মঙ্গলবার, ২ জুলাই, ২০২৪

মখলূক – ৭


মখলূক— (পর্ব – ৭)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


ফিতনার যুগে আলিমদের কর্তব্য—

ফিতনা যখন ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করবে, প্রতিটি কাজই বিপরীত হওয়া শুরু করবে, মানুষ ধর্মীয় বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, মুমিনকে কোন কাজের যোগ্য মনে করা হবে না, কেউই আলিমের সন্ধান করবে না, উপদেশপূর্ণ বাক্যের কোন মূল্য থাকবে না এবং নিজের ধর্মের ব্যাপারেও যখন কেউ সাহায্য করবে না,

মানুষের সর্বস্তরে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে ফিতনা যখন পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়বে,

বিশেষ শ্রেণীর মানুষ ধর্মীয় নির্দেশ পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করবে,

এমতাবস্থায় আলিমের জন্যও নির্জনতা ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন এবং জনসাহচর্য পরিত্যাগ করে গোপনে জীবন যাপনের একটা ওজর পাওয়া যেতে পারে। আমার আশঙ্কা হয় যে, আমি যেসব বিষয় বর্ণনা করলাম সে সঙ্কটপূর্ণ ও কঠিন যুগেই কেবল তা বিদ্যমান থাকবে, তারই বা কি নিশ্চয়তা আছে? সুতরাং বাহ্য দৃষ্টিতে ধরা না পড়লেও আদতে এর মধ্যেই মানুষের সাহচর্য ত্যাগ ও নির্জনতা এবং নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বনের নির্দেশ বিদ্যমান রয়েছে। বিষয়টিকে খুব গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। কেননা এ ক্ষেত্রে ভ্রান্তির খুবই আশঙ্কা এবং তাতেই ক্ষতির আশঙ্কাও বেশী

এখন হয়তো কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) কি বলেননি যে : 

“জামা'আত ও সংঘবদ্ধতাকে আঁকড়ে থাক; কেননা জামা'আতের উপরই আল্লাহর রহমত বিদ্যমান। (আর মনে রাখবে) শয়তান হলো মানুষের জন্য ব্যাঘ্রস্বরূপ। জামা'আত থেকে বিচ্ছিন্ন, দূরে ও প্রান্তে অবস্থানকারী এবং যে ব্যক্তি জামা'আত থেকে পৃথক হইয়া একা থাকে, শয়তান তাকে ধরে নিয়ে যায়”।

এবং তিনি কি আরও বলেননি ? “শয়তান নিঃসঙ্গ ও একা ব্যক্তির সাথে সাথে থাকে। কিন্তু দু'জন হলেই দূরে অবস্থান করে”।


হ্যাঁ, সত্যই উপরিউক্ত কথাগুলো রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বয়ং বলেছেন। কিন্তু তিনি তো একথা বলেছেন যে, নিজের গৃহকে আঁকড়ে থাক, বিশেষ বিশেষ লোকের সাহচর্য অবলম্বন করো এবং সাধারণের সংশ্রব একেবারে বর্জন করো। সুতরাং দেখা যাচ্ছে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যেমন জামা'আতে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনি গোলযোগপূর্ণ সময়ে মানুষের সংশ্রব বর্জন ও নির্জন জীবন যাপনেরও নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু তাই বলে তাঁর এতদুভয় নির্দেশের মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। বরং দু'টি নির্দেশের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে নেয়া দরকার। প্রথমত, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) যেখানে জামা'আতকে আঁকড়ে থাকার কথা বলেছেন, সেখানে তিনি জামা'আত অর্থে ধর্মীয় বিষয় ও ধর্মীয় আহকাম সম্পর্কে বলেছেন। কেননা, উম্মতে মুহাম্মদীয়া কখনও অধর্মের ব্যাপারে একমত হতে পারে না এবং এ ক্ষেত্রে কেউ যদি ইজমায়ে উম্মতের বিরুদ্ধে চলে যায়, তবে তার ক্ষেত্রে উক্ত হাদীস প্রযোজ্য হতে পারে অথবা জমহুর উলামাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যাপারে রায় প্রকাশ করলে, তার জন্যও এ হাদীস সাবধান বাণী হিসেবে প্রযোজ্য হয়। তেমনি জমহুর উলামাদের থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও হতে পারে। এসবই পরিত্যাজ্য কাজ এবং এগুলোর পরিণাম স্বভাবতই বিপদগামী হওয়া। তবে হ্যাঁ, ধর্মের ঘনিষ্ঠতা রক্ষার জন্যই যদি পৃথক হওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে সেটা আলাদা কথা। তা অবশ্যই করা যেতে পারে।


‘জামা'আত আঁকড়ে থাক' – এর দ্বিতীয় অর্থ এ হতে পারে যে, জুম'আ - জামা'আত পরিত্যাগ করো না। কেননা এগুলোর মধ্যে ধর্মীয় শক্তি প্রকাশ পায় এবং এগুলোর মধ্যেই ইসলামের পরিপূর্ণতা লাভ হয়। তাছাড়া, এ ধরনের অনুষ্ঠানের দ্বারা কাফির ও বিধর্মীদেরও তুষানলে নিপতিত করা সম্ভব হয় । সুতরাং এ ধরনের অনুষ্ঠান আল্লাহ্র রহমত থেকে নিশ্চয়ই শূন্য থাকবে না। এজন্য আমরা একা জীবন অবলম্বনকারীকে বলে থাকি, উত্তম ও ভাল সকল সমাবেশেই তার অংশগ্রহণ করা উচিত— অপরপক্ষে গোলযোগপূর্ণ ও ক্ষতিকারক সমাবেশ থেকে দূরে অবস্থান সে করতে পারে। কেননা এসব স্থানে প্রতি পদেই অসুবিধা বিদ্যমান।


‘জামা'আত আঁকড়ে থাক'-এর তৃতীয় অর্থ এ হতে পারে যে, ধর্মীয় ব্যাপারে যারা দুর্বল, শান্তি ও নিরাপদকালে তাদের আলাদা না হওয়ার জন্য তাকীদ করা হয়েছে।


তবে যারা ধর্মীয় ব্যাপারে শক্তিশালী এবং আল্লাহর সকল বিষয়েও যথেষ্ট ওয়াকিফহাল, তারা যদি দেখতে পায় যে, ফিতনার সে সময় এসে গেছে,

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) যে যুগের ব্যাপারে উম্মতকে সাবধান করে গেছেন এবং সে সময় নির্জনতা ও একাকী জীবন যাপনের নির্দেশ দিয়েছেন, তাহলে তখন তাদের জন্য নির্জনতা ও একাকী জীবন যাপনই উত্তম ও ভাল। কেননা, এমন যুগে মানুষের সাথে মেলামেশার মধ্যে ফাসাদ ও বিপদের ঝুঁকি বিদ্যমান থাকে। তবে ইসলামী বিষয় সংক্রান্ত সমাবেশ এবং সাধারণ কল্যাণকার্য থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া উচিত নয়। যদি মানুষের সংস্রব বর্জন, নির্জনতা ও একাকী জীবন যাপনই একান্ত উদ্দেশ্য হয়, তাহলে কোন পর্বত শীর্ষে অথবা কোন জনমানবহীন স্থানে চলে যাওয়াই উত্তম। কারণ তথায় গেলে নিজের ধর্মকে অন্তত সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবে।


মোদ্দাকথা আল্লাহ্ যাকে জুম'আ, জামা'আত ও অন্যান্য সকল ইসলাম বিষয়ক সমাবেশে অংশ গ্রহণের সামর্থ্য দান করেছেন সে যেখানেই আর যে পরিস্থিতিতেই অবস্থান করুক না কেন, তাতে তার অংশগ্রহণ করা উচিত – যাতে করে এর মহান সওয়াব থেকে বঞ্চিত না হতে হয়। কেননা ধর্মীয় সমাবেশ--তা সে যেখানেই হোক না কেন, আল্লাহর তরফ থেকেই হয়ে থাকে। অবশ্য অনেক সময় মানুষের দোষ-ত্রুটির জন্য তাতেও ফাসাদ ও ফাটল সৃষ্টি হয়ে যায়। আবদাল ও কুতুবদের সম্পর্কে এ ধরনের কথাই শুনতে পাওয়া যায় । ইসলামী বিষয়ে যেখানেই কোন সমাবেশ হোক না কেন, তাঁরা সেখানেই উপস্থিত হন। তাঁরা যেখানেই যেতে চান, সেখানেই পৌঁছে যেতে পারেন। তাঁদের জন্য ধরাটি একটি পদক্ষেপের স্থান মাত্র।


বর্ণিত আছে, এ সকল বুযুর্গের জন্য যমীনকে শুইয়ে দেয়া হয় এবং শান্তির সাথে তাদের আহবান করা হয়। আর তাদের উপর বিস্তার করে থাকে কেরামত ও কল্যাণের ছায়া।


যাঁরা এ ব্যাপারে সাফল্য অর্জন করেছেন, আমি তাঁদের মোবারকবাদ জানাই। আল্লাহ্ তাদের নিজ সংকল্পে দৃঢ় থাকার তৌফিক দান করুন, যারা নিজের নফসকে রেহাই দেয়ার ব্যাপারে ঔদাসীন্য অবলম্বন করেছে আর লক্ষ্যস্থলে পৌঁছতে অপারগ, আমাদের ন্যায় অন্বেষীদের তিনি সাহায্য করুন।


আমি নিজের অবস্থাকে নিম্নোক্ত কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করার প্রয়াস পাব : 

অন্বেষী দল সাফল্য অর্জন করেছে এবং তারা তাদের উদ্দেশ্যে উপনীত হয়ে গেছে। আর বন্ধুগণ বন্ধুদের দ্বারাই সাফল্য অর্জন করেছে। অথচ, আমরা উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়া ও সে পথ থেকে বিরত থাকা- এ দুইয়ের মাঝখানে কম্পমান ও অস্থিরতায় ডুবে আছি। নিকটকে দূর আর দূরের মধ্যে নৈকট্য তালাশ করছি। তাছাড়া এ নফসটিও এমন যে, সে অসম্ভব জিনিসকেই জ্ঞানের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সুতরাং আমাদের এমন জিনিস পান করাও যাতে সকল বেদনা দূর হয়ে যায় এবং সিরাতুল মুস্তাকীমের সোজা পথ হাসিল হয়।


ওহে রোগ-জীর্ণদের চিকিৎসক। এ রোগীদের আহত অন্তঃকরণের বর্তমানে এ একটিই কামনা। ওহে বিপদ ত্রাতা, আমি জানি না, কি দিয়ে আমার এ রোগের চিকিৎসা করবো। আমি এ-ও জানি না যে, কি দিয়ে কিয়ামতের দিন সাফল্য লাভ করবো?

--

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...