেই সময় বান্দা যখন পিপাসায় কাতর হইয়া যায়, তখন শয়তান এক পেয়ালা ঠান্ডা-পানি লইয়া বান্দার সম্মুখে উপস্থিত হয় এবং পেয়ালাটি আন্দোলিত করিতে থাকে। তখন কাতর বান্দা ভুলবশতঃ শয়তানের নিকট পানি চায়। উত্তরে শয়তান বলে, “হে বান্দা! তুমি যদি এই কথা বল যে, এই বিশ্ব-জগতের কোন প্রতিপালক নাই, তবেই তোমাকে আমি এই পানি পান করাইতে পারি।”  ইহাতে বান্দা যদি কোন উত্তর প্রদান না করে, তবে শয়তান পুনরায় তাহার পদযুগলের সন্নিকটে বসিয়া পানির পেয়ালা নাড়াচাড়া করিতে থাকে। তখন উক্ত বান্দা বলে, “আমাকে কিছু পানি দাও।” উত্তরে শয়তান বলে, “হে বান্দা! তুমি যদি বলিতে পার যে, রাসূলগণ মিথ্যাকথা প্রচার করিয়া গিয়াছে, তবে তোমাকে পানি পান করাইতে পারি।” এমতাবস্থায় যাহার ভাগ্যে বদবখতি লেখা আছে, সে পিপাসার যাতনা সহ্য করিতে না পারিয়া শয়তানের ইচ্ছা অনুসারে কাজ করিয়া বেঈমান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে এবং ধর্ম-ভীরু ও আল্লাহভক্ত ব্যক্তি ঈমানের শক্তির প্রভাবে শয়তানের প্ররোচনা হইতে নিজেকে মুক্ত রাখিতে সক্ষম হয় ও পবিত্র ঈমানের সহিত তাহার রূহ, অনন্ত রাজ্যে বিলীন হইয়া যায়।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, বিখ্যাত সুফী আবু জাকারিয়া (রহঃ) -এর জান কবজের সময় তাহার এক প্রিয়তম বন্ধু তাহাকে কালেমায়ে শাহাদাত তালকীন দিতে (পড়াইতে) শুরু করেন; কিন্তু প্রত্যুত্তরে সুফী আবু জাকারিয়া (রহঃ) কিছুই বলিলেন না এবং মুখমণ্ডল অন্যদিকে ফিরাইয়া লইলেন। দ্বিতীয়বারও তিনি এমনই করিলেন এবং তৃতীয়বার তালকীনের সময় বলিলেন, “আমি ইহা বলিব না ।” ফলে বন্ধুবর অত্যন্ত বিচলিত ও চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। এইভাবে কিছুক্ষণ অতিবাহিত হইয়া যাওয়ার পর আবু জাকারিয়া (রহঃ) যাতনার শীতলতা অনুভব করতঃ চক্ষুদ্বয় উন্মিলিত করিয়া বলিলেন, “হে বন্ধু! তুমি কি আমাকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে?” বন্ধুবর বলিলেন, “হ্যা আমরা আপনাকে তিনবার কালেমায়ে শাহাদাত তালকীন করিয়াছি, কিন্তু দুইবারই আপনি মুখমণ্ডল অন্যদিকে ফিরাইয়া লইয়াছিলেন এবং তৃতীয়বার বলিয়াছিলেন যে, “আমি ইহা বলিব না।” তখন সুফী আবু জাকারিয়া (রহঃ) বলিলেন, “বিতাড়িত ইবলিস শয়তান এক পেয়ালা পানিসহ আমার ডানদিকে দাঁড়াইয়া এবং পানির পাত্রটি নাড়াচাড়া করিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, “হে বান্দা! তুমি কি পানি পান করিবে?” আমি উত্তর করিলাম, “হ্যা পান করিব।” তখন শয়তান বলিল, “যদি তুমি বল যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তায়ালার পুত্র ছিলেন, তবে তোমাকে আমি পানি পান করাইব।” এইকথা শ্রবণ করিয়া আমি মুখ ফিরাইয়া লইয়াছি। তারপর শয়তান পায়ের কাছে আসিয়াও সেই কথা বলিল, তখনও আমি মুখ ফিরাইয়া লইয়াছি। তৃতীয়বার শয়তান আমাকে বলিল- “তুমি অন্ততঃ বল, 'লা-ইলাহা অর্থাৎ কোনই উপাস্য নাই।” ইহার প্রত্যুত্তরে আমি বলিলাম, আমি কখনও এই কথা বলিব না। ইহা শ্রবণ করিয়াই শয়তান পানির পাত্রটিকে মাটিতে নিক্ষেপ করিয়া চলিয়া গেল। আমি মরদুদ্ শয়তানের কথার উত্তর দিয়াছি মাত্র। আমি তোমাদের কথার উত্তর দেই নাই। এখন আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, “আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কোনও উপাস্য নাই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ তা'আলার বান্দা এবং রাসূল ছিলেন ।”

হযরত মানসুর ইব্‌নে আম্মার (রাঃ) এই প্রসঙ্গে বর্ণনা করিয়াছেন যে, মুমূর্ষু ব্যক্তির অবস্থাকে মোটামুটি পাঁচভাগে ভাগ করা হইয়া থাকে। যেমন- (১) তাহার ধন-সম্পদ নিজের উত্তরাধিকারদের মধ্যে বন্টন করিয়া দেওয়া হয়, (২) মালাকুল মউত রূহ্ লইয়া অনন্তে বিলীন হইয়া যায়, (৩) দেহের মাংস কীট-পতঙ্গে খাইয়া ফেলে, (৪) হাড় অস্থি মাটির সহিত মিশিয়া যায় এবং (৫) সৎকর্মগুলি ইহার হকদারেরা লইয়া যায়। তবে প্রত্যেকে স্বীয় প্রাপ্যাংশ বন্টন করিয়া লইয়া যাইতে অনুশোচনা করিবার কিছুই নাই; কিন্তু, হায়! বিতাড়িত শয়তান যেন ঈমান হরণ করিতে না পারে। পবিত্র ঈমান হইতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ আল্লাহ পাক হইতে বিচ্ছিন্ন হওয়া মাত্র। ইহার ক্ষতিপূরণ সম্পূর্ণ অসম্ভব। আল্লাহ তা'আলা আমাদের 'খাতেমা বিখায়ের’ এনায়েত করুন, আমিন।

পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...