মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৪

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১৬) কবরে মানুষের অবস্থা



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ১৬)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

কবরে মানুষের অবস্থা 
জেনে রাখুনকবরের অন্তর্বর্তী জীবনে মানুষের বিভিন্ন অবস্থা ও মর্যাদা দেখা দেয়। সে সব অবস্থা ও স্তরের সংখ্যা অশেষ। তবে প্রধান অবস্থা ও স্তর হল চারটি। 
(১) প্রথম শ্রেণীর লোক সচেতন প্রকৃতির হয়ে থাকে। তাদের সামনে তাদের কৃত ভাল বা মন্দ কাজগুলো স্বরূপে দেখা দিলে তথা অনুকূল বা প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হলেই তারা সুখ বা দুঃখ লাভ করে থাকে। নিম্ন আয়াতে সেটাই ইংগিত করা হলঃ 
যাতে কাউকে বলতে না হয়- হায় আফসোস! আমি আল্লাহর প্রতি (আমার কর্তব্যে) অবহেলা করেছিলাম, আর আমি তো ঠাট্টা বিদ্রূপকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।(সূরা যুমারঃ আয়াত ৫৬)
আমি এমন এক দল আল্লাহর ওলী দেখেছিযাদের মন ঠিক শান্ত পানিপূর্ণ পুকুরের মতই প্রশান্ত। বাতাসে সে পানিতে ঢেউ খেলে না। তাই ঠিক দুপুরে মধ্যাহ্ন সূর্যের আলো যখন তার বুকে পড়েতখন সেটা এক খণ্ড নূরের টুকরার মতই হয়ে যায়। তাঁদের সে নূর হল পুণ্য কাজ কিংবা পুণ্য স্মৃতি (আল্লাহর ধ্যান) অথবা আল্লাহর রহমতের নূর। 

(২) দ্বিতীয় ধরনের লোক তাদেরই কাছাকাছি হয়ে থাকে। কিন্তু তারা স্বাভাবিক নিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকে এবং যা কিছু স্বপ্নেই পেয়ে থাকে। স্বপ্নে আমরা স্বভাবতঃ তা-ই দেখিযা আমাদের মিশ্র অনুভূতিতে মওজুদ তাকে। সজাগ অবস্থায় সেদিকে খেয়াল যায় না কিংবা মনোযোগ থাকে না। শুধু কতিপয় ধারণা রূপে অন্তরে সেগুলো সঞ্চিত হয়ে থাকে। স্বপ্নে সেগুলোই হুবহু রূপ ধরে আমাদের কাছে ধরা দেয়। যেমনতপ্ত পিত্তের মানুষ স্বপ্নে দেখতে পায়প্রচণ্ড গ্রীস্মে সে এক জংগলে অবস্থান করছে। ভীষণ গরমে হাওয়া বয়ে চলছে। হঠাৎ জংগলে আগুন লেগে গেল। সে আগুন চারদিক থেকে তাকে ঘিরে নিল। সে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছে। পালিয়ে বাঁচার জন্য। কিন্তু পালাবার জায়গা পাচ্ছে না। ফলে সেই আগুনে সে জ্বলে মরছে। 
এভাবে তার ভীষণ কষ্ট ভুগতে হয়। তেমনি সর্দী-কাশীতে আক্রান্ত ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে যেশীতের রাতে সে নৌকায় কোথাও যাচ্ছে। হঠাৎ তুফান এসে তার নৌকা উল্টে ফেলল। তখন সে বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগল। কিন্তু বাঁচতে পারছিল না। ডুবে মরতে বসে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল।

মানুষের ভেতর অনুসন্ধান চালিয়ে আপনি এরূপ বিচিত্র অবস্থার লোক পাবেন যারা নিজ জীবনের বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত ধারণা ও ঘটনা সুখ বা দুঃখের স্বপ্ন রূপে নিদ্রাবস্থায় অর্জন করে। সেগুলো সাধারণত অভিজ্ঞতা অর্জনকারীর ধ্যান-ধারণা ও স্বভাবের অনুকূল হয়ে থাকে। তেমনি দ্বিতীয় ধরনের ব্যক্তির কবর জীবনে পাপ বা পুণ্যের ফল এভাবে স্বপ্নেই লাভ করবে। পার্থক্য শুধু এতটুকুএ এমন এক স্বপ্নকাল বা নিদ্রা যা থেকে মানুষ কেয়ামতের আগে মুক্ত হয় না। স্বপ্নদ্রষ্টা কখনও স্বপ্নে জানতে পায় না যেস্বপ্ন তার বাস্তব নয়শুধুই স্বপ্ন। এও বুঝতে পায় না যেআসলে তার কোন সুখ বা দুঃখ হচ্ছে না। বরং স্বপ্নকেই সে সত্য ভেবে থাকে। এখন যদি তার এ স্বপ্ন কেয়ামতের আগে শেষ না হত অর্থাৎ সে জাগ্রত না হততা হলে বাস্তব যে অন্যকিছু তা সে কোন দিনই জানতে পেত না। সুতরাং কবর জীবনকে স্বপ্ন জীবন না বলে বাস্তব জীবন বলাই অধিক সংগত। 

এ কারণেই হিংস্র প্রকৃতির লোক কবর জীবনে দেখতে পায়তাকে কোন হিংস্র জীব ছিঁড়ে খাচ্ছে। কৃপণরা দেখতে পায়তাদের সাপ-বিচ্ছু দংশন করে চলছে। 
তারপর ঊর্ধতন জগতের জ্ঞান থেকে যারা বঞ্চিত ছিলতারা দেখতে পায়দুফেরেশতা (মুনকার-নাকীর) এসে ঊর্ধতন জগতের তত্ত্ব জিজ্ঞেস করল। তারা প্রশ্ন করছে, ‘তোমার প্রভু কে?’ ‘তোমার দ্বীন কি?’ ‘তোমার রাসূল কে?’ ইত্যাদি। 

(৩) তৃতীয় শ্রেণীর লোকদের ভেতর পশুত্ব ও দেবত্ব দুটোই দুর্বল বলে মরার পর তারা কবর জীবনে নিম্ন স্তরের ফেরেশতাদের সাথে গিয়ে মিলিত হয়। কখনও নিজেদের প্রকৃতিগত ও জন্মগত কারণেকখনও আবার অন্য কোন কারণে তারা সেরূপ করে থাকে। প্রকৃতিগত কারণ হল এইতার দেবত্ব পশুত্বের প্রভাবে কমই আচ্ছন্ন হত। তারা না সে নির্দেশ মানতনা প্রভাব স্বীকার করত। অন্য কারণের একটি হল এইসে ব্যক্তি তার ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা দাবিয়ে রেখেছে ও ভালভাবে এ পথে স্থির রয়েছে। তারপর আত্মিক সাধনা চালিয়ে দেবত্বের জ্যোতি ও ইলহাম অর্জন করেছে। কখনও দেখা যায়নপুংসক ব্যক্তি পুরুষ আকারে জন্ম নিয়েও নারী প্রকৃতি ও স্বভাবের হয়ে থাকে। যদিও শৈশবে পুরুষ ও নারীর বাসনা কামনার স্বাতন্ত্র্য সে উপলব্ধি করে না। কারণসে বয়সটি হল খাওয়া-দাওয়া আর খেলা-ধূলার বয়স। তখন তার সে সবের দিকে খেয়ালই থাকে না। তখন যদি তাকে পুরুষের চাল-চলতে অভ্যস্ত করা হয় এবং নারীর চাল-চলন রোধ করা হয়তা হলে সে ইচ্ছায় হোক কি অনিচ্ছায়পুরুষ স্বভাবেরই হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন সে যুবক হয় এবং নিজ স্বভাবে বেপরোয়া হয়তখন সঠিক ভাবেই সে নারী প্রকৃতির ওপর জমে বসে। ফলে চলনে-বলনেআচার-আচরণে ও ইচ্ছায় অভিলাষে সে পুরোপুরিই নারী হয়ে যায়। এমন কি যৌন ক্ষেত্রেও সে কর্তার ভূমিকা ভুলে কর্মের ভূমিকা পালন করে চলে। এভাবে বেশ কিছুকাল চলার পর দেখা যাবেসে পুরুষের সমাজ ছেড়ে নারী সমাজেই বিচরণ করে ফিরছে। 

ঠিক এ অবস্থাই দাঁড়ায় মানুষের অন্যান্য ক্ষেত্রেও। মানুষ তার পার্থিব জীবনে খাওয়া-পরাবাসনা-কামনা এবং অন্যান্য রীতি-নীতিও প্রয়োজন সম্পাদনে নিয়োজিত থাকে। কিন্তু নিম্ন স্তরের ফেরেশতাদের সাথে তাদের আত্মিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। তাই আকর্ষণও সেদিকে থাকে। যখন সে মরে যায় এবং জড় দেহ থেকে মুক্তি পায়তখন সে সেই মূল স্বভাবে ফিরে যায় এবং ফেরেশতাদের সমাজে গিয়ে ঠাঁই নেয়। তখন তাদেরও ফেরেশতাদের মত ইলহাম হয়। তাদেরও পাখা পালক হয়। হাদীসে আছে, ‘আমি জাফর ইবনে আবু তালিবকে জান্নাতে পাখায় ভর করে ফেরেশতাদের সাথে উড়তে দেখেছি 

তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ কখনও আল্লাহর বাণীকে উচ্চকিত করার কাজে এবং আল্লাহর দলের সহায়তায় নিয়োজিত থাকেন। কখনও বা মানুষের পুণ্যের খেয়াল উদ্রেক করেন। কখনও তাদের কিছু লোকের স্বভাবগত আকাঙ্ক্ষা জাগে দেহ ধারণের। তাই স্বরূপ জগতের দুয়ার খুলে যায়। তখন তার জৈব প্রাণে এক ঐশী শক্তি এসে যায় এবং সেটা একটা জ্যোতির্ময় দেহের অধিকারী হয়। কখনও তাদের কিছু লোক খাওয়া-দাওয়া করতে চায়। তখন তাদের সে ইচ্ছা পূরণের জন্য তারা যা খেতে চায় তার সুব্যবস্থা করা হয়। কুরআন মজীদের নিম্ন আয়াতে তারই ইংগিত দেখতে পাইঃ  
আল্লাহর পথে যারা প্রাণ দিল তাদের মৃত ভেব না। বরং তারা জীবিত। নিজ প্রভুর কাছে তারা রুজী পেয়ে থাকে। আল্লাহদত্ত খোরাক খেয়ে তারা খুশীতে মাতোয়ারা থাকে (
সূরা আলে ইমরানঃ আয়াতঃ ১৬৯)

এ সব শ্রেণী ছাড়া শয়তানের প্রভাবিত শ্রেণীও রয়েছে। তারাও স্বভাবগত কিংবা অন্য কারণে এরূপ খারাপ প্রকৃতির হয় যেতাদের চিন্তা-ভাবনা সর্বদা ন্যায়ের পরিপন্থীসৃষ্টির নিয়ম-শৃঙ্খলা বিরোধী ও সচ্চরিত্রতার অন্তরায় হয়ে থাকে। তারা ইচ্ছা করেই এ ধরনের হীন ও জঘন্য চিন্তা ও অভ্যেস অনুসরণ করে থাকে। তাই আল্লাহর অসন্তোষ ও অভিশাপ তাদের ঘিরে রাখে। তারা মরে গিয়ে শয়তানের দলে মিলিত হয়। তাদের কালো পোশাক পরানো হয় এবং তাদের ইতর কাজ ও স্বভাবগুলো স্বরূপে তাদের সামনে দেখা দেয়। 

প্রথম শ্রেণীর লোকগুলোর অন্তরে আনন্দ থাকে বলে তারা স্বভাবতই তাদের পুরস্কার পেয়ে যায়। দ্বিতীয় শ্রেণী তাদের কৃতকার্যের স্বরূপ ও পরিণতি দেখে দুঃখ ও অনুতাপে দগ্ধ হয় বলে স্বভাবতই শাস্তি ভোগ করে। খোঁজারা যেভাবে নিজেদের মানব সামজের নিকৃষ্টতম পর্যায়ে দেখতে পেয়ে অত্যন্ত মানসিক যাতনা ভুগতে থাকেতা থেকে কোন মতেই অব্যাহতি পায় নাএও তেমনি ব্যাপার। 

শ্রেণী বিন্যাসকারীদের দৃষ্টিতে আরও এক ধরনের লোক রয়েছে। তারা হল সমঝোতাকারীর দল। তাদের ভেতর জৈবিক দিক প্রবল ও আত্মিক দিক দুর্বল থাকে। অধিকাংশ লোকই এ শ্রেণীভুক্ত। তাদের অধিকাংশ কাজই জৈব স্বভাবের হয়ে থাকে। জৈবিক চাহিদা পূরণেই তারা ব্যস্ত থাকে। এ শ্রেণীর লোকের দেহের সাথে প্রাণের সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয় নাবরং বাস্তব সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে চৈন্তিক সম্পর্কটা থেকে যায়। তার প্রবৃত্তি কখনও ভাবতে পারে না যেদেহের সাথে তার সম্পর্কচ্ছেদ ঘটেছে। তাই (মর) দেহটি যদি তার কেটে কুটে টুকরা করা হয় তো ভাবে যেতাকেই তা করা হচ্ছে। তাদের বৈশিষ্ট্য হল এইআন্তরিক ভাবেই তারা দেহগত প্রাণ হয় অর্থাৎ দেহকেই প্রাণ ভেবে থাকে। কিংবা মনে করেদেহছাড়া প্রাণের আলাদা অস্তিত্ব নেই। হয়ত সে বিশেষ সমাজ বা মতাদর্শের আওতায় পড়ে মুখে অন্যরূপ কথা বলে থাকে। 

এ ধরনের লোক মারা গেলে স্বরূপে জগতের হাল্কা জ্যোতি তাদের ওপর দেখা দেয়। তাদের ভেতর দেখা দেয় উদভ্রান্ত খেয়াল ও ধ্যান-ধারণা। এখানে আত্মিক সাধনাকারীদের যে অবস্থা দেখা দেয়তাদেরও ঠিক সেই অবস্থা দেখা দেয়। তাদের কৃত কাজকর্ম কখনও খেয়ালী রূপ নিয়েকখনও স্বরূপ জগতের অন্যান্য বস্তুর মত বাস্তব রূপনিয়ে তাদের সামনে দেখা দেয়। আত্মিক সাধনাকারীদের সামনে যে ভাবে সব কিছু স্বরূপে দেখা দেয়এও তেমনি ব্যাপার। 
এখানে যদি তারা ফেরেশতা সুলভ কাজ করে থাকেতা হলে সেগুলো তাদের ফেরেশতা আকরে দেখানো হয়। তাদের হাতে থাকে নরম রেশমী কাপড়। তাদের সাথে তারা খুব নম্র ও ভদ্রভাবে মিলে-মিলে ও কথা-বার্তা বলে। তাদের জন্য জান্নাতের জানালা খুলে ধরা হয়। তাই তারা জান্নাতের ঘ্রাণ পেতে থাকে। যদি তারা পশু সুলভ খারাপ কাজ করে থাকে ও অভিশপ্ত হয়তা হলে তারা কাজগুলো সে ভয়াবহ ও কুৎসিত ফেরেশতা রূপে দেখতে পাবে। তারা কলো চেহারা নিয়ে বিকট আওয়াজে রূঢ় ভাষায় কথা বলবে। সেখানে যেমন ক্রোধকে হিংস্র জীব ও কাপুরুষতাকে খরগোশ আকারে দেখানো হবেএও তেমনি দেখানো হবে। 
কবর জগতে এমন সব ফেরেশতা রয়েছেন যাদের নিজ নিজ যোগ্যতা অনুসারে কাজে নিয়োজিত রাখা হয়েছে। এ জগতে আগমনকারী মানুষদের শান্তি বা শাস্তি দেবার কাজেও তাদের ব্যবহার করা হয়। সুতরাং শান্তিপ্রাপ্ত কিংবা শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাদের দেখতে পেত না। 
জেনে রাখুনকবর জগত কোন আলাদা জগত নয়। এ জগতেরই পরিশিষ্ট বা শেষাংশ। সেখানে সে কিছু গায়বী খবর জানতে পায় মাত্র। প্রত্যেকের বিশেষ বিশেষ অবস্থা সেখানে প্রকাশ পায়। বিচার জগতের ব্যাপার অন্যরূপ। সেখানে মানুষের ব্যক্তিগত অবস্থা লোপ পেয়ে সকল মানুষের সামগ্রিক অবস্থা প্রকাশ পাবে। অর্থাৎ মানুষের ব্যক্তিগত খুঁটিনাটি কাজগুলোর স্ব স্ব রূপে আত্মপ্রকাশের ব্যাপারটি কবর জীবনেই শেষ হবে। বিচার জীবনে তার কাজের সামগ্রিক বিচার-বিবেচনা হবে। আল্লাহই ভাল জানেন।

পরবর্তী পর্ব
বিচার জগতের তত্ত্বকথা 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...