হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “রোজ হাশরে আল্লাহ যখন কবরবাসীদিগকে উঠাইবেন, তখন রেদওয়ানকে নির্দেশ দিবেন যে, “হে রেদওয়ান! আমি রোযাদারদিগকে তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় উত্থিত করিয়াছি। অতএব তাহাদের জন্য বেহেশ্তী বালক ও খাদেমদিগকে আকাঙ্ক্ষিত দ্রব্য খাদ্য ও পানীয় উপস্থিত কর।" তখনই রেদওয়ান বেহেশ্তী, বালক ও খাদেমদিগকে নূরের তব্ক্কা লইয়া হাজির হইতে হুকুম করিবেন। তৎক্ষণাত বেহেশ্তী ফল-ফলারি, আহার্য ও পানীয় লইয়া তাহার নিকট এত বালক ও খাদেম উপস্থিত হইবে যে, তাহাদের সংখ্যা আকাশের তারা, বৃক্ষরাজীর পাতা, বালূ-কণা ও পানির বিন্দু হইতেও সমধিক হইবে। তাহারা রোযাদারদিগকে পানাহার করাইবে এবং বলিবে, “আজ পূর্ব প্রেরিত বস্তুর প্রতিদান নিঃসঙ্কোচে পানাহার করুন।
হে আল্লাহ! আমাদিগকেও এই শ্রেণীর আহার্য দান করুন।"
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “রোজ কিয়ামতে কবর হইতে উত্থিত হইবার পর তিন শ্রেণীর লোকের সহিত ফেরেশতাগণ করমর্দন করিবে। যাহারা আল্লাহর পথে শহীদ হইয়াছে, যাহারা রমজান মাসে রোযা রাখিয়াছে এবং যাহারা আরাফাতের দিন রোযা রাখিয়াছে।"
হযরত আয়েশা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “বেহেশতের মধ্যে হীরা, জাওহার, মণি-মুক্তা ও সোনা-রূপার তৈরী একটি মহল আছে।” আমি আরজ করিলাম, “হে আল্লাহর রাসূল! ইহা কাহার জন্য?” তিনি বলিলেন, “যাহারা আরাফাতের দিন রোযা রাখিয়াছে।” তিনি আরও বলিলেন, “হে আয়েশা! আরাফাতের দিন ও জুময়ার দিন আল্লাহর নিকট অত্যন্ত প্রিয়। সেইদিন আল্লাহ পাকের অগণিত রহমত নাযিল হয়।
যে লোক আরাফার দিন রোযা রাখে, আল্লাহ পাক তাহার জন্য ত্রিশটি রহমতের দুয়ার খুলিয়া দেন। সে ইফ্তার ও পানি পান করিবার সময় তাহার শরীরের প্রত্যেক শিরা-উপশিরা ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া বলে, “হে আল্লাহ! সূর্য উদয় পর্যন্ত তাহার উপর তোমার করুণা বর্ষণ কর।”
অপর এক বর্ণনায় আছে যে, রোযাদার কবর হইতে উত্থিত হইবার সময় নিজ মুখে রোযার সুগন্ধ পাইবে। তাহাদের সামনে মজাদার আহার্য ও মিঠা পানি হাজির করিয়া বলা হইবে, “আপনারা আজ' পরম সুখে পানাহার করিয়া স্বীয় ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণ করুন। কেননা অপরাপর মানুষ যখন পরম তৃপ্তির আহার্য গ্রহণে মত্ত ছিল, তখন আপনারা ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত ছিলেন। আজ আপনারা সুখ অনুভব করুন।” অন্যান্য মানুষ যখন হিসাব-নিকাশ দিতে ব্যস্ত থাকিবে তখন তাহারা পানাহার সমাপন করিয়া সুখ লাভ করিতে থাকিবে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, “দশ শ্রেণীর লোকের শরীর কবরে পচিবে না; যথা-(১) শহীদ, (২) হাক্কানী আলেম, (৩) গাজী বা ধর্ম যোদ্ধা, (৪) কোরআনে হাফেজ, (৫) মোয়াজ্জিন, (৬) ইনসাফগার রাজা-বাদশাহ, (৭) প্রসবকালীন মৃত্যু বরণকারী রমণী, (৮) যাহাকে অন্যায়ভাবে নিধন করা হইয়াছে, (৯) জুময়ার দিনে বা রাত্রে মৃত ব্যক্তি, (১০) আলাফাতের দিনে মৃত ব্যক্তি।
আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন, “রোজ কিয়ামতে সকলেই সদ্য প্রসূত শিশুর ন্যায় নগ্নদেহে হাশর ময়দানে উত্থিত হইবে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) আরজ করিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! পুরুষ লোকেরাও কি স্ত্রীলোকদের সহিত একত্রেই থাকিবে?" হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, হ্যাঁ, মিলিয়া মিশিয়াই থাকিবে।" হযরত আয়েশা (রাঃ) আক্ষেপ করিয়া বলিলেন, “হায়! লজ্জা ও অপমানের অবতারণা হইবে, যখন একে অন্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবে।”
তখন আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বিবি আয়েশার (রাঃ) কাঁধে মৃদু আঘাত করিয়া বলিলেন, “হে ছিদ্দিক নন্দিনী! সেদিন একে অন্যের প্রতি কুদৃষ্টি নিক্ষেপ করিবে না, কেননা সকলেই স্বীয় চিন্তায় নিমগ্ন থাকিবে এবং উর্ধ্বনেত্রে আকাশের দিকে চাহিয়া থাকিবে। তাহাদের মধ্যে কেহ পা পর্যন্ত, কেহ হাঁটু পর্যন্ত, কেহ উদর পর্যন্ত, কেহ বক্ষদেশ পর্যন্ত, কেহ গলা পর্যন্ত, কেহ তার অধিক ঘর্ম-স্রোতে সাঁতার কাটিতে থাকিবে। সেদিন এমন কোন মর্যাদাশীল ফেরেশতা, নবী ও রাসূল অথবা শহীদ কবর হইতে উত্থিত হইবে না যাহারা হিসাব-নিকাশ দেওয়া ও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দাঁড়াইয়া থাকিবার ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত ও পেরেশান হইবে না।"
হযরত আয়েশা (রাঃ) আরও আরজ করিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল ।! কেহ কি সেদিন আরোহীরূপে হাশর মাঠে উত্থিত হইবে।” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হ্যাঁ অবশ্যই। নবী ও রাসূল এবং তাহাদের পরিবার-পরিজন ছাড়াও রজব, সাবান ও রমযান মাসের রোযাদারগণ আরোহী হইয়া হাশর ময়দানে উঠিবে।”
মা আয়েশা (রাঃ) পুনরায় আরজ করিলেন, “কেহ কি সেদিন আত্মতৃপ্তি সহকারে উপস্থিত হইবে?” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হ্যাঁ, নবী ও রাসূল এবং তাহাদের পরিবার-পরিজন ব্যতীত রজব, সাবান ও রমজান মাসের রোযাদারগণও পরিতৃপ্ত হইয়া হাশর মাঠে সমবেত হইবে, তাহারা ক্ষুধা-তৃষ্ণা হইতে মুক্ত থাকিবে এবং অপর সকলেই ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হইবে।”
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, রোজ কিয়ামতে ফেরেশতাগণ লোকদিগকে বাইতুল মোকাদ্দাসের নিকটবর্তী ‘সাহেরা' নামক স্থানে জড়ো করিতে নিবেন। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “ফাইন্নামা হিয়া যাজ্বরাতুওঁ ওয়াহিদাতুন ফাইজা হুম বিছাহিরাহ্” অর্থাৎ দ্বিতীয়বার সিঙ্গায় ফুৎকার এক ধমক বা শাসানো ধ্বনি ভিন্ন কিছু নহে।
অতঃপর তাহারা সাহেরা বা সমতল ময়দানে জড়ো হইবে। আরও বর্ণিত আছে যে, “কিয়ামতের মাঠে মানুষের সারি হইবে একশত বিশটি। প্রত্যেক সারি লম্বায় চল্লিশ হাজার ও প্রস্থে এক হাজার বৎসরের পথের সমান হইবে। তন্মধ্যে মাত্র তিনটি সারি হইবে মুমিন বান্দাদের। বাকী অন্যান্য সারিতে বেদ্বীন কাফেরগণ থাকিবে।”
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে, জনাব নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “আমার উম্মতগণ একশত বিশ সারিতে বিভক্ত হইবে।” এই বর্ণনাই সত্য। মুমিনগণের হস্ত-পদ ও মুখমন্ডল অতিশয় উজ্জ্বল ও ফর্সা হইবে এবং কাফেরদের মুখমন্ডল বিশ্রী ও কৃষ্ণবর্ণ হইবে। তাহারা শৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া শয়তানের সহিত শাস্তি ভোগ করিবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন