📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৩)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
মৃত্যুমুহূর্তে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাতর ফরিয়াদ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, যখন কাহারো মৃত্যুর সময় ঘনাইয়া আসে, তখন মালাকুল মউত তাহার আত্মা কবজ করিবার জন্য বান্দার মুখের নিকট আগমন করেন, তখন তাহার মুখমন্ডল আল্লাহ্ তা'আলার জিকির করিতে করিতে বলে, "মৃত্যুদূত! ক্ষান্ত হও, আর সন্মুখে অগ্রসর হইওনা। এই পথে তোমার মনঃবাসনা পূর্ণ হইবেনা। কারণ এই পথে প্রতিনিয়ত আল্লাহ্ তা'আলার জিকির হইয়াছে'। তখন মৃত্যুদূত আল্লা্হ্ তা'আলার কাছে আরজ করেন,"হে আল্লাহ্ ! আপনার বান্দা এরূপ বলিতেছে। আমি এখন কি করিতে পারি?" তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাহাকে অন্যদিক হইতে চেষ্টা করিতে নির্দেশ করিবেন। নির্দেশ মত মালাকুল মউত এইবার তাহার হস্তের দিক হইতে প্রাণ সংহারের মৃত্যুবান নিক্ষেপ করিতে উদ্যত হইবেন। তখন হাত বাধা দিয়া বলিবে "হে মৃত্যুদূত আমি তোমাকে এই পথে আক্রমন করিতে বারণ করিতেছি। কারণ এই হাত দ্বারা আমি অনেক দান খয়রাত করিয়াছি।, সস্নেহে এতিমের মস্তক স্পর্শ করিয়াছি, কত লেখনি চালনা করিয়াছি এবং শাণিত কৃপাণ দৃঢভাবে ধারণ করিয়া কাফের বেদ্বীনের গ্রীবাদেশে চালনা করিয়াছি। অতএব তুমি এই পথে আক্রমন করিওনা।" অতঃপর মালাকুল মউত পদদ্বয়ের দিক হইতে মৃত্যুবাণ নিক্ষেপ করিতে সচেষ্ট হইবেন। তখন পদযুগল দৃঢস্বরে বাধা প্রদান পূর্বক বলিবে, "হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও, আর সন্মুখে অগ্রসর হইওনা। এই দিক দিয়া আমাকে আক্রমন করিওনা পদদ্বয়ের সাহায্যে আমি জুমআ আর জামাতের জন্য দৌড়াইয়াছি। রোগীর সেবাযত্নের জন্য গমন করিয়াছি। বিদ্যার্জনের জন্য জ্ঞানীদের মজলিসে যোগদান করিয়াছি।" তার পর মালাকুল মউতের আক্রমন কর্ণদ্বয়ের প্রতি আকৃষ্ট হইতেছে দেখিয়া, তাহারা বলিবে! ক্ষান্ত হও! এদিকে অগ্রসর হইওনা। আমি এই কর্ণদ্বারা আল্লাহ্ তা'আলার পবিত্র কালাম ও যিকির শুনিয়া হৃদয়কে পবিত্র ও আলোকিত করিয়াছি।" অতঃপর নেত্র দ্বয়ের দিকে আক্রমন করিবার উপক্রম করিলে তাহারা বলিবে, "হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও, ধৈর্যধারণ কর, আমাদের দ্বারা পবিত্র কুরআনের প্রতি ও আলেমগণের প্রতি দৃষ্টিপাত করা হইয়াছে। এজন্য তুমি নেত্রদ্বয়ের ক্ষেত্রে আক্রমন চালাইওনা।" মালাকুল মউত বান্দার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সহিত তর্কযুদ্বে পরাস্ত হইয়া আল্লাহ্ তাআলার নিকট আরজ করিবেন, হে আল্লাহ্! আপনার বান্দা আমাকে যুক্তি-তর্কে পরাস্ত করিয়াছে ও এইরূপ বলিয়াছে। এখন আমি কিরূপে তাহার রূহ্ কবজ করিব, বলুন।" প্রত্যুত্তরে আল্লাহ্ তা'আলা বলিবেন, "হে মালাকুল মউত! এভাবে তুমি তাহার জান কবজ করিতে সক্ষম হইবেনা, বরং তুমি তোমার হাতের উপর আমার নাম লিখিয়া আমার প্রিয় মুমিন বান্দার সম্মুখে উপস্থাপন কর। তবেই দেখিবে যে, আমার বান্দার রূহ্ আমার নাম দেখিতে দেখিতে কষ্ট-ক্লেশ ব্যাতীত হাসিতে হাসিতে অনন্তে মিলিয়া যাইবে।" অতঃপর মালাকুল মাউত তাহাই করিবেন। ইহাতে বান্দার রূহ্ আল্লাহ্ তা'আলার পবিত্র নামের মায়ায় বিমুগ্ধ হইয়া মৃত্যুকষ্ট বিস্মৃত হইয়া পরমানন্দে অন্তরের পথে বিলিন হইয়া যাইবে।
তাই বন্ধুগণ, মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করুন, যাহারা নিজ অন্তর প্রদেশে আল্লাহর নামের মোহর অংকিত করিতে সক্ষম হইয়াছেন, নিশ্চয় তাহারা আল্লাহ প্রদত্ত সুকঠিন শাস্তি বিচ্ছিন্নতার কষ্ট ও যাতনা এবং অপদস্থতার তীব্র গ্লানি হইতে নিস্তার লাভ করিবেন। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা এরশাদ করেন, -("উলাইকা কাতাবা ফি কুলুবিহিমুল ঈমানা") অর্থাত : "উহারাই, যাহাদের হৃদয় কন্দরে আল্লাহ্ তা'আলা ঈমানের মোহর অংকিত করিয়া দিয়াছেন।" আর আল্লাহ্ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, - ("আফামান্ শারাহাল্লাহু ছাদরাহু লিল্ ইসলামি ফাহুয়া আলানুরিম্-মির রাব্বিহ্") অর্থাত : আল্লাহ্ তা'আলা যাদের অন্তকরণকে পবিত্র ইসলামের জন্য সম্প্রসারিত করিয়াছেন, নিশ্চয় তাহারা আল্লাহ্ তা'আলার প্রদত্ত জ্যাতিতে বিরাজ করিতেছে। অতএব সে কিয়ামতের দিন আযাবের ভয় হইতে পরিত্রাণ লাভে সক্ষম হইবে"।
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত আছে যে, যখন কোন বান্দার জান কবজ আরম্ভ হয়, তখন আল্লাহ্ তা'আলার তরফ হইতে কেহ উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলে, "হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও কিছু সময় তাহাকে আরাম করিতে দাও।" আর রূহ্ যখন বক্ষস্থল পর্যন্ত আসে তখন পূনরায় ডাকিয়া বলা হয় যে, "হে মৃত্যুদূত ক্ষান্ত হও, ক্ষান্ত হও, আরো কিছু সময় তাহাকে আরাম করিতে দাও।" অনুরূপ ভাবে হাটু ও নাভী পর্যন্ত পৌছিলেও তেমনি বলা হইয়া থাকে। পরিশেষে রূহ্ যখন কন্ঠ পর্যন্ত পৌছিয়া যায় তখন অতি উচ্চৈঃস্বরে বলা হয় হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও! ক্ষান্ত হও! তা্হাকে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হইতে চিরবিদায় গ্রহন করিবার জন্য কিছু সময় প্রদান কর।" তখন চক্ষুদ্বয় রূহ্কে বিদায় দিয়া বলে, হে বন্ধু কিয়ামত পর্যন্ত তোমার উপর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হউক।" অনুরুপ ভাবে উভয় হস্ত, উভয় কর্ণ এবং পদদ্বয় রূহ্কে আশীর্বাদ করিয়া চির বিদায় গ্রহন করে।
আমরা আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে প্রার্থনা করিতেছি যেন আমাদের রসনা হইতে ঈমানের বাণী এবং অন্তর হইতে মারেফাতের জ্যোতি বিদায় করিতে না হয়। তারপর হস্তদ্বয়, পদদ্বয় নিস্তেজ হইয়া পড়িয়া থাকে এবং চক্ষুদ্বয় জ্যোতিহীন ও কর্ণদ্বয় শ্রবণ শক্তিহীন এবং দেহ কাঠামো আত্মাহীন হইয়া পরিয়া থাকে।
আহা! সে সময় যদি রসনা শাহাদত বিহীন ও আত্মা আল্লাহ্ তা'আলার মারেফত বিহীন পরিয়া থাকে, তবে সেই বান্দাকে কবরের মধ্যে কতইনা দুরবস্থা ও দুঃখ যাতনা ভোগ করিতে হইবে। যেখানে মাতা-পিতা, ভ্রাতা-ভগ্নি, বন্ধু-বান্ধব, পূত্র-কন্যা, পাড়া-প্রতিবেশী, বিছনাপত্র ও আবরণ বলিতে কিছুই থাকিবেনা। আহা! সে সময় যদি আল্লাহ্ অনুগ্রহ না করেন তাহলে তাহাকে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হইতে হইবে।
ইমাম আযম হযরত আবু হানিফা (রহঃ) বলিয়াছেন, "জান কবজের সময় বান্দার ঈমান নষ্ট হইবার অত্যাধিক সম্ভাবনা থাকে।"
ঈমান নষ্ট না করার জন্য আমরা পরম করুনাময়ের সাহায্য ও অনুকম্পা কামনা করিতেছি। আমিন! আমিন!!
পরবর্তী পর্ব
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন