মখলূক— (পর্ব – ৬)
📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ধর্মের নেতাদের দুটি জিনিষ আবশ্যক—
এখানে আরও একটি বিষয় অবশ্যই স্মরণীয় যে, যে ব্যক্তির নিকট ধর্মীয় ব্যাপারে সমাজ নির্ভরশীল, মানুষের মধ্যে অবস্থানের জন্য তাঁর দু'টি জিনিসের অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রথমত, অসীম ধৈর্য, বিপুল সহিষ্ণুতা, উদার দৃষ্টি ও সকল ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য ও সহযোগিতা লাভের যোগ্যতা। দ্বিতীয়ত, সমাজের অন্যান্য সকল ব্যাপারে যদিও তিনি সশরীরে স্বয়ং অবস্থান করবেন তথাপি তাঁকে সকল বিষয় থেকে আলাদা থাকতে হবে। সুতরাং যখন তিনি কথাবার্তা বলবেন, তিনি ধর্মীয় বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেবেন। যদি কেউ সাক্ষাৎ করতে আসে, তবে তার মর্যাদা ও সম্মান অনুযায়ী তাকে মর্যাদা দান ও সম্মান প্রদর্শন করবেন। যদি মানুষ তাঁকে উপেক্ষা করে বা তাঁর সম্পর্কে উদাসীন হয়ে যায়, তবে এ অবস্থাকে সৌভাগ্য মনে করবে। সমাজ যদি নেক ও সত্য কাজে ব্যাপৃত হয়, তবে তার বিরোধিতা করবে অথবা তা থেকে দূরে অবস্থান করবে। অবশ্য যদি দেখা যায় যে, উপদেশ কাজে আসবে, তবে উক্ত কার্যে বাধা দান করবে বা নিজের গোস্বা প্রকাশ করবে। এমনিভাবে, সমস্ত শক্তি ও ক্ষমতা দিয়ে তাঁকে তাঁর হক আদায় করতে হবে। মানুষের সাক্ষাৎ বা ইবাদতে অংশ গ্রহণ করে হোক অথবা সমাজে যে বিষয়ের অভাব আছে, তা পূরণ করেই হোক -- ধর্মীয় ব্যাপারে সমাজের প্রতি যে দায়িত্ব তাঁর আছে, তা পালন করবে। মনে রাখবে, এর কোন বদলার প্রত্যাশী হতে পারবে না। এ ধরনের কোন ধারণা রাখা এবং ধর্মীয় ব্যাপারে মানুষের মনে অসঙ্গত ধারণা সৃষ্টি করাও চলবে না। যদি সামর্থ্য থাকে, তবে ধর্মীয় ব্যাপারে হক আদায়ের জন্য অকুণ্ঠচিত্ত থাকবে।
সমাজের মন্দ দিকগুলো দূর করার চেষ্টা করবে। তাদের খোশখবর দান করবে। নিজেকে সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং নিজের অভাবের বিষয় সর্বদা গোপন রাখবে। তাহলে মানুষ বাহ্যত তাঁকেই তাদের অনুসরণীয় মনে করবে এবং অন্তরেও তাঁর ন্যায় হওয়ার জন্য চিন্তা-ভাবনা করবে।
এ সব বিষয় ছাড়া তাঁর জন্য আরও কতিপয় কর্তব্য রয়েছে। যথা নিজের ব্যাপারেও সর্বদা সতর্ক ও সচেতন এবং বিশেষ ইবাদতে লিপ্ত থাকতে হবে।
যেমন হযরত উমর 'আল-ফারূক (রা) বলেছেনঃ যদি রাতে বিশ্রাম লাভ করি, তাহলে আমার নফসকে লোকসানের দিকে ঠেলে দিতে হয, আর যদি দিনে বিশ্রাম গ্রহণ করি, তবে মানুষের হক নষ্ট করতে হয়। সুতরাং এই দুই সময়ের মধ্যে বিশ্রাম নেয়ার অবকাশ কোথায়?
উপরিউক্ত বিষয়টিকেই কতিপয় কবিতার মধ্যেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
যেমন-
যদি তুমি ইমামদের জীবনাদর্শের প্রতি আকর্ষণ অনুভব কর তবে নিজের নফসকে এমন দৃঢ় কর যেন বিপদাপদ তোমাকে টলাতে না পারে। নফসকে আত্মমর্যাদায় বলীয়ান করে প্রতিটি খারাপ জিনিস উদ্ভবের মুকাবিলা করতে হবে এবং এমনিভাবে ধৈর্য শিক্ষা দেবে যে, তা যেমন বক্ষে প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।
তোমার জিহ্বা থাকবে নীরব, তোমার চতুর্দিক থাকবে বন্ধ। তেমনি তোমার গোপনীয়তা থাকবে সত্যিই লুক্কায়িত – বুদ্ধিমানের নিকট এটাই - সবচাইতে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে।
তোমার মন্দ সমালোচনা হবে, দরজা থাকবে বন্ধ। মুখে থাকবে মুচকি হাসি – কিন্তু পেট থাকবে খালি। তোমার অন্তর আহত, তোমার ব্যবসা অচল, - তোমার মর্যাদা বিলুপ্ত – সর্বত্র কেবল তোমার দোষ-ত্রুটির আলোচনা। তবুও দিনরাত তুমি কাল ও মানুষের অভিশাপ হজম করে চলেছ। অন্তরে যদি তাঁদের (মহৎ ব্যক্তির) আদর্শ অনুসরণের আকঙ্খা পোষণ কর, তবে দিনে মানুষের কাজে পুরস্কার বা কৃতজ্ঞতা ব্যতীতই লিপ্ত হয়ে যাও এবং রাতে সেই মিলনানন্দে ডুবে যাও, একই কাফেলার অন্য লোক যে আনন্দের খবরও জানে না।
সুতরাং জীবনের রাত্রিসমূহকে সে মহাসঙ্কটপূর্ণ ও কঠিন দিনের উপায় লাভে নিয়োজিত কর, যে দিন অন্য কোন কিছুই কাজে আসবে না ।
মোটকথা, মানুষের মধ্যে অবস্থানকালে স্বয়ং মানুষের সাহচর্যে থাকবে ঠিক; কিন্তু অন্তর থাকবে বহু দূরে – অতি দূরে। আল্লাহর কসম, এ অবস্থায় উপনীত হওয়া খুবই কঠিন। সংসারটাও বড়ই সংকুল। এ বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের ওস্তাদ সাহেব ওসীয়ত করতে গিয়ে বলেছেনঃ “আয় বৎস, যুগের মানুষের সাথে অবস্থান করলেও তাদের সৃষ্ট স্রোতের টানে ভেসে যেও না। তিনি আরও বলেছেনঃ ব্যাপারটা খুবই কঠিন। কেননা, জীবনটা জীবিতদের সাথে আর অনুসরণ করতে হয় মৃত ব্যক্তিদের।
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মসউদ (রা) বলেছেনঃ মানুষের সাথে মেলামেশা কর, কিন্তু তোমার অন্তর যেন তাদের সাথে কথা না বলে। তাঁর এ কথাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মহান, সন্দেহ নেই।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন