বিচার জগতের তত্ত্বকথা
জেনে রাখুন, মানব প্রাণের বিশেষ একটি প্রত্যাবর্তন স্থল রয়েছে। লোহাকে যেভাবে চুম্বক টেনে নেয়, তেমনি টেনে নেয় প্রাণকে তার উৎসভূমি। সে জায়গার নাম হল, ‘হাযিরাতুল কুদস’ বা পবিত্র মজলিস। সব প্রাণই দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেখানকার ধারক প্রাণ বা শ্রেষ্ঠতম প্রাণের সাথে মিলিত হয়। রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সে প্রাণের আখ্যা দিয়েছেন বহুমুখী ও বহু ভাষী প্রাণ। এ সমাবেশ স্থলকে স্বরূপ জগত বা উপমা জগত যা ইচ্ছা বলতে পারেন। সেখানে মানব জাতির আদি নকশা বা চিত্র তৈরী হয়। এখানে ব্যক্তি বিশেষের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যমূল রীতি-নীতি ও কার্য-কলাপ লোপ পেয়ে তা মানব জাতির সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যের ও বিধি-বিধানের সাথে একাত্ম হয়। অন্য কথায়, তার জড় বৈশিষ্ট্যের ওপর আত্মিক বৈশিষ্ট্যের বা রূপের ওপর স্বরূপের প্রাধান্য ঘটে এবং সেটাই অবশিষ্ট থাকে।
কথাটির ব্যাখ্যা এই, কিছু ব্যাপার মানুষের নেহাৎ ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যমূলক। সেগুলোই একটি মানুষকে অপর মানুষ থেকে পৃথক করে দেখায়। তেমনি কতকগুলো ব্যাপার সব মানুষের ভেতর সমানে পাওয়া যায়। সুতরাং যে ব্যাপারগুলো সব মানুষের ভেতরই সমভাবে বিদ্যমান, স্বভাবতই সেগুলো মানবের জাতিগত বৈশিষ্ট্য। সেগুলোই হল মানব প্রকৃতি। ‘প্রতিটি মানব শিশু তার প্রকৃতির ধর্ম (ইসলাম) নিয়ে জন্ম নেয় তার মা-বাপ (পরিমণ্ডল) তাকে অন্যান্য ধর্মে দীক্ষা দেয়’ হাদীসটি এ সত্যেরই প্রমাণ দেয়।
জেনে রাখুন, মানব প্রাণের বিশেষ একটি প্রত্যাবর্তন স্থল রয়েছে। লোহাকে যেভাবে চুম্বক টেনে নেয়, তেমনি টেনে নেয় প্রাণকে তার উৎসভূমি। সে জায়গার নাম হল, ‘হাযিরাতুল কুদস’ বা পবিত্র মজলিস। সব প্রাণই দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেখানকার ধারক প্রাণ বা শ্রেষ্ঠতম প্রাণের সাথে মিলিত হয়। রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সে প্রাণের আখ্যা দিয়েছেন বহুমুখী ও বহু ভাষী প্রাণ। এ সমাবেশ স্থলকে স্বরূপ জগত বা উপমা জগত যা ইচ্ছা বলতে পারেন। সেখানে মানব জাতির আদি নকশা বা চিত্র তৈরী হয়। এখানে ব্যক্তি বিশেষের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যমূল রীতি-নীতি ও কার্য-কলাপ লোপ পেয়ে তা মানব জাতির সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যের ও বিধি-বিধানের সাথে একাত্ম হয়। অন্য কথায়, তার জড় বৈশিষ্ট্যের ওপর আত্মিক বৈশিষ্ট্যের বা রূপের ওপর স্বরূপের প্রাধান্য ঘটে এবং সেটাই অবশিষ্ট থাকে।
কথাটির ব্যাখ্যা এই, কিছু ব্যাপার মানুষের নেহাৎ ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যমূলক। সেগুলোই একটি মানুষকে অপর মানুষ থেকে পৃথক করে দেখায়। তেমনি কতকগুলো ব্যাপার সব মানুষের ভেতর সমানে পাওয়া যায়। সুতরাং যে ব্যাপারগুলো সব মানুষের ভেতরই সমভাবে বিদ্যমান, স্বভাবতই সেগুলো মানবের জাতিগত বৈশিষ্ট্য। সেগুলোই হল মানব প্রকৃতি। ‘প্রতিটি মানব শিশু তার প্রকৃতির ধর্ম (ইসলাম) নিয়ে জন্ম নেয় তার মা-বাপ (পরিমণ্ডল) তাকে অন্যান্য ধর্মে দীক্ষা দেয়’ হাদীসটি এ সত্যেরই প্রমাণ দেয়।
সৃষ্টির প্রত্যেকটি জাতির বিশেষ প্রকৃতি বা রীতি-নীতির দুটি দিক রয়েছে। তার একটি দিক হল বাহ্যিক। যেমন তার জন্ম, আকৃতি, বর্ণ পরিমাপ, স্বর ইত্যাদি। যে সত্তার ভেতর যে শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া যাবে, তাকে সেই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ধরা হবে। কারণ, উপাদানে অভাব বা ত্রুটি না থাকলে শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্য ও চাহিদা মতেই সৃষ্টিটি গড়ে উঠবে। যেমন, মানুষ মাত্রেই সরল আকৃতির, বাকসম্পন্ন ও মসৃণ ত্বকবিশিষ্ট হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে ঘোড়ার বাঁকা গড়ন, হ্রেষারব, রোমশ চর্ম ইত্যাকার বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হয়।
এ শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্য তার অন্তর্ভুক্ত কোন সত্তায়ই অবর্তমান হতে পারে না। হতে পারে যদি ভেতর বা বাইরের কোন কারণ তার প্রকৃতি বদলে দেয়। প্রতিটি শ্রেণীর রীতি-নীতিও ভিন্ন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না, মধুমক্ষিকাকে আল্লাহ কিরূপ দিব্যজ্ঞান দিয়েছেন যে, বিভিন্ন গাছের ফল-ফুল থেকে সে খুঁজে খুঁজে মধু আহরণ করে, সুনিপুণ ভাবে ঘর তৈরি করে, ঘরকেই আবার মধুর আকরে পরিণত করে?
পাখীদের দেখুন। আল্লাহ তাদের সহজাত শিক্ষা দিলেন পুং পাখী স্ত্রী পাখীর প্রতি আসক্ত হবে এবং জোড়া মিলে বাসা বানাবে। সেখানে ডিম দেবে। ডিম থেকে বাচ্চা হবে। বাচ্চাকে যথাযথ ভাবে তারা লালন-পালন করবে। বাচ্চা বড় হলে তাদের বাপ-মা শিখিয়ে দেয়, কোথায় পানি পাবে আর কোথায় পাবে খাদ্য। কি ভাবে শত্রু থেকে বাঁচতে হবে তাও শিখিয়ে দেয়। শিকায় কিভাবে বিড়াল আর শিকারী থেকে পালাতে হবে সে পদ্ধতি। কল্যাণ কোন পথে আসবে এবং নিজ জাতি ও মানব জাতির সৃষ্ট অকল্যাণ থেকে বাঁচার উপায় কি, সবই সবিস্তারে বুঝিয়ে দেয়। কোন বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন লোক কি বলতে পারবে, এ সব বিধি-বিধান জাতিগত চাহিদার অনুকূল নয় কিংবা কোন সম্পর্ক নেই এ সবের সেই পাখিকুলের সাথে? জানা দরকার, ব্যক্তি সত্তার সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে জাতিগত বা শ্রেণীগত এ সহজাত বিধানের পূর্ণ আনুকূল্যের ভেতর। তাই শ্রেণীগত রীতি-নীতির বিরোধিতা করা কোন ব্যক্তি সত্তার জন্যই কল্যাণকর নয়। এ জাতিগত বিধানের তারতম্যের কারণেই সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের প্রশ্নে ব্যক্তি সত্তার ক্রিয়া-কলাপে পার্থক্য দেখা দেয়। যতক্ষণ ব্যক্তি তার শ্রেণীগত রীতির ওপর বহাল থাকে, ততক্ষণ তার কোনই দুর্ভোগ আসে না। কিন্তু বাইরের প্রভাবে যখনই ব্যক্তি জাতীয় স্বভাবের বাইরে চলে যায়, দুর্ভোগ তার জন্য অপরিহার্য হয়। এটা যেন ঠিক মানুষের কোন অংগ-প্রত্যংগ বাইরের কোন আঘাত পেয়ে পংগু বা অচল হয়ে গেল। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এ হাদীসটি তারই ইংগিত দেয়ঃ
“প্রতিটি মানব শিশু নিজ প্রকৃতি (ইসলাম) নিয়ে জন্মে। তার বাপ-মা তাকে পরে ইহুদী, নাসারা বা মাজুসী করে গড়ে তোলে”।
এ শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্য তার অন্তর্ভুক্ত কোন সত্তায়ই অবর্তমান হতে পারে না। হতে পারে যদি ভেতর বা বাইরের কোন কারণ তার প্রকৃতি বদলে দেয়। প্রতিটি শ্রেণীর রীতি-নীতিও ভিন্ন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না, মধুমক্ষিকাকে আল্লাহ কিরূপ দিব্যজ্ঞান দিয়েছেন যে, বিভিন্ন গাছের ফল-ফুল থেকে সে খুঁজে খুঁজে মধু আহরণ করে, সুনিপুণ ভাবে ঘর তৈরি করে, ঘরকেই আবার মধুর আকরে পরিণত করে?
পাখীদের দেখুন। আল্লাহ তাদের সহজাত শিক্ষা দিলেন পুং পাখী স্ত্রী পাখীর প্রতি আসক্ত হবে এবং জোড়া মিলে বাসা বানাবে। সেখানে ডিম দেবে। ডিম থেকে বাচ্চা হবে। বাচ্চাকে যথাযথ ভাবে তারা লালন-পালন করবে। বাচ্চা বড় হলে তাদের বাপ-মা শিখিয়ে দেয়, কোথায় পানি পাবে আর কোথায় পাবে খাদ্য। কি ভাবে শত্রু থেকে বাঁচতে হবে তাও শিখিয়ে দেয়। শিকায় কিভাবে বিড়াল আর শিকারী থেকে পালাতে হবে সে পদ্ধতি। কল্যাণ কোন পথে আসবে এবং নিজ জাতি ও মানব জাতির সৃষ্ট অকল্যাণ থেকে বাঁচার উপায় কি, সবই সবিস্তারে বুঝিয়ে দেয়। কোন বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন লোক কি বলতে পারবে, এ সব বিধি-বিধান জাতিগত চাহিদার অনুকূল নয় কিংবা কোন সম্পর্ক নেই এ সবের সেই পাখিকুলের সাথে? জানা দরকার, ব্যক্তি সত্তার সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে জাতিগত বা শ্রেণীগত এ সহজাত বিধানের পূর্ণ আনুকূল্যের ভেতর। তাই শ্রেণীগত রীতি-নীতির বিরোধিতা করা কোন ব্যক্তি সত্তার জন্যই কল্যাণকর নয়। এ জাতিগত বিধানের তারতম্যের কারণেই সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের প্রশ্নে ব্যক্তি সত্তার ক্রিয়া-কলাপে পার্থক্য দেখা দেয়। যতক্ষণ ব্যক্তি তার শ্রেণীগত রীতির ওপর বহাল থাকে, ততক্ষণ তার কোনই দুর্ভোগ আসে না। কিন্তু বাইরের প্রভাবে যখনই ব্যক্তি জাতীয় স্বভাবের বাইরে চলে যায়, দুর্ভোগ তার জন্য অপরিহার্য হয়। এটা যেন ঠিক মানুষের কোন অংগ-প্রত্যংগ বাইরের কোন আঘাত পেয়ে পংগু বা অচল হয়ে গেল। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এ হাদীসটি তারই ইংগিত দেয়ঃ
“প্রতিটি মানব শিশু নিজ প্রকৃতি (ইসলাম) নিয়ে জন্মে। তার বাপ-মা তাকে পরে ইহুদী, নাসারা বা মাজুসী করে গড়ে তোলে”।
জানা দরকার, মানব প্রাণের পবিত্র দরবারে (হাযিরাতুল কুদস) উপনীত হবার দুটো পদ্ধতি রয়েছে। কোন প্রাণ নিজ সাহস ও দিব্য সৃষ্টির বদৌলতে সরাসরি সেখানে পৌঁছে। কোন প্রাণকে পুরস্কার বা শাস্তিদানের জন্য সেখানে রূপ দিয়ে নেয়া হয়। সাহস ও দিব্যদৃষ্টি নিয়ে পৌঁছার অর্থ হল এই, যে ব্যক্তি জৈবিক অনাচার ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত রয়েছে, তার প্রাণ সরাসরি পবিত্র দরবারে পৌঁছে যায়। তখন সেখানকার কিছু কিছু ব্যাপার সে জানতেও পায়। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এ হাদীস তার ইংগিত দেয়ঃ
“আদম ও মূসা নিজ প্রভুর দরবারে উপস্থিত রয়েছেন”।
এ ছাড়া বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তাঁর কয়েকটি হাদীসেই বলা হয়েছেঃ
“পুণ্যবানদের প্রাণ শ্রেষ্ঠতম প্রাণের (রূহে আজম) পাশে সমবেত হয়”। দ্বিতীয় ধরনের উপনীত হবার ব্যাপারটি হল এই, কেয়ামতের দিন আবার মানব দেহকে প্রাণ দান করে উত্থিত করা হবে। এটা কোন নতুন জীবন নয়। আগের জীবনের এটা উপসংহার মাত্র। বেশি খেয়ে কারো বদ হজম হলে যেমন অসুস্থতার পর নতুন স্বাস্থ্য ফিরে পায়, এও তেমনি ব্যাপার। যদি তা না হত, তা হলে ভিন্ন মানুষ হয়ে যেত। ফলে মৃত্যুপূর্ব মানুষটির জন্য মৃত্যুপরবর্তী নতুন মানুষটির কর্মফল ভোগ সংগত হত না।
বাইরে আমরা যে সব বস্তু দেখছি তার অনেকটাই স্বপ্নে দেখা বস্তুর মত। বস্তু সত্তার ধারণাটি রূপ নিয়ে ধরা দেয়। যেমন হযরত দাউদের (আঃ) কাছে ফেরেশতা ঝগড়ারত অবস্থায় এসে বিচার প্রার্থী হলেন। দাউদ (আঃ) সংগে সংগে বুঝে ফেললেন, উরিয়ার স্ত্রী বিচারের তিনি যে ভুল করেছেন, সেটাকেই বস্তুরূপ দিয়ে ফেরেশতারা তাঁর সামনে তুলে ধরছেন।–[এ ঘটনাটির বিশুদ্ধতা যদিও প্রশ্নাতীত নহে, তথাপি কোন কিছু বুঝাবার জন্য উপমা হিসেবে ব্যবহার করা আপত্তিকর হতে পারে না।]
অমনি তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন। এভাবে (শবে মে’রাজ) মহানবীর সামনে ফেরেশতারা এক পেয়ালা দুধ ও এক পেয়ালা শরাব পেশ করলেন। তিনি দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করে শরাবের পেয়ালা প্রত্যাখ্যান করলেন। এখানে তাঁর উম্মতের জন্য দুধকে বিবেক (হেদায়েত) ও শরাবকে রিপুর (গোমরাহীর) প্রতীক হিসাবে উপস্থিত করা হল। দুধ গ্রহণ করে তিনি পুণ্যবান উম্মতের হেদায়েত লাভের ইংগিত দিলেন। তেমনি মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বপ্নে দেখলেন, তিনি হযরত আবু বকর (রা.) ও উমরকে (র.) নিয়ে একটি কূপের পাড়ে বসে আছেন এবং হযরত উসমান (রা.) পৃথক হয়ে অন্যত্র বসেছেন। এটা ছিল তাঁদের দাফন হবার বাস্তব রূপ। তাঁদের তিন জন একই স্থানে ও উসমান (রা.) অন্যস্থানে দাফন হবেন বলে জানানো হল। হযরত দাউদ ইবনুল মুসাইয়েবও মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বপ্নের এই ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এ থেকে আরও জেনে নিন, শেষ বিচারে অনেক ব্যাপারই এ ধরনের ঘটবে। গুণাগুণকে বস্তুরূপে দাঁড় করিয়ে কাজ চালানো হবে।
জানা দরকার, সাধারণ লোকের আল্লাহদত্ত প্রাণ ও জৈব প্রাণের ভেতর গভীর সম্পর্ক হওয়ায় স্বরূপ জগতের ব্যাপারগুলো সম্পর্কে তারা জন্মান্ধের মত হয়ে যায়। জন্মান্ধ যেমন আলো ও রূপের মোটামুটি ধারণা নেয়, তেমনি সাধারণ লোকদের ধারণা সৃষ্টির জন্য হাশরের দিন কিছু ব্যাপার আত্মপ্রকাশ করবে।–[তার ফলে তার জৈবিক প্রভাব লোপ পাবে এবং নিজের স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারবে।]
এ উদ্দেশ্যেই যখস সবলোক উত্থিত হবে তখন শুরুতেই একদলকে তাদের পাপ ও পুণ্যের জন্য শাস্তি ও পুরস্কার দেয়া হবে। সে বিচার তাদের হাল্কা ভাবেই করা হোক কিংবা কঠিন ভাবে। কিছু লোককে পুলসিরাত পার হতে বলা হবে। পাপীরা হোঁচট খাবে এবং পুণ্যবানরা স্বচ্ছন্দে পার হবে। কিছু লোককে তাদের নেতার পিছু ধরতে বলা হবে। পুণ্যবান নেতৃত্বের অনুসারীরা মুক্তি পেয়ে যাবে এবং পাপী নেতার অনুসারীরা ধ্বংস হবে। কিন্তু লোকের হাত-পা কথা বলবে এবং কিছু লোক আমলনামা পড়বে। কখনও কৃপণের কার্পণ্য রূপ ধরে এসে তার পিঠে সোয়ার হবে কিংবা দাগ হয়ে বসে যাবে।
মোটকথা, এ সব উপমা-উদাহরণ তার জাতিগত কার্যকলাপেরই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। যে ব্যক্তির আল্লাহদত্ত প্রাণ সবল ও জৈবিক প্রাণ উদার, তাদের সামনে উপমা-উদাহরণ আসবে সূক্ষ্মতর হয়ে ও পূর্ণত্ব নিয়ে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যে বলেছেন, ‘আমার উম্মতের অধিকাংশের শাস্তি কবরেই হয়ে যাবে’-এ ব্যাপারটি ঠিক উক্ত উপমা-উদাহরণেরই অন্তর্ভুক্ত। হাশর মাঠে এমন কিছু উপমা-উদাহরণও পেশ করা হবে যা সবাই সমানে দেখতে পাবে। যেমন মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সার্বজনীন নবুয়তের প্রতীক হবে ‘হাউজে কাওছার’। তেমনি মানুষের সুরক্ষিত কার্যকলাপের প্রতীক হবে ‘মীযান’। তেমনি উৎকৃষ্ট পানীয় এ হিসেবে ‘শরাবান তহুরা’। গৌরবের পরিধেয় হিসেবে ‘লেবাছে ফাখেরা’। অনিন্দ্য সহচরী হিসেবে ‘হুরে মাকসূরা’ এবং চিত্তাকর্ষী নিবাস হিসেবে ‘কসূরে দিল নশীন’ পেশ করা হবে। তেমনি পাপের আঁধার থেকে আল্লাহর নিয়ামতের দিকে ফিরে আসার জন্য আশ্চর্য ধরনের সব পদ্ধতি রয়েছে। যেমন মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সবার শেষে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের ব্যক্তি সম্পর্কে সে সব বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি তার আকৃতি-প্রকৃতিও বলে দিয়েছেন।–
[বোখারী ও মুসলিম শরীফের উক্ত হাদীসটি এই –“জনৈক জাহান্নামী আল্লাহর কাছে আরজ করবে, দয়াময় প্রভু! দোযখের আগুন আমাকে ঝলসে ফেলেছে, তাই তোমার দয়া থেকে আমাকে বঞ্চিত রেখ না। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, কিরূপ দয়া চাও! সে আরজ করবে, শুধু আমার মুখটাকে আগুন থেকে বাঁচাও, আর কিছু চাইনা। এ কথার ওপর সে প্রতিজ্ঞাও করবে। যখন তার মুখ আগুনথেকে ওপরে উঠে আসবে, তখন সে জান্নাতের ছায়াঘেরা বাগান দেখতে পাবে। অমনি তার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে। আরজ করবে, প্রভু! শুধু আমাকে বাগানটির কাছে যেতে দাও। তাকে ভালভাবে প্রতিজ্ঞা করিয়ে যখন গোসল সারিয়ে সেখানে নেয়া হবে, কিছুক্ষণ কোনমতে চুপ থেকেই জান্নাতের লোভনীয় আরাম-আয়েশের সামগ্রী দেখে আবার নতুন আব্দার তুলবে ইত্যাদি।]
মানুষের সেখানেও মানবিক বাসনা ও কামনা দেখা দেবে। সেমতে আল্লাহর নেয়ামতও বস্তুরূপে ধরা দেবে। মানুষের কামনা-বাসনায় পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্যও দেখা দেবে। আল্লাহর দানও সে অনুযায়ী প্রকাশ পাবে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদীসে তার ইংগিত পাই। তিনি বলেনঃ জান্নাতে ঢুকে আমি একটি রক্তিম অধরের শ্যামল তরুণী দেখতে পেলাম। প্রশ্ন করলাম, এ কে?-[মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) শ্যামল মেয়ে দেখে এ কারণে অবাক হলেন যে, আরবের দৃষ্টিতে তা সুন্দর নয়। সুতরাং তা দেখানো হল কেন?] জবাব পেলাম, জাফর ইবনে আবু তালিব এ ধরনের সহচরী পসন্দ করে বলেই একে সৃষ্টি করা হল।–[জা’ফর ইবনে আবু তালিব হিজরত করে বেশ কিছুদিন আবিসিনিয়া ছিলেন। সেখানে এ ধরনের মেয়েকে সুন্দরী বলা হয়। তাই তিনি তা পসন্দ করতেন।]
মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অন্যত্র বলেন, যদি তুমি জান্নাতে গিয়ে চাও যে, ইয়াকুতের লাল ঘোড়ায় চড়ে সর্বত্র ঘুরে বেড়াবে, তক্ষুণি তুমি পেয়ে যাবে এবং তোমার সুখ পূর্ণ হবে। অন্যত্র তিনি বলেন, এক জান্নাতী আল্লাহর কাছে চাষাবাদের অনুমতি চাইবে। তাকে আল্লাহ প্রশ্ন করবেন, তোমার মনের ইচ্ছা কি সব পূরণ করা হয় নি? সে জবাব দিবে হ্যাঁ, সবই পূর্ণ হয়েছে। তবে আমি চাষাবাদ খুব ভালবাসি। তখন সে অনুমতি পেয়ে ফসল বুনবে। দেখতে না দেখতে তা গাছ হয়ে ফুলে ও ফলে সুশোভিত ও পরিপক্ক হয়ে কর্তিত হয়ে যাবে। এমন কি নিমেষে তার চারদিকে ফসলের পাহাড় তৈরী হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ বলবেন, নাও হে আদম সন্তান! তোমার পেট তো কিছুতেই ভরে না। অবশেষে মিশকের টিলায় চড়ে আল্লাহর দীদার সবাই পেয়ে ধন্য হবে। তারপর আরও অনেক কিছু ঘটবে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন সবিস্তারে এ সব বলেন নি, আমিও তা প্রকাশ করা ঠিক মনে করলাম না।
পরবর্তী পর্ব-
সংগঠন উদ্ভাবন পদ্ধতি

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন