পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
মৃত্যুরহস্য
জেনে রাখুন, ধাতব পদার্থ, উদ্ভিদ, পশু ও মানুষ এ সব স্তরের সৃষ্টির চার ধরনের ধারক ও ক্রিয়া-প্রক্রিয়া রয়েছে। যদিও আপাত দৃষ্টিতে কথাটি নিঃসংশয় মনে হয় না। মৌল উপাদানগুলো (আগুন, বায়ু, পানি ও মাটি) যখন অণু-পরমাণু আকারে সংঘাত মিলনের ব্রতে নিরত থাকে, তখন তা থেকে কয়েক ধরনের যৌগিক বস্তু সৃষ্টি হয়। যেমন দুই উপাদানের মিশ্রণজাত তাপ বা বাষ্প, ধূলা, ধোঁয়া, সতেজ মাটি, চাষের জমীন, অংগার, শিখা ইত্যাদি। তিন উপাদানের মিশ্রণজাত যেমন, ছানা মাটির বস্তু, কাদা মাটি ইত্যাদি। তেমনি চার উপাদানের মিশ্রণজাত বস্তুও রয়েছে।
এ সব জিনিসের বৈশিষ্ট্য বলতে এর অন্তর্ভুক্ত উপাদানেরই বিশেষত্ব বৈ নয়। মিশ্রিত উপাদানের বাইর থেকে কোন গুণ এতে আসতে পারে না, ভেতরেও নতুন কোন গুণের উদ্ভব হতে পারে না। এ ধরনের বস্তুকে শূন্যাবস্থার বা প্রাথমিক সৃষ্টি বলা হয়। (বাষ্প, পানি ও আগুনের এবং ধূলা, মাটি ও বায়ুর মিশ্রণজাত সৃষ্টিগুলো তাদের অন্তর্ভুক্ত।)
মৃত্যুরহস্য
জেনে রাখুন, ধাতব পদার্থ, উদ্ভিদ, পশু ও মানুষ এ সব স্তরের সৃষ্টির চার ধরনের ধারক ও ক্রিয়া-প্রক্রিয়া রয়েছে। যদিও আপাত দৃষ্টিতে কথাটি নিঃসংশয় মনে হয় না। মৌল উপাদানগুলো (আগুন, বায়ু, পানি ও মাটি) যখন অণু-পরমাণু আকারে সংঘাত মিলনের ব্রতে নিরত থাকে, তখন তা থেকে কয়েক ধরনের যৌগিক বস্তু সৃষ্টি হয়। যেমন দুই উপাদানের মিশ্রণজাত তাপ বা বাষ্প, ধূলা, ধোঁয়া, সতেজ মাটি, চাষের জমীন, অংগার, শিখা ইত্যাদি। তিন উপাদানের মিশ্রণজাত যেমন, ছানা মাটির বস্তু, কাদা মাটি ইত্যাদি। তেমনি চার উপাদানের মিশ্রণজাত বস্তুও রয়েছে।
এ সব জিনিসের বৈশিষ্ট্য বলতে এর অন্তর্ভুক্ত উপাদানেরই বিশেষত্ব বৈ নয়। মিশ্রিত উপাদানের বাইর থেকে কোন গুণ এতে আসতে পারে না, ভেতরেও নতুন কোন গুণের উদ্ভব হতে পারে না। এ ধরনের বস্তুকে শূন্যাবস্থার বা প্রাথমিক সৃষ্টি বলা হয়। (বাষ্প, পানি ও আগুনের এবং ধূলা, মাটি ও বায়ুর মিশ্রণজাত সৃষ্টিগুলো তাদের অন্তর্ভুক্ত।)
এ স্তরের পরে আসে ধাতব যুগ। উক্ত মিশ্রণজাত বস্তুগুলোকে অনুগত বাহক বানিয়ে খনিজ পদার্থের আবির্ভাব ঘটেছে। ধারকের বৈশিষ্ট্যই তার বৈশিষ্ট্য। ধারকের প্রকৃতিকে সে নিজের ভেতর সুরক্ষিত রাখে।
তৃতীয় স্তরে আসে উদ্ভিদ যুগ। ধাতব যুগের ওপর আরোহণ করেই তার আগমন। তবে তার শক্তি এত বেশী যে, অংশের উপাদান ও প্রাথমিক সৃষ্টিগুলোকে বদলে সে নিজ প্রকৃতিতে গড়ে তোলে। ফলে সে সব অংশগত উপাদানাদির প্রয়োজনীয় প্রভাব প্রক্রিয়া প্রকৃতিগতভাবে বিদ্যমান থাকে।
এরপর আসে প্রাণীর স্তর। এ স্তরে বস্তুর ভেতর প্রকৃতিগত প্রাণের (খাদ্যগ্রহণ ও বর্ধন শক্তি) উন্নয়ন দেখা দেয় এবং প্রকৃতিগত প্রাণকে বাহন করেই জৈবিক প্রাণের আগমন ঘটে। এ স্তর প্রকৃতিগত প্রাণে অনুভূতি ও ইচ্ছার সংযোগ ঘটায়। ফলে নিজ আকাঙ্ক্ষিত ও উপকারী জিনিস অর্জনের জন্য প্রাণীর উদ্যোগী ও প্রয়াসী হয়। তেমনি ক্ষতিকারক ব্যাপার থেকে তারা দূরে থাকে।
অবশেষে আসে মানুষের স্তর। জৈবিক প্রাণকে বাহন করে এর আগমন ঘটে। এ স্তরে জৈবিক প্রাণের সাথে বিচার-বুদ্ধিরও সংযোগ ঘটে। তাই এ প্রাণ চরিত্র ও দক্ষতার ওপর জোর দেয়। মানে, ভাল হতে ও ভাল কাজ করতে বলে এবং মন্দ হতে ও মন্দ কাজ করতে নিষেধ করে। এ উদ্দেশ্যে সে নৈতিক অনুভূতি ও চিন্তাশক্তি চাংগা রাখে। এবং তাদের উত্তম নীতি নিয়মের আওতায় সুবিন্যস্ত করে নেয়। এমন কি সেটাকে ঊর্ধ জগত থেকে পাবার সব কিছুর যোগ্য ধারক রূপে গড়ে তোলে।
আপাত দৃষ্টিতে এ কথাগুলো যতই সংশয়মূলক মনে হোক না কেন, ভেবে দেখলে বুঝতে পাবেন, প্রতিটি প্রভাব ও প্রতিক্রিয়াকে তার নিজ স্বতন্ত্র উৎসের সাথে সম্পৃক্ত করতে হয়। তেমনি প্রত্যেক ধরনের সৃষ্টিকে তার নিজস্ব বাহনে বসিয়ে নিতে হয়। এটাও জানা প্রয়োজন, প্রতিটি ধরনের জন্য একটি ভিত্তিমূল থাকা দরকার। তার সাথে যেন সৃষ্টিটি স্থির থাকতে পারে। ধারকটির অবশ্যই ধরনটির উপযোগী হতে হবে। ধরনের ধারকটির প্রয়োজনীয়তা ঠিক মোমের পুতুলের যে ভাবে মোম প্রয়োজন তেমনি।
সুতরাং যে ব্যক্তি বলে, মানবের প্রকৃতিগত প্রাণ মৃত্যুর পর মানব দেহ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যায়, সে ভুল বলে। হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে, মানব প্রকৃতির দুটো উপাদান থাকে (যার ভিত্তিতে তার সৃষ্টি) একটি মৌলিক। সেটাকে প্রকৃতিগত প্রাণ বলে। দেহের সাথে তার যোগ প্রত্যক্ষ। দ্বিতীয় উপাদানটি কৃত্রিম। সেটাকে জড়দেহ বলে (তার সাথে থাকে পরোক্ষ সম্পর্ক)। তাই মানুষ যখন মারা যায়, তখন জড় দেহ বিচ্ছিন্ন হয় বটে, তাতে প্রকৃতিগত প্রাণের কোন ক্ষতি হয় না। বরং প্রকৃতিগত প্রাণের সাথে জড় দেহের সম্পর্ক থেকে যায় অবিচ্ছেদ্য।
একজন সুদক্ষ শিল্পীর হাত কেটে ফেললেও তার শিল্প ক্ষমতা যেমন যথারীতি অক্ষুণ্ন থাকে এও তেমনি ব্যাপার। তেমনি কোন দ্রুত গতির মানুষের পা কেটে ফেললে কিংবা কোন দৃষ্টি ও শ্রবণ শক্তির মানুষের চোখ ও কান হারালে তার চলার, শোনার ও দেখার শক্তি বহাল থেকে যায়, প্রকৃতিগত প্রাণ-মনেরও ঠিক সেই অবস্থা। উপাদান ছাড়াই শুধু প্রকৃতিগত প্রাণের সাথেই সে সম্পৃক্ত থাকতে পারে।
জানা দরকার, মানুষের কার্যকলাপ কয়েক ধরনের হয়। কিছু কাজ তারা মনের ইচ্ছায় করে থাকে। যদি তাকে বাধা না দেয়া হয়, তা হলে সে তা কার্যকরী করবে এবং খেয়াল-খুশীর বিরুদ্ধে সে কখনও যাবে না। কিছু কাজ তারা প্রকৃতিগত প্রয়োজনের তাগাদায় কিংবা বাইরের কোন প্রভাবে পড়ে করে থাকে। যেমন, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ইত্যাদি। যখন সে সবের কারণ চলে যায়, তখন তা করার ইচ্ছাও চলে যায়। অবশ্য সেগুলোকে স্থায়ী অভ্যেসে পরিণত করে নিলে অন্য কথা।
দেখুন, এরূপ অনেক লোক আছে যারা কোন বিশেষ ব্যক্তি কিংবা কবিত্ব অথবা বিশেষ কোন জিনেসের প্রতি আসক্ত হয়। তখন তারা ভালবাসার ব্যক্তি বা বস্তুর অনুকূল পোশাক-আশাক ও চাল-চলন অনুসরণ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু যদি তারা স্বাভাবিক অবস্থায় থাকত, তা হলে তা বর্জন করে চললে তাদের কোনই অসুবিধা হত না। কিছু লোক অবশ্য এমন হয় যে, অন্তর থেকেই সে অনুরূপ পোশাক-আশাক ও চাল-চলন পসন্দ করে। তখন তাকে স্বাভাবিক অবস্থায়ও সেই পোশাক ও ঢং অনুসরণ করতে দেখা যাবে।
তেমনি কিছুলোক এরূপ স্মরণ শক্তি রাখে যে, নানা ধরনের কথা-বার্তার ভেতর থেকে সে তার প্রয়োজনীয় কথাগুলো বেছে নিয়ে স্মরণ রাখে। তার দৃষ্টি থাকে আলোচনার দিকে, ফলাফলের দিকে নয়। বাক চাতুর্যই তাকে আকৃষ্ট করে এবং বাক চাতুর্যের দক্ষতা কোত্থেকে এল তা নিয়ে তার ভাবনা নেই। এক ধরনের বেখেয়াল লোক এমন থাকে যে, মূল কথা ছেড়ে আজে বাজে কথায় ডুবে থাকে। তার নজরে কারণ আসে না, আসে শুধু কাজ। ফলে কাজের প্রাণ সম্পর্কে উদাসীন থেকে কাজের রূপই তার স্মরণে রাখে।
জেনে রাখুন, যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার জড় দেহটি পচে-গলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু তার প্রকৃতিগত প্রাণ জৈবিক প্রাণের সাথে সংযোগ রাখে। তবে তার ভেতর (পার্থিব প্রয়োজনে) যে বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল, তা থাকে না। ফলে তার উদ্দেশ্যমূলক কাজ ছাড়া পার্থিব প্রয়োজনে যেগুলো করতে হত, তা আর প্রকাশ পায় না। শুধু যে সব উদ্দেশ্যমূলক নৈতিক কাজ তার ব্যক্তিত্বের প্রভাবে দেখা দিত, সেগুলোই তার আসল প্রাণের সাথে থেকে যায়। তখন তার জীবনে বিবেক প্রাধান্য পায় ও রিপু অবদমিত হয়। তারপর যখন ঊর্ধতন জগৎ থেকে তার অন্তরে হাযিরাতুল কুদুস এবং তার সুরক্ষিত কৃতকার্যের আলোকপাত ঘটে, তখন তার বিবেক হয় দুঃখ পায়, নয় আনন্দ লাভ করে।
এটাও জানা দরকার, যখন বিবেক (পার্থিব জীবনে) রিপুর সাথে মিলে-মিশে সমঝোতা করে চলে, তার কিছু না কিছু প্রভাব বিবেকে ঢুকে যায় এবং বিবেককে তা মেনে চলতে হয়। কিন্তু সব চাইতে ক্ষতিকর ও খারাপ ব্যাপার হল এই, বিবেকে তার উদ্দেশ্য ও পরিণতির বিপরীত অভ্যেস ও অবস্থার সৃষ্টি হওয়া। তেমনি সব চাইতে উত্তম ও কল্যাণকর ব্যাপার হল এই, বিবেকে তার অভ্যেস ও অনুকূল অবস্থাকে বহাল তবিয়তে কায়েম রাখা।
মোট কথা, খারাপ ব্যাপারের আরেক দিক হল,অন্তরে সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির এরূপ মায়া হওয়া যে, দুটি ছাড়া জীবনে অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে বলে মনে না করা। দ্বিতীয় দিক হল, অন্তরে এমন সব সাধারণ খারাপ অভ্যেস ও অবস্থঅ মুদ্রিত হয়ে যাওয়া যা মানুষকে ধার্মিক ও ভাল হওয়া থেকে সরিয়ে রাখে। তৃতীয় দিক হল এই, অন্তরকে এরূপ অপবিত্র ও আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন রাখা যে, না কখনও সে আল্লাহকে জানতে চাইবে, না তাঁর সামনে সবিনয়ে আনত থাকবে। মোট কথা অন্তরে পবিত্রতা ও কল্যাণময়তার বিপরীত কিছু সৃষ্টি হতে দেয়া। চতুর্থ ব্যাপার এই, অন্তরের গতি সত্যের সহায়তা ও আল্লাহ-রাসূলের নির্দেশকে মর্যাদা দান এবং সাধারণ কল্যাণ প্রতিষ্ঠার কাজে ঊর্ধ্বতন জগতের কার্যক্রমের বিরোধী হওয়া। এমন কি তার ফলে তার উপর উর্ধ্বতম জগতের শত্রুতা ও লা’নত আসে।
মোট কথা, ভাল দিকের ভেতর একটি হল এই, এরূপ ভাল কাজ করা যাতে অন্তরের পবিত্রতা ও আল্লাহর সকাশে বিনয় অর্জিত হয়। এমন কি ফেরেশতাদের অবস্থা যেন স্মরণে আসে। তা ছাড়া এমন সব ধর্মীয় ধ্যান-ধারণার দিকে যেন খেয়াল যায় যাতে মানুষ শুধু পার্থিব জীবন নিয়েই তৃপ্ত না থাকে। দ্বিতীয় দিক হল এই, মানুষটির যেন ধার্মিকতা ও ন্যায়পরায়ণতার পুতুল ও নম্র-দয়ার্দ্র অন্তরের হয়ে যায়। তৃতীয় কথা হল, মানুষ যেন এরূপ পবিত্র থাকে যাতে করে ঊর্ধ্বতন জগতের দোয়া এবং তাদের সুনজর বহাল থাকে এবং সে যেন কল্যাণের জীবন বিধান অনুসরণ করে চলে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
ষষ্ঠদশ পরিচ্ছেদ
কবরে মানুষের অবস্থা

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন